মূলপাতা
লগইন

Color

Indigo
Red
Green
Teal
Blue
Purple
Rose

Mode

Light
EN

শব্দের সংজ্ঞা, উৎস ও গঠন অনুসারে শ্রেণিবিভাগ এবং যৌগিক, রূঢ়ি ও যোগরূঢ় শব্দের পার্থক্য।

শব্দ কাকে বলে — শ্রেণিবিভাগ ও উদাহরণ

শব্দের সংজ্ঞা, উৎস ও গঠন অনুসারে শ্রেণিবিভাগ এবং যৌগিক, রূঢ়ি ও যোগরূঢ় শব্দের পার্থক্য।

সংজ্ঞা

অর্থবোধক ধ্বনি বা ধ্বনিসমষ্টিকে শব্দ বলে। যে ধ্বনিগুচ্ছ কোনো অর্থ প্রকাশ করে না, সেটি শব্দ নয় — অর্থই শব্দের প্রধান শর্ত।

উৎস অনুসারে শব্দের পাঁচ ভাগ

বাংলা ভাষার শব্দভাণ্ডার এক জায়গা থেকে আসেনি। কিছু শব্দ সংস্কৃত থেকে সরাসরি এসেছে, কিছু ভেঙেচুরে এসেছে, কিছু এদেশের আদি অধিবাসীদের ভাষা থেকে, আর কিছু বিদেশি বণিক ও শাসকদের সঙ্গে। উৎস চিনলে বানানের নিয়মও ধরা পড়ে — ণত্ব ও ষত্ব বিধান কেবল তৎসম শব্দেই খাটে।

উৎস অনুসারে শব্দ

শ্রেণিপরিচয়উদাহরণ
তৎসমসংস্কৃত থেকে অবিকৃতচন্দ্র, সূর্য, নক্ষত্র, ভবন
অর্ধতৎসমসংস্কৃত থেকে সামান্য বিকৃতজ্যোছনা, ছেরাদ্দ, গিন্নি
তদ্ভবপ্রাকৃতের পথ ধরে বিবর্তিতচাঁদ, হাত, মাথা, ঘর
দেশিএদেশের আদি ভাষা থেকেকুড়ি, ডাব, ঢেঁকি, চুলা
বিদেশিঅন্য ভাষা থেকে গৃহীতকলম, চেয়ার, আইন, টেবিল
  • সংস্কৃত চন্দ্র > প্রাকৃত চন্দ > বাংলা চাঁদতদ্ভবের পথ
  • চাঁদ একটি তৎসম শব্দ চাঁদ একটি তদ্ভব শব্দ
  • গিন্নি তদ্ভব গিন্নি অর্ধতৎসমগৃহিণী থেকে সামান্য বিকৃত

বিদেশি শব্দ কোথা থেকে এল

বাংলায় বিদেশি শব্দের সংখ্যা কম নয়, এবং কোন শব্দ কোন ভাষা থেকে এসেছে তা পরীক্ষায় সরাসরি জিজ্ঞাসা করা হয়। বাণিজ্য, শাসন ও ধর্মের সূত্রেই এই শব্দগুলো ভাষায় ঢুকেছে।

ভাষাউদাহরণ
আরবিআল্লাহ, কিতাব, কলম, আদালত, হালাল
ফারসিচশমা, দোকান, বাগান, রোজা, দরবার
তুর্কিচাকু, তোপ, উজবুক, বাবা, বেগম
পর্তুগিজআলমারি, চাবি, বালতি, জানালা, গির্জা
ইংরেজিস্কুল, অফিস, টিকিট, ব্যাংক
হিন্দিপানি নয়—চাহিদা, খানা, ওয়ালা
  • আলমারি, চাবি, বালতি — পর্তুগিজপর্তুগিজরা প্রথম ইউরোপীয় বণিক
  • চেয়ার আরবি শব্দ চেয়ার ইংরেজি শব্দ

গঠন অনুসারে শব্দ — মৌলিক ও সাধিত

উৎসের ভাগ ছাড়াও শব্দকে গঠনের দিক থেকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়। যে শব্দকে আর ভাঙা যায় না, তা মৌলিক; আর উপসর্গ, প্রত্যয় বা সমাসের সাহায্যে যে শব্দ তৈরি, তা সাধিত।

