দ্বিরুক্ত শব্দ — প্রকারভেদ ও উদাহরণ
শব্দ, পদ ও ধ্বন্যাত্মক দ্বিরুক্তির পার্থক্য এবং প্রতিটির উদাহরণ ও অর্থগত ব্যবহার।
সংজ্ঞা
একই শব্দ বা শব্দাংশ দুবার ব্যবহৃত হয়ে যখন নতুন অর্থ প্রকাশ করে, তাকে দ্বিরুক্ত শব্দ বলে। বাংলায় এই প্রয়োগ খুব সাধারণ এবং অর্থে বৈচিত্র্য আনে।
দ্বিরুক্তি কী এবং কেন হয়
একই শব্দ, পদ বা ধ্বনি পরপর দুবার ব্যবহার করে যখন নতুন অর্থ তৈরি করা হয়, তখন তাকে দ্বিরুক্ত শব্দ বলে। ভালো ভালো, ঘরে ঘরে, ঝমঝম — তিনটিই দ্বিরুক্তি, তবে তিন রকমের।
দ্বিরুক্তি নিছক পুনরাবৃত্তি নয়। ভালো আর ভালো ভালো এক কথা নয় — দ্বিতীয়টিতে বহুত্ব যোগ হয়েছে। বার আর বার বার-এও তাই: একটিতে একবার, অন্যটিতে ধারাবাহিকতা। শব্দটি দুবার বলার মধ্য দিয়েই অর্থে নতুন মাত্রা আসে, আর সেটিই দ্বিরুক্তির কাজ।
বাংলা ভাষায় দ্বিরুক্তি খুব সক্রিয়, কারণ বাংলায় আধিক্য, ধারাবাহিকতা বা সামান্যতা বোঝাতে আলাদা শব্দের চেয়ে পুনরাবৃত্তিই স্বাভাবিক মনে হয়। ইংরেজিতে যেখানে very বা repeatedly বসাতে হয়, বাংলায় সেখানে শব্দটি দুবার বললেই চলে।
- দ্বিরুক্তি তিন প্রকার — শব্দের, পদের ও ধ্বন্যাত্মক।
- পুনরাবৃত্তি অর্থে নতুন মাত্রা যোগ করে, নয়তো সেটি দ্বিরুক্তি নয়।
- দ্বিরুক্ত শব্দকে শব্দদ্বৈত নামেও ডাকা হয়।
- ✓ ভালো → ভালো ভালো — বহুত্ব যোগ হলো
- ✓ বার → বার বার — ধারাবাহিকতা যোগ হলো
শব্দের দ্বিরুক্তি — চার ধরন
একই শব্দ বা কাছাকাছি অর্থের দুটি শব্দ পাশাপাশি বসিয়ে যে দ্বিরুক্তি হয়, সেটিই শব্দের দ্বিরুক্তি। এর ভেতরে চারটি আলাদা ধরন আছে, এবং পরীক্ষায় ধরন নির্ণয় করতেই বলা হয়।
শব্দের দ্বিরুক্তির চার ধরন
| ধরন | গঠন | উদাহরণ |
|---|---|---|
| অবিকৃত | একই শব্দ হুবহু দুবার | ভালো ভালো, বার বার, ধীরে ধীরে |
| সামান্য পরিবর্তিত | দ্বিতীয়টি সামান্য বদলে | ঘর-দোর, চুপচাপ, মিল-মিশ |
| সমার্থক | কাছাকাছি অর্থের দুই শব্দ | ধন-দৌলত, খেলা-ধুলা, রাগ-অনুরাগ |
| বিপরীতার্থক | বিপরীত অর্থের দুই শব্দ | আসা-যাওয়া, দিন-রাত, ভালো-মন্দ |
- ✓ ঘর-দোর — সামান্য পরিবর্তিত — “দোর” একা ব্যবহৃত হয় না
- ✓ দিন-রাত — বিপরীতার্থক — দুটি বিপরীত শব্দ
- ✗ ধন-দৌলত বিপরীতার্থক ✓ ধন-দৌলত সমার্থক দ্বিরুক্তি
পদের দ্বিরুক্তি
বিভক্তিযুক্ত পদ দুবার ব্যবহার করলে হয় পদের দ্বিরুক্তি। শব্দের দ্বিরুক্তির সঙ্গে পার্থক্যটি সূক্ষ্ম কিন্তু নির্দিষ্ট — এখানে শব্দটির সঙ্গে বিভক্তি বা অনুসর্গ যুক্ত থাকে।
ঘর শব্দটি দুবার বললে হয় শব্দের দ্বিরুক্তি, কিন্তু ঘরে ঘরে বললে এ বিভক্তি যুক্ত হওয়ায় সেটি পদের দ্বিরুক্তি। এই একটি প্রশ্নেই ধরন নির্ণয় হয়ে যায় — বিভক্তি আছে কি না দেখো।
| পদ | বিভক্তি | অর্থ |
|---|---|---|
| ঘরে ঘরে | এ | প্রতিটি ঘরে |
| হাতে হাতে | এ | তৎক্ষণাৎ |
| দুয়ে দুয়ে | এ | জোড়ায় জোড়ায় |
| জনে জনে | এ | প্রত্যেককে |
| কালে কালে | এ | যুগে যুগে |
- ✓ ঘরে ঘরে — পদের দ্বিরুক্তি — বিভক্তি আছে
- ✓ ঘর ঘর — শব্দের দ্বিরুক্তি — বিভক্তি নেই
ধ্বন্যাত্মক বা অনুকার দ্বিরুক্তি
প্রকৃতির বা বস্তুর শব্দ অনুকরণ করে যে দ্বিরুক্তি তৈরি হয়, তাকে ধ্বন্যাত্মক দ্বিরুক্তি বলে। ঝমঝম, কড়কড়, টাপুরটুপুর — এদের কোনো মূল শব্দ নেই, শব্দটি নিজেই ধ্বনির অনুকরণ।
এই শ্রেণিটি বাংলার একটি বড় সম্পদ। বৃষ্টির শব্দ, বাতাসের শব্দ, হাঁটার শব্দ — প্রতিটির জন্য আলাদা দ্বিরুক্ত শব্দ আছে, আর সেগুলো কবিতা ও গল্পে ছবি আঁকার কাজ করে।
| শব্দ | কী বোঝায় |
|---|---|
| ঝমঝম | জোরে বৃষ্টির শব্দ |
| টাপুরটুপুর | হালকা বৃষ্টির শব্দ |
| কড়কড় | বজ্রের শব্দ |
| শনশন | বাতাসের শব্দ |
| মিটমিট | ক্ষীণ আলো |
| ধুকপুক | হৃৎস্পন্দন |
- ✓ বৃষ্টি টাপুরটুপুর পড়ছে — ধ্বনির অনুকরণ
- ✗ ঝমঝম শব্দের দ্বিরুক্তি ✓ ঝমঝম ধ্বন্যাত্মক দ্বিরুক্তি
দ্বিরুক্তি কী কী অর্থ যোগ করে
ধরন চেনার পাশাপাশি প্রশ্নে প্রায়ই জানতে চাওয়া হয় দ্বিরুক্তিটি কোন অর্থ প্রকাশ করছে। একই গঠন প্রসঙ্গভেদে ভিন্ন অর্থ দিতে পারে, তাই বাক্যটি দেখে সিদ্ধান্ত নিতে হয়।
| অর্থ | উদাহরণ | বাক্য |
|---|---|---|
| আধিক্য | রাশি রাশি | রাশি রাশি ধান কাটা হলো |
| ধারাবাহিকতা | বার বার | সে বার বার ডাকল |
| সামান্যতা | ঈষৎ ঈষৎ | ঈষৎ ঈষৎ হাসি |
| বহুত্ব | ভালো ভালো | ভালো ভালো বই পড়ো |
| তীব্রতা | গরম গরম | গরম গরম খেয়ে নাও |
| ব্যাপ্তি | ঘরে ঘরে | ঘরে ঘরে খবর পৌঁছাল |
- ✓ রাশি রাশি — আধিক্য
- ✓ জনে জনে — ব্যাপ্তি
পরীক্ষায় কীভাবে আসে
দ্বিরুক্ত শব্দ থেকে প্রশ্ন তিন রকম — সংজ্ঞা ও প্রকারভেদ, একটি শব্দ দিয়ে ধরন নির্ণয়, আর বাক্যে প্রয়োগ করে অর্থ লেখা। তিনটিতেই উত্তরের কাঠামো আলাদা, তাই প্রশ্নটি মন দিয়ে পড়া দরকার।
ধরন নির্ণয়ের প্রশ্নে সবচেয়ে বেশি ভুল হয় পদের দ্বিরুক্তি নিয়ে। শিক্ষার্থীরা ঘরে ঘরে দেখে শব্দের দ্বিরুক্তি লিখে ফেলে, অথচ বিভক্তি থাকায় সেটি পদের দ্বিরুক্তি। বিভক্তি আছে কি না — এই একটি প্রশ্নই যথেষ্ট।
উত্তরে ধরনের নামের সঙ্গে কারণটিও লিখতে হয়। “ঘরে ঘরে — পদের দ্বিরুক্তি, কারণ এখানে এ বিভক্তি যুক্ত আছে” — এই এক বাক্যেই পূর্ণ নম্বর।
- বিভক্তি থাকলে পদের দ্বিরুক্তি, না থাকলে শব্দের।
- মূল শব্দ না থাকলে, কেবল ধ্বনি অনুকরণ হলে ধ্বন্যাত্মক।
- উত্তরে ধরন + কারণ দুটিই লেখো।
- ✗ উত্তর: শব্দের দ্বিরুক্তি। ✓ উত্তর: পদের দ্বিরুক্তি, কারণ এ বিভক্তি যুক্ত আছে।
বিস্তারিত আলোচনা
দ্বিরুক্ত শব্দ তিন প্রকার। শব্দের দ্বিরুক্তিতে গোটা শব্দ দুবার বসে — ভালো ভালো, ছোট ছোট, ধীরে ধীরে, বার বার। পদের দ্বিরুক্তিতে বিভক্তিযুক্ত পদ দুবার বসে — হাতে হাতে, ঘরে ঘরে, দেশে দেশে। আর ধ্বন্যাত্মক দ্বিরুক্তিতে অর্থহীন ধ্বনি দুবার বসে অনুকার শব্দ তৈরি করে — কলকল, ঝরঝর, টুপটাপ, মিটমিট।
দ্বিরুক্ত শব্দ নানা অর্থে ব্যবহৃত হয়। আধিক্য বোঝাতে — রাশি রাশি, ধামা ধামা। ধারাবাহিকতা বোঝাতে — ক্রমে ক্রমে, ধীরে ধীরে। সামান্যতা বোঝাতে — জ্বর জ্বর, ভয় ভয়। বিরক্তি বা তুচ্ছার্থে — খাওয়া-দাওয়া, লেখা-পড়া। আবার সমার্থক শব্দ পাশাপাশি বসিয়েও দ্বিরুক্তি হয় — ধন-দৌলত, কাগজ-পত্র, ঘর-বাড়ি।
অনুকার বা ধ্বন্যাত্মক শব্দ বাংলার একটি বিশেষ সম্পদ। প্রাণীর ডাক (ঘেউ ঘেউ, কা কা), প্রাকৃতিক শব্দ (গুড় গুড়, ঝম ঝম), কিংবা বস্তুর শব্দ (ঠক ঠক, খট খট) — সবই এই শ্রেণিতে পড়ে। এদের অংশগুলো আলাদাভাবে অর্থহীন, কিন্তু একসঙ্গে বসলে স্পষ্ট অর্থ তৈরি হয়।
মনে রাখার কথা
দ্বিরুক্ত শব্দ চেনা সহজ, কিন্তু কোন প্রকারের তা বলা কঠিন — শব্দ, পদ না ধ্বনি দুবার হয়েছে, সেটিই দেখো।
সাধারণ ভুল
পরীক্ষায় এই ভুলগুলোই সবচেয়ে বেশি নম্বর কাটে। ভুল রূপটি দেখে নিলে নিজের লেখায় ধরা সহজ হয়।
- ✗ “ঘরে ঘরে” শব্দের দ্বিরুক্তি। ✓ এটি পদের দ্বিরুক্তি — এ বিভক্তি যুক্ত আছে।
- ✗ “ধন-দৌলত” বিপরীতার্থক দ্বিরুক্তি। ✓ এটি সমার্থক দ্বিরুক্তি।
- ✗ “ঝমঝম” শব্দের দ্বিরুক্তি। ✓ এটি ধ্বন্যাত্মক দ্বিরুক্তি — মূল শব্দ নেই।
- ✗ দ্বিরুক্তি মানে কেবল পুনরাবৃত্তি। ✓ পুনরাবৃত্তিতে অর্থে নতুন মাত্রা যোগ হলে তবেই দ্বিরুক্তি।
অনুশীলন
নিচের প্রশ্নগুলোর উত্তর নিজে লেখো, তারপর মিলিয়ে নাও।
- দ্বিরুক্ত শব্দ কাকে বলে?
- দ্বিরুক্তি কত প্রকার ও কী কী?
- “ঘরে ঘরে” কোন ধরনের দ্বিরুক্তি ও কেন?
- শব্দের দ্বিরুক্তির চারটি ধরন লেখো।
- ধ্বন্যাত্মক দ্বিরুক্তির তিনটি উদাহরণ দাও।
- “রাশি রাশি” কোন অর্থ প্রকাশ করে?
- দ্বিরুক্তির ধরন নির্ণয়ের সহজ সূত্র কী?
- দ্বিরুক্ত শব্দের অন্য নাম কী?
