ষত্ব বিধান — নিয়ম ও উদাহরণসহ ব্যাখ্যা
তৎসম শব্দে কখন ষ হয় — ষত্ব বিধানের নিয়ম, উপসর্গ-নিয়ম ও ব্যতিক্রম।
সংজ্ঞা
তৎসম শব্দে কখন দন্ত্য-স না হয়ে মূর্ধন্য-ষ হবে, সেই নিয়মকে ষত্ব বিধান বলে। ণত্ব বিধানের মতো এটিও কেবল তৎসম শব্দে প্রযোজ্য।
কোথায় খাটে, কোথায় খাটে না
ষত্ব বিধান তৎসম শব্দে দন্ত্য-স-এর বদলে কখন মূর্ধন্য-ষ বসবে তার নিয়ম। ণত্ব বিধানের মতোই এটিও কেবল সংস্কৃত থেকে আসা শব্দে প্রযোজ্য; খাঁটি বাংলা, তদ্ভব, দেশি ও বিদেশি শব্দে ষ বসে না।
- বিদেশি শব্দে সব সময় স — পোস্ট, মাস্টার, স্টেশন।
- তদ্ভব শব্দেও স — সাঁঝ, সোনা।
- সন্দেহ হলে আগে শব্দের উৎস চেনো, তারপর নিয়ম প্রয়োগ করো।
অ, আ ছাড়া অন্য স্বরের পরে ষ হয়
ষত্ব বিধানের প্রধান সূত্র। অ ও আ বাদে যেকোনো স্বরের (ই, ঈ, উ, ঊ, ঋ, এ, ঐ, ও, ঔ) পরে যদি স্ আসে, তবে সেটি ষ-এ পরিণত হয়। এই সূত্রকে সংক্ষেপে বলা হয় “অ-আ ছাড়া বাকি সবেই ষ”।
| পূর্বস্বর | উদাহরণ |
|---|---|
| ই | বিষ, বিষয়, নিষেধ |
| উ | মুষিক, পুষ্প, তুষার |
| ঋ | কৃষক, বৃষ্টি, বর্ষা |
| এ | শেষ, বেষ্টন |
| ও | দোষ, ঘোষ |
- ✗ ভবিস্যৎ ✓ ভবিষ্যৎ — ই-এর পরে ষ
- ✗ বৃস্টি ✓ বৃষ্টি — ঋ-এর পরে ষ
- ✓ অসীম — অ-এর পরে, তাই স — নিয়মের সীমা এখানেই
ট ও ঠ-এর আগে ষ হয়
ট-বর্গের ধ্বনির আগে উষ্মধ্বনি এলে সেটি ষ হয়, কারণ দুটিরই উচ্চারণস্থান মূর্ধা — ঠিক ণত্ব বিধানের সমান্তরাল যুক্তি।
| শব্দ | কারণ |
|---|---|
| কষ্ট | ট-এর আগে ষ |
| নষ্ট | ট-এর আগে ষ |
| ওষ্ঠ | ঠ-এর আগে ষ |
| শ্রেষ্ঠ | ঠ-এর আগে ষ |
- ✗ কস্ট ✓ কষ্ট
- ✗ শ্রেস্ঠ ✓ শ্রেষ্ঠ
ঋ-কার ও র-এর পরে ষ
ঋ-কার এবং র্-এর পরেও দন্ত্য-স মূর্ধন্য-ষ হয়ে যায়। ণত্ব বিধানেও ঋ ও র একই কাজ করে, তাই দুটি বিধান একসঙ্গে মনে রাখা সহজ।
- ঋ ও র — ণত্বেও ণ আনে, ষত্বেও ষ আনে। একটি সূত্রেই দুটি বিধান মনে থাকে।
- ✓ বর্ষা — র-এর পরে ষ
- ✓ কৃষি — ঋ-কারের পরে ষ
- ✓ পরিষ্কার — র-এর প্রভাবে ষ
ব্যতিক্রম ও সতর্কতা
- সমাসবদ্ধ পদের সীমানা পেরিয়ে ষত্ব সাধারণত হয় না।
- অতি-, পরি-, প্রতি- উপসর্গের পরে অনেক শব্দে ষ হয় — পরিষদ, অভিষেক।
- বিদেশি শব্দে যত পরিচিতই হোক, ষ নয় — স্টেশন, পোস্টার।
- ✗ পোষ্টার ✓ পোস্টার — বিদেশি শব্দ
- ✗ মাষ্টার ✓ মাস্টার
উপসর্গের পরে ষত্ব