  • সাধিত শব্দ তিনভাবে তৈরি হয় — উপসর্গযোগে, প্রত্যয়যোগেসমাসে
  • চলন্ত = চল্ + অন্ত (প্রত্যয়), প্রশাসন = প্র + শাসন (উপসর্গ), নীলাকাশ = নীল আকাশ (সমাস)।
ভাগসংজ্ঞাউদাহরণ
মৌলিক শব্দভাঙলে অর্থ থাকে নাগোলাপ, নাক, লাল, তিন
সাধিত শব্দউপসর্গ/প্রত্যয়/সমাসে গঠিতচলন্ত, প্রশাসন, নীলাকাশ
  • হাত — মৌলিকভাঙলে অর্থহীন
  • হাতল — সাধিতহাত + ল প্রত্যয়

অর্থ অনুসারে শব্দের ভাগ

একই শব্দ সব সময় একই অর্থ দেয় না। ব্যাকরণে অর্থের দিক থেকে শব্দকে তিন ভাগে দেখা হয়, এবং যোগরূঢ় শব্দ নিয়েই প্রশ্নে সবচেয়ে বেশি বিভ্রান্তি হয়।

ভাগব্যাখ্যাউদাহরণ
যৌগিক শব্দপ্রকৃতি-প্রত্যয়ের অর্থই বজায় থাকেগায়ক (গৈ + অক = যে গায়)
রূঢ়/রূঢ়ি শব্দব্যুৎপত্তিগত অর্থ ছেড়ে নতুন অর্থহস্তী (হস্ত আছে যার, কিন্তু বোঝায় হাতি)
যোগরূঢ় শব্দসমাসের অর্থ ছেড়ে বিশেষ অর্থপঙ্কজ (পঙ্কে জন্মে যা, কিন্তু বোঝায় পদ্ম)
  • পঙ্কজ — শামুকও পঙ্কে জন্মায়, তবু শব্দটি কেবল পদ্ম বোঝায়তাই যোগরূঢ়
  • পঙ্কজ যৌগিক শব্দ পঙ্কজ যোগরূঢ় শব্দ

উৎস চেনার কাজের কৌশল

  • শব্দে ণ, ষ, ঋ, ক্ষ, জ্ঞ থাকলে প্রায় নিশ্চিতভাবে তৎসম।
  • চন্দ্র/চাঁদ, হস্ত/হাত জাতীয় জোড়া পেলে দ্বিতীয়টি তদ্ভব।
  • খাদ্য-পোশাক-আসবাবের নাম হলে অনেক সময় বিদেশি — আলমারি, চেয়ার, বিরিয়ানি।
  • সংখ্যা ও গ্রামীণ জিনিসের নাম প্রায়ই দেশি — কুড়ি, ডাব, ঢেঁকি।
  • কৃষ্ণ — ঋ ও ষ আছে, তাই তৎসম
  • ঢেঁকি — গ্রামীণ যন্ত্র, দেশি শব্দ

শব্দভাণ্ডার কীভাবে গড়ে উঠল

বাংলা ভাষার শব্দভাণ্ডার এক দিনে তৈরি হয়নি, আর কোনো একক উৎস থেকেও আসেনি। এর ভিত্তি প্রাচীন ভারতীয় আর্য ভাষা, কিন্তু তার ওপর স্তরে স্তরে জমা হয়েছে এদেশের আদি অধিবাসীদের শব্দ, বণিকদের আনা শব্দ এবং শাসকদের ভাষার শব্দ। একটি ভাষার শব্দভাণ্ডার আসলে সেই জনগোষ্ঠীর ইতিহাসেরই প্রতিচ্ছবি।

সে কারণেই কোন শব্দ কোথা থেকে এল তা জানা কেবল পরীক্ষার প্রশ্ন নয়। তুর্কি ও ফারসি শব্দগুলো এসেছে শাসনব্যবস্থার সঙ্গে, তাই আদালত, দরবার, ফরমান জাতীয় শব্দ প্রশাসনিক। পর্তুগিজ শব্দ এসেছে বাণিজ্যের সঙ্গে, তাই আলমারি, বালতি, চাবি জাতীয় ঘরোয়া জিনিসের নাম। ইংরেজি শব্দ এসেছে শিক্ষা ও প্রযুক্তির সঙ্গে, তাই স্কুল, কলেজ, টিকিট

এই সূত্রটি মনে রাখলে অচেনা শব্দের উৎস অনুমান করাও সহজ হয়। শব্দটি কী বোঝাচ্ছে দেখে ভাবো, বাংলায় সেই জিনিসটি কাদের হাত ধরে এসেছে — উত্তর প্রায়ই মিলে যায়।

