মূলপাতা
লগইন

Color

Indigo
Red
Green
Teal
Blue
Purple
Rose

Mode

Light
EN

অপিনিহিতি, সমীভবন, ধ্বনি বিপর্যয়সহ ধ্বনি পরিবর্তনের সব প্রকার — উদাহরণসহ।

ধ্বনি পরিবর্তন — প্রকারভেদ ও উদাহরণ

অপিনিহিতি, সমীভবন, ধ্বনি বিপর্যয়সহ ধ্বনি পরিবর্তনের সব প্রকার — উদাহরণসহ।

সংজ্ঞা

উচ্চারণের সুবিধা বা অনায়াস প্রবণতার কারণে শব্দের ভেতরের ধ্বনি যখন স্থান বদলায়, লোপ পায় বা নতুন ধ্বনি যুক্ত হয়, তাকে ধ্বনি পরিবর্তন বলে।

ধ্বনি পরিবর্তন কেন ঘটে

ভাষা মুখে মুখে চলে, আর মুখ সব সময় সহজ পথ খোঁজে। উচ্চারণে যেটুকু শ্রম কমানো যায়, বক্তা তা কমিয়ে নেন — বহু মানুষ বহুকাল ধরে একই কাজ করলে শব্দের চেহারাই বদলে যায়। এই স্বাভাবিক বদলের নামই ধ্বনি পরিবর্তন।

তাই ধ্বনি পরিবর্তন ভুল নয়, ভাষার জীবিত থাকার লক্ষণ। স্কুল থেকে ইস্কুল, রত্ন থেকে রতন — প্রতিটির পেছনে উচ্চারণকে সহজ করার একটি কারণ আছে।

  • পরিবর্তনগুলো ঘটে স্বরাগম, স্বরলোপ, স্থান বদল ও ধ্বনির প্রভাব — এই চার ধরনে।
  • পরীক্ষায় নাম ও উদাহরণ মিলিয়ে জিজ্ঞাসা করা হয়, তাই জোড়ায় মনে রাখা কাজে দেয়।

স্বরাগম — নতুন স্বর যুক্ত হওয়া

উচ্চারণ সহজ করতে শব্দের ভেতরে বা প্রান্তে একটি স্বরধ্বনি যুক্ত হয়। কোথায় যুক্ত হচ্ছে তার ওপর নাম নির্ভর করে।

প্রকারকোথায়উদাহরণ
আদি স্বরাগমশব্দের শুরুতেস্কুল > ইস্কুল, স্টেশন > ইস্টিশন
মধ্য স্বরাগম / বিপ্রকর্ষশব্দের মাঝেরত্ন > রতন, ধর্ম > ধরম
অন্ত্য স্বরাগমশব্দের শেষেসত্য > সত্যি, বেঞ্চ > বেঞ্চি
  • স্পর্ধা > আস্পর্ধাআদি স্বরাগম
  • গ্রাম > গেরামমধ্য স্বরাগম

স্বরলোপ ও ধ্বনি লোপ

প্রকারব্যাখ্যাউদাহরণ
সম্প্রকর্ষ / সংকোচনমাঝের স্বর লোপবসতি > বস্তি, জানালা > জানলা
অন্তর্হতিমাঝের ব্যঞ্জন লোপফাল্গুন > ফাগুন, আলাহিদা > আলাদা
সমাক্ষরলোপএকই ধ্বনির পুনরাবৃত্তি লোপবড় দাদা > বড়দা
  • ফলাহার > ফলারঅন্তর্হতি
  • বসতি > বস্তিসম্প্রকর্ষ

অপিনিহিতি, অভিশ্রুতি ও ধ্বনি বিপর্যয়

এই তিনটি পরীক্ষায় সবচেয়ে বেশি গুলিয়ে যায়, কারণ তিনটিতেই ধ্বনির অবস্থান বদলায়। পার্থক্যটি ছকে দেখে নিলে আর মেলাতে অসুবিধা হয় না।

নামকী ঘটেউদাহরণ
অপিনিহিতিপরের ই বা উ আগে উচ্চারিত হয়আজি > আইজ, রাখিয়া > রাইখা
অভিশ্রুতিঅপিনিহিতির পর স্বর মিলে নতুন রূপকরিয়া > কইরা > করে
ধ্বনি বিপর্যয়দুটি ধ্বনি স্থান বদল করেরিকশা > রিসকা, বাকস > বাসক
  • সাধু “করিয়া” > চলিত “করে”অভিশ্রুতির ফল
  • আইজ — ধ্বনি বিপর্যয় আইজ — অপিনিহিতি

সমীভবন, বিষমীভবন ও স্বরসঙ্গতি

নামকী ঘটেউদাহরণ
সমীভবনপাশের ধ্বনির প্রভাবে এক হয়ে যাওয়াজন্ম > জম্ম, কাঁদনা > কান্না
বিষমীভবনএকই ধ্বনির একটি বদলে যাওয়ালাল > নাল, শরীর > শরীল
স্বরসঙ্গতিএক স্বরের প্রভাবে অন্য স্বর বদলদেশি > দিশি, বিলাতি > বিলিতি
  • উড়িয়া > উড়েস্বরসঙ্গতি ও অভিশ্রুতি একসঙ্গে
  • তসবি > তসবিহ নয়, বরং লাল > নাল বিষমীভবনএকই ধ্বনির পুনরাবৃত্তি ভাঙে

