মূলপাতা
লগইন

Color

Indigo
Red
Green
Teal
Blue
Purple
Rose

Mode

Light
EN

উৎস অনুসারে বাংলা শব্দের শ্রেণিবিভাগ — তৎসম, অর্ধ-তৎসম, তদ্ভব, দেশি ও বিদেশি শব্দ উদাহরণসহ।

তৎসম, তদ্ভব, দেশি ও বিদেশি শব্দ

উৎস অনুসারে বাংলা শব্দের শ্রেণিবিভাগ — তৎসম, অর্ধ-তৎসম, তদ্ভব, দেশি ও বিদেশি শব্দ উদাহরণসহ।

সংজ্ঞা

উৎস অনুসারে বাংলা শব্দকে তৎসম, অর্ধ-তৎসম, তদ্ভব, দেশি ও বিদেশি — এই কয়েকটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়। কোন শব্দ কোথা থেকে এসেছে, সেটিই এই ভাগের ভিত্তি।

তৎসম শব্দ চেনার উপায়

তৎসম শব্দের অর্থই হলো “তার সমান” — অর্থাৎ সংস্কৃতে যেমন ছিল, বাংলায় ঠিক তেমনই আছে। বানান বদলায়নি বলেই সংস্কৃতের বানান-নিয়মগুলোও এই শব্দগুলোতেই কাজ করে।

  • শব্দে ণ, ষ, ঋ, ক্ষ, জ্ঞ, হ্ম থাকলে প্রায় নিশ্চিতভাবে তৎসম।
  • ণত্ব ও ষত্ব বিধান কেবল তৎসম শব্দে খাটে — এটিই এই ভাগ চেনার ব্যবহারিক দরকার।
  • যুক্তবর্ণ-বহুল ভারী শব্দ সাধারণত তৎসম।
চিহ্নউদাহরণ শব্দ
কারণ, বর্ণ, পূর্ণ, ঋণ
কষ্ট, ভবিষ্যৎ, বৃষ্টি
ঋণ, তৃণ, কৃষক
ক্ষ / জ্ঞক্ষমা, পক্ষ, জ্ঞান, বিজ্ঞান
  • নক্ষত্র, চন্দ্র, সূর্য, ভবন — তৎসম
  • জানালা তৎসম জানালা পর্তুগিজণ-ষ নেই, যুক্তবর্ণও নেই

তদ্ভব শব্দ কীভাবে তৈরি হলো

তদ্ভব মানে “তা থেকে উদ্ভূত”। সংস্কৃত শব্দ সরাসরি বাংলায় আসেনি — মাঝে প্রাকৃত ও অপভ্রংশের স্তর পেরিয়ে এসেছে, আর প্রতিটি স্তরে উচ্চারণ কিছুটা সহজ হয়েছে। তাই তদ্ভব শব্দ শুনতে হালকা ও ঘরোয়া।

সংস্কৃত → প্রাকৃত → বাংলা

সংস্কৃতপ্রাকৃততদ্ভব বাংলা
চন্দ্রচন্দচাঁদ
হস্তহত্থহাত
মস্তকমত্থঅমাথা
কর্ণকণ্ণকান
গৃহঘরঘর
ভক্তভত্তভাত
  • কর্ম > কম্ম > কাজতিন ধাপে সহজ হয়েছে
  • সূর্য > সুজ্জ > সুরুজ

অর্ধতৎসম — মাঝামাঝি শ্রেণি

কিছু সংস্কৃত শব্দ বাংলায় এসে সামান্য বদলেছে, কিন্তু প্রাকৃতের পুরো পথ পেরোয়নি। এদের বলে অর্ধতৎসম। পরীক্ষায় এই শ্রেণিটিই সবচেয়ে বেশি ভুল হয়, কারণ শব্দগুলো তদ্ভবের মতো শোনায়।

তৎসমঅর্ধতৎসমপার্থক্য
জ্যোৎস্নাজ্যোছনাযুক্তবর্ণ সহজ হয়েছে
গৃহিণীগিন্নিস্বর ও ব্যঞ্জন দুটিই বদলেছে
শ্রাদ্ধছেরাদ্দশ্র > ছের
কৃষ্ণকেষ্টঋ > এ
বৈষ্ণববোষ্টমঐ > ও
  • গিন্নি তদ্ভব গিন্নি অর্ধতৎসম
  • কেষ্ট তৎসম কেষ্ট অর্ধতৎসম; তৎসম রূপ কৃষ্ণ