অতি-, অভি-, পরি-, প্রতি-, নি-, বি-, সু- এই উপসর্গগুলোর শেষে ই বা উ-কার থাকে। তাই এদের পরে দন্ত্য-স এলে সেটি নিয়মমাফিক মূর্ধন্য-ষ হয়ে যায়। উপসর্গ চিনে নিলে এই শ্রেণির বানান নিয়ে আর দ্বিধা থাকে না।
| উপসর্গ | শব্দ | কারণ |
|---|---|---|
| পরি- | পরিষদ, পরিষ্কার | ই-কারের পরে ষ |
| অভি- | অভিষেক, অভিষিক্ত | ই-কারের পরে ষ |
| প্রতি- | প্রতিষ্ঠা, প্রতিষ্ঠান | ই-কারের পরে ষ |
| নি- | নিষেধ, নিষিদ্ধ | ই-কারের পরে ষ |
| সু- | সুষম, সুষুপ্ত | উ-কারের পরে ষ |
| বি- | বিষম, বিষয় | ই-কারের পরে ষ |
- ✗ পরিসদ ✓ পরিষদ
- ✗ প্রতিস্ঠান ✓ প্রতিষ্ঠান
- ✗ নিসেধ ✓ নিষেধ
কখন স থাকে, ষ হয় না
ষত্ব বিধানের সীমা জানা যতটা দরকার, নিয়মটি জানা ততটাই। অ ও আ-এর পরে, সমাসবদ্ধ পদের সীমানায় এবং অ-তৎসম শব্দে দন্ত্য-স-ই থাকে। এই তিনটি ক্ষেত্র মনে থাকলে অতিরিক্ত ষ লেখার ভুল বন্ধ হয়।
- সন্দেহ হলে প্রথম প্রশ্ন: শব্দটি কি তৎসম? না হলে সোজা দন্ত্য-স।
- দ্বিতীয় প্রশ্ন: আগে কি অ বা আ? হলে দন্ত্য-স।
- তৃতীয় প্রশ্ন: পরে কি ট বা ঠ? হলে মূর্ধন্য-ষ।
| ক্ষেত্র | উদাহরণ | কারণ |
|---|---|---|
| অ/আ-এর পরে | অসীম, আসক্ত, বাসনা | নিয়মের বাইরে |
| সমাসবদ্ধ পদ | অগ্নিসাক্ষী, ভ্রাতুষ্পুত্র নয়—দুই পদ আলাদা | সীমানা পেরোয় না |
| বিদেশি শব্দ | স্টেশন, মাস্টার, পোস্ট | তৎসম নয় |
| তদ্ভব শব্দ | সোনা, সাঁঝ, সাপ | তৎসম নয় |
- ✗ অষীম ✓ অসীম — অ-এর পরে, তাই স
- ✗ বাষনা ✓ বাসনা
- ✗ ষোনা ✓ সোনা — তদ্ভব শব্দ
ষ, শ ও স — তিনটি উষ্মধ্বনির ভাগ
বাংলায় তিনটি উষ্মধ্বনি আছে এবং তিনটির উচ্চারণস্থান আলাদা। ষত্ব বিধান বুঝতে হলে আগে জানা দরকার এই তিনটি কে কোথায় বসে, কারণ নিয়মটি আসলে উচ্চারণস্থানেরই ফল।
- ট-বর্গ ও ষ — দুটিরই স্থান মূর্ধা, তাই ট-ঠ-এর আগে ষ বসে।
- ত-বর্গ ও স — দুটিরই স্থান দন্ত, তাই ত-থ-এর আগে স বসে।
- চ-বর্গ ও শ — দুটিরই স্থান তালু, তাই চ-ছ-এর আগে শ বসে।
| বর্ণ | নাম | উচ্চারণস্থান | উদাহরণ |
|---|---|---|---|
| শ | তালব্য-শ | তালু | শিশু, শীত, শরীর |
| ষ | মূর্ধন্য-ষ | মূর্ধা | ষাঁড়, কৃষ্ণ, কষ্ট |
| স | দন্ত্য-স | দন্ত | সব, সোনা, অসীম |
- ✓ কষ্ট — ট মূর্ধন্য, তাই ষ
- ✓ নিস্তব্ধ — ত দন্ত্য, তাই স
- ✓ নিশ্চয় — চ তালব্য, তাই শ
- ✗ নিষ্চয় ✓ নিশ্চয় — চ-এর আগে শ, ষ নয়
পরীক্ষায় আসা ষত্ব-বানানের তালিকা
