বাংলা উপসর্গ — ২১টি উপসর্গের তালিকা ও উদাহরণ
খাঁটি বাংলা একুশটি উপসর্গের পূর্ণ তালিকা, প্রতিটির অর্থ ও প্রয়োগ উদাহরণসহ।
সংজ্ঞা
খাঁটি বাংলা ভাষার নিজস্ব যে একুশটি উপসর্গ আছে, সেগুলোকে বাংলা উপসর্গ বলে। এগুলো প্রধানত তদ্ভব ও দেশি শব্দের আগে বসে।
একুশটি খাঁটি বাংলা উপসর্গ
খাঁটি বাংলা উপসর্গ ২১টি, এবং এদের চেনার সহজ সূত্র হলো এরা কেবল বাংলা শব্দের আগে বসে। তৎসম উপসর্গের মতো এরা সংস্কৃত থেকে আসেনি, তাই সঙ্গের শব্দটিও সাধারণত তদ্ভব বা দেশি হয়। তালিকাটি একবার দেখে নিলে পরীক্ষায় শ্রেণি নির্ণয় করতে ভুল হয় না।
তালিকার কয়েকটি উপসর্গ তৎসম তালিকাতেও আছে — নি, বি, সু, আ। এদের শ্রেণি ঠিক হয় সঙ্গের শব্দ দেখে: নিখুঁত-এ খুঁত বাংলা শব্দ, তাই নি খাঁটি বাংলা উপসর্গ; নিবাস-এ বাস তৎসম, তাই সেখানে নি তৎসম উপসর্গ। একই চেহারা, দুই শ্রেণি।
খাঁটি বাংলা উপসর্গ ও তাদের অর্থদ্যোতনা
| উপসর্গ | অর্থদ্যোতনা | উদাহরণ |
|---|---|---|
| অ | নিন্দা, অভাব | অকাজ, অচেনা, অজানা |
| অঘা | বোকা | অঘারাম, অঘাচণ্ডী |
| অজ | নিতান্ত, বিশিষ্ট | অজপাড়াগাঁ, অজমূর্খ |
| অনা | অভাব, ছাড়া | অনাবৃষ্টি, অনাচার, অনাদর |
| আ | বিশিষ্ট, পর্যন্ত | আকাঁড়া, আধোয়া |
| আড় | বক্র, আধা | আড়চোখে, আড়াআড়ি, আড়কোলা |
| আন | না, বিক্ষিপ্ত | আনমনা, আনচান |
| আব | অস্পষ্টতা | আবছায়া, আবডাল |
| ইতি | এ, পুরোনো | ইতিকর্তব্য, ইতিহাস |
| ঊন / উন | কম | ঊনপঞ্চাশ, উনিশ |
- ✓ অনা + বৃষ্টি = অনাবৃষ্টি — অভাব বোঝাচ্ছে
- ✓ আড় + চোখে = আড়চোখে — বক্রতা বোঝাচ্ছে
তালিকার বাকি এগারোটি
বাকি উপসর্গগুলো দৈনন্দিন বাংলায় বেশি ব্যবহৃত, তাই উদাহরণও চেনা। কু, নি, ভর, সু — এগুলো এত স্বাভাবিকভাবে ব্যবহার করি যে উপসর্গ বলে আলাদা মনে হয় না।
| উপসর্গ | অর্থদ্যোতনা | উদাহরণ |
|---|---|---|
| কদ | নিন্দিত, অপ্রশস্ত | কদাকার, কদর্য |
| কু | কুৎসিত, অপকর্ষ | কুকাজ, কুনজর, কুসঙ্গ |
| নি | নিশ্চয়, না | নিখুঁত, নিলাজ, নিরেট |
| পাতি | ক্ষুদ্র | পাতিহাঁস, পাতিলেবু, পাতিশিয়াল |
| বি | ভুল, নিন্দিত | বিভুঁই, বিপথ, বিফল |
| ভর | পূর্ণতা | ভরপেট, ভরদুপুর, ভরসন্ধ্যা |
| রাম | বড়, উৎকৃষ্ট | রামছাগল, রামদা, রামবোকা |
| স | সঙ্গে | সজোরে, সরব, সলজ্জ |
| সা | উৎকৃষ্ট | সাজিরা, সাজোয়ান |
| সু | উত্তম, সহজ | সুনজর, সুখবর, সুদিন |
| হা | অভাব | হাঘরে, হাভাতে, হাপিত্যেশ |
- ✓ পাতি + হাঁস = পাতিহাঁস — ক্ষুদ্রতা বোঝাচ্ছে
- ✓ হা + ভাতে = হাভাতে — অভাব বোঝাচ্ছে
