বিদেশি উপসর্গ — আরবি, ফারসি ও ইংরেজি উপসর্গ
বাংলায় প্রচলিত বিদেশি উপসর্গের তালিকা ও অর্থ — বদ, বে, না, লা, হর প্রভৃতি উদাহরণসহ।
সংজ্ঞা
আরবি, ফারসি, উর্দু ও ইংরেজি প্রভৃতি ভাষা থেকে আসা যেসব উপসর্গ বাংলা শব্দের আগে বসে, সেগুলোকে বিদেশি উপসর্গ বলে।
বিদেশি উপসর্গ কীভাবে বাংলায় এল
বাংলা ভাষা কেবল বিদেশি শব্দ ধার করেনি, বিদেশি উপসর্গও নিয়েছে। শাসন, বাণিজ্য, ধর্ম ও শিক্ষার সূত্রে যেসব ভাষার সঙ্গে বাংলার দীর্ঘ সংস্পর্শ হয়েছে, তাদের উপসর্গগুলো ধীরে ধীরে বাংলা শব্দের আগেও বসতে শুরু করেছে। আজ বেআইনি বা হাফহাতা বলতে গিয়ে আমরা আর ভাবি না যে উপসর্গ দুটি বিদেশি।
খাঁটি বাংলা ও তৎসম উপসর্গের মতো এদের নির্দিষ্ট সংখ্যা নেই, কারণ তালিকাটি আজও খোলা। যতদিন নতুন ভাষার সংস্পর্শ থাকবে, ততদিন নতুন উপসর্গও ঢুকতে পারে — এটাই জীবন্ত ভাষার লক্ষণ।
একটি বিষয় লক্ষণীয়। বিদেশি উপসর্গ প্রায়ই বাংলা বা তৎসম শব্দের আগে বসে যায়, আর তাতে মিশ্র শব্দ তৈরি হয়। ব্যাকরণ একে ভুল বলে না; শ্রেণি নির্ণয়ের সময় কেবল উপসর্গটির উৎস ভাষার নাম লিখতে হয়, সঙ্গের শব্দের নয়।
- বিদেশি উপসর্গের নির্দিষ্ট সংখ্যা নেই — তালিকাটি খোলা।
- এরা বাংলা শব্দের আগেও বসে — বেহিসাব, হাফহাতা।
- শ্রেণি লেখার সময় উপসর্গের উৎস ভাষার নাম লিখতে হয়।
- ✓ বে + হিসাব = বেহিসাব — ফারসি উপসর্গ, আরবি শব্দ
- ✓ হাফ + হাতা = হাফহাতা — ইংরেজি উপসর্গ, বাংলা শব্দ
আরবি ও ফারসি উপসর্গ
সুলতানি ও মুঘল আমলে প্রশাসনের ভাষা ছিল ফারসি, আর ধর্ম ও আইনের ভাষা আরবি। তাই এই দুই ভাষার উপসর্গই বাংলায় সবচেয়ে বেশি এবং সবচেয়ে গভীরভাবে বসে গেছে। বে, বদ, না, কম — এগুলো এত স্বাভাবিক যে বিদেশি বলে আলাদা মনে হয় না।
আরবি ও ফারসি উপসর্গ
| ভাষা | উপসর্গ | অর্থদ্যোতনা | উদাহরণ |
|---|---|---|---|
| আরবি | আম | সাধারণ | আমদরবার, আমমোক্তার |
| আরবি | খাস | বিশেষ | খাসমহল, খাসখবর |
| আরবি | লা | নেই | লাজবাব, লাওয়ারিশ |
| আরবি | গর | অভাব | গরমিল, গরহাজির |
| ফারসি | বে | ছাড়া, নয় | বেআইনি, বেহিসাব, বেকার |
| ফারসি | বদ | মন্দ | বদমেজাজ, বদনাম, বদরাগি |
| ফারসি | না | না-বোধক | নারাজ, নাচার, নাবালক |
| ফারসি | কম | অল্প | কমজোর, কমবখত |
| ফারসি | নিম | আধা | নিমরাজি, নিমখুন |
| ফারসি | ফি | প্রতি | ফিবছর, ফিরোজ নয়—ফিসন |
- ✓ গর + মিল = গরমিল — আরবি, অভাব অর্থে
- ✓ নিম + রাজি = নিমরাজি — ফারসি, আধা অর্থে
ইংরেজি ও হিন্দি উপসর্গ
