কৃৎ প্রত্যয় — নিয়ম ও উদাহরণসহ ব্যাখ্যা
ধাতুর সঙ্গে যুক্ত কৃৎ প্রত্যয়ের নিয়ম ও উদাহরণ — গায়ক, দর্শন, পড়ুয়া প্রভৃতির বিশ্লেষণসহ।
সংজ্ঞা
ধাতুর সঙ্গে যে প্রত্যয় যুক্ত হয়ে নতুন শব্দ গঠন করে, তাকে কৃৎ প্রত্যয় বলে। কৃৎ প্রত্যয়যোগে গঠিত শব্দকে বলা হয় কৃদন্ত শব্দ।
কৃৎ প্রত্যয় কোথায় বসে
ধাতুর সঙ্গে যে প্রত্যয় যুক্ত হয়ে নতুন শব্দ গড়ে, তাকে কৃৎ প্রত্যয় বলে। আর এইভাবে গঠিত শব্দের নাম কৃদন্ত শব্দ। শনাক্ত করার নিয়ম একটাই — প্রকৃতিটি যদি ক্রিয়ার মূল হয়, প্রত্যয়টি কৃৎ; প্রকৃতি নামশব্দ হলে সেটি তদ্ধিত।
কৃৎ প্রত্যয়ের প্রধান কাজ ক্রিয়াকে অন্য পদে বদলে দেওয়া। √চল্ একটি ক্রিয়ামূল, নিজে বাক্যে বসতে পারে না। কিন্তু অন যোগ করলে চলন হয় বিশেষ্য, অন্ত যোগ করলে চলন্ত হয় বিশেষণ। একই মূল থেকে দুই রকম পদ — এটাই প্রত্যয়ের ক্ষমতা।
বাংলায় কৃৎ প্রত্যয় দুই ধারার। খাঁটি বাংলা কৃৎ প্রত্যয় বসে বাংলা ধাতুর সঙ্গে, আর সংস্কৃত কৃৎ প্রত্যয় বসে সংস্কৃত ধাতুর সঙ্গে। দুটির তালিকা আলাদা, এবং পরীক্ষায় ধারা নির্ণয় করতেও বলা হয়।
| শব্দ | প্রকৃতি | প্রত্যয় | গঠিত পদ |
|---|---|---|---|
| চলন | √চল্ | অন | বিশেষ্য |
| চলন্ত | √চল্ | অন্ত | বিশেষণ |
| গমন | √গম্ | অন | বিশেষ্য |
| দর্শনীয় | √দৃশ্ | অনীয় | বিশেষণ |
| কর্তব্য | √কৃ | তব্য | বিশেষ্য |
- ✓ √গৈ + অক = গায়ক — যে গান করে
- ✗ সামাজিক একটি কৃদন্ত শব্দ ✓ সামাজিক তদ্ধিতান্ত — সমাজ ধাতু নয়
সংস্কৃত কৃৎ প্রত্যয়
সংস্কৃত কৃৎ প্রত্যয়গুলোই বাংলার আনুষ্ঠানিক ও পারিভাষিক শব্দভাণ্ডার গড়েছে। ব্যাকরণে এদের অনেক সময় সাংকেতিক নামে ডাকা হয় — অনট, ণক, তৃচ, ক্ত — কিন্তু ব্যবহারিক রূপটি সহজ।
সংস্কৃত কৃৎ প্রত্যয়
| প্রত্যয় | অর্থদ্যোতনা | উদাহরণ |
|---|---|---|
| অন | ক্রিয়ার নাম | √গম্ + অন = গমন |
| অক | যে করে | √কৃ + অক = কারক |
| অনীয় | যোগ্য | √দৃশ্ + অনীয় = দর্শনীয় |
| তব্য | অবশ্যকরণীয় | √কৃ + তব্য = কর্তব্য |
| ক্ত (ত) | সম্পন্ন | √ভজ্ + ক্ত = ভক্ত |
| তৃচ (তা) | যে করে | √দা + তৃচ = দাতা |
| ইন্ (ণিন্) | স্বভাব | √কৃ + ইন্ = কারী |
- ✓ √শ্রু + অনীয় = শ্রবণীয় — শোনার যোগ্য
- ✓ √জ্ঞা + তৃচ = জ্ঞাতা — যে জানে
- ✓ √গৈ + ক্ত = গীত — যা গাওয়া হয়েছে
খাঁটি বাংলা কৃৎ প্রত্যয়
বাংলা ধাতুর সঙ্গে যুক্ত প্রত্যয়গুলো ঘরোয়া ও কথ্য শব্দ গড়ে। নাচুনি, দৌড়ানি, কাটা, ঘুমানো — এগুলো সংস্কৃত নিয়মে নয়, বাংলার নিজস্ব ধারায় তৈরি।