তিন শ্রেণির পার্থক্য এক ছকে

দিকতৎসমঅর্ধতৎসমতদ্ভব
উৎসসংস্কৃতসংস্কৃতসংস্কৃত
পথসরাসরিসরাসরি, সামান্য বিকৃতপ্রাকৃত-অপভ্রংশ হয়ে
বানানঅবিকৃতঅল্প বদলঅনেক বদল
উদাহরণচন্দ্রচন্দরচাঁদ
ণ-ষ বিধানখাটেখাটে নাখাটে না
  • চন্দ্র (তৎসম) → চন্দর (অর্ধতৎসম) → চাঁদ (তদ্ভব)একই মূল, তিন চেহারা
  • গৃহ (তৎসম) → ঘর (তদ্ভব)

পরীক্ষায় কীভাবে জিজ্ঞাসা করা হয়

  • একটি শব্দ দিয়ে শ্রেণি জিজ্ঞাসা — সবচেয়ে বেশি আসে।
  • তৎসম রূপ থেকে তদ্ভব রূপ লিখতে বলা হয়, বা উল্টোটা।
  • তিন শ্রেণির পার্থক্য লিখতে বলা হয় — ছকের রূপে লিখলে দ্রুত হয়।
  • অর্ধতৎসমের উদাহরণ চাওয়া হয়, কারণ এটিই কম মনে থাকে।
  • ভাত তৎসম ভাত তদ্ভব; তৎসম রূপ ভক্ত
  • কাজ তৎসম কাজ তদ্ভব; তৎসম রূপ কর্ম

তিন শ্রেণির ভাগ কেন দরকার

তৎসম, অর্ধতৎসম আর তদ্ভব — তিনটিরই উৎস এক, সংস্কৃত। তবু ব্যাকরণ এদের আলাদা করে দেখে, এবং তার পেছনে বাস্তব কারণ আছে। বানানের নিয়ম শ্রেণিভেদে বদলে যায়: ণত্ব ও ষত্ব বিধান কেবল তৎসম শব্দেই খাটে, তাই কারণ বানানে ণ বসে কিন্তু জানালা বানানে নয়। শ্রেণিটি না চিনলে বানানের নিয়মও প্রয়োগ করা যায় না।

দ্বিতীয় কারণ ভাষার স্বর। তৎসম শব্দ ভারী ও আনুষ্ঠানিক শোনায়, তদ্ভব শব্দ হালকা ও ঘরোয়া। একই অর্থে গৃহ আর ঘর দুটোই চলে, কিন্তু চিঠিতে গৃহ আর কথায় ঘর বসে। লেখার সময় কোন শব্দটি বেছে নেব, সেই বোধ তৈরি হয় এই ভাগ জানা থাকলে।

তৃতীয় কারণ ইতিহাস। তদ্ভব শব্দের চেহারা দেখে বোঝা যায় ভাষাটি কোন পথে এসেছে — সংস্কৃত থেকে প্রাকৃত, প্রাকৃত থেকে অপভ্রংশ, তারপর বাংলা। হস্ত থেকে হত্থ, তারপর হাত: প্রতিটি ধাপে যুক্তবর্ণ ভেঙেছে আর উচ্চারণ সহজ হয়েছে। শব্দটাই ভাষার বিবর্তনের সাক্ষী।

  • বানানের নিয়ম শ্রেণিভেদে আলাদা — এটিই সবচেয়ে ব্যবহারিক কারণ।
  • তৎসম আনুষ্ঠানিক, তদ্ভব ঘরোয়া — রচনায় শব্দ বাছাইয়ে কাজে লাগে।
  • তদ্ভব শব্দের গঠন ভাষার ইতিহাস ধরে রাখে।
  • গৃহ (তৎসম) — আনুষ্ঠানিক লেখায়
  • ঘর (তদ্ভব) — কথ্য ও ঘরোয়া প্রয়োগে
  • জানালায় ণ বসাতে হবে জানালা তৎসম নয়, তাই ন-ই থাকবে