বানান শুদ্ধিকরণের প্রশ্নে ষত্ব বিধান থেকেই সবচেয়ে বেশি শব্দ আসে, আর প্রায় প্রতিবার একই শব্দগুলো ফেরে। তালিকাটি একবার মিলিয়ে নিলে এই অংশে নম্বর হারানোর কারণ থাকে না।
বহুল ভুল হওয়া ষত্ব-বানান
| অশুদ্ধ | শুদ্ধ | নিয়ম |
|---|---|---|
| ভবিস্যৎ | ভবিষ্যৎ | ই-কারের পরে ষ |
| বৃস্টি | বৃষ্টি | ঋ-কারের পরে ষ |
| কস্ট | কষ্ট | ট-এর আগে ষ |
| শ্রেস্ঠ | শ্রেষ্ঠ | ঠ-এর আগে ষ |
| পরিসদ | পরিষদ | পরি- উপসর্গ |
| প্রতিস্ঠান | প্রতিষ্ঠান | প্রতি- উপসর্গ |
| ওস্ঠ | ওষ্ঠ | ঠ-এর আগে ষ |
| তুসার | তুষার | উ-কারের পরে ষ |
- ✗ নিসিদ্ধ ✓ নিষিদ্ধ
- ✗ সুসম ✓ সুষম
বিস্তারিত আলোচনা
ষত্ব বিধানের মূল শর্ত হলো অ ও আ ছাড়া অন্য স্বরধ্বনির পরে, কিংবা ক ও র-এর পরে স থাকলে সেই স মূর্ধন্য-ষ হয়ে যায়। যেমন ভবিষ্যৎ, মুষ্টি, বৃষ্টি, কৃষক, উষ্ণ। ই, উ, ঋ-কারের পর জিহ্বা স্বাভাবিকভাবেই মূর্ধার দিকে সরে আসে, তাই দন্ত্য-স উচ্চারণ কঠিন হয়ে পড়ে — এটিই নিয়মের পেছনের কারণ।
ঋ-কারের পরে এবং র্-এর পরে স থাকলে তা ষ হয়, যেমন বর্ষা, বর্ষণ, ঘর্ষণ। আবার কয়েকটি নির্দিষ্ট উপসর্গের পরেও স ষ হয় — অভি, অনু, পরি, প্রতি, বি, নি ইত্যাদির পরে যেমন অভিষেক, অনুষ্ঠান, পরিষদ, প্রতিষ্ঠান, বিষয়, নিষেধ।
কিছু শব্দে ষ ব্যবহৃত হয় কেবল প্রচলনের কারণে, কোনো সূত্র ছাড়াই — যেমন আষাঢ়, ঔষধ, কষ্ট, বিষ, ভাষা, পোষাক নয় বরং পোশাক। আর খাঁটি বাংলা ও বিদেশি শব্দে ষ ব্যবহৃত হয় না; সেখানে দন্ত্য-স বা তালব্য-শ বসে, যেমন জিনিস, পোস্ট, স্টেশন।
মনে রাখার কথা
ণত্ব বিধানের চাবি ঋ-র-ষ, আর ষত্ব বিধানের চাবি অ-আ ছাড়া অন্য স্বর, ক ও র — দুটি আলাদা রাখো।
সাধারণ ভুল
পরীক্ষায় এই ভুলগুলোই সবচেয়ে বেশি নম্বর কাটে। ভুল রূপটি দেখে নিলে নিজের লেখায় ধরা সহজ হয়।
- ✗ কস্ট ✓ কষ্ট — ট-এর আগে ষ
- ✗ ভবিস্যৎ ✓ ভবিষ্যৎ — ই-এর পরে ষ
- ✗ মাষ্টার ✓ মাস্টার — বিদেশি শব্দে ষ নয়
- ✗ ষত্ব বিধান সব বাংলা শব্দে প্রযোজ্য। ✓ কেবল তৎসম শব্দে প্রযোজ্য।
অনুশীলন
নিচের প্রশ্নগুলোর উত্তর নিজে লেখো, তারপর মিলিয়ে নাও।
- ষত্ব বিধান কাকে বলে?
- অ ও আ ছাড়া অন্য স্বরের পরে কী হয়?
- “কষ্ট” শব্দে ষ হলো কেন?
- বিদেশি শব্দে ষ বসে কি? উদাহরণ দাও।
- ঋ ও র সম্পর্কে ণত্ব ও ষত্ব বিধানের মিল কী?
- “শ্রেষ্ঠ” বানানে ষ কেন?