এই ধারার একটি বৈশিষ্ট্য হলো প্রত্যয়গুলো প্রায়ই ক্রিয়ার ভাব বা ফল বোঝায়। আনি প্রত্যয় বারবার ঘটা কাজ বোঝায় (দৌড়ানি), উনি বোঝায় অভ্যাস (নাচুনি), আর আ বোঝায় ক্রিয়াটির নাম (বাঁচা)।
| প্রত্যয় | উদাহরণ | অর্থ |
|---|---|---|
| অন্ত | √চল্ + অন্ত = চলন্ত | চলমান |
| আ | √বাঁচ + আ = বাঁচা | ক্রিয়ার নাম |
| আনি | √দৌড় + আনি = দৌড়ানি | বারবার ঘটা |
| উনি | √নাচ + উনি = নাচুনি | অভ্যাস |
| আই | √লড় + আই = লড়াই | ক্রিয়ার ফল |
| তি | √উঠ + তি = উঠতি | চলমান অবস্থা |
- ✓ √কাঁদ + উনি = কাঁদুনি
- ✓ √বাছ + আই = বাছাই
প্রত্যয় যোগে ধাতুর রূপ বদলায়
কৃৎ প্রত্যয় বসানোর সময় ধাতুর চেহারা প্রায়ই বদলে যায়, আর এখানেই শিক্ষার্থীরা আটকায়। √দৃশ্ থেকে দর্শনীয় হওয়ার পথে ধাতুটি দর্শ রূপ নিয়েছে; √কৃ থেকে কারক হওয়ার পথে কার হয়েছে। একে বলা হয় গুণ বা বৃদ্ধি।
তাই শব্দ ভেঙে প্রকৃতি বের করার সময় ধাতুর পরিবর্তিত রূপ দেখে বিভ্রান্ত হওয়া চলবে না। জোড়া লাগিয়ে যাচাই করাই একমাত্র নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি — মূল শব্দটি ফিরে এলে ভাঙাটি ঠিক।
| ধাতু | পরিবর্তিত রূপ | গঠিত শব্দ |
|---|---|---|
| √দৃশ্ | দর্শ | দর্শনীয়, দর্শক |
| √কৃ | কার | কারক, কারী |
| √গৈ | গায় | গায়ক |
| √শ্রু | শ্রব | শ্রবণ, শ্রবণীয় |
| √ভজ্ | ভক্ | ভক্ত, ভক্তি |
- ✗ দর্শনীয় = √দর্শ + অনীয় ✓ দর্শনীয় = √দৃশ্ + অনীয় — মূল ধাতু দৃশ্
- ✗ কারক = কার + অক ✓ কারক = √কৃ + অক
কৃদন্ত শব্দের পদশ্রেণি
একই ধাতু থেকে ভিন্ন প্রত্যয়ে ভিন্ন শ্রেণির পদ তৈরি হয়, এবং প্রশ্নে প্রায়ই জানতে চাওয়া হয় গঠিত শব্দটি কোন পদ। প্রত্যয়টি চিনলে উত্তরও মিলে যায়, কারণ প্রতিটি প্রত্যয় নির্দিষ্ট শ্রেণির পদ গড়ে।
| প্রত্যয় | গঠিত পদ | উদাহরণ |
|---|---|---|
| অন, তব্য, তি | বিশেষ্য | গমন, কর্তব্য, ভক্তি |
| অন্ত, অনীয়, ক্ত | বিশেষণ | চলন্ত, দর্শনীয়, ভক্ত |
| অক, তৃচ, ইন্ | কর্তৃবাচক বিশেষ্য | কারক, দাতা, কারী |
- ✓ √চল্ + অন = চলন — বিশেষ্য
- ✓ √চল্ + অন্ত = চলন্ত — বিশেষণ
- ✓ √দা + তৃচ = দাতা — কর্তৃবাচক বিশেষ্য
পরীক্ষায় কী আসে
কৃৎ প্রত্যয় থেকে প্রশ্ন সাধারণত দুই রকম — প্রকৃতি-প্রত্যয় নির্ণয়, অথবা কৃৎ ও তদ্ধিতের পার্থক্য। প্রথমটিতে শব্দ ভেঙে দেখাতে হয়, দ্বিতীয়টিতে সংজ্ঞা ও উদাহরণ লিখতে হয়।