- ✓ রাম + ছাগল = রামছাগল — বড় আকার বোঝাচ্ছে
একই উপসর্গ, দুই শ্রেণি
চারটি উপসর্গ — নি, বি, সু, আ — খাঁটি বাংলা ও তৎসম দুই তালিকাতেই আছে। পরীক্ষায় এখান থেকেই সবচেয়ে বেশি ফাঁদ পাতা হয়, কারণ উপসর্গটি দেখে শ্রেণি বলা যায় না; বলতে হয় সঙ্গের শব্দ দেখে।
নিয়মটি সরল: সঙ্গের শব্দ তৎসম হলে উপসর্গও তৎসম, আর সঙ্গের শব্দ বাংলা হলে উপসর্গও খাঁটি বাংলা। শব্দটি তৎসম কি না বুঝতে ণ, ষ, ঋ, ক্ষ, জ্ঞ খোঁজো, নয়তো শব্দটির ঘরোয়া চেহারা দেখো।
| উপসর্গ | খাঁটি বাংলা প্রয়োগ | তৎসম প্রয়োগ |
|---|---|---|
| নি | নিখুঁত, নিলাজ | নিবাস, নিয়োগ |
| বি | বিভুঁই, বিপথ | বিজ্ঞান, বিয়োগ |
| সু | সুখবর, সুদিন | সুশাসন, সুকৃতি |
| আ | আকাঁড়া, আধোয়া | আহার, আগমন |
- ✓ নিখুঁত — খুঁত বাংলা শব্দ, তাই খাঁটি বাংলা উপসর্গ
- ✓ নিবাস — বাস তৎসম শব্দ, তাই তৎসম উপসর্গ
- ✗ নি সব সময় তৎসম উপসর্গ ✓ সঙ্গের শব্দ দেখে শ্রেণি ঠিক হয়
অর্থদ্যোতনার ধরন
খাঁটি বাংলা উপসর্গগুলো মূলত চার ধরনের ভাব যোগ করে — অভাব, নিন্দা, আধিক্য এবং ক্ষুদ্রতা। কোন উপসর্গ কোন ভাব আনছে তা বলতে পারলে ব্যাখ্যামূলক প্রশ্নে পূর্ণ নম্বর মেলে।
| ভাব | উপসর্গ | উদাহরণ |
|---|---|---|
| অভাব | অ, অনা, হা | অচেনা, অনাদর, হাঘরে |
| নিন্দা | কু, কদ, বি | কুনজর, কদাকার, বিপথ |
| আধিক্য / পূর্ণতা | ভর, রাম, সা | ভরপেট, রামছাগল, সাজোয়ান |
| ক্ষুদ্রতা | পাতি, ঊন | পাতিলেবু, ঊনপঞ্চাশ |
| উৎকর্ষ | সু, স | সুদিন, সরব |
- ✓ কু + সঙ্গ = কুসঙ্গ — নিন্দাসূচক
- ✓ ভর + দুপুর = ভরদুপুর — পূর্ণতাসূচক
পরীক্ষায় কীভাবে আসে
এই অধ্যায় থেকে প্রশ্ন তিন রকম — সংখ্যা জিজ্ঞাসা, উপসর্গ চিহ্নিত করা, আর শ্রেণি নির্ণয়। সংখ্যা প্রশ্নে ২১ ও ২০ গুলিয়ে ফেলা সবচেয়ে সাধারণ ভুল, তাই দুটি সংখ্যা জোড়ায় মনে রাখো: খাঁটি বাংলা ২১, তৎসম ২০।
- উপসর্গ চিহ্নিত করতে বলা হলে শব্দটি ভেঙে দেখাও — অনা + বৃষ্টি।
- শ্রেণি জিজ্ঞাসা করলে সঙ্গের শব্দটির পরিচয় দিয়ে যুক্তি দাও।
- অর্থদ্যোতনা চাইলে ভাবটির নাম লেখো — অভাব, নিন্দা, আধিক্য।
- ✗ উত্তর: অনা উপসর্গ। ✓ উত্তর: অনা উপসর্গ, অভাব অর্থে — অনা + বৃষ্টি = অনাবৃষ্টি।
- ✗ খাঁটি বাংলা উপসর্গ ২০টি ✓ খাঁটি বাংলা উপসর্গ ২১টি
বিদেশি উপসর্গও বাংলায় কাজ করে
খাঁটি বাংলা ও তৎসমের বাইরে আরও এক শ্রেণির উপসর্গ বাংলায় নিয়মিত ব্যবহৃত হয় — বিদেশি উপসর্গ। এদের নির্দিষ্ট সংখ্যা নেই, কারণ শাসন, বাণিজ্য ও শিক্ষার সূত্রে নতুন উপসর্গ ঢুকতেই থেকেছে। আরবি, ফারসি, ইংরেজি ও হিন্দি — চারটি ভাষা থেকেই বাংলা উপসর্গ ধার করেছে।
