উপসর্গ কাকে বলে — প্রকারভেদ ও উদাহরণ
উপসর্গের সংজ্ঞা, তিন প্রকারভেদ এবং অর্থবাচকতা ও অর্থদ্যোতকতার পার্থক্য উদাহরণসহ।
সংজ্ঞা
যেসব অব্যয়সূচক শব্দাংশ ধাতু বা শব্দের আগে বসে নতুন শব্দ গঠন করে এবং অর্থের পরিবর্তন, সম্প্রসারণ বা সংকোচন ঘটায়, তাদের উপসর্গ বলে।
উপসর্গের নিজের অর্থ নেই, তবু অর্থ বদলায়
উপসর্গ এমন একটি শব্দাংশ যার নিজস্ব কোনো অর্থ নেই, অথচ শব্দের আগে বসলে সেই শব্দের অর্থ বদলে দেয় বা নতুন অর্থ যোগ করে। হার শব্দের সঙ্গে প্র বসলে হয় প্রহার, আ বসলে আহার, বি বসলে বিহার, পরি বসলে পরিহার। চারটি শব্দের অর্থ সম্পূর্ণ আলাদা, অথচ মূল শব্দ একটিই।
এই বৈশিষ্ট্যটিই উপসর্গকে অন্য শব্দাংশ থেকে আলাদা করে। প্রত্যয় বসে শব্দের শেষে, উপসর্গ বসে আগে। আবার সমাসে যে দুটি পদ মেলে, তাদের প্রত্যেকটির নিজস্ব অর্থ থাকে — উপসর্গের তা নেই। তাই উপসর্গকে বলা হয় অর্থহীন কিন্তু অর্থদ্যোতক।
ব্যাকরণে উপসর্গের কাজ তিনটি: নতুন অর্থ তৈরি করা, অর্থের প্রসার বা সংকোচন ঘটানো, আর কখনো কখনো কেবল শব্দটিকে অলংকৃত করা। শেষ ক্ষেত্রে উপসর্গ থাকলেও অর্থ প্রায় একই থাকে — যেমন পরিপূর্ণ, যেখানে পূর্ণ-ই যথেষ্ট ছিল।
- উপসর্গ বসে শব্দের আগে, প্রত্যয় বসে শেষে।
- উপসর্গের নিজস্ব অর্থ নেই, কিন্তু অর্থ দ্যোতনা আছে।
- বাংলায় উপসর্গ তিন শ্রেণির — খাঁটি বাংলা, তৎসম ও বিদেশি।
এক শব্দে চার উপসর্গ
| উপসর্গ | গঠিত শব্দ | অর্থ |
|---|---|---|
| প্র | প্রহার | আঘাত করা |
| আ | আহার | খাওয়া |
| বি | বিহার | ভ্রমণ |
| পরি | পরিহার | বর্জন |
| সম | সংহার | ধ্বংস |
- ✓ প্র + হার = প্রহার — মূল শব্দ এক, অর্থ ভিন্ন
- ✗ উপসর্গের নিজস্ব অর্থ আছে ✓ উপসর্গ অর্থহীন, কিন্তু অর্থদ্যোতক
তিন শ্রেণির উপসর্গ
বাংলায় ব্যবহৃত উপসর্গ তিন শ্রেণিতে ভাগ করা হয়, এবং সংখ্যাগুলো পরীক্ষায় সরাসরি জিজ্ঞাসা করা হয়। খাঁটি বাংলা উপসর্গ ২১টি, তৎসম বা সংস্কৃত উপসর্গ ২০টি, আর বিদেশি উপসর্গের নির্দিষ্ট সংখ্যা নেই।
একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য মনে রাখা দরকার। খাঁটি বাংলা উপসর্গ কেবল বাংলা শব্দের আগে বসে, আর তৎসম উপসর্গ বসে তৎসম শব্দের আগে। কয়েকটি উপসর্গ দুই তালিকাতেই আছে — নি, বি, সু, আ — কিন্তু তারা কোন শ্রেণির তা ঠিক হয় সঙ্গের শব্দটি দেখে।