উত্তর লেখার সময় ধাতুর আগে √ চিহ্ন বসানো ভালো অভ্যাস, কারণ তাতেই বোঝা যায় প্রকৃতিটি ক্রিয়ামূল। আর প্রত্যয়ের নামের সঙ্গে গঠিত পদের শ্রেণিও লিখে দিলে ব্যাখ্যাটি সম্পূর্ণ হয়।
সবচেয়ে সাধারণ ভুল হলো ধাতুর পরিবর্তিত রূপকে মূল ধাতু ভেবে নেওয়া। দর্শনীয়-এর প্রকৃতি দর্শ নয়, √দৃশ্; কারক-এর প্রকৃতি কার নয়, √কৃ। এই দুটি উদাহরণ মনে রাখলে বাকিগুলোতেও সতর্ক থাকা যায়।
- উত্তরে ধাতুর আগে √ বসাও।
- প্রত্যয়ের নাম + গঠিত পদের শ্রেণি — দুটিই লেখো।
- ধাতুর পরিবর্তিত রূপকে মূল ধাতু ভেবো না।
- ✗ উত্তর: অনীয় প্রত্যয়। ✓ উত্তর: √দৃশ্ + অনীয় = দর্শনীয়, কৃৎ প্রত্যয়, গঠিত পদ বিশেষণ।
বিস্তারিত আলোচনা
কৃৎ প্রত্যয় চেনার প্রথম শর্ত হলো মূল অংশটি একটি ধাতু হতে হবে, অর্থাৎ ক্রিয়ার মূল রূপ। বাংলা কৃৎ প্রত্যয়ের মধ্যে বহুল ব্যবহৃত কয়েকটি হলো অ, অন, আ, আই, উয়া, না, তি। যেমন √চল্ + অন্ত = চলন্ত, √পড় + উয়া = পড়ুয়া, √নাচ + অন = নাচন, √বাঁধ + আ = বাঁধা।
সংস্কৃত কৃৎ প্রত্যয়ের ব্যবহারও বাংলায় প্রচুর। অক প্রত্যয়ে হয় কর্তৃবাচক শব্দ — √গৈ + অক = গায়ক, √পঠ্ + অক = পাঠক, √নী + অক = নায়ক। অন প্রত্যয়ে হয় ভাববাচক শব্দ — √গম্ + অন = গমন, √দৃশ্ + অন = দর্শন। ক্ত প্রত্যয়ে হয় কর্মবাচক বিশেষণ — √ভুজ্ + ক্ত = ভুক্ত।
পরীক্ষায় কৃৎ প্রত্যয় নির্ণয়ের প্রশ্ন এলে শব্দটিকে আগে ধাতু ও প্রত্যয়ে ভাগ করতে হবে, তারপর প্রত্যয়টির নাম লিখতে হবে। যেমন "দর্শন" শব্দে √দৃশ্ ধাতু এবং অন প্রত্যয়; "নায়ক" শব্দে √নী ধাতু এবং অক প্রত্যয়। ধাতুর রূপ পরিবর্তিত হয় বলেই শিক্ষার্থীরা এখানে ভুল করে, তাই প্রচলিত উদাহরণগুলো আলাদা করে মনে রাখা দরকার।
মনে রাখার কথা
কৃৎ প্রত্যয়ে মূল অংশ সবসময় ধাতু — উদাহরণে ধাতুচিহ্ন √ দেখে নিলে ভুল হওয়ার আশঙ্কা কমে।
সাধারণ ভুল
পরীক্ষায় এই ভুলগুলোই সবচেয়ে বেশি নম্বর কাটে। ভুল রূপটি দেখে নিলে নিজের লেখায় ধরা সহজ হয়।
- ✗ কারক = কার + অক ✓ কারক = √কৃ + অক — মূল ধাতু কৃ।
- ✗ সামাজিক একটি কৃদন্ত শব্দ। ✓ সামাজিক তদ্ধিতান্ত — সমাজ নামপ্রকৃতি, ধাতু নয়।
- ✗ কৃৎ প্রত্যয় নামশব্দের সঙ্গে বসে। ✓ কৃৎ প্রত্যয় কেবল ধাতুর সঙ্গে বসে।
- ✗ দর্শনীয়-এর প্রকৃতি দর্শ। ✓ প্রকৃতি √দৃশ্ — দর্শ তার পরিবর্তিত রূপ।
অনুশীলন
নিচের প্রশ্নগুলোর উত্তর নিজে লেখো, তারপর মিলিয়ে নাও।
- কৃৎ প্রত্যয় কাকে বলে?
