সংস্কৃত বা তৎসম উপসর্গ — ২০টি উপসর্গ ও উদাহরণ
কুড়িটি সংস্কৃত উপসর্গের তালিকা, অর্থ ও প্রয়োগ — একই ধাতুর সঙ্গে ভিন্ন উপসর্গের উদাহরণসহ।
সংজ্ঞা
সংস্কৃত ভাষা থেকে আসা যে কুড়িটি উপসর্গ তৎসম শব্দের আগে বসে নতুন শব্দ গঠন করে, সেগুলোকে তৎসম বা সংস্কৃত উপসর্গ বলে।
কুড়িটি তৎসম উপসর্গ
তৎসম বা সংস্কৃত উপসর্গ ২০টি, এবং এরা কেবল তৎসম শব্দের আগে বসে। সংস্কৃত ব্যাকরণে এদের বলা হয় প্রাদি উপসর্গ, কারণ তালিকাটি শুরু হয় প্র দিয়ে। বাংলার আনুষ্ঠানিক ও পারিভাষিক শব্দভাণ্ডারের বড় অংশ এই কুড়িটি উপসর্গের সাহায্যেই গড়া।
তালিকা মুখস্থ করার চেয়ে অর্থদ্যোতনা ধরে মনে রাখা কাজে দেয়। প্র আধিক্য বোঝায়, অপ নিন্দা, নির্ অভাব, অতি মাত্রাধিক্য — অর্থটি জানা থাকলে অচেনা শব্দের মানেও অনুমান করা যায়।
তৎসম উপসর্গ ও অর্থদ্যোতনা (১–১০)
| উপসর্গ | অর্থদ্যোতনা | উদাহরণ |
|---|---|---|
| প্র | আধিক্য, শ্রেষ্ঠতা | প্রবল, প্রখর, প্রচার |
| পরা | বিপরীত, আতিশয্য | পরাজয়, পরাক্রম, পরাভব |
| অপ | নিকৃষ্ট, বিপরীত | অপমান, অপকার, অপবাদ |
| সম | একত্র, সম্যক | সংগীত, সমাবেশ, সম্মেলন |
| নি | নিশ্চয়, নিষেধ | নিবাস, নিবারণ, নিয়োগ |
| অব | নিম্নে, হীনতা | অবতরণ, অবজ্ঞা, অবনতি |
| অনু | পশ্চাৎ, সাদৃশ্য | অনুসরণ, অনুবাদ, অনুচর |
| নির্ | অভাব, নিষেধ | নির্দোষ, নির্জন, নির্ভয় |
| দুর্ | মন্দ, কষ্টসাধ্য | দুর্নাম, দুর্গম, দুর্ভাগ্য |
| বি | বিশেষ, অভাব | বিজ্ঞান, বিশেষ, বিয়োগ |
- ✓ প্র + বল = প্রবল — আধিক্য
- ✓ নির্ + জন = নির্জন — অভাব
তালিকার বাকি দশটি
বাকি দশটি উপসর্গ পারিভাষিক ও শাস্ত্রীয় শব্দে বেশি দেখা যায়। অধি, পরি, প্রতি, অভি, উপ — এই পাঁচটি ছাড়া বাংলার প্রশাসনিক ও বৈজ্ঞানিক পরিভাষা প্রায় গড়াই যেত না।
| উপসর্গ | অর্থদ্যোতনা | উদাহরণ |
|---|---|---|
| অধি | আধিপত্য, উপরে | অধিকার, অধিবাস, অধ্যক্ষ |
| সু | উত্তম, সহজ | সুশাসন, সুকৃতি, সুগম |
| উৎ | ঊর্ধ্ব, প্রাবল্য | উৎপাত, উন্নতি, উদ্যোগ |
| পরি | সম্যক, চারদিকে | পরিপূর্ণ, পরিভ্রমণ, পরিচালনা |
| প্রতি | বিরুদ্ধ, প্রত্যেক | প্রতিবাদ, প্রতিদিন, প্রতিচ্ছবি |
| অতি | অতিরিক্ত, অতিক্রম | অতিরিক্ত, অত্যন্ত, অতিক্রম |
| অপি | নিশ্চয়, সংশয় | অপিনিহিতি |
| অভি | সম্মুখে, সর্বতোভাবে | অভিযান, অভিমুখ, অভিষেক |
| উপ | সামীপ্য, ক্ষুদ্র | উপকূল, উপগ্রহ, উপদেশ |
| আ | পর্যন্ত, ঈষৎ | আকণ্ঠ, আরক্ত, আগমন |
- ✓ উপ + গ্রহ = উপগ্রহ — ক্ষুদ্রতা ও সামীপ্য
- ✓ প্রতি + দিন = প্রতিদিন — প্রত্যেক
উপসর্গ বদলালে অর্থ কতটা বদলায়