- সামান্য পরিবর্তিত দ্বিরুক্তির দুটি উদাহরণ দাও।
- দ্বিরুক্তি বাংলা ভাষায় এত সক্রিয় কেন?
- একই দ্বিরুক্ত শব্দ কি ভিন্ন প্রসঙ্গে ভিন্ন অর্থ দিতে পারে?
উত্তর
- একই শব্দ, পদ বা ধ্বনি পরপর দুবার ব্যবহার করে নতুন অর্থ প্রকাশ করা হলে তাকে দ্বিরুক্ত শব্দ বলে।
- তিন প্রকার — শব্দের দ্বিরুক্তি, পদের দ্বিরুক্তি এবং ধ্বন্যাত্মক বা অনুকার দ্বিরুক্তি।
- পদের দ্বিরুক্তি, কারণ এখানে এ বিভক্তি যুক্ত আছে। বিভক্তি না থাকলে সেটি শব্দের দ্বিরুক্তি হতো।
- অবিকৃত (বার বার), সামান্য পরিবর্তিত (ঘর-দোর), সমার্থক (ধন-দৌলত) ও বিপরীতার্থক (আসা-যাওয়া)।
- ঝমঝম, টাপুরটুপুর ও কড়কড় — তিনটিই ধ্বনির অনুকরণে তৈরি, এদের কোনো মূল শব্দ নেই।
- আধিক্য — প্রচুর পরিমাণ বোঝাতে ব্যবহৃত হয়।
- বিভক্তি থাকলে পদের দ্বিরুক্তি, না থাকলে শব্দের; আর মূল শব্দ না থাকলে ধ্বন্যাত্মক।
- শব্দদ্বৈত। একই শব্দ, পদ বা ধ্বনি দুবার ব্যবহৃত হয় বলে এই নাম।
- ঘর-দোর ও মিল-মিশ। দ্বিতীয় অংশটি সামান্য বদলে গেছে এবং একা ব্যবহৃত হয় না।
- কারণ বাংলায় আধিক্য, ধারাবাহিকতা বা সামান্যতা বোঝাতে আলাদা শব্দ যোগ করার চেয়ে শব্দটি দুবার বলাই স্বাভাবিক — ইংরেজিতে যেখানে very বা repeatedly বসাতে হয়, বাংলায় সেখানে পুনরাবৃত্তিই যথেষ্ট।
- পারে। “গরম গরম” কখনো তীব্রতা বোঝায় (গরম গরম খেয়ে নাও), কখনো সদ্যতা (গরম গরম খবর)। তাই ধরন নয়, অর্থ নির্ণয়ের সময় বাক্যটি দেখে সিদ্ধান্ত নিতে হয়।
উপযোগী শ্রেণি: নবম, দশম, একাদশ, দ্বাদশ শ্রেণি।
সচরাচর জিজ্ঞাসা
একই শব্দ বা শব্দাংশ দুবার ব্যবহৃত হয়ে নতুন অর্থ প্রকাশ করলে তাকে দ্বিরুক্ত শব্দ বলে — যেমন ভালো ভালো, ঘরে ঘরে, কলকল।
তিন প্রকার — শব্দের দ্বিরুক্তি (ভালো ভালো), পদের দ্বিরুক্তি (হাতে হাতে) এবং ধ্বন্যাত্মক বা অনুকার দ্বিরুক্তি (ঝরঝর, টুপটাপ)।
যেখানে অর্থহীন ধ্বনি দুবার বসে অনুকার শব্দ তৈরি করে — যেমন কলকল, ঝম ঝম, ঘেউ ঘেউ। অংশগুলো একা অর্থহীন, একসঙ্গে অর্থবহ।
বিভক্তি আছে কি না দেখো। “ঘর ঘর”-এ বিভক্তি নেই, তাই শব্দের দ্বিরুক্তি; “ঘরে ঘরে”-তে এ বিভক্তি যুক্ত, তাই পদের দ্বিরুক্তি। মূল শব্দই না থাকলে, কেবল ধ্বনি অনুকরণ হলে সেটি ধ্বন্যাত্মক।
আরও বাংলা ব্যাকরণ পড়ো
বাংলা ব্যাকরণ-এর পূর্ণ তালিকা ও বাংলা লেখার অন্যান্য অংশ এক জায়গায়।
আমাদের সাথে যুক্ত থাকো
পড়াশোনার আপডেট, সাজেশন ও প্রশ্নোত্তর সবার আগে পেতে আমাদের ফেসবুক পেজ ও গ্রুপে যুক্ত হও।






