- প্রকৃতি-প্রত্যয় নির্ণয় করো: গমন।
- প্রকৃতি-প্রত্যয় নির্ণয় করো: নাচুনি।
- “দর্শনীয়” শব্দের প্রকৃতি কী এবং কেন বিভ্রান্তি হয়?
- একই ধাতু থেকে বিশেষ্য ও বিশেষণ গড়ার উদাহরণ দাও।
- কর্তৃবাচক বিশেষ্য গড়ে এমন তিনটি প্রত্যয় লেখো।
- খাঁটি বাংলা কৃৎ প্রত্যয়ের তিনটি উদাহরণ দাও।
- কৃৎ প্রত্যয় ভাষাকে কী দেয়?
উত্তর
- ধাতুর সঙ্গে যে প্রত্যয় যুক্ত হয়ে নতুন শব্দ গঠন করে, তাকে কৃৎ প্রত্যয় বলে; গঠিত শব্দকে বলে কৃদন্ত শব্দ।
- √গম্ + অন। এটি সংস্কৃত কৃৎ প্রত্যয়, গঠিত পদ বিশেষ্য।
- √নাচ + উনি। এটি খাঁটি বাংলা কৃৎ প্রত্যয়, অভ্যাস অর্থে।
- প্রকৃতি √দৃশ্। প্রত্যয় যোগের সময় ধাতুটি দর্শ রূপ নেওয়ায় অনেকে দর্শকেই মূল ধাতু ভেবে ফেলে।
- √চল্ থেকে অন যোগে চলন (বিশেষ্য) এবং অন্ত যোগে চলন্ত (বিশেষণ)।
- অক, তৃচ ও ইন্ — যেমন কারক, দাতা, কারী।
- আনি (দৌড়ানি), উনি (নাচুনি) ও আই (লড়াই) — তিনটিই বাংলা ধাতুর সঙ্গে বসে।
- ক্রিয়ামূল থেকে বিশেষ্য ও বিশেষণ গড়ার ক্ষমতা। ধাতু একা বাক্যে বসতে পারে না, কিন্তু প্রত্যয় যোগে সেটি পূর্ণ পদ হয়ে ওঠে।
উপযোগী শ্রেণি: নবম, দশম, একাদশ, দ্বাদশ শ্রেণি।
সচরাচর জিজ্ঞাসা
ধাতুর সঙ্গে যুক্ত হয়ে যে প্রত্যয় নতুন শব্দ গঠন করে, তাকে কৃৎ প্রত্যয় বলে। এতে গঠিত শব্দকে কৃদন্ত শব্দ বলা হয় — যেমন √চল্ + অন্ত = চলন্ত।
√গৈ + অক = গায়ক। এখানে √গৈ ধাতু এবং অক কৃৎ প্রত্যয়, যা কর্তৃবাচক অর্থে অর্থাৎ "যে গান গায়" বোঝাতে ব্যবহৃত হয়েছে।
মূল অংশটি ধাতু কি না দেখে। কৃৎ প্রত্যয়ে মূল অংশ সবসময় ক্রিয়ামূল, আর তদ্ধিত প্রত্যয়ে তা বিশেষ্য বা বিশেষণ।
কৃৎ প্রত্যয় বসে ধাতুর সঙ্গে এবং গঠিত শব্দকে বলে কৃদন্ত (√গম্ + অন = গমন); তদ্ধিত প্রত্যয় বসে নামশব্দের সঙ্গে এবং গঠিত শব্দকে বলে তদ্ধিতান্ত (সমাজ + ইক = সামাজিক)।
আরও বাংলা ব্যাকরণ পড়ো
বাংলা ব্যাকরণ-এর পূর্ণ তালিকা ও বাংলা লেখার অন্যান্য অংশ এক জায়গায়।
আমাদের সাথে যুক্ত থাকো
পড়াশোনার আপডেট, সাজেশন ও প্রশ্নোত্তর সবার আগে পেতে আমাদের ফেসবুক পেজ ও গ্রুপে যুক্ত হও।






