তৎসম উপসর্গের শক্তি বোঝা যায় একটি ধাতুর সঙ্গে পরপর কয়েকটি উপসর্গ বসিয়ে দেখলে। হার বা কার জাতীয় একটি অংশের আগে ভিন্ন উপসর্গ বসিয়ে বাংলা কয়েক ডজন স্বতন্ত্র শব্দ পেয়েছে, এবং প্রতিটির অর্থ পরস্পর থেকে আলাদা।
এই কারণেই পরিভাষা তৈরিতে তৎসম উপসর্গ এত কাজে লাগে। ইংরেজি pre-, post-, sub-, super- যে কাজ করে, বাংলায় সেই কাজ করে প্র, অনু, উপ, অধি। নতুন বৈজ্ঞানিক পরিভাষা গড়ার সময় আজও এই উপসর্গগুলোই ব্যবহৃত হয়।
| উপসর্গ + কার | গঠিত শব্দ | অর্থ |
|---|---|---|
| প্র | প্রকার | ধরন |
| অপ | অপকার | ক্ষতি |
| উপ | উপকার | সাহায্য |
| অধি | অধিকার | স্বত্ব |
| প্রতি | প্রতিকার | প্রতিবিধান |
| সম | সংস্কার | পরিশোধন |
- ✓ উপ + কার = উপকার বনাম অপ + কার = অপকার — বিপরীত অর্থ
- ✓ অধি + কার = অধিকার — আধিপত্য
সন্ধির সঙ্গে সম্পর্ক
তৎসম উপসর্গ শব্দের আগে বসার সময় প্রায়ই সন্ধি ঘটে, আর তখন উপসর্গের চেহারা বদলে যায়। উৎ উপসর্গটি উৎ + নতি মিলে উন্নতি হয়, উৎ + যোগ মিলে উদ্যোগ হয়। উপসর্গ চিনতে হলে তাই সন্ধির নিয়মও মাথায় রাখতে হয়।
একই কারণে সম উপসর্গ কখনো সং (সংগীত), কখনো সঞ্ (সঞ্চয়), কখনো সন্ (সন্তোষ) রূপে দেখা দেয়। শব্দটি ভেঙে উপসর্গ বের করতে বলা হলে আগে সন্ধি বিচ্ছেদ করে নিতে হয়।
| উপসর্গ | সন্ধির পর | শব্দ |
|---|---|---|
| উৎ | উন্ | উন্নতি (উৎ + নতি) |
| উৎ | উদ্ | উদ্যোগ (উৎ + যোগ) |
| সম | সং | সংগীত (সম্ + গীত) |
| সম | সঞ্ | সঞ্চয় (সম্ + চয়) |
| নির্ | নিষ্ | নিষ্ঠুর (নির্ + ঠুর) |
- ✗ উন্নতি-র উপসর্গ উন্ ✓ উন্নতি-র উপসর্গ উৎ — সন্ধিতে রূপ বদলেছে
- ✗ সংগীত-এর উপসর্গ সং ✓ সংগীত-এর উপসর্গ সম্
পরীক্ষায় কী আসে
তৎসম উপসর্গ থেকে প্রশ্ন সাধারণত দুই রকম — সংখ্যা ও তালিকা, অথবা একটি শব্দ দিয়ে উপসর্গ ও অর্থদ্যোতনা নির্ণয়। দ্বিতীয়টিতে সন্ধির কারণে রূপ বদলে যাওয়া শব্দই সবচেয়ে বেশি আসে, কারণ সেখানেই ভুল হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
- তৎসম উপসর্গ ২০টি — খাঁটি বাংলার ২১টির সঙ্গে গুলিয়ো না।
- শব্দ ভাঙার আগে সন্ধি বিচ্ছেদ করে নাও।
- উত্তরে উপসর্গের নাম + অর্থদ্যোতনা দুটিই লেখো।
- ✗ উত্তর: প্র উপসর্গ। ✓ উত্তর: প্র উপসর্গ, আধিক্য অর্থে — প্র + বল = প্রবল।
- ✗ তৎসম উপসর্গ ২১টি ✓ তৎসম উপসর্গ ২০টি
তৎসম উপসর্গ ও ইংরেজি উপসর্গের মিল
তৎসম উপসর্গ কীভাবে কাজ করে তা বুঝতে ইংরেজির সঙ্গে মিলিয়ে দেখা সবচেয়ে সহজ পথ, কারণ দুটি ভাষাই একই ইন্দো-ইউরোপীয় পরিবারের এবং উপসর্গের কাজও প্রায় একই। প্র যা করে, ইংরেজিতে pro- বা pre- তাই করে; উপ যা করে, sub- তাই করে।