| শ্রেণি | সংখ্যা | উদাহরণ উপসর্গ |
|---|---|---|
| খাঁটি বাংলা | ২১টি | অ, অনা, আড়, আন, কু, নি, পাতি, ভর, সা, হা |
| তৎসম / সংস্কৃত | ২০টি | প্র, পরা, অপ, সম, অনু, অব, নির, দুর, বি, অধি |
| বিদেশি | নির্দিষ্ট নয় | বে, বদ, কম, না, গর, লা, হেড, সাব, ফুল |
- ✓ নি + খুঁত = নিখুঁত — বাংলা শব্দ, তাই খাঁটি বাংলা উপসর্গ
- ✓ নি + বাস = নিবাস — তৎসম শব্দ, তাই তৎসম উপসর্গ
উপসর্গ, প্রত্যয় ও অব্যয় — গুলিয়ে ফেলার জায়গা
পরীক্ষায় প্রায়ই একটি শব্দাংশ দেখিয়ে জিজ্ঞাসা করা হয় সেটি উপসর্গ না প্রত্যয় না অব্যয়। তিনটির পার্থক্য অবস্থান ও স্বাধীনতায়। উপসর্গ শব্দের আগে বসে ও একা ব্যবহৃত হয় না; প্রত্যয় শব্দের শেষে বসে ও একা ব্যবহৃত হয় না; আর অব্যয় বাক্যে স্বাধীনভাবে বসতে পারে।
আরেকটি ফাঁদ হলো অ। একই অ কখনো উপসর্গ (অচেনা), কখনো নঞর্থক অব্যয়ের অংশ। যেটি শব্দের আগে বসে নতুন শব্দ গড়ছে, সেটিই উপসর্গ — আলাদা করে দাঁড়াতে পারলে সেটি অব্যয়।
| দিক | উপসর্গ | প্রত্যয় | অব্যয় |
|---|---|---|---|
| অবস্থান | শব্দের আগে | শব্দের পরে | বাক্যে যেকোনো জায়গায় |
| স্বাধীনতা | একা বসে না | একা বসে না | একা বসতে পারে |
| নিজস্ব অর্থ | নেই | নেই | আছে |
| উদাহরণ | প্র + যত্ন | চল + অন্ত | এবং, কিন্তু |
- ✓ অ + চেনা = অচেনা — উপসর্গ
- ✗ চলন্ত-এর অন্ত একটি উপসর্গ ✓ অন্ত একটি প্রত্যয়, শব্দের শেষে বসেছে
উপসর্গ শব্দের অর্থ কীভাবে বদলায়
একই উপসর্গ সব শব্দে একই কাজ করে না। কখনো অর্থ পুরো উল্টে যায়, কখনো তীব্র হয়, কখনো কেবল আনুষ্ঠানিক শোনায়। উত্তর লেখার সময় কোন ধরনের পরিবর্তন ঘটেছে তা বলতে পারলে ব্যাখ্যাটি সম্পূর্ণ হয়।
| পরিবর্তনের ধরন | উদাহরণ | ব্যাখ্যা |
|---|---|---|
| অর্থের বিপরীত | সম্ভব → অসম্ভব | নঞর্থকতা যোগ |
| অর্থের তীব্রতা | পূর্ণ → পরিপূর্ণ | মাত্রা বৃদ্ধি |
| অর্থের সংকোচন | হার → আহার | নির্দিষ্ট অর্থে সীমিত |
| সম্পূর্ণ নতুন অর্থ | হার → বিহার | সম্পর্কহীন নতুন অর্থ |
| অর্থের অবনতি | নাম → বদনাম | নেতিবাচক ভাব |
- ✓ কু + কর্ম = কুকর্ম — অর্থের অবনতি
- ✓ অতি + রিক্ত = অতিরিক্ত — মাত্রা বৃদ্ধি
উপসর্গ চেনার পদ্ধতি
একটি শব্দে উপসর্গ আছে কি না বুঝতে সহজ পরীক্ষা আছে: শব্দটির শুরুর অংশ বাদ দিয়ে দেখো বাকিটা অর্থবহ শব্দ থাকে কি না। প্রহার থেকে প্র বাদ দিলে হার থাকে, যা অর্থবহ — তাই প্র উপসর্গ। পাহাড় থেকে পা বাদ দিলে হাড় থাকে, কিন্তু পাহাড় ও হাড়-এর অর্থে কোনো সম্পর্ক নেই, তাই এখানে উপসর্গ নেই।
- বাদ দেওয়ার পর বাকি অংশ অর্থবহ হতে হবে।
- মূল শব্দ ও গঠিত শব্দের অর্থে সম্পর্ক থাকতে হবে।
- একই শব্দে একাধিক উপসর্গও বসতে পারে — সম + আ + হার = সমাহার।
- ✓ অনু + সরণ = অনুসরণ — সরণ অর্থবহ, সম্পর্কও আছে
- ✗ পাহাড় = পা + হাড় ✓ পাহাড়-এ কোনো উপসর্গ নেই
- ✓ সম + আ + হার = সমাহার — দুটি উপসর্গ পাশাপাশি
বিস্তারিত আলোচনা
উপসর্গের নিজের কোনো স্বাধীন অর্থ নেই, কিন্তু শব্দের আগে বসলে সে অর্থ বদলে দিতে পারে। "হার" শব্দের আগে "প্র" বসলে হয় প্রহার, "আ" বসলে আহার, "বি" বসলে বিহার, "উপ" বসলে উপহার। চারটি শব্দের অর্থ সম্পূর্ণ আলাদা, অথচ মূল শব্দ একই। এ কারণেই বলা হয় উপসর্গের অর্থবাচকতা নেই, কিন্তু অর্থদ্যোতকতা আছে।
বাংলা উপসর্গ তিন প্রকার — খাঁটি বাংলা উপসর্গ, তৎসম বা সংস্কৃত উপসর্গ এবং বিদেশি উপসর্গ। খাঁটি বাংলা উপসর্গ একুশটি, তৎসম উপসর্গ কুড়িটি, আর বিদেশি উপসর্গ এসেছে আরবি, ফারসি, উর্দু ও ইংরেজি থেকে। পরীক্ষায় প্রায়ই কোনো শব্দ দেখিয়ে জিজ্ঞাসা করা হয় সেখানে কোন শ্রেণির উপসর্গ ব্যবহৃত হয়েছে।
উপসর্গ ও প্রত্যয়ের পার্থক্য মনে রাখা জরুরি। উপসর্গ বসে শব্দের আগে, প্রত্যয় বসে শব্দ বা ধাতুর পরে। আবার উপসর্গ নিজে কোনো অর্থ বহন করে না, কিন্তু প্রত্যয় অনেক সময় নির্দিষ্ট অর্থ যোগ করে। "প্রশ্ন" শব্দে প্র উপসর্গ, আর "চালক" শব্দে অক প্রত্যয়।
মনে রাখার কথা
উপসর্গের অর্থবাচকতা নেই কিন্তু অর্থদ্যোতকতা আছে — এই বাক্যটিই উপসর্গ অধ্যায়ের প্রাণ।
সাধারণ ভুল
পরীক্ষায় এই ভুলগুলোই সবচেয়ে বেশি নম্বর কাটে। ভুল রূপটি দেখে নিলে নিজের লেখায় ধরা সহজ হয়।
- ✗ উপসর্গের নিজস্ব অর্থ আছে। ✓ উপসর্গ অর্থহীন, কিন্তু শব্দের অর্থ বদলে দেয়।
- ✗ উপসর্গ শব্দের শেষে বসে। ✓ উপসর্গ শব্দের আগে বসে; শেষে বসে প্রত্যয়।
- ✗ খাঁটি বাংলা উপসর্গ ২০টি। ✓ খাঁটি বাংলা উপসর্গ ২১টি; তৎসম উপসর্গ ২০টি।
- ✗ পাহাড় শব্দে পা একটি উপসর্গ। ✓ পাহাড়-এ কোনো উপসর্গ নেই — হাড়-এর সঙ্গে অর্থের সম্পর্ক নেই।
অনুশীলন
নিচের প্রশ্নগুলোর উত্তর নিজে লেখো, তারপর মিলিয়ে নাও।
- উপসর্গ কাকে বলে?