লক্ষণীয়, বিদেশি উপসর্গ প্রায়ই বাংলা শব্দের আগেও বসে যায় — বেহিসাব, গরমিল, হাফহাতা। এটি ভাষার স্বাভাবিক মিশ্রণ, ভুল নয়। তবে পরীক্ষায় শ্রেণি জিজ্ঞাসা করা হলে উপসর্গটির উৎস ভাষার নাম লিখতে হয়, সঙ্গের শব্দের নয়।
| ভাষা | উপসর্গ | উদাহরণ |
|---|---|---|
| আরবি | আম, খাস, লা, গর, বাজে | আমদরবার, খাসমহল, লাজবাব, গরমিল, বাজেখরচ |
| ফারসি | কার, দর, না, ফি, বদ, বে, কম, নিম | কারখানা, দরদালান, নারাজ, ফিবছর, বদমেজাজ, বেআইনি |
| ইংরেজি | ফুল, হাফ, হেড, সাব | ফুলহাতা, হাফহাতা, হেডমাস্টার, সাবজজ |
| হিন্দি | হর | হরহামেশা, হরকিসিম |
- ✓ বে + আইনি = বেআইনি — ফারসি উপসর্গ, বাংলা-আরবি শব্দের আগে
- ✓ হাফ + হাতা = হাফহাতা — ইংরেজি উপসর্গ, বাংলা শব্দের আগে
বিস্তারিত আলোচনা
বাংলা উপসর্গগুলো হলো অ, অঘা, অজ, অনা, আ, আড়, আন, আব, ইতি, ঊন, কদ, কু, নি, পাতি, বি, ভর, রাম, স, সা, সু, হা। এই একুশটির তালিকা পরীক্ষায় সরাসরি জিজ্ঞাসা করা হয়, তাই মুখস্থ করে রাখা লাভজনক।
প্রতিটি উপসর্গ নির্দিষ্ট ধরনের অর্থ যোগ করে। "অ" নিন্দা বা অভাব বোঝায় — অকেজো, অচেনা। "অনা" অভাব বোঝায় — অনাবৃষ্টি, অনাচার। "কু" মন্দ অর্থে বসে — কুকাজ, কুনজর। "সু" ভালো অর্থে — সুনজর, সুখবর। "ভর" পূর্ণতা বোঝায় — ভরপেট, ভরসন্ধ্যা। "রাম" বৃহৎ অর্থে — রামছাগল, রামদা।
কিছু উপসর্গ চেনা কঠিন কারণ সেগুলো শব্দের সঙ্গে মিশে গেছে। "আড়" বাঁকা বা আংশিক অর্থে বসে — আড়চোখ, আড়পাগলা। "পাতি" ক্ষুদ্র অর্থে — পাতিহাঁস, পাতিলেবু। "হা" অভাব অর্থে — হাভাতে, হাঘরে। "ইতি" পুরোনো অর্থে — ইতিকথা, ইতিপূর্বে। উদাহরণসহ পড়লে এগুলো সহজেই মনে থাকে।
মনে রাখার কথা
একুশটি বাংলা উপসর্গের তালিকা একবার মুখস্থ করে নিলে প্রতি বছরই তা থেকে নম্বর পাওয়া যায়।
সাধারণ ভুল
পরীক্ষায় এই ভুলগুলোই সবচেয়ে বেশি নম্বর কাটে। ভুল রূপটি দেখে নিলে নিজের লেখায় ধরা সহজ হয়।
- ✗ খাঁটি বাংলা উপসর্গ ২০টি। ✓ খাঁটি বাংলা ২১টি, তৎসম ২০টি।
- ✗ “নি” সব সময় তৎসম উপসর্গ। ✓ সঙ্গের শব্দ বাংলা হলে খাঁটি বাংলা — যেমন নিখুঁত।
- ✗ পাতিলেবুর “পাতি” একটি শব্দ। ✓ “পাতি” একটি উপসর্গ, ক্ষুদ্রতা বোঝায়।
- ✗ রামছাগলের “রাম” ব্যক্তিনাম। ✓ এখানে “রাম” উপসর্গ, বড় বা উৎকৃষ্ট অর্থে।
অনুশীলন
নিচের প্রশ্নগুলোর উত্তর নিজে লেখো, তারপর মিলিয়ে নাও।
- খাঁটি বাংলা উপসর্গ কয়টি?