ধ্বনি পরিবর্তনের নাম মেলানোর ছক

পরীক্ষায় প্রশ্নের চেহারা প্রায় সব সময় এক — একটি শব্দজোড়া দিয়ে বলা হয় এটি কোন প্রক্রিয়ার উদাহরণ। তাই নামগুলোর সঙ্গে একটি করে চেনা উদাহরণ গেঁথে রাখলে উত্তর সঙ্গে সঙ্গে মেলে।

নাম ও চেনা উদাহরণ

প্রক্রিয়াচেনা জোড়াএক কথায়
আদি স্বরাগমস্কুল > ইস্কুলশুরুতে স্বর যোগ
মধ্য স্বরাগমরত্ন > রতনমাঝে স্বর যোগ
অন্ত্য স্বরাগমসত্য > সত্যিশেষে স্বর যোগ
সম্প্রকর্ষবসতি > বস্তিমাঝের স্বর লোপ
অন্তর্হতিফাল্গুন > ফাগুনমাঝের ব্যঞ্জন লোপ
অপিনিহিতিআজি > আইজই আগে চলে এল
অভিশ্রুতিকরিয়া > করেঅপিনিহিতির পরের ধাপ
ধ্বনি বিপর্যয়বাকস > বাসকদুই ধ্বনি স্থান বদল
সমীভবনজন্ম > জম্মপাশের মতো হয়ে যাওয়া
বিষমীভবনলাল > নালএকই ধ্বনির একটি বদল
স্বরসঙ্গতিদেশি > দিশিএক স্বরের প্রভাবে অন্যটি
  • গ্রাম > গেরাম — মধ্য স্বরাগম
  • জানালা > জানলা — সম্প্রকর্ষ
  • রিকশা > রিসকা — ধ্বনি বিপর্যয়

সমীভবনের তিন প্রকার

সমীভবন প্রশ্নে বেশি আসে, আর এর ভেতরেও তিনটি ভাগ আছে — কোন ধ্বনি কোনটিকে টানছে, তার ওপর নাম নির্ভর করে। ভাগ তিনটি চিনে রাখলে “কোন সমীভবন” প্রশ্নের উত্তরও দেওয়া যায়।

প্রকারকী ঘটেউদাহরণ
প্রগত সমীভবনআগের ধ্বনি পরেরটিকে বদলায়চক্র > চক্ক, পক্ব > পক্ক
পরাগত সমীভবনপরের ধ্বনি আগেরটিকে বদলায়তৎ + জন্য > তজ্জন্য
অন্যোন্য সমীভবনদুটিই বদলে যায়সত্য > সচ্চ
  • কাঁদনা > কান্না — পরাগত সমীভবন
  • চক্র > চক্ক — পরাগত চক্র > চক্ক — প্রগত

সাধু থেকে চলিত — ধ্বনি পরিবর্তনের বড় উদাহরণ

বাংলা গদ্যে সাধু রীতি থেকে চলিত রীতিতে যাওয়ার পুরো প্রক্রিয়াটাই আসলে ধ্বনি পরিবর্তনের একটি বড় উদাহরণ। ক্রিয়াপদ ও সর্বনামের সাধু রূপ চলিত রূপে আসতে গিয়ে অপিনিহিতি ও অভিশ্রুতির ধাপ পেরিয়েছে।

  • ক্রিয়াপদের পরিবর্তন মূলত অপিনিহিতি → অভিশ্রুতি
  • সর্বনামের পরিবর্তন মূলত অন্তর্হতি — মাঝের হ লোপ পেয়েছে।
সাধু রূপমধ্যবর্তীচলিত রূপ
করিয়াকইরাকরে
বলিয়াবইলাবলে
দেখিয়াদেইখাদেখে
তাহারতার
যাহারাযারা
হইয়াছেহইছেহয়েছে
  • তাহার > তার — অন্তর্হতি
  • করিয়া > করে — অভিশ্রুতি

বিস্তারিত আলোচনা

ভাষা জীবন্ত, তাই ধ্বনি স্থির থাকে না। মানুষ কথা বলতে গিয়ে সহজ পথ খোঁজে, আর সেই সহজ করার প্রবণতা থেকেই ধ্বনি পরিবর্তন ঘটে। বহু বছরের ব্যবহারে "রাত্রি" হয়েছে "রাত", "হস্ত" হয়েছে "হাত"। এই পরিবর্তনগুলো এলোমেলো নয়; এদের নির্দিষ্ট ধরন আছে এবং ব্যাকরণে তার আলাদা নাম দেওয়া হয়েছে।

