স্বরসন্ধি — নিয়ম ও উদাহরণসহ সন্ধি বিচ্ছেদ
স্বরসন্ধির সব নিয়ম, উদাহরণ ও সন্ধি বিচ্ছেদ — বিদ্যালয়, শুভেচ্ছা, সূর্যোদয় প্রভৃতিসহ।
সংজ্ঞা
স্বরধ্বনির সঙ্গে স্বরধ্বনির মিলনে যে সন্ধি হয়, তাকে স্বরসন্ধি বলে। দুই পাশের দুটি স্বর মিলে একটি স্বরে পরিণত হয়, এবং সেই নতুন স্বরটিই মিলিত শব্দে বসে।
সমবর্ণের মিলন — এক জাতের দুই স্বর
একই জাতের দুটি স্বর পাশাপাশি এলে তারা মিলে সেই জাতেরই দীর্ঘ স্বর হয়। নিয়মটি সবচেয়ে সহজ এবং পরীক্ষায় সবচেয়ে বেশি আসে।
সমবর্ণ স্বরসন্ধি
| যোগ | ফল | উদাহরণ |
|---|---|---|
| অ/আ + অ/আ | আ | হিম + আলয় = হিমালয় |
| ই/ঈ + ই/ঈ | ঈ | পরি + ঈক্ষা = পরীক্ষা |
| উ/ঊ + উ/ঊ | ঊ | সু + উক্তি = সূক্তি |
- ✓ বিদ্যা + আলয় = বিদ্যালয় — আ + আ = আ
- ✓ অতি + ইব = অতীব — ই + ই = ঈ
- ✓ ভানু + উদয় = ভানূদয় — উ + উ = ঊ
বিপরীত বর্ণের মিলন — গুণসন্ধি
অ বা আ-এর পরে অন্য জাতের স্বর এলে দুটি মিলে একটিমাত্র নতুন স্বর হয়। কোন স্বর কী হয়, তা নিচের ছকে বাঁধা।
| যোগ | ফল | উদাহরণ |
|---|---|---|
| অ/আ + ই/ঈ | এ | শুভ + ইচ্ছা = শুভেচ্ছা |
| অ/আ + উ/ঊ | ও | সূর্য + উদয় = সূর্যোদয় |
| অ/আ + ঋ | অর্ | দেব + ঋষি = দেবর্ষি |
| অ/আ + এ/ঐ | ঐ | জন + এক = জনৈক |
| অ/আ + ও/ঔ | ঔ | বন + ওষধি = বনৌষধি |
- ✓ নর + ইন্দ্র = নরেন্দ্র — অ + ই = এ
- ✓ নীল + উৎপল = নীলোৎপল — অ + উ = ