পদাশ্রিত নির্দেশক — টি, টা, খানা, খানি
পদাশ্রিত নির্দেশকের সংজ্ঞা, প্রকারভেদ ও প্রয়োগ — নির্দিষ্টতা ও অনির্দিষ্টতার পার্থক্যসহ।
সংজ্ঞা
যেসব শব্দাংশ পদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে নির্দিষ্টতা বা অনির্দিষ্টতা বোঝায়, তাদের পদাশ্রিত নির্দেশক বলে। ইংরেজির article-এর কাজ বাংলায় এরাই করে।
নির্দেশক কী কাজ করে
যে শব্দাংশ পদের শেষে যুক্ত হয়ে সেই পদটিকে নির্দিষ্ট করে তোলে, তাকে পদাশ্রিত নির্দেশক বলে। বই বললে যেকোনো বই বোঝায়, কিন্তু বইটি বললে নির্দিষ্ট একটি বই। পদের আশ্রয়ে থাকে বলেই নাম পদাশ্রিত নির্দেশক।
ইংরেজিতে এই কাজ করে the — কিন্তু ইংরেজিতে সেটি শব্দের আগে বসে একটি আলাদা শব্দ হিসেবে, আর বাংলায় নির্দেশক শব্দের শেষে জুড়ে যায়। এ কারণেই বাংলায় নির্দেশককে আলাদা পদ ধরা হয় না, ধরা হয় পদের অংশ।
নির্দেশক কেবল বিশেষ্যের সঙ্গে বসে না। বিশেষণ, সর্বনাম ও সংখ্যাবাচক শব্দের সঙ্গেও বসে — ভালোটা, আমারটা, একটি। যেখানেই নির্দিষ্ট করার দরকার, সেখানেই নির্দেশক যেতে পারে।
- নির্দেশক পদের শেষে যুক্ত হয়, আগে নয়।
- প্রধান কাজ নির্দিষ্টতা বোঝানো।
- বিশেষ্য, বিশেষণ, সর্বনাম ও সংখ্যাবাচক — সবের সঙ্গেই বসতে পারে।
- ✓ বই → বইটি — অনির্দিষ্ট থেকে নির্দিষ্ট
- ✓ ভালো → ভালোটা — বিশেষণের সঙ্গে
- ✓ আমার → আমারটা — সর্বনামের সঙ্গে
নির্দেশকের তালিকা
বাংলায় ব্যবহৃত পদাশ্রিত নির্দেশকগুলো সংখ্যায় কম, কিন্তু প্রয়োগে খুব সূক্ষ্ম। কোনটি কোথায় বসবে তা বস্তুটির আকার ও বক্তার মনোভাবের ওপর নির্ভর করে।
পদাশ্রিত নির্দেশক
| নির্দেশক | প্রয়োগ | উদাহরণ |
|---|---|---|
| টা | সাধারণ, কখনো তুচ্ছার্থে | বইটা, ছেলেটা |
| টি | আদর বা ক্ষুদ্রার্থে | বইটি, মেয়েটি |
| খানা | চ্যাপ্টা বা বিস্তৃত বস্তু | কাপড়খানা, ঘরখানা |
| খানি | খানার আদরার্থক রূপ | চিঠিখানি, মুখখানি |
| গাছা | লম্বা ও সরু বস্তু | দড়িগাছা, লাঠিগাছা |
| গাছি | গাছার ক্ষুদ্রার্থক রূপ | চুড়িগাছি |
| গুলা / গুলো | বহুবচন, সাধারণ | বইগুলো, ছেলেগুলা |
| গুলি | বহুবচন, আদরার্থে | পাখিগুলি |
- ✓ একখানা চিঠি — চ্যাপ্টা বস্তু
- ✓ একগাছা দড়ি — লম্বা ও সরু
- ✗ একগাছা বই ✓ একখানা বই
টা ও টি — মনোভাবের পার্থক্য
টা আর টি ব্যাকরণগতভাবে একই কাজ করে, কিন্তু বক্তার মনোভাব আলাদা প্রকাশ করে। টি সাধারণত আদর, শ্রদ্ধা বা ক্ষুদ্রতা বোঝায়; টা নিরপেক্ষ, কখনো তুচ্ছার্থক।
ছেলেটি এসেছে আর ছেলেটা এসেছে — দুটি বাক্যে তথ্য এক, কিন্তু সুর আলাদা। প্রথমটিতে স্নেহ বা সৌজন্য, দ্বিতীয়টিতে নিরাসক্তি বা অবজ্ঞা। রচনায় ও সংলাপে এই পার্থক্য কাজে লাগে।
একই কারণে খানা ও খানি, গাছা ও গাছি, গুলা ও গুলি জোড়ায় আসে — প্রতিটি জোড়ায় দ্বিতীয়টি আদরার্থক বা ক্ষুদ্রার্থক রূপ।
| নিরপেক্ষ / তুচ্ছার্থে | আদর / ক্ষুদ্রার্থে |
|---|---|
| টা — ছেলেটা | টি — ছেলেটি |
| খানা — ঘরখানা | খানি — ঘরখানি |
| গাছা — দড়িগাছা | গাছি — চুড়িগাছি |
| গুলা — ছেলেগুলা | গুলি — পাখিগুলি |
- ✓ মেয়েটি খুব মেধাবী — স্নেহ ও সৌজন্য
- ✓ লোকটা কথা শোনে না — নিরাসক্তি
সংখ্যার সঙ্গে নির্দেশক
সংখ্যাবাচক শব্দের সঙ্গে নির্দেশক যুক্ত হলে গণনাটি নির্দিষ্ট হয়ে যায়। পাঁচ বই অনির্দিষ্ট, কিন্তু পাঁচটি বই নির্দিষ্ট পাঁচটির কথা বলে। বাংলায় সংখ্যা বলার সময় নির্দেশক প্রায় বাধ্যতামূলক — খালি সংখ্যা দিয়ে বস্তু গোনা অস্বাভাবিক শোনায়।
এখানেও বস্তুর আকার অনুযায়ী নির্দেশক বদলায়, এবং সেটি বাংলার একটি সূক্ষ্ম সৌন্দর্য। দুখানা রুটি, তিনগাছা দড়ি, চারটি কলম — তিনটি বাক্যেই সংখ্যা আছে, কিন্তু নির্দেশক তিন রকম।
| সংখ্যা + নির্দেশক | বস্তু | কেন এই নির্দেশক |
|---|---|---|
| একটি | কলম, বই | সাধারণ বস্তু |
| দুখানা | রুটি, কাপড় | চ্যাপ্টা বা বিস্তৃত |
| তিনগাছা | দড়ি, লাঠি | লম্বা ও সরু |
| চারটে | আম, ডিম | কথ্য রূপ |
- ✗ পাঁচ বই দাও ✓ পাঁচটি বই দাও
- ✗ দুইগাছা রুটি ✓ দুখানা রুটি
নির্দেশক বনাম বিভক্তি
দুটিই পদের শেষে যুক্ত হয় বলে নির্দেশক ও বিভক্তি গুলিয়ে যাওয়া স্বাভাবিক, কিন্তু কাজ সম্পূর্ণ আলাদা। বিভক্তি বাক্যে পদটির সম্পর্ক বোঝায় — কে কর্তা, কে কর্ম। নির্দেশক কেবল নির্দিষ্টতা বোঝায়, সম্পর্ক নয়।
ছেলেটি শব্দে টি নির্দেশক, কিন্তু ছেলেকে শব্দে কে বিভক্তি। দুটি একসঙ্গেও বসতে পারে — ছেলেটিকে, যেখানে টি নির্দেশক আর কে বিভক্তি। ক্রম সব সময় একই: আগে নির্দেশক, পরে বিভক্তি।
| দিক | নির্দেশক | বিভক্তি |
|---|---|---|
| কাজ | নির্দিষ্টতা বোঝায় | বাক্যে সম্পর্ক বোঝায় |
| উদাহরণ | টা, টি, খানা, গুলো | কে, রে, এ, তে, র |
| অবস্থান | বিভক্তির আগে | নির্দেশকের পরে |
| একসঙ্গে | ছেলে + টি + কে = ছেলেটিকে |
- ✓ ছেলেটিকে ডাকো — টি নির্দেশক, কে বিভক্তি
- ✗ ছেলেকেটি ✓ ছেলেটিকে — নির্দেশক আগে বসে
পরীক্ষায় কী আসে
এই অধ্যায় থেকে প্রশ্ন সাধারণত তিন রকম — সংজ্ঞা, নির্দেশক চিহ্নিত করা, আর কোন বস্তুতে কোন নির্দেশক বসবে তা নির্ণয়। শেষটিতেই বেশি ভুল হয়, কারণ খানা ও গাছা-র প্রয়োগ মনে থাকে না।