ঔপনিবেশিক শিক্ষা ও প্রশাসনের হাত ধরে ইংরেজি উপসর্গ বাংলায় ঢুকেছে, আর এদের প্রায় সবই পদমর্যাদা বা পরিমাণ বোঝায়। হিন্দি থেকে এসেছে খুব কম, কার্যত একটিই — হর।
| ভাষা | উপসর্গ | অর্থদ্যোতনা | উদাহরণ |
|---|---|---|---|
| ইংরেজি | হেড | প্রধান | হেডমাস্টার, হেডপণ্ডিত |
| ইংরেজি | সাব | অধীন | সাবজজ, সাবরেজিস্ট্রার |
| ইংরেজি | ফুল | পূর্ণ | ফুলহাতা, ফুলবাবু |
| ইংরেজি | হাফ | আধা | হাফহাতা, হাফটিকিট |
| হিন্দি | হর | প্রতি | হরহামেশা, হরকিসিম |
- ✓ সাব + জজ = সাবজজ — অধীনস্থ পদ
- ✓ হর + হামেশা = হরহামেশা — প্রতিনিয়ত
অর্থদ্যোতনার ধরন
বিদেশি উপসর্গগুলো মূলত চার ধরনের ভাব আনে — অভাব বা না-বোধকতা, মন্দত্ব, পরিমাণ এবং পদমর্যাদা। প্রশ্নে অর্থদ্যোতনা জানতে চাইলে এই চারটির একটির নাম লিখলেই উত্তর সম্পূর্ণ হয়।
| ভাব | উপসর্গ | উদাহরণ |
|---|---|---|
| অভাব / না-বোধক | বে, না, লা, গর | বেকার, নারাজ, লাওয়ারিশ, গরহাজির |
| মন্দত্ব | বদ | বদনাম, বদমেজাজ |
| পরিমাণ | কম, নিম, হাফ, ফুল | কমজোর, নিমরাজি, হাফটিকিট, ফুলহাতা |
| পদমর্যাদা | হেড, সাব | হেডমাস্টার, সাবজজ |
| ব্যাপ্তি | আম, হর, ফি | আমদরবার, হরহামেশা, ফিবছর |
- ✓ বে + কার = বেকার — কাজ নেই — অভাব
- ✓ হাফ + টিকিট = হাফটিকিট — আধা — পরিমাণ
তিন শ্রেণি আলাদা করার কৌশল
পরীক্ষায় একটি শব্দ দেখিয়ে উপসর্গের শ্রেণি জিজ্ঞাসা করা হলে দুটি ধাপে উত্তর মেলে। প্রথমে দেখো উপসর্গটি চেনা তৎসম তালিকার ২০টির একটি কি না; না হলে খাঁটি বাংলার ২১টির একটি কি না। দুটিতেই না মিললে সেটি বিদেশি।
দ্বিতীয় সূত্র শব্দের চেহারা। উপসর্গটি যদি বে, বদ, না, কম, হাফ, হেড জাতীয় হয় এবং শোনায় ঘরোয়া অথচ সংস্কৃত নয়, তবে সেটি প্রায় নিশ্চিতভাবে বিদেশি। তৎসম উপসর্গ সব সময় সংস্কৃত শব্দের আগে বসে, আর সেই শব্দে প্রায়ই ণ, ষ বা যুক্তবর্ণ থাকে।
| শ্রেণি | সংখ্যা | সঙ্গের শব্দ | চেনার সূত্র |
|---|---|---|---|
| খাঁটি বাংলা | ২১টি | বাংলা শব্দ | অনা, আড়, পাতি, হা |
| তৎসম | ২০টি | তৎসম শব্দ | প্র, পরা, নির্, অধি |
| বিদেশি | নির্দিষ্ট নয় | যেকোনো শব্দ | বে, বদ, হেড, হাফ |
- ✓ বেআইনি — বে বিদেশি (ফারসি) উপসর্গ
- ✗ বেআইনি-র উপসর্গ খাঁটি বাংলা ✓ বে একটি ফারসি উপসর্গ
মিশ্র শব্দ নিয়ে বিভ্রান্তি
বিদেশি উপসর্গ বাংলা শব্দের আগে বসলে যে শব্দ তৈরি হয়, তাকে বলা হয় মিশ্র শব্দ। হাফহাতা-য় উপসর্গ ইংরেজি আর শব্দ বাংলা; বেহিসাব-এ উপসর্গ ফারসি আর শব্দ আরবি। শিক্ষার্থীরা প্রায়ই এখানে থমকে যায় — কোনটির নাম লিখব?
