মূলপাতা
লগইন

Color

Indigo
Red
Green
Teal
Blue
Purple
Rose

Mode

Light
EN

নাম প্রকৃতির সঙ্গে যুক্ত তদ্ধিত প্রত্যয়ের নিয়ম — ঢাকাই, সামাজিক, মানবতা প্রভৃতির বিশ্লেষণসহ।

তদ্ধিত প্রত্যয় — নিয়ম ও উদাহরণসহ ব্যাখ্যা

নাম প্রকৃতির সঙ্গে যুক্ত তদ্ধিত প্রত্যয়ের নিয়ম — ঢাকাই, সামাজিক, মানবতা প্রভৃতির বিশ্লেষণসহ।

সংজ্ঞা

নাম প্রকৃতির অর্থাৎ বিশেষ্য, বিশেষণ বা সর্বনামের সঙ্গে যে প্রত্যয় যুক্ত হয়ে নতুন শব্দ গঠন করে, তাকে তদ্ধিত প্রত্যয় বলে। এতে গঠিত শব্দকে তদ্ধিতান্ত শব্দ বলা হয়।

তদ্ধিত প্রত্যয় কোথায় বসে

নামপ্রকৃতি অর্থাৎ বিশেষ্য, বিশেষণ বা সর্বনামের সঙ্গে যে প্রত্যয় যুক্ত হয়ে নতুন শব্দ গড়ে, তাকে তদ্ধিত প্রত্যয় বলে। এভাবে গঠিত শব্দের নাম তদ্ধিতান্ত শব্দ। কৃৎ প্রত্যয়ের সঙ্গে পার্থক্য একটাই — সেটি বসে ধাতুর সঙ্গে, এটি বসে নামশব্দের সঙ্গে।

তদ্ধিত প্রত্যয়ের কাজ মূলত সম্বন্ধ বোঝানো। সমাজ থেকে সামাজিক মানে সমাজ সম্বন্ধীয়; ঢাকা থেকে ঢাকাই মানে ঢাকার। ভাব, গুণ, অধিকার, উৎপত্তিস্থান — এই সব সম্পর্কই তদ্ধিত প্রত্যয়ে প্রকাশ পায়।

কৃৎ প্রত্যয়ের মতো এখানেও দুই ধারা — খাঁটি বাংলা তদ্ধিত এবং সংস্কৃত তদ্ধিত। বাংলা ধারা ঘরোয়া শব্দ গড়ে, সংস্কৃত ধারা গড়ে আনুষ্ঠানিক ও পারিভাষিক শব্দ।

শব্দপ্রকৃতিপ্রত্যয়যে সম্বন্ধ
সামাজিকসমাজইকসমাজ সম্বন্ধীয়
ঢাকাইঢাকাআইঢাকার
বাঘাবাঘবাঘের মতো
মধুরতামধুরতামধুর হওয়ার ভাব
দাঁতালদাঁতআলদাঁত আছে যার
  • শহর + ইয়া = শহুরেশহরের অধিবাসী
  • গমন একটি তদ্ধিতান্ত শব্দ গমন কৃদন্ত — √গম্ ধাতু

সংস্কৃত তদ্ধিত প্রত্যয়

সংস্কৃত তদ্ধিত প্রত্যয় বাংলার পারিভাষিক শব্দভাণ্ডারের ভিত্তি। ইক প্রত্যয়টি একাই কয়েকশো শব্দ গড়েছে — সামাজিক, রাজনৈতিক, বার্ষিক, দৈনিক

সংস্কৃত তদ্ধিত প্রত্যয়

প্রত্যয়অর্থদ্যোতনাউদাহরণ
ইকসম্বন্ধসমাজ + ইক = সামাজিক
তাভাব বা গুণমধুর + তা = মধুরতা
ত্বভাবমনুষ্য + ত্ব = মনুষ্যত্ব
ইমনভাবনীল + ইমন = নীলিমা
ময়পূর্ণজল + ময় = জলময়
ইতযুক্তপুষ্প + ইত = পুষ্পিত
ইন্ (বিশিষ্টার্থে)অধিকারীগুণ + ইন্ = গুণী
  • বর্ষ + ইক = বার্ষিকআদ্যস্বরের বৃদ্ধি ঘটেছে
  • দিন + ইক = দৈনিক
  • মহৎ + ত্ব = মহত্ত্ব

খাঁটি বাংলা তদ্ধিত প্রত্যয়

বাংলা তদ্ধিত প্রত্যয়গুলো দৈনন্দিন ভাষার শব্দ গড়ে, আর এদের অর্থদ্যোতনা প্রায়ই খুব নির্দিষ্ট — পেশা, স্বভাব, অধিকার বা উৎপত্তিস্থান।

প্রত্যয়অর্থদ্যোতনাউদাহরণ
সাদৃশ্য বা আধিক্যবাঘ + আ = বাঘা
আইস্থান বা সম্বন্ধঢাকা + আই = ঢাকাই
আলঅধিকারীদাঁত + আল = দাঁতাল
উয়া / ওসম্বন্ধমাছ + উয়া = মেছো
গিরিপেশা বা ভাববাবু + গিরি = বাবুগিরি
পনাভাবগিন্নি + পনা = গিন্নিপনা
ওয়ালাঅধিকারীদুধ + ওয়ালা = দুধওয়ালা
মিভাবপাগল + আমি = পাগলামি
  • ধনী + ত্ব নয় — বাংলায় ধনীপনাবাংলা ধারা আলাদা
  • জেলে = জাল + ইয়াপেশাবাচক

আদ্যস্বরের বৃদ্ধি

সংস্কৃত তদ্ধিত প্রত্যয় বসার সময় মূল শব্দের প্রথম স্বরটি প্রায়ই দীর্ঘ হয়ে যায়। একে বলে আদ্যস্বরের বৃদ্ধি, এবং এটি না চিনলে প্রকৃতি বের করা কঠিন হয়ে পড়ে — সামাজিক দেখে সমাজ খুঁজে পাওয়া সহজ নয় যদি নিয়মটি জানা না থাকে।

বৃদ্ধির ধারা নির্দিষ্ট: অ হয় আ, ই হয় ঐ, উ হয় ঔ। সমাজ থেকে সামাজিক, দিন থেকে দৈনিক, পুরুষ থেকে পৌরুষ — তিনটিই এই একই নিয়মের ফল।

আদ্যস্বরবৃদ্ধিউদাহরণ
সমাজ → সামাজিক
দিন → দৈনিক
পুরুষ → পৌরুষ
বর্ষ → বার্ষিক
শিব → শৈব
  • সামাজিক = সামাজ + ইক সামাজিক = সমাজ + ইকআদ্যস্বরের বৃদ্ধি
  • দৈনিক = দৈন + ইক দৈনিক = দিন + ইক

কৃৎ ও তদ্ধিত আলাদা করার নিয়ম

পরীক্ষায় সবচেয়ে বেশি আসা প্রশ্নটি হলো একটি শব্দ দিয়ে প্রত্যয়ের শ্রেণি নির্ণয়। উত্তরের পথ একটাই — প্রকৃতিটি ধাতু না নামশব্দ তা দেখা। ধাতু হলে কৃৎ, নামশব্দ হলে তদ্ধিত।

প্রকৃতিটি ধাতু কি না বুঝতে দেখো সেটি দিয়ে কোনো ক্রিয়া গড়া যায় কি না। √চল্ দিয়ে চলি, চলে, চলব — তাই এটি ধাতু। সমাজ দিয়ে কোনো ক্রিয়া গড়া যায় না, তাই এটি নামপ্রকৃতি।

দিককৃৎ প্রত্যয়তদ্ধিত প্রত্যয়
প্রকৃতিধাতুনামশব্দ
চিহ্ন√ বসে√ বসে না
গঠিত শব্দকৃদন্ততদ্ধিতান্ত
উদাহরণ√গম্ + অন = গমনসমাজ + ইক = সামাজিক
যাচাইক্রিয়া গড়া যায়ক্রিয়া গড়া যায় না
  • চলন্ত — √চল্ ধাতু, তাই কৃৎ
  • ঢাকাই — ঢাকা নামশব্দ, তাই তদ্ধিত

তদ্ধিত প্রত্যয় ভাষাকে কী দেয়

তদ্ধিত প্রত্যয় না থাকলে বাংলায় বিশেষণ গড়া প্রায় অসম্ভব হতো। সমাজ একটি বস্তু, কিন্তু সামাজিক একটি গুণ; বর্ষ একটি সময়, কিন্তু বার্ষিক একটি বৈশিষ্ট্য। বিশেষ্য থেকে বিশেষণে যাওয়ার সেতুটিই তদ্ধিত প্রত্যয়।

একইভাবে ভাববাচক বিশেষ্যও এখান থেকেই আসে। মধুর একটি গুণ, আর মধুরতা সেই গুণের ভাব; মানুষ একটি সত্তা, আর মনুষ্যত্ব তার ধর্ম। বিমূর্ত ধারণা প্রকাশ করতে ভাষার এই যন্ত্রটিই লাগে।

তাই নতুন পরিভাষা গড়ার সময় আজও তদ্ধিত প্রত্যয় সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়। ইংরেজি -ical, -ness, -hood যে কাজ করে, বাংলায় সেই কাজ করে ইক, তা, ত্ব

  • বিশেষ্য → বিশেষণ: ইক, ময়, ইত।
  • বিশেষণ → ভাববাচক বিশেষ্য: তা, ত্ব, ইমন।
  • নাম → পেশা বা অধিকার: ওয়ালা, আল, গিরি।
  • মধুর + তা = মধুরতাগুণ থেকে ভাব
  • জল + ময় = জলময়বস্তু থেকে বিশেষণ

বিস্তারিত আলোচনা

বাংলা তদ্ধিত প্রত্যয়ের মধ্যে আই, উয়া, আলি, আমি, পনা, ত্ব, তা প্রভৃতি বহুল ব্যবহৃত। যেমন ঢাকা + আই = ঢাকাই, মিঠা + আই = মিঠাই, ছেলে + আমি = ছেলেমি, পাগল + আমি = পাগলামি, বাবু + আনা = বাবুয়ানা। প্রতিটিতেই মূল অংশ একটি বিশেষ্য বা বিশেষণ, ধাতু নয়।

সংস্কৃত তদ্ধিত প্রত্যয়ের মধ্যে ত্ব ও তা সবচেয়ে পরিচিত, দুটিই ভাববাচক বিশেষ্য গঠন করে — মানব + তা = মানবতা, গুরু + ত্ব = গুরুত্ব, মহৎ + ত্ব = মহত্ত্ব। ইক প্রত্যয়ে হয় সম্বন্ধবাচক বিশেষণ — সমাজ + ইক = সামাজিক, ইতিহাস + ইক = ঐতিহাসিক। খেয়াল রাখতে হবে ইক প্রত্যয় যুক্ত হলে প্রথম স্বরের বৃদ্ধি হয়।

তদ্ধিত প্রত্যয় নানা অর্থে ব্যবহৃত হয় — অপত্য অর্থে (মনু + ষ্ণ = মানব), সম্বন্ধ অর্থে (দেব + ষ্ণ = দৈব), সমষ্টি অর্থে (ছাত্র + ত্ব), ভাব অর্থে (প্রভু + ত্ব = প্রভুত্ব), পেশা অর্থে (কামার, কুমার)। কোন অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে, পরীক্ষায় সেটিও জিজ্ঞাসা করা হয়।