এই মিল কেবল কৌতূহলের বিষয় নয়, ব্যবহারিকও। বৈজ্ঞানিক পরিভাষা বাংলায় আনার সময় অনুবাদকেরা ঠিক এই সমান্তরাল ধরেই শব্দ গড়েছেন — sub-continent হয়েছে উপমহাদেশ, super-natural হয়েছে অতিপ্রাকৃত, co-operation হয়েছে সহযোগিতা।
তাই কোনো ইংরেজি পারিভাষিক শব্দের বাংলা খুঁজতে হলে উপসর্গটি আগে মিলিয়ে নেওয়া কাজের কৌশল। বাকি অংশের বাংলা জানা থাকলে পুরো শব্দটিই দাঁড়িয়ে যায়।
| তৎসম উপসর্গ | ইংরেজি সমান্তরাল | উদাহরণ |
|---|---|---|
| উপ | sub- | উপমহাদেশ / sub-continent |
| অতি | super-, hyper- | অতিপ্রাকৃত / super-natural |
| প্রতি | counter-, re- | প্রতিক্রিয়া / reaction |
| অনু | post-, follow- | অনুসরণ / following |
| নির্ | de-, non- | নির্দোষ / non-guilty |
| সম | co-, con- | সহযোগিতা / co-operation |
- ✓ উপ + গ্রহ = উপগ্রহ / satellite — ক্ষুদ্রতর, অধীন
- ✓ প্রতি + ক্রিয়া = প্রতিক্রিয়া / reaction
বিস্তারিত আলোচনা
সংস্কৃত উপসর্গ কুড়িটি — প্র, পরা, অপ, সম্, নি, অব, অনু, নির্, দুর্, বি, অধি, সু, উৎ, পরি, প্রতি, অভি, অতি, অপি, উপ, আ। এগুলো কেবল তৎসম শব্দ বা সংস্কৃত ধাতুর আগে বসে, খাঁটি বাংলা শব্দের আগে নয়।
প্রতিটি উপসর্গের নির্দিষ্ট অর্থপ্রবণতা আছে। "প্র" আধিক্য বা প্রকর্ষ বোঝায় — প্রখর, প্রবল, প্রচার। "পরি" সম্যক বা চারদিক বোঝায় — পরিপূর্ণ, পরিভ্রমণ। "নির্" অভাব বোঝায় — নির্দোষ, নির্জন। "দুর্" মন্দ বা কষ্টসাধ্য বোঝায় — দুর্জন, দুর্গম। "অতি" আধিক্য — অতিরিক্ত, অতিশয়। "উৎ" ঊর্ধ্ব বা উৎকর্ষ — উন্নতি, উৎপাদন।
একই ধাতুর আগে ভিন্ন উপসর্গ বসিয়ে দেখলে উপসর্গের ক্ষমতা স্পষ্ট হয়। √হর ধাতুর আগে প্র বসলে প্রহার, আ বসলে আহার, বি বসলে বিহার, সম্ বসলে সংহার, উপ বসলে উপহার। ধাতু একই, অথচ পাঁচটি সম্পূর্ণ ভিন্ন শব্দ ও অর্থ — এ থেকেই বোঝা যায় উপসর্গ কেন গুরুত্বপূর্ণ।
মনে রাখার কথা
একই ধাতুর সঙ্গে আলাদা উপসর্গ বসিয়ে অনুশীলন করলে কুড়িটি উপসর্গই দ্রুত আয়ত্তে আসে।
সাধারণ ভুল
পরীক্ষায় এই ভুলগুলোই সবচেয়ে বেশি নম্বর কাটে। ভুল রূপটি দেখে নিলে নিজের লেখায় ধরা সহজ হয়।
- ✗ তৎসম উপসর্গ ২১টি। ✓ তৎসম উপসর্গ ২০টি; খাঁটি বাংলা উপসর্গ ২১টি।
- ✗ “উন্নতি”-র উপসর্গ উন্। ✓ উপসর্গটি উৎ — সন্ধিতে রূপ বদলেছে।
- ✗ “সংগীত”-এর উপসর্গ সং। ✓ উপসর্গটি সম্ — সন্ধিতে সং হয়েছে।
- ✗ তৎসম উপসর্গ বাংলা শব্দের আগেও বসে। ✓ তৎসম উপসর্গ কেবল তৎসম শব্দের আগে বসে।
অনুশীলন
নিচের প্রশ্নগুলোর উত্তর নিজে লেখো, তারপর মিলিয়ে নাও।
- তৎসম উপসর্গ কয়টি ও এদের অন্য নাম কী?