তদ্ভব শব্দ গড়ার সাধারণ ধারা

সংস্কৃত থেকে তদ্ভবে আসার পথে কয়েকটি পরিবর্তন বারবার ঘটেছে, আর সেগুলো চিনে রাখলে অচেনা জোড়াও মিলিয়ে ফেলা যায়। সবচেয়ে সাধারণ ধারা হলো যুক্তবর্ণের সরলীকরণ — সংস্কৃতের কঠিন যুক্তবর্ণ প্রাকৃতে দ্বিত্ব হয়ে যায়, তারপর বাংলায় একটি ব্যঞ্জনে দাঁড়ায় এবং আগের স্বরটি দীর্ঘ হয়।

দ্বিতীয় ধারা নাসিক্যীভবন। সংস্কৃতের যুক্ত নাসিক্য ধ্বনি বাংলায় এসে চন্দ্রবিন্দু হয়ে যায় — চন্দ্র থেকে চাঁদ, বন্ধ থেকে বাঁধ। তৃতীয় ধারা স্বরাগম ও স্বরলোপ: উচ্চারণ সহজ করতে কোথাও নতুন স্বর ঢুকেছে, কোথাও পুরোনো স্বর খসে গেছে।

এই ধারাগুলো এক জায়গায় দেখলে বোঝা যায় তদ্ভব শব্দ এলোমেলোভাবে বদলায়নি। প্রতিটি পরিবর্তনের পেছনে উচ্চারণকে হালকা করার একই প্রবণতা কাজ করেছে — যে প্রবণতা আজও ধ্বনি পরিবর্তনের অধ্যায়ে দেখা যায়।

ধারাসংস্কৃত → বাংলাকী ঘটল
যুক্তবর্ণ সরলীকরণহস্ত > হাতস্ত > ত, স্বর দীর্ঘ
নাসিক্যীভবনচন্দ্র > চাঁদন্দ্র > ঁদ
যুক্তবর্ণ সরলীকরণকর্ম > কাজর্ম > জ
স্বরাগমস্নেহ > সিনেহমাঝে স্বর যুক্ত
  • বন্ধ > বাঁধনাসিক্যীভবন
  • মস্তক > মাথাযুক্তবর্ণ ভেঙেছে, স্বর দীর্ঘ হয়েছে

বিস্তারিত আলোচনা

সংস্কৃত থেকে অবিকৃতভাবে বাংলায় আসা শব্দকে তৎসম বলে — যেমন চন্দ্র, সূর্য, নক্ষত্র, ভবন, মস্তক। এই শব্দগুলো সংস্কৃতে যেমন ছিল, বাংলাতেও ঠিক তেমনই আছে। অর্ধ-তৎসম শব্দ সংস্কৃত থেকেই এসেছে, কিন্তু কিছুটা বিকৃত হয়ে — যেমন জ্যোৎস্না থেকে জ্যোছনা, শ্রাদ্ধ থেকে ছেরাদ্দ, গ্রহ থেকে গেরো।

তদ্ভব শব্দ সংস্কৃত থেকে প্রাকৃতের মধ্য দিয়ে বিবর্তিত হয়ে বাংলায় এসেছে, তাই এদের চেহারা অনেকটাই বদলে গেছে — সংস্কৃত হস্ত থেকে হাত, চর্মকার থেকে চামার, ভক্ত থেকে ভাত। এগুলোকে খাঁটি বাংলা শব্দও বলা হয়, কারণ বাংলা ভাষার মেরুদণ্ড এই শব্দগুলোই।

দেশি শব্দ এসেছে এ অঞ্চলের আদি অধিবাসীদের ভাষা থেকে — কুলা, ডাব, ঢেঁকি, চোঙা। আর বিদেশি শব্দ এসেছে বাণিজ্য, শাসন ও ধর্মের সূত্রে নানা ভাষা থেকে: আরবি (আল্লাহ, কিতাব, আদালত), ফারসি (চশমা, দোকান, বাগান), তুর্কি (চাকু, তোপ), পর্তুগিজ (আলমারি, চাবি, বালতি), ইংরেজি (স্কুল, টেবিল, ডাক্তার)।