- বাংলা ভাষায় উপসর্গ কত প্রকার ও কী কী?
- “হার” শব্দের আগে চারটি উপসর্গ বসিয়ে চারটি শব্দ লেখো।
- উপসর্গ ও প্রত্যয়ের পার্থক্য কী?
- একটি শব্দে উপসর্গ আছে কি না তা কীভাবে যাচাই করবে?
- একই শব্দে দুটি উপসর্গ বসতে পারে কি? উদাহরণ দাও।
- উপসর্গ কোন কোন ভাবে শব্দের অর্থ বদলায়?
- বিদেশি উপসর্গের চারটি উদাহরণ দাও।
উত্তর
- যে অর্থহীন শব্দাংশ শব্দের আগে বসে নতুন অর্থ তৈরি করে বা অর্থের পরিবর্তন ঘটায়, তাকে উপসর্গ বলে।
- তিন প্রকার — খাঁটি বাংলা উপসর্গ (২১টি), তৎসম বা সংস্কৃত উপসর্গ (২০টি) এবং বিদেশি উপসর্গ।
- প্রহার, আহার, বিহার ও পরিহার। মূল শব্দ এক হলেও চারটির অর্থ সম্পূর্ণ আলাদা।
- উপসর্গ শব্দের আগে বসে আর প্রত্যয় শব্দের শেষে; দুটিরই নিজস্ব অর্থ নেই, কিন্তু অবস্থান আলাদা।
- শুরুর অংশ বাদ দিয়ে দেখো বাকিটা অর্থবহ শব্দ কি না এবং দুটির অর্থে সম্পর্ক আছে কি না — দুটিই থাকলে সেটি উপসর্গ।
- পারে। যেমন সম + আ + হার = সমাহার, এখানে সম ও আ দুটিই উপসর্গ।
- পাঁচভাবে — অর্থ উল্টে দেয় (সম্ভব > অসম্ভব), তীব্র করে (পূর্ণ > পরিপূর্ণ), সংকুচিত করে (হার > আহার), সম্পূর্ণ নতুন অর্থ দেয় (হার > বিহার) এবং অবনতি ঘটায় (নাম > বদনাম)।
- বে (বেআইনি), বদ (বদমেজাজ), গর (গরমিল) ও হেড (হেডমাস্টার) — যথাক্রমে ফারসি, ফারসি, আরবি ও ইংরেজি থেকে।
উপযোগী শ্রেণি: নবম, দশম, একাদশ, দ্বাদশ শ্রেণি।
সচরাচর জিজ্ঞাসা
যেসব অব্যয়সূচক শব্দাংশ ধাতু বা শব্দের আগে বসে নতুন শব্দ গঠন করে ও অর্থের পরিবর্তন ঘটায়, তাদের উপসর্গ বলে। যেমন প্র + হার = প্রহার।
তিন প্রকার — খাঁটি বাংলা উপসর্গ (২১টি), তৎসম বা সংস্কৃত উপসর্গ (২০টি) এবং বিদেশি উপসর্গ, যা আরবি, ফারসি, উর্দু ও ইংরেজি থেকে এসেছে।
উপসর্গ বসে শব্দ বা ধাতুর আগে, প্রত্যয় বসে পরে। উপসর্গের নিজস্ব অর্থ নেই, কেবল অর্থদ্যোতকতা আছে; প্রত্যয় অনেক সময় নির্দিষ্ট অর্থ যোগ করে।
পারে। যেমন সম + আ + হার = সমাহার, কিংবা প্র + তি + ঘাত = প্রতিঘাত। উপসর্গ পরপর বসে অর্থে নতুন স্তর যোগ করে।
আরও বাংলা ব্যাকরণ পড়ো
বাংলা ব্যাকরণ-এর পূর্ণ তালিকা ও বাংলা লেখার অন্যান্য অংশ এক জায়গায়।
আমাদের সাথে যুক্ত থাকো
পড়াশোনার আপডেট, সাজেশন ও প্রশ্নোত্তর সবার আগে পেতে আমাদের ফেসবুক পেজ ও গ্রুপে যুক্ত হও।






