- “নির্জন” শব্দের উপসর্গ ও অর্থদ্যোতনা কী?
- “উপকার” ও “অপকার” — উপসর্গ বদলে অর্থ কীভাবে বদলাল?
- “উদ্যোগ” শব্দের উপসর্গ কোনটি?
- আধিক্য বোঝায় এমন দুটি তৎসম উপসর্গ লেখো।
- উপসর্গ নির্ণয়ের আগে কী করে নিতে হয়?
- তৎসম উপসর্গের সঙ্গে ইংরেজি উপসর্গের মিল কোথায়?
- তৎসম উপসর্গকে প্রাদি উপসর্গ বলা হয় কেন?
উত্তর
- ২০টি। সংস্কৃত ব্যাকরণে এদের প্রাদি উপসর্গ বলা হয়, কারণ তালিকাটি প্র দিয়ে শুরু।
- “নির্” উপসর্গ, অভাব অর্থে — জনের অভাব বোঝাচ্ছে।
- “উপ” সাহায্য বোঝায় আর “অপ” নিকৃষ্টতা, তাই একটির অর্থ সাহায্য এবং অন্যটির ক্ষতি।
- “উৎ”। সন্ধির ফলে এটি উদ্ রূপ নিয়েছে — উৎ + যোগ = উদ্যোগ।
- “প্র” ও “অতি” — যেমন প্রবল, অতিরিক্ত।
- সন্ধি বিচ্ছেদ, কারণ সন্ধিতে উপসর্গের রূপ বদলে যায় — যেমন সংগীত ভাঙলে সম্ + গীত পাওয়া যায়।
- দুটি ভাষাই ইন্দো-ইউরোপীয় পরিবারের, তাই উপসর্গের কাজও প্রায় এক — উপ মেলে sub-এর সঙ্গে, অতি মেলে super-এর সঙ্গে, সম মেলে co-এর সঙ্গে। পরিভাষা অনুবাদে এই সমান্তরালই কাজে লাগানো হয়।
- কারণ সংস্কৃত ব্যাকরণে তালিকাটি শুরু হয় “প্র” দিয়ে, আর প্র-আদি অর্থাৎ প্র ইত্যাদি থেকেই নামটি এসেছে।
উপযোগী শ্রেণি: নবম, দশম, একাদশ, দ্বাদশ শ্রেণি।
সচরাচর জিজ্ঞাসা
কুড়িটি — প্র, পরা, অপ, সম্, নি, অব, অনু, নির্, দুর্, বি, অধি, সু, উৎ, পরি, প্রতি, অভি, অতি, অপি, উপ, আ।
মন্দ, কঠিন বা কষ্টসাধ্য অর্থে। যেমন দুর্জন (মন্দ লোক), দুর্গম (যেখানে যাওয়া কঠিন), দুর্ভিক্ষ, দুর্নাম।
সাধারণত না। তৎসম উপসর্গ তৎসম শব্দ বা সংস্কৃত ধাতুর আগেই বসে। খাঁটি বাংলা শব্দের আগে বাংলা উপসর্গ ব্যবহৃত হয়।
শব্দটির সন্ধি বিচ্ছেদ করে নাও। উন্নতি ভাঙলে উৎ + নতি, সংগীত ভাঙলে সম্ + গীত — বিচ্ছেদের পর মূল উপসর্গটি বেরিয়ে আসে। বিচ্ছেদ না করে সরাসরি উপসর্গ খুঁজলে উন্ বা সং-কে উপসর্গ ভেবে ভুল হয়।
আরও বাংলা ব্যাকরণ পড়ো
বাংলা ব্যাকরণ-এর পূর্ণ তালিকা ও বাংলা লেখার অন্যান্য অংশ এক জায়গায়।
আমাদের সাথে যুক্ত থাকো
পড়াশোনার আপডেট, সাজেশন ও প্রশ্নোত্তর সবার আগে পেতে আমাদের ফেসবুক পেজ ও গ্রুপে যুক্ত হও।






