মনে রাখার কথা

তৎসম শব্দ চেনা জরুরি, কারণ ণত্ব-ষত্ব বিধান ও ঈ-কার সংক্রান্ত বানান নিয়ম কেবল সেখানেই প্রযোজ্য।

সাধারণ ভুল

পরীক্ষায় এই ভুলগুলোই সবচেয়ে বেশি নম্বর কাটে। ভুল রূপটি দেখে নিলে নিজের লেখায় ধরা সহজ হয়।

  • অর্ধতৎসম ও তদ্ভব একই জিনিস। অর্ধতৎসম সরাসরি সংস্কৃত থেকে সামান্য বিকৃত; তদ্ভব প্রাকৃতের পথ ধরে এসেছে।
  • ভাত তৎসম শব্দ। ভাত তদ্ভব — তৎসম রূপ ভক্ত।
  • তদ্ভব শব্দে ণত্ব বিধান খাটে। ণত্ব ও ষত্ব বিধান কেবল তৎসম শব্দে খাটে।
  • জ্যোছনা তৎসম। জ্যোছনা অর্ধতৎসম; তৎসম রূপ জ্যোৎস্না।

অনুশীলন

নিচের প্রশ্নগুলোর উত্তর নিজে লেখো, তারপর মিলিয়ে নাও।

  1. তৎসম শব্দ কাকে বলে?
  2. “হাত” শব্দের তৎসম রূপ কী?
  3. অর্ধতৎসম শব্দের তিনটি উদাহরণ দাও।
  4. তদ্ভব শব্দ কোন পথে বাংলায় এসেছে?
  5. ণত্ব-ষত্ব বিধান কোন শ্রেণির শব্দে খাটে?
  6. “কাজ” ও “ভাত”-এর তৎসম রূপ লেখো।
  7. সংস্কৃত থেকে তদ্ভবে আসার সাধারণ ধারা কী কী?
  8. তৎসম ও তদ্ভব শব্দের প্রয়োগে কী পার্থক্য?

উত্তর

  1. সংস্কৃত থেকে অবিকৃতভাবে বাংলায় আসা শব্দকে তৎসম শব্দ বলে — যেমন চন্দ্র, সূর্য, নক্ষত্র।
  2. হস্ত। প্রাকৃতে হত্থ হয়ে বাংলায় হাত রূপ নিয়েছে।
  3. জ্যোছনা, গিন্নি ও ছেরাদ্দ — যথাক্রমে জ্যোৎস্না, গৃহিণী ও শ্রাদ্ধ থেকে সামান্য বিকৃত।
  4. সংস্কৃত থেকে প্রাকৃত ও অপভ্রংশের স্তর পেরিয়ে — প্রতিটি স্তরে উচ্চারণ কিছুটা সহজ হয়েছে।
  5. কেবল তৎসম শব্দে। অর্ধতৎসম, তদ্ভব, দেশি ও বিদেশি শব্দে খাটে না।
  6. কর্ম ও ভক্ত। দুটিই প্রাকৃতের পথ ধরে বদলে বর্তমান রূপ নিয়েছে।
  7. প্রধানত তিনটি — যুক্তবর্ণের সরলীকরণ (হস্ত > হাত), নাসিক্যীভবন (চন্দ্র > চাঁদ) এবং স্বরাগম বা স্বরলোপ। প্রতিটির পেছনেই উচ্চারণ সহজ করার প্রবণতা কাজ করেছে।
  8. তৎসম শব্দ ভারী ও আনুষ্ঠানিক শোনায়, তদ্ভব শব্দ হালকা ও ঘরোয়া। একই অর্থে গৃহ লেখা হয় আনুষ্ঠানিক রচনায়, আর ঘর বলা হয় কথ্য ভাষায়।

উপযোগী শ্রেণি: নবম, দশম, একাদশ, দ্বাদশ শ্রেণি।

সচরাচর জিজ্ঞাসা

আরও বাংলা ব্যাকরণ পড়ো

বাংলা ব্যাকরণ-এর পূর্ণ তালিকা ও বাংলা লেখার অন্যান্য অংশ এক জায়গায়।

আমাদের সাথে যুক্ত থাকো

পড়াশোনার আপডেট, সাজেশন ও প্রশ্নোত্তর সবার আগে পেতে আমাদের ফেসবুক পেজ ও গ্রুপে যুক্ত হও।