সহজ সূত্রটি মনে রাখো: চ্যাপ্টা হলে খানা, লম্বা-সরু হলে গাছা, বাকি সব টা বা টি। কাপড়, রুটি, চিঠি, ঘর চ্যাপ্টা বা বিস্তৃত — তাই খানা। দড়ি, লাঠি, চুড়ি লম্বা ও সরু — তাই গাছা।
আরেকটি প্রশ্ন আসে নির্দেশক ও বিভক্তির পার্থক্য নিয়ে। উত্তরে দুটির কাজ আলাদা করে লেখো এবং ছেলেটিকে জাতীয় একটি উদাহরণ দাও যেখানে দুটিই আছে — তাতে ব্যাখ্যাটি সম্পূর্ণ হয়।
- চ্যাপ্টা → খানা/খানি; লম্বা-সরু → গাছা/গাছি; বাকি → টা/টি।
- জোড়ার দ্বিতীয়টি সব সময় আদরার্থক।
- নির্দেশক আগে, বিভক্তি পরে — ছেলেটিকে।
- ✗ একখানা দড়ি ✓ একগাছা দড়ি
- ✗ একগাছা চিঠি ✓ একখানা চিঠি
বিস্তারিত আলোচনা
বাংলায় নির্দিষ্টতা বোঝাতে টি, টা, খানা, খানি, গাছা, গাছি, জন প্রভৃতি ব্যবহৃত হয় — বইটি, ছেলেটা, কাগজখানা, দড়িগাছা, লোকজন। এগুলো আলাদা শব্দ নয়, পদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে বসে, তাই এদের নাম পদাশ্রিত নির্দেশক।
কোন নির্দেশক কোথায় বসবে তার একটি প্রবণতা আছে। টি ও খানি সাধারণত আদরের বা ক্ষুদ্র অর্থে বসে — ছেলেটি, বইখানি। টা ও খানা তুলনায় সাধারণ বা কখনো তুচ্ছার্থে — ছেলেটা, বইখানা। জন কেবল ব্যক্তিবাচক শব্দের সঙ্গে বসে — দুজন, লোকজন। গাছা ও গাছি লম্বা বস্তুর সঙ্গে — দড়িগাছা, চুড়িগাছি।
অনির্দিষ্টতা বোঝাতে সংখ্যাবাচক শব্দ পদের আগে বসে — এক লোক, দুই ছেলে। আর নির্দিষ্টতা বোঝাতে নির্দেশক পদের পরে বসে — লোকটি, ছেলে দুটি। একই বাক্যে দুটোই থাকতে পারে, যেমন "একটি বই" — এখানে এক অনির্দিষ্ট, আর টি নির্দিষ্টতার দিকে টানছে।
মনে রাখার কথা
নির্দেশক সবসময় পদের পরে বসে, আর অনির্দিষ্টতাবাচক শব্দ আগে — অবস্থান দেখেই দুটিকে আলাদা করা যায়।
সাধারণ ভুল
পরীক্ষায় এই ভুলগুলোই সবচেয়ে বেশি নম্বর কাটে। ভুল রূপটি দেখে নিলে নিজের লেখায় ধরা সহজ হয়।
- ✗ নির্দেশক পদের আগে বসে। ✓ নির্দেশক পদের শেষে যুক্ত হয়।
- ✗ একগাছা বই ✓ একখানা বই — গাছা লম্বা-সরু বস্তুতে বসে।
- ✗ “কে” একটি পদাশ্রিত নির্দেশক। ✓ “কে” একটি বিভক্তি; নির্দেশক হলো টা, টি, খানা, গাছা।
- ✗ ছেলেকেটি ✓ ছেলেটিকে — নির্দেশক আগে, বিভক্তি পরে।
অনুশীলন
নিচের প্রশ্নগুলোর উত্তর নিজে লেখো, তারপর মিলিয়ে নাও।
- পদাশ্রিত নির্দেশক কাকে বলে?
- “খানা” ও “গাছা” কোন ধরনের বস্তুতে বসে?
- “টা” ও “টি”-এর পার্থক্য কী?
- নির্দেশক ও বিভক্তির পার্থক্য কী?
- নির্দেশক ও বিভক্তি একসঙ্গে বসলে ক্রম কী হয়?
- বহুবচন বোঝায় এমন দুটি নির্দেশক লেখো।
- নির্দেশক কি কেবল বিশেষ্যের সঙ্গে বসে?