- উপসর্গের পরে ষত্ব হয় এমন দুটি শব্দ লেখো।
- একই শব্দে ণত্ব ও ষত্ব দুটিই দেখা যায় — এমন একটি উদাহরণ দাও।
- শ, ষ ও স-এর উচ্চারণস্থান কী কী?
- চ বা ছ-এর আগে কোন উষ্মধ্বনি বসে?
- উপসর্গের পরে ষত্ব হয় এমন তিনটি শব্দ লেখো।
- বানান শুদ্ধ করো: তুসার, নিসিদ্ধ, সুসম।
উত্তর
- তৎসম শব্দে কোথায় দন্ত্য-স-এর বদলে মূর্ধন্য-ষ বসবে, তার নিয়মকেই ষত্ব বিধান বলে।
- দন্ত্য-স মূর্ধন্য-ষ-এ পরিণত হয় — যেমন বিষ, মুষিক, বৃষ্টি।
- ট-এর আগে উষ্মধ্বনি এলে সেটি ষ হয়, কারণ দুটিরই উচ্চারণস্থান মূর্ধা।
- না। যেমন স্টেশন, মাস্টার, পোস্টার — এগুলোতে সব সময় দন্ত্য-স লেখা হয়।
- দুটি বিধানেই ঋ ও র পরের বর্ণকে মূর্ধন্য করে — ণত্বে ন থেকে ণ, ষত্বে স থেকে ষ।
- ঠ-এর আগে উষ্মধ্বনি থাকায় সেটি ষ হয়েছে — একই কারণে ওষ্ঠ, নষ্ট।
- পরিষদ ও অভিষেক। পরি- ও অভি- উপসর্গের শেষে ই-কার থাকায় পরের দন্ত্য-স মূর্ধন্য-ষ-এ পরিণত হয়েছে।
- কৃষ্ণ। ঋ-কারের পরে দন্ত্য-স মূর্ধন্য-ষ হয়েছে, আর সেই ষ-এর পরেই দন্ত্য-ন মূর্ধন্য-ণ হয়েছে।
- শ তালব্য (তালু), ষ মূর্ধন্য (মূর্ধা) এবং স দন্ত্য (দন্ত)। ষত্ব বিধানের নিয়মগুলো আসলে এই উচ্চারণস্থানেরই ফল।
- তালব্য-শ, কারণ চ-বর্গের উচ্চারণস্থানও তালু — যেমন নিশ্চয়, দুশ্চরিত্র। ষ বসালে ভুল হয়।
- পরিষদ, অভিষেক ও প্রতিষ্ঠান। তিনটিতেই উপসর্গের শেষে ই-কার থাকায় পরের দন্ত্য-স মূর্ধন্য-ষ হয়েছে।
- তুষার, নিষিদ্ধ, সুষম। তিনটিতেই অ-আ ছাড়া অন্য স্বরের পরে দন্ত্য-স মূর্ধন্য-ষ হয়েছে।
উপযোগী শ্রেণি: নবম, দশম, একাদশ, দ্বাদশ শ্রেণি।
সচরাচর জিজ্ঞাসা
তৎসম শব্দে কোন অবস্থায় দন্ত্য-স না হয়ে মূর্ধন্য-ষ হবে, তার নিয়মকে ষত্ব বিধান বলে। যেমন বৃষ্টি, কৃষক, বর্ষা।
অভি, অনু, পরি, প্রতি, বি, নি প্রভৃতি উপসর্গের পরে — যেমন অভিষেক, অনুষ্ঠান, পরিষদ, প্রতিষ্ঠান, বিষয়, নিষেধ।
না। ষত্ব বিধান কেবল তৎসম শব্দে প্রযোজ্য। খাঁটি বাংলা ও বিদেশি শব্দে দন্ত্য-স বা তালব্য-শ বসে, যেমন জিনিস, স্টেশন।
দুটিতেই ঋ ও র পরের বর্ণকে মূর্ধন্য করে দেয় — ণত্বে ন থেকে ণ, ষত্বে স থেকে ষ। আবার দুটিই কেবল তৎসম শব্দে প্রযোজ্য।
আরও বাংলা ব্যাকরণ পড়ো
বাংলা ব্যাকরণ-এর পূর্ণ তালিকা ও বাংলা লেখার অন্যান্য অংশ এক জায়গায়।
আমাদের সাথে যুক্ত থাকো
পড়াশোনার আপডেট, সাজেশন ও প্রশ্নোত্তর সবার আগে পেতে আমাদের ফেসবুক পেজ ও গ্রুপে যুক্ত হও।






