মনে রাখার কথা

তদ্ধিত প্রত্যয়ে মূল অংশ কখনোই ধাতু নয় — এটি নিশ্চিত করে নিলে কৃৎ প্রত্যয়ের সঙ্গে গুলিয়ে যাবে না।

সাধারণ ভুল

পরীক্ষায় এই ভুলগুলোই সবচেয়ে বেশি নম্বর কাটে। ভুল রূপটি দেখে নিলে নিজের লেখায় ধরা সহজ হয়।

  • সামাজিক = সামাজ + ইক সামাজিক = সমাজ + ইক — আদ্যস্বরের বৃদ্ধি ঘটেছে।
  • গমন একটি তদ্ধিতান্ত শব্দ। গমন কৃদন্ত — প্রকৃতি √গম্ ধাতু।
  • তদ্ধিত প্রত্যয় ধাতুর সঙ্গে বসে। তদ্ধিত প্রত্যয় নামপ্রকৃতির সঙ্গে বসে।
  • দৈনিক = দৈন + ইক দৈনিক = দিন + ইক।

অনুশীলন

নিচের প্রশ্নগুলোর উত্তর নিজে লেখো, তারপর মিলিয়ে নাও।

  1. তদ্ধিত প্রত্যয় কাকে বলে?
  2. প্রকৃতি-প্রত্যয় নির্ণয় করো: বার্ষিক।
  3. আদ্যস্বরের বৃদ্ধি কী? উদাহরণ দাও।
  4. কৃৎ ও তদ্ধিত প্রত্যয় আলাদা করবে কীভাবে?
  5. ভাববাচক বিশেষ্য গড়ে এমন তিনটি প্রত্যয় লেখো।
  6. খাঁটি বাংলা তদ্ধিত প্রত্যয়ের চারটি উদাহরণ দাও।
  7. “মেছো” শব্দটি কীভাবে গঠিত?

উত্তর

  1. নামপ্রকৃতির সঙ্গে যে প্রত্যয় যুক্ত হয়ে নতুন শব্দ গঠন করে তাকে তদ্ধিত প্রত্যয় বলে; গঠিত শব্দকে বলে তদ্ধিতান্ত শব্দ।
  2. বর্ষ + ইক। আদ্যস্বর অ বৃদ্ধি পেয়ে আ হয়েছে।
  3. সংস্কৃত তদ্ধিত প্রত্যয় বসলে মূল শব্দের প্রথম স্বর দীর্ঘ হয় — অ হয় আ, ই হয় ঐ, উ হয় ঔ। যেমন সমাজ → সামাজিক, দিন → দৈনিক।
  4. প্রকৃতিটি ধাতু হলে কৃৎ, নামশব্দ হলে তদ্ধিত। প্রকৃতি দিয়ে ক্রিয়া গড়া যায় কি না দেখলেই বোঝা যায়।
  5. তা, ত্ব ও ইমন — যেমন মধুরতা, মনুষ্যত্ব, নীলিমা।
  6. আ (বাঘা), আল (দাঁতাল), গিরি (বাবুগিরি) ও ওয়ালা (দুধওয়ালা)।
  7. মাছ + উয়া। বাংলা তদ্ধিত প্রত্যয় উয়া যুক্ত হয়ে সম্বন্ধ বোঝাচ্ছে।

উপযোগী শ্রেণি: নবম, দশম, একাদশ, দ্বাদশ শ্রেণি।

সচরাচর জিজ্ঞাসা

আরও বাংলা ব্যাকরণ পড়ো

বাংলা ব্যাকরণ-এর পূর্ণ তালিকা ও বাংলা লেখার অন্যান্য অংশ এক জায়গায়।

আমাদের সাথে যুক্ত থাকো

পড়াশোনার আপডেট, সাজেশন ও প্রশ্নোত্তর সবার আগে পেতে আমাদের ফেসবুক পেজ ও গ্রুপে যুক্ত হও।