  • প্রশাসন ও আইনের শব্দ — বেশির ভাগ আরবি-ফারসি
  • ঘরোয়া আসবাব ও বাসনের নাম — অনেকটাই পর্তুগিজ
  • শিক্ষা, যন্ত্র ও অফিসের শব্দ — মূলত ইংরেজি
  • কৃষি, গ্রামীণ যন্ত্র ও সংখ্যাবাচক কিছু শব্দ — দেশি
  • আদালত, ফরমান, দরবার — শাসনের সূত্রে আরবি-ফারসি
  • বালতি, আলমারি, চাবি — বাণিজ্যের সূত্রে পর্তুগিজ
  • ঢেঁকি, কুড়ি, ডাব — এদেশের আদি ভাষা থেকে দেশি

পরীক্ষায় শব্দ অধ্যায় থেকে যা আসে

শব্দ অধ্যায় থেকে প্রশ্ন প্রায় সব সময় তিনটি ভাগের একটিতে পড়ে — উৎস, গঠন বা অর্থ। প্রশ্নের ভাষা দেখেই বোঝা যায় কোন ভাগ চাওয়া হচ্ছে। “কোন শ্রেণির শব্দ” জিজ্ঞাসা করলে উৎস, “কোন প্রকারে গঠিত” জিজ্ঞাসা করলে গঠন, আর “যোগরূঢ় কি না” জিজ্ঞাসা করলে অর্থ।

উত্তর লেখার সময় কেবল নামটি লিখে থেমে যাওয়া সবচেয়ে বড় ভুল। শ্রেণির নামের সঙ্গে কারণটিও এক বাক্যে লিখতে হয় — “চাঁদ তদ্ভব শব্দ, কারণ সংস্কৃত চন্দ্র প্রাকৃত চন্দ হয়ে বাংলায় চাঁদ রূপ নিয়েছে”। এই এক বাক্যেই পূর্ণ নম্বর আর অর্ধেক নম্বরের পার্থক্য।

বহুনির্বাচনি অংশে সবচেয়ে বেশি ফাঁদ পাতা হয় অর্ধতৎসম ও যোগরূঢ় শব্দ নিয়ে। অর্ধতৎসমকে তদ্ভব ভেবে ফেলা আর যোগরূঢ়কে যৌগিক ভেবে ফেলা — এই দুটিই বছরের পর বছর একই রকম ভুল হিসেবে ফিরে আসে।

  • শ্রেণির নাম + কারণ — উত্তরের পূর্ণ রূপ এটাই।
  • অর্ধতৎসম বনাম তদ্ভব: সংস্কৃত থেকে সরাসরি সামান্য বিকৃত হলে অর্ধতৎসম।
  • যোগরূঢ় বনাম যৌগিক: অর্থ সংকুচিত হয়ে একটি বিশেষ জিনিস বোঝালে যোগরূঢ়।
  • ণ, ষ, ঋ, ক্ষ, জ্ঞ দেখলে তৎসম ধরে নেওয়া নিরাপদ।
  • উত্তর: তদ্ভব। উত্তর: তদ্ভব, কারণ চন্দ্র > চন্দ > চাঁদ।কারণ ছাড়া নম্বর কাটে
  • হস্তী যৌগিক শব্দ হস্তী রূঢ়ি শব্দহস্ত আছে যার — কিন্তু বোঝায় কেবল হাতি

বিস্তারিত আলোচনা

বাংলা শব্দকে দুইভাবে ভাগ করা হয় — উৎস অনুসারে এবং গঠন অনুসারে। উৎস অনুসারে শব্দ চার শ্রেণিতে পড়ে: তৎসম, অর্ধ-তৎসম, তদ্ভব এবং দেশি ও বিদেশি। এই ভাগটি জানা জরুরি, কারণ ণত্ব-ষত্ব বিধান কিংবা বানানের অনেক নিয়ম কেবল তৎসম শব্দেই খাটে, বাকিগুলোতে নয়।

গঠন অনুসারে শব্দ দুই প্রকার — মৌলিক ও সাধিত। যে শব্দকে ভাঙলে আর কোনো অর্থবোধক অংশ পাওয়া যায় না, তা মৌলিক শব্দ, যেমন হাত, নাক, গোলাপ। আর উপসর্গ, প্রত্যয় বা সমাসের সাহায্যে যে শব্দ গঠিত হয়, তা সাধিত শব্দ — যেমন হাতল, প্রশ্ন, চালক, নীলাকাশ।

