সংখ্যাবাচক শব্দ — অঙ্কবাচক, পূরণবাচক ও তারিখবাচক
সংখ্যাবাচক শব্দের চার প্রকার এবং পূরণবাচক ও তারিখবাচক শব্দের তালিকা উদাহরণসহ।
সংজ্ঞা
যে শব্দ দিয়ে সংখ্যা, ক্রম, পূরণ বা পরিমাণ বোঝানো হয়, তাকে সংখ্যাবাচক শব্দ বলে। বাংলায় এর কয়েকটি স্বতন্ত্র রূপ আছে।
সংখ্যাবাচক শব্দের চার প্রকার
যে শব্দ দিয়ে সংখ্যা, পরিমাণ, ক্রম বা তারিখ বোঝানো হয়, তাকে সংখ্যাবাচক শব্দ বলে। বাংলায় এদের চার ভাগে ভাগ করা হয়, এবং চারটি ভাগ একই সংখ্যার চার রকম রূপ — এক সংখ্যাটিই ১, এক, প্রথম ও পয়লা রূপে দেখা দেয়।
ভাগগুলো আলাদা করার নিয়ম সহজ। চিহ্ন হলে অঙ্কবাচক, গোনা হলে পরিমাণবাচক, ক্রম বোঝালে ক্রমবাচক, আর দিনের তারিখ হলে তারিখবাচক। প্রশ্নে যে রূপটি দেওয়া আছে সেটি দেখেই ভাগ বলা যায়।
একই সংখ্যার চার রূপ
| প্রকার | কী বোঝায় | এক | দুই | তিন | চার |
|---|---|---|---|---|---|
| অঙ্কবাচক | সংখ্যার চিহ্ন | ১ | ২ | ৩ | ৪ |
| পরিমাণবাচক | গণনা | এক | দুই | তিন | চার |
| ক্রমবাচক | ক্রম বা পূরণ | প্রথম | দ্বিতীয় | তৃতীয় | চতুর্থ |
| তারিখবাচক | মাসের দিন | পয়লা | দোসরা | তেসরা | চৌঠা |
- ✓ পাঁচটি বই — পরিমাণবাচক
- ✓ পঞ্চম শ্রেণি — ক্রমবাচক
- ✓ পয়লা বৈশাখ — তারিখবাচক
ক্রমবাচক শব্দ নিয়মিত নয়
ক্রমবাচক শব্দগুলো সংখ্যার সঙ্গে কোনো নির্দিষ্ট প্রত্যয় যোগ করে তৈরি হয়নি — প্রায় প্রতিটির রূপ আলাদা, এবং অনেকগুলো সরাসরি সংস্কৃত থেকে এসেছে। তাই এদের গঠন বের করার চেষ্টা না করে তালিকা ধরে মনে রাখাই কাজের।
বিশেষভাবে সতর্ক থাকতে হয় দ্বিতীয়, চতুর্থ ও ষষ্ঠ নিয়ে। বাংলায় এদের সংক্ষিপ্ত রূপ যথাক্রমে ২য়, ৪র্থ ও ৬ষ্ঠ — সংখ্যার পরে ম বসিয়ে লিখলে ভুল হয়। এই তিনটিই সবচেয়ে বেশি ভুল লেখা হয়।
| সংখ্যা | ক্রমবাচক | সংক্ষিপ্ত রূপ |
|---|---|---|
| ১ | প্রথম | ১ম |
| ২ | দ্বিতীয় | ২য় |
| ৩ | তৃতীয় | ৩য় |
| ৪ | চতুর্থ | ৪র্থ |
| ৫ | পঞ্চম | ৫ম |
| ৬ | ষষ্ঠ | ৬ষ্ঠ |
| ৭ | সপ্তম | ৭ম |
- ✗ ২ম শ্রেণি ✓ ২য় শ্রেণি
- ✗ ৪ম অধ্যায় ✓ ৪র্থ অধ্যায়
- ✗ ৬ম শ্রেণি ✓ ৬ষ্ঠ শ্রেণি
তারিখবাচক শব্দের নিজস্ব ধারা
মাসের প্রথম চারটি দিনের নাম সম্পূর্ণ আলাদা — পয়লা, দোসরা, তেসরা, চৌঠা। এগুলো ফারসি প্রভাবে গড়া এবং সংখ্যার সঙ্গে এদের রূপগত মিল নেই। পাঁচ থেকে শুরু করে ধারাটি নিয়মিত হয়ে যায়: পাঁচই, ছউই, সাতই, আটই।