আদি স্বরাগমে শব্দের শুরুতে স্বর যুক্ত হয় — স্কুল > ইস্কুল, স্টেশন > ইস্টিশন। মধ্য স্বরাগম বা বিপ্রকর্ষে শব্দের মাঝে স্বর ঢোকে — রত্ন > রতন, ধর্ম > ধরম। অন্ত্য স্বরাগমে শেষে স্বর যোগ হয় — বেঞ্চ > বেঞ্চি। আবার অপিনিহিতিতে ই বা উ আগে চলে আসে — আজি > আইজ, রাখিয়া > রাইখা।

সমীভবনে পাশাপাশি দুটি অসম ধ্বনি মিলে সমান হয়ে যায় — জন্ম > জম্ম, কাঁদনা > কান্না। বিষমীভবনে উল্টোটা ঘটে, দুটি সমান ধ্বনির একটি বদলে যায় — লাল > নাল, শরীর > শরীল। আর ধ্বনি বিপর্যয়ে দুটি ধ্বনি স্থান বদল করে — বাক্স > বাস্ক, রিকশা > রিশকা, পিশাচ > পিচাশ।

মনে রাখার কথা

ধ্বনি পরিবর্তন ভুল নয়, ভাষার স্বাভাবিক গতি — তবে পরীক্ষায় প্রতিটি প্রকারের নাম ও উদাহরণ আলাদা করে জানা চাই।

সাধারণ ভুল

পরীক্ষায় এই ভুলগুলোই সবচেয়ে বেশি নম্বর কাটে। ভুল রূপটি দেখে নিলে নিজের লেখায় ধরা সহজ হয়।

  • রত্ন > রতন — আদি স্বরাগম রত্ন > রতন — মধ্য স্বরাগম বা বিপ্রকর্ষ
  • করিয়া > করে — অপিনিহিতি করিয়া > করে — অভিশ্রুতি
  • জন্ম > জম্ম — বিষমীভবন জন্ম > জম্ম — সমীভবন
  • ধ্বনি পরিবর্তন ভাষার ভুল। এটি ভাষার স্বাভাবিক ও জীবন্ত পরিবর্তন।

অনুশীলন

নিচের প্রশ্নগুলোর উত্তর নিজে লেখো, তারপর মিলিয়ে নাও।

  1. “ইস্কুল” কোন ধরনের ধ্বনি পরিবর্তন?
  2. অপিনিহিতি ও অভিশ্রুতির পার্থক্য কী?
  3. “বস্তি” শব্দটি কোন প্রক্রিয়ায় গঠিত?
  4. “জানালা > জানলা” কী ধরনের পরিবর্তন?
  5. সমীভবন কাকে বলে?
  6. “দেশি > দিশি” কোন প্রক্রিয়ার উদাহরণ?
  7. প্রগত ও পরাগত সমীভবনের পার্থক্য কী?
  8. অন্যোন্য সমীভবন কাকে বলে?
  9. “ফাল্গুন > ফাগুন” কোন প্রক্রিয়ার উদাহরণ?

উত্তর

  1. আদি স্বরাগম — শব্দের শুরুতে একটি স্বরধ্বনি যুক্ত হয়েছে।
  2. অপিনিহিতিতে পরের ই বা উ আগে উচ্চারিত হয় (আজি > আইজ); অভিশ্রুতিতে সেই পরিবর্তনের পর স্বরগুলো মিলে নতুন রূপ নেয় (করিয়া > কইরা > করে)।
  3. সম্প্রকর্ষ বা সংকোচন — বসতি শব্দের মাঝের স্বর লোপ পেয়েছে।
  4. মধ্যস্বরলোপ বা সম্প্রকর্ষ — মাঝের স্বরধ্বনি লোপ পেয়েছে।
  5. পাশাপাশি দুটি ধ্বনির একটি অন্যটির প্রভাবে তার মতো হয়ে গেলে তাকে সমীভবন বলে — যেমন জন্ম > জম্ম।
  6. স্বরসঙ্গতি — পরের স্বরের প্রভাবে আগের স্বর বদলে গেছে।
  7. প্রগত সমীভবনে আগের ধ্বনি পরেরটিকে নিজের মতো করে নেয় (চক্র > চক্ক), আর পরাগত সমীভবনে পরের ধ্বনি আগেরটিকে বদলায় (কাঁদনা > কান্না)।
  8. যেখানে পাশাপাশি দুটি ধ্বনিই পরস্পরের প্রভাবে বদলে যায়, তাকে অন্যোন্য সমীভবন বলে — যেমন সত্য > সচ্চ।
  9. অন্তর্হতি — শব্দের মাঝের ব্যঞ্জনধ্বনিটি লোপ পেয়েছে।

উপযোগী শ্রেণি: নবম, দশম, একাদশ, দ্বাদশ শ্রেণি।

সচরাচর জিজ্ঞাসা

আরও বাংলা ব্যাকরণ পড়ো

বাংলা ব্যাকরণ-এর পূর্ণ তালিকা ও বাংলা লেখার অন্যান্য অংশ এক জায়গায়।

আমাদের সাথে যুক্ত থাকো

পড়াশোনার আপডেট, সাজেশন ও প্রশ্নোত্তর সবার আগে পেতে আমাদের ফেসবুক পেজ ও গ্রুপে যুক্ত হও।