- “অনাবৃষ্টি” শব্দের উপসর্গ কোনটি ও কী অর্থে?
- “নিখুঁত” ও “নিবাস” — দুটিতে “নি” একই শ্রেণির উপসর্গ কি?
- ক্ষুদ্রতা বোঝায় এমন দুটি বাংলা উপসর্গ লেখো।
- “হাভাতে” শব্দের উপসর্গ ও অর্থদ্যোতনা কী?
- নিন্দা অর্থে ব্যবহৃত তিনটি বাংলা উপসর্গ লেখো।
- বিদেশি উপসর্গ কোন কোন ভাষা থেকে বাংলায় এসেছে?
- খাঁটি বাংলা উপসর্গগুলো প্রধানত কোন কোন ভাব যোগ করে?
- উপসর্গ চিহ্নিত করতে বলা হলে উত্তরে কী কী লিখবে?
উত্তর
- ২১টি। তৎসম উপসর্গ ২০টি — দুটি সংখ্যা জোড়ায় মনে রাখলে গুলিয়ে যায় না।
- “অনা” উপসর্গ, অভাব অর্থে — বৃষ্টির অভাব বোঝাচ্ছে।
- না। নিখুঁত-এ খুঁত বাংলা শব্দ, তাই খাঁটি বাংলা উপসর্গ; নিবাস-এ বাস তৎসম, তাই তৎসম উপসর্গ।
- “পাতি” ও “ঊন” — যেমন পাতিলেবু, ঊনপঞ্চাশ।
- “হা” উপসর্গ, অভাব অর্থে — ভাতের অভাব, অর্থাৎ দরিদ্র।
- কু, কদ ও বি — যেমন কুনজর, কদাকার, বিপথ।
- প্রধানত আরবি, ফারসি, ইংরেজি ও হিন্দি থেকে — যেমন গরমিল (আরবি), বেআইনি (ফারসি), হেডমাস্টার (ইংরেজি), হরহামেশা (হিন্দি)।
- চার ধরনের ভাব — অভাব (অনাদর, হাঘরে), নিন্দা (কুনজর, কদাকার), আধিক্য বা পূর্ণতা (ভরপেট, রামছাগল) এবং ক্ষুদ্রতা (পাতিলেবু, ঊনপঞ্চাশ)।
- শব্দটি ভেঙে দেখাবে, উপসর্গের নাম লিখবে এবং তার অর্থদ্যোতনা জানাবে — যেমন “অনা + বৃষ্টি = অনাবৃষ্টি; অনা উপসর্গ, অভাব অর্থে”।
উপযোগী শ্রেণি: নবম, দশম, একাদশ, দ্বাদশ শ্রেণি।
সচরাচর জিজ্ঞাসা
একুশটি — অ, অঘা, অজ, অনা, আ, আড়, আন, আব, ইতি, ঊন, কদ, কু, নি, পাতি, বি, ভর, রাম, স, সা, সু, হা।
ক্ষুদ্র বা ছোট অর্থে। যেমন পাতিহাঁস (ছোট হাঁস), পাতিলেবু, পাতিশিয়াল — প্রতিটিতেই আকারে ছোট বোঝানো হয়েছে।
প্রধানত তদ্ভব ও দেশি শব্দের আগে। তৎসম শব্দের আগে সাধারণত সংস্কৃত উপসর্গ বসে, আর বিদেশি শব্দের আগে বিদেশি উপসর্গ।
পারে — নি, বি, সু ও আ দুই তালিকাতেই আছে। শ্রেণি ঠিক হয় সঙ্গের শব্দ দেখে: নিখুঁত-এ খুঁত বাংলা শব্দ বলে উপসর্গটি খাঁটি বাংলা, আর নিবাস-এ বাস তৎসম বলে সেটি তৎসম উপসর্গ।
আরও বাংলা ব্যাকরণ পড়ো
বাংলা ব্যাকরণ-এর পূর্ণ তালিকা ও বাংলা লেখার অন্যান্য অংশ এক জায়গায়।
আমাদের সাথে যুক্ত থাকো
পড়াশোনার আপডেট, সাজেশন ও প্রশ্নোত্তর সবার আগে পেতে আমাদের ফেসবুক পেজ ও গ্রুপে যুক্ত হও।






