তারপর সংখ্যার শেষ ধ্বনি অনুযায়ী ই, শে বা এ বসে — আঠারোই, একুশে, পঁচিশে। একুশে ফেব্রুয়ারি বা পঁচিশে বৈশাখ এই ধারারই উদাহরণ, এবং এগুলো বাংলা সংস্কৃতিতে নামের মতো ব্যবহৃত হয়।
| তারিখ | তারিখবাচক শব্দ |
|---|---|
| ১ | পয়লা / পহেলা |
| ২ | দোসরা |
| ৩ | তেসরা |
| ৪ | চৌঠা |
| ৫ | পাঁচই |
| ৭ | সাতই |
| ২১ | একুশে |
| ২৫ | পঁচিশে |
- ✓ পয়লা বৈশাখ — বছরের প্রথম দিন
- ✓ একুশে ফেব্রুয়ারি — তারিখবাচক শব্দ নামের মতো ব্যবহৃত
- ✗ এক বৈশাখ ✓ পয়লা বৈশাখ
পরিমাণবাচক শব্দের সঙ্গে নির্দেশক
পরিমাণবাচক শব্দ একা বসলে অনির্দিষ্ট থাকে, কিন্তু তার সঙ্গে পদাশ্রিত নির্দেশক যোগ করলে নির্দিষ্টতা আসে। পাঁচ বই আর পাঁচটি বই এক নয় — দ্বিতীয়টিতে নির্দিষ্ট পাঁচটির কথা বলা হচ্ছে।
কোন নির্দেশক বসবে তা নির্ভর করে বস্তুটির চেহারার ওপর। চ্যাপ্টা বা বিস্তৃত বস্তুতে খানা, খানি; লম্বা ও সরু বস্তুতে গাছা, গাছি; আর সাধারণভাবে টা, টি। এই বাছাইটিই বাংলার একটি সূক্ষ্ম বৈশিষ্ট্য।
| নির্দেশক | কোন বস্তুতে | উদাহরণ |
|---|---|---|
| টা / টি | সাধারণ যেকোনো বস্তু | একটি বই, দুটি কলম |
| খানা / খানি | চ্যাপ্টা বা বিস্তৃত | একখানা কাপড়, দুখানা রুটি |
| গাছা / গাছি | লম্বা ও সরু | একগাছা দড়ি, দুগাছি চুড়ি |
| গুলি / গুলো | বহুবচন | বইগুলো, ছেলেগুলি |
- ✓ একখানা চিঠি — চ্যাপ্টা বস্তু
- ✗ একগাছা বই ✓ একখানা বই — বই লম্বা-সরু নয়
সংখ্যাবাচক শব্দ ও বাংলা সংস্কৃতি
সংখ্যাবাচক শব্দ কেবল ব্যাকরণের বিষয় নয়, বাংলা সংস্কৃতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়ানো। পয়লা বৈশাখ, একুশে ফেব্রুয়ারি, পঁচিশে বৈশাখ — তিনটিই তারিখবাচক শব্দ, অথচ প্রতিটি একেকটি উৎসব বা স্মরণের নাম হয়ে গেছে।
এই কারণেই তারিখবাচক শব্দের বানান নিয়ে সতর্ক থাকা দরকার। একুশে ফেব্রুয়ারি লিখতে গিয়ে ২১ ফেব্রুয়ারি লিখলে তারিখটি ঠিক থাকে, কিন্তু নামটি হারিয়ে যায়। রচনা বা প্রতিবেদনে শব্দরূপটিই ব্যবহার করা রীতি।
পরিমাণবাচক শব্দেও একই কথা খাটে। বাংলায় কুড়ি (২০), গণ্ডা (৪), হালি (৪), ডজন (১২) জাতীয় শব্দ প্রচলিত, যেগুলো নির্দিষ্ট পরিমাণ বোঝায় এবং বাজারের ভাষায় আজও ব্যবহৃত হয়।
- উৎসব ও স্মরণের নামে তারিখবাচক শব্দই ব্যবহৃত হয়।
- কুড়ি, হালি, গণ্ডা, ডজন — প্রচলিত পরিমাণবাচক শব্দ।
- কুড়ি একটি দেশি শব্দ, সংস্কৃত নয়।
- ✓ এক হালি ডিম = চারটি ডিম
- ✓ এক কুড়ি = বিশটি
পরীক্ষায় কী আসে
এই অধ্যায় থেকে প্রশ্ন সাধারণত দুই রকম — প্রকারভেদ ও উদাহরণ, অথবা একটি শব্দ দিয়ে প্রকার নির্ণয়। দ্বিতীয়টিতে তারিখবাচক ও ক্রমবাচক গুলিয়ে ফেলা সবচেয়ে সাধারণ ভুল।
পার্থক্যটি মনে রাখার সহজ উপায় আছে: ক্রমবাচক বোঝায় অবস্থান (প্রথম স্থান, দ্বিতীয় শ্রেণি), আর তারিখবাচক বোঝায় দিন (পয়লা বৈশাখ, তেসরা মার্চ)। প্রশ্নে মাসের নাম থাকলে প্রায় নিশ্চিতভাবে তারিখবাচক।
বানানের প্রশ্নেও এই অধ্যায় আসে, বিশেষত সংক্ষিপ্ত ক্রমবাচক রূপ নিয়ে। ২য়, ৪র্থ ও ৬ষ্ঠ — এই তিনটি ঠিকভাবে লিখতে পারলে বাকিগুলোতে ভুল হওয়ার সুযোগ কম।
- ক্রমবাচক = অবস্থান; তারিখবাচক = দিন।
- মাসের নাম সঙ্গে থাকলে তারিখবাচক।
- ২য়, ৪র্থ, ৬ষ্ঠ — অনিয়মিত সংক্ষিপ্ত রূপ, মুখস্থ রাখো।
- ✗ পয়লা বৈশাখ — ক্রমবাচক ✓ পয়লা বৈশাখ — তারিখবাচক
- ✗ প্রথম শ্রেণি — তারিখবাচক ✓ প্রথম শ্রেণি — ক্রমবাচক
বিস্তারিত আলোচনা
সংখ্যাবাচক শব্দ প্রধানত চার প্রকার। অঙ্কবাচক শব্দে সংখ্যা অঙ্কে বা কথায় লেখা হয় — ১, ২, ৩ কিংবা এক, দুই, তিন। পরিমাণবাচক শব্দে বস্তুর পরিমাণ বোঝায় — একটি, দুটি, তিনখানা। পূরণবাচক শব্দে ক্রম বোঝায় — প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয়। আর তারিখবাচক শব্দে দিনের ক্রম বোঝায় — পয়লা, দোসরা, তেসরা, চৌঠা।
পূরণবাচক শব্দ গঠনে বাংলা কিছু অনিয়ম দেখায়, আর পরীক্ষায় ভুলটি সেখানেই হয়। এক থেকে হয় প্রথম, দুই থেকে দ্বিতীয়, তিন থেকে তৃতীয়, চার থেকে চতুর্থ, পাঁচ থেকে পঞ্চম, ছয় থেকে ষষ্ঠ। এগুলো সংখ্যার সঙ্গে কোনো নির্দিষ্ট প্রত্যয় যোগ করে পাওয়া যায় না, তাই আলাদাভাবে মনে রাখতে হয়।
সাত থেকে অবশ্য নিয়ম কিছুটা স্থির হয় — সপ্তম, অষ্টম, নবম, দশম, একাদশ, দ্বাদশ। আর তারিখবাচক শব্দ ব্যবহৃত হয় কেবল মাসের প্রথম কয়েক দিনের জন্য: পয়লা, দোসরা, তেসরা, চৌঠা, পাঁচই, ছয়ই, সাতই — এরপর সাধারণ সংখ্যাই ব্যবহৃত হয়।
মনে রাখার কথা
পূরণবাচক শব্দে নিয়ম কম, ব্যতিক্রম বেশি — প্রথম থেকে ষষ্ঠ পর্যন্ত আলাদা করে মুখস্থ করাই নিরাপদ।
সাধারণ ভুল
পরীক্ষায় এই ভুলগুলোই সবচেয়ে বেশি নম্বর কাটে। ভুল রূপটি দেখে নিলে নিজের লেখায় ধরা সহজ হয়।
- ✗ ২ম, ৪ম, ৬ম ✓ ২য়, ৪র্থ, ৬ষ্ঠ — অনিয়মিত রূপ
- ✗ “পয়লা বৈশাখ” ক্রমবাচক শব্দ। ✓ এটি তারিখবাচক শব্দ।
- ✗ একগাছা বই ✓ একখানা বই — গাছা লম্বা-সরু বস্তুতে বসে।
- ✗ সংখ্যাবাচক শব্দ তিন প্রকার। ✓ চার প্রকার — অঙ্কবাচক, পরিমাণবাচক, ক্রমবাচক ও তারিখবাচক।
অনুশীলন
নিচের প্রশ্নগুলোর উত্তর নিজে লেখো, তারপর মিলিয়ে নাও।
- সংখ্যাবাচক শব্দ কত প্রকার ও কী কী?