- বাংলায় খালি সংখ্যা দিয়ে বস্তু গোনা যায় না কেন?
- একই বস্তুতে দুই রকম নির্দেশক বসলে অর্থ বদলায় কি?
- নির্দেশককে “পদাশ্রিত” বলা হয় কেন?
উত্তর
- যে শব্দাংশ পদের শেষে যুক্ত হয়ে পদটিকে নির্দিষ্ট করে তোলে, তাকে পদাশ্রিত নির্দেশক বলে — যেমন বই থেকে বইটি।
- “খানা” বসে চ্যাপ্টা বা বিস্তৃত বস্তুতে (কাপড়খানা, ঘরখানা), আর “গাছা” বসে লম্বা ও সরু বস্তুতে (দড়িগাছা, লাঠিগাছা)।
- কাজ একই, কিন্তু মনোভাব আলাদা — “টি” আদর বা ক্ষুদ্রার্থে, আর “টা” নিরপেক্ষ, কখনো তুচ্ছার্থে।
- নির্দেশক নির্দিষ্টতা বোঝায় আর বিভক্তি বাক্যে পদের সম্পর্ক বোঝায়। “ছেলেটিকে”-তে টি নির্দেশক এবং কে বিভক্তি।
- আগে নির্দেশক, পরে বিভক্তি — ছেলে + টি + কে = ছেলেটিকে।
- “গুলো” ও “গুলি” — যেমন বইগুলো, পাখিগুলি। দ্বিতীয়টি আদরার্থক।
- না। বিশেষণ, সর্বনাম ও সংখ্যাবাচক শব্দের সঙ্গেও বসে — ভালোটা, আমারটা, একটি।
- কারণ সংখ্যাবাচক শব্দের সঙ্গে নির্দেশক প্রায় বাধ্যতামূলক। “পাঁচ বই” অস্বাভাবিক শোনায়, “পাঁচটি বই” স্বাভাবিক — নির্দেশকই গণনাটিকে নির্দিষ্ট করে তোলে।
- তথ্য বদলায় না, সুর বদলায়। “ছেলেটি এসেছে” আর “ছেলেটা এসেছে” — প্রথমটিতে স্নেহ বা সৌজন্য, দ্বিতীয়টিতে নিরাসক্তি প্রকাশ পায়।
- কারণ এটি একা দাঁড়াতে পারে না, সব সময় কোনো পদের আশ্রয়ে সেই পদের শেষে যুক্ত হয়ে বসে। এ কারণেই একে আলাদা পদ ধরা হয় না, ধরা হয় পদের অংশ।
উপযোগী শ্রেণি: নবম, দশম, একাদশ, দ্বাদশ শ্রেণি।
সচরাচর জিজ্ঞাসা
যেসব শব্দাংশ পদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে নির্দিষ্টতা বা অনির্দিষ্টতা বোঝায়, তাদের পদাশ্রিত নির্দেশক বলে — যেমন টি, টা, খানা, খানি, জন।
টি সাধারণত আদর, ক্ষুদ্রতা বা সম্মান বোঝায় (ছেলেটি), আর টা তুলনামূলকভাবে সাধারণ বা কখনো তুচ্ছার্থে ব্যবহৃত হয় (ছেলেটা)।
কেবল ব্যক্তিবাচক শব্দের সঙ্গে — যেমন দুজন, তিনজন, লোকজন। বস্তুবাচক শব্দের সঙ্গে জন ব্যবহৃত হয় না।
কাজে প্রায় এক — দুটিই নির্দিষ্টতা বোঝায়। তবে ইংরেজিতে the শব্দের আগে বসে আলাদা শব্দ হিসেবে, আর বাংলায় নির্দেশক শব্দের শেষে জুড়ে যায়। এ কারণেই বাংলায় একে আলাদা পদ ধরা হয় না, ধরা হয় পদের অংশ।
আরও বাংলা ব্যাকরণ পড়ো
বাংলা ব্যাকরণ-এর পূর্ণ তালিকা ও বাংলা লেখার অন্যান্য অংশ এক জায়গায়।
আমাদের সাথে যুক্ত থাকো
পড়াশোনার আপডেট, সাজেশন ও প্রশ্নোত্তর সবার আগে পেতে আমাদের ফেসবুক পেজ ও গ্রুপে যুক্ত হও।






