উত্তর সরল: প্রশ্ন যদি উপসর্গের শ্রেণি জানতে চায়, উপসর্গটির উৎস ভাষার নাম লেখো। প্রশ্ন যদি শব্দের শ্রেণি জানতে চায়, তবে সেটি মিশ্র শব্দ। দুটি আলাদা প্রশ্ন, দুটি আলাদা উত্তর।
ভাষাবিজ্ঞানের দিক থেকে এই মিশ্রণ দুর্বলতা নয়, শক্তি। ধার করা উপাদান যখন নিজের শব্দের সঙ্গে অনায়াসে মিশে যায়, তখন বোঝা যায় ভাষাটি উপাদানটিকে সত্যিই আত্মস্থ করেছে।
- উপসর্গের শ্রেণি = উপসর্গের উৎস ভাষা।
- শব্দের শ্রেণি = মিশ্র শব্দ, যদি দুই ভাষার উপাদান মেলে।
- মিশ্রণ ভাষার আত্মীকরণের প্রমাণ, ভুল নয়।
- ✓ হাফহাতা — উপসর্গ ইংরেজি, শব্দটি মিশ্র
- ✓ বেহিসাব — উপসর্গ ফারসি, শব্দটি মিশ্র
বিস্তারিত আলোচনা
ফারসি উপসর্গই বাংলায় সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়েছে, কারণ দীর্ঘকাল রাজভাষা হিসেবে ফারসির প্রভাব ছিল। "বদ" মন্দ অর্থে — বদমেজাজ, বদনাম, বদহজম। "কার" কাজ অর্থে — কারখানা, কারচুপি। "দর" মধ্যে অর্থে — দরখাস্ত, দরদালান। "না" নেতিবাচক — নারাজ, নাচার, নাদান। "বে" অভাব — বেআইনি, বেহুঁশ, বেকার।
আরবি উপসর্গের মধ্যে "আম" সাধারণ অর্থে বসে — আমদরবার, আমমোক্তার। "খাস" বিশেষ অর্থে — খাসমহল, খাসদখল। "লা" নেতিবাচক অর্থে — লাজবাব, লাপাত্তা, লাওয়ারিশ। উর্দু-হিন্দি থেকে এসেছে "হর" প্রত্যেক অর্থে — হররোজ, হরহামেশা।
ইংরেজি থেকেও কিছু উপসর্গ বাংলায় ঢুকেছে, বিশেষ করে আধুনিক প্রশাসনিক ও শিক্ষাসংক্রান্ত ব্যবহারে — সাব (সাব-রেজিস্ট্রার, সাব-ইন্সপেক্টর), হেড (হেডমাস্টার, হেডক্লার্ক), ফুল (ফুলবাবু, ফুলহাতা)। এগুলো ব্যাকরণের বইয়ে সবসময় স্বীকৃতি পায় না, কিন্তু প্রচলিত বাংলায় ব্যাপকভাবে চলে। লক্ষণীয় যে বিদেশি উপসর্গ প্রায়ই বিদেশি শব্দের সঙ্গেই বসে, তবে দীর্ঘ ব্যবহারে অনেক সময় খাঁটি বাংলা শব্দের সঙ্গেও জুড়ে যায় — যেমন বেহিসাবি, বেসামাল, নাখোশ। এই মিশ্রণই বাংলা ভাষার গ্রহণক্ষমতার প্রমাণ।
মনে রাখার কথা
বিদেশি উপসর্গ চিনতে হলে শব্দটির উৎস ভাষা আন্দাজ করা দরকার — বদ, বে, না দেখলেই ফারসি ভাবা নিরাপদ।
সাধারণ ভুল
পরীক্ষায় এই ভুলগুলোই সবচেয়ে বেশি নম্বর কাটে। ভুল রূপটি দেখে নিলে নিজের লেখায় ধরা সহজ হয়।
- ✗ বিদেশি উপসর্গ ২০টি। ✓ বিদেশি উপসর্গের নির্দিষ্ট সংখ্যা নেই — তালিকাটি খোলা।
- ✗ “বে” একটি খাঁটি বাংলা উপসর্গ। ✓ “বে” একটি ফারসি উপসর্গ।
- ✗ বিদেশি উপসর্গ কেবল বিদেশি শব্দের আগে বসে। ✓ বাংলা ও তৎসম শব্দের আগেও বসে — হাফহাতা, বেহিসাব।
- ✗ “হেডমাস্টার”-এর উপসর্গ আরবি। ✓ “হেড” একটি ইংরেজি উপসর্গ।
অনুশীলন
নিচের প্রশ্নগুলোর উত্তর নিজে লেখো, তারপর মিলিয়ে নাও।
- বিদেশি উপসর্গ কয়টি?
- “গরহাজির” শব্দের উপসর্গ কোন ভাষার ও কী অর্থে?
- ফারসি উপসর্গের চারটি উদাহরণ দাও।
- “সাবজজ” ও “হেডমাস্টার” — উপসর্গ দুটি কোন ভাষার?
- মিশ্র শব্দ কাকে বলে?
- “নিমরাজি” শব্দে উপসর্গের অর্থ কী?
- উপসর্গের শ্রেণি নির্ণয়ে প্রথম ধাপ কী?
- অভাব বা না-বোধকতা বোঝায় এমন চারটি বিদেশি উপসর্গ লেখো।
উত্তর
- নির্দিষ্ট সংখ্যা নেই। খাঁটি বাংলা ২১টি ও তৎসম ২০টি হলেও বিদেশি উপসর্গের তালিকা আজও খোলা।
- “গর” একটি আরবি উপসর্গ, অভাব অর্থে — হাজির না থাকা বোঝাচ্ছে।
- বে, বদ, না ও কম — যেমন বেআইনি, বদনাম, নারাজ, কমজোর।
- দুটিই ইংরেজি। “সাব” অধীনস্থতা এবং “হেড” প্রধানত্ব বোঝায়।
- দুই ভিন্ন ভাষার উপাদান মিলে যে শব্দ তৈরি হয় তাকে মিশ্র শব্দ বলে — যেমন হাফহাতা, যেখানে উপসর্গ ইংরেজি ও শব্দ বাংলা।
- “নিম” অর্থ আধা — অর্থাৎ পুরোপুরি রাজি নয়, আংশিক রাজি।
- দেখা যে উপসর্গটি তৎসম ২০টির বা খাঁটি বাংলা ২১টির তালিকায় আছে কি না; না থাকলে সেটি বিদেশি।
- বে, না, লা ও গর — যেমন বেকার, নারাজ, লাওয়ারিশ ও গরহাজির। প্রথম দুটি ফারসি, শেষ দুটি আরবি।
উপযোগী শ্রেণি: নবম, দশম, একাদশ, দ্বাদশ শ্রেণি।
সচরাচর জিজ্ঞাসা
আরবি, ফারসি, উর্দু, ইংরেজি প্রভৃতি ভাষা থেকে এসে যেসব উপসর্গ বাংলা শব্দের আগে বসে, সেগুলোকে বিদেশি উপসর্গ বলে — যেমন বদনাম, বেআইনি।
ফারসি ভাষার, এবং অভাব বা নেতিবাচক অর্থে বসে। যেমন বেআইনি, বেহুঁশ, বেকার, বেদখল — প্রতিটিতেই কোনো কিছুর অনুপস্থিতি বোঝানো হয়েছে।
প্রত্যেক বা প্রতিটি অর্থে বসে, এবং এটি এসেছে উর্দু-ফারসি ভাষা থেকে। যেমন হররোজ অর্থ প্রতিদিন, আর হরহামেশা অর্থ সবসময় বা প্রতিনিয়ত।
না, বরং ভাষার আত্মীকরণের প্রমাণ। হাফহাতা বা বেহিসাব-এর মতো শব্দে উপসর্গ এক ভাষার আর মূল শব্দ অন্য ভাষার — এদের বলা হয় মিশ্র শব্দ, এবং এগুলো শুদ্ধ বাংলা।
আরও বাংলা ব্যাকরণ পড়ো
বাংলা ব্যাকরণ-এর পূর্ণ তালিকা ও বাংলা লেখার অন্যান্য অংশ এক জায়গায়।
আমাদের সাথে যুক্ত থাকো
পড়াশোনার আপডেট, সাজেশন ও প্রশ্নোত্তর সবার আগে পেতে আমাদের ফেসবুক পেজ ও গ্রুপে যুক্ত হও।






