- “চার” সংখ্যার চার রূপ লেখো।
- ক্রমবাচক ও তারিখবাচক শব্দ আলাদা করবে কীভাবে?
- দ্বিতীয়, চতুর্থ ও ষষ্ঠের সংক্ষিপ্ত রূপ লেখো।
- “একগাছা” ও “একখানা” কোন ধরনের বস্তুতে বসে?
- এক হালি ও এক কুড়ি বলতে কত বোঝায়?
- মাসের প্রথম চার দিনের তারিখবাচক শব্দ লেখো।
- তারিখবাচক শব্দ কোন ভাষার প্রভাবে গড়া?
- একই সংখ্যার চার রূপ থাকার সুবিধা কী?
উত্তর
- চার প্রকার — অঙ্কবাচক, পরিমাণবাচক, ক্রমবাচক ও তারিখবাচক।
- অঙ্কবাচক ৪, পরিমাণবাচক চার, ক্রমবাচক চতুর্থ এবং তারিখবাচক চৌঠা।
- ক্রমবাচক অবস্থান বোঝায় (দ্বিতীয় শ্রেণি), আর তারিখবাচক মাসের দিন বোঝায় (দোসরা মার্চ)। মাসের নাম সঙ্গে থাকলে সেটি তারিখবাচক।
- ২য়, ৪র্থ ও ৬ষ্ঠ। সংখ্যার পরে “ম” বসালে ভুল হয়।
- “গাছা” বসে লম্বা ও সরু বস্তুতে (দড়ি, চুড়ি), আর “খানা” বসে চ্যাপ্টা বা বিস্তৃত বস্তুতে (কাপড়, রুটি)।
- এক হালি মানে চারটি এবং এক কুড়ি মানে বিশটি। কুড়ি একটি দেশি শব্দ।
- পয়লা, দোসরা, তেসরা ও চৌঠা — এদের রূপ সংখ্যার সঙ্গে মেলে না।
- মাসের প্রথম চার দিনের নাম — পয়লা, দোসরা, তেসরা, চৌঠা — ফারসি প্রভাবে গড়া, তাই সংখ্যার সঙ্গে এদের রূপগত মিল নেই।
- প্রতিটি রূপ আলাদা কাজ করে — অঙ্ক লেখায় সংক্ষেপ আনে, পরিমাণবাচক গোনায় ব্যবহৃত হয়, ক্রমবাচক অবস্থান বোঝায় এবং তারিখবাচক দিন নির্দেশ করে। একটিই রূপ থাকলে বাক্যে ভূমিকা বোঝা যেত না।
উপযোগী শ্রেণি: নবম, দশম, একাদশ, দ্বাদশ শ্রেণি।
সচরাচর জিজ্ঞাসা
চার প্রকার — অঙ্কবাচক (এক, দুই), পরিমাণবাচক (একটি, দুটি), পূরণবাচক (প্রথম, দ্বিতীয়) এবং তারিখবাচক (পয়লা, দোসরা)।
যে শব্দ দিয়ে ক্রম বা পূরণ বোঝানো হয় — যেমন প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ, পঞ্চম, ষষ্ঠ। এগুলো নিয়মে নয়, প্রচলনে গঠিত।
মাসের প্রথম কয়েক দিনের জন্য — পয়লা, দোসরা, তেসরা, চৌঠা, পাঁচই, ছয়ই, সাতই। এরপর সাধারণ সংখ্যাবাচক শব্দই ব্যবহৃত হয়।
কারণ রূপগুলো নিয়মিত নয়। ১ম, ৩য়, ৫ম, ৭ম নিয়ম মেনে চললেও দ্বিতীয়, চতুর্থ ও ষষ্ঠের রূপ যথাক্রমে ২য়, ৪র্থ ও ৬ষ্ঠ — সংখ্যার পরে “ম” বসালে ভুল হয়।
আরও বাংলা ব্যাকরণ পড়ো
বাংলা ব্যাকরণ-এর পূর্ণ তালিকা ও বাংলা লেখার অন্যান্য অংশ এক জায়গায়।
আমাদের সাথে যুক্ত থাকো
পড়াশোনার আপডেট, সাজেশন ও প্রশ্নোত্তর সবার আগে পেতে আমাদের ফেসবুক পেজ ও গ্রুপে যুক্ত হও।






