আরেকটি ভাগ আছে অর্থ অনুসারে। যৌগিক শব্দে প্রকৃতি ও প্রত্যয়ের অর্থ মিলে যা দাঁড়ায়, শব্দের অর্থও তা-ই — যেমন গায়ক মানে যে গান গায়। রূঢ়ি শব্দে সেই অর্থ থাকে না, বরং অন্য অর্থ প্রচলিত হয়ে যায় — হস্তী মানে হাতযুক্ত নয়, একটি প্রাণী। আর যোগরূঢ় শব্দে সমাসনিষ্পন্ন অর্থের বাইরে বিশেষ অর্থ বসে, যেমন পঙ্কজ মানে যে-কোনো কাদাজাত বস্তু নয়, পদ্মফুল।

মনে রাখার কথা

শব্দের শ্রেণিবিভাগ মুখস্থ না করে উদাহরণ দিয়ে চিনতে শেখো — পরীক্ষায় উদাহরণ থেকেই শ্রেণি জিজ্ঞাসা করা হয়।

সাধারণ ভুল

পরীক্ষায় এই ভুলগুলোই সবচেয়ে বেশি নম্বর কাটে। ভুল রূপটি দেখে নিলে নিজের লেখায় ধরা সহজ হয়।

  • চাঁদ তৎসম শব্দ। চাঁদ তদ্ভব; এর তৎসম রূপ চন্দ্র।
  • গিন্নি তদ্ভব শব্দ। গিন্নি অর্ধতৎসম — গৃহিণী থেকে সামান্য বিকৃত।
  • পঙ্কজ যৌগিক শব্দ। পঙ্কজ যোগরূঢ় শব্দ — অর্থ সংকুচিত হয়ে কেবল পদ্ম।
  • আলমারি আরবি শব্দ। আলমারি পর্তুগিজ শব্দ।

অনুশীলন

নিচের প্রশ্নগুলোর উত্তর নিজে লেখো, তারপর মিলিয়ে নাও।

  1. উৎস অনুসারে শব্দ কত প্রকার ও কী কী?
  2. তৎসম ও তদ্ভব শব্দের পার্থক্য কী?
  3. দেশি শব্দের তিনটি উদাহরণ দাও।
  4. “পঙ্কজ” কোন শ্রেণির শব্দ ও কেন?
  5. মৌলিক ও সাধিত শব্দের পার্থক্য কী?
  6. পর্তুগিজ ভাষা থেকে আসা তিনটি শব্দ লেখো।

উত্তর

  1. পাঁচ প্রকার — তৎসম, অর্ধতৎসম, তদ্ভব, দেশি ও বিদেশি।
  2. তৎসম শব্দ সংস্কৃত থেকে অবিকৃতভাবে এসেছে, আর তদ্ভব শব্দ প্রাকৃতের পথ ধরে বিবর্তিত হয়ে এসেছে — যেমন চন্দ্র তৎসম, চাঁদ তদ্ভব।
  3. কুড়ি, ডাব ও ঢেঁকি — এগুলো এদেশের আদি অধিবাসীদের ভাষা থেকে এসেছে।
  4. যোগরূঢ়। সমাসের অর্থে পঙ্কে জন্মে এমন সবকিছু বোঝানোর কথা, কিন্তু শব্দটি কেবল পদ্ম বোঝায়।
  5. মৌলিক শব্দকে ভাঙলে অর্থ থাকে না; সাধিত শব্দ উপসর্গ, প্রত্যয় বা সমাসের সাহায্যে গঠিত।
  6. আলমারি, চাবি ও বালতি। পর্তুগিজ বণিকদের হাত ধরে এগুলো বাংলায় এসেছে।

উপযোগী শ্রেণি: নবম, দশম, একাদশ, দ্বাদশ শ্রেণি।

সচরাচর জিজ্ঞাসা

আরও বাংলা ব্যাকরণ পড়ো

বাংলা ব্যাকরণ-এর পূর্ণ তালিকা ও বাংলা লেখার অন্যান্য অংশ এক জায়গায়।

আমাদের সাথে যুক্ত থাকো

পড়াশোনার আপডেট, সাজেশন ও প্রশ্নোত্তর সবার আগে পেতে আমাদের ফেসবুক পেজ ও গ্রুপে যুক্ত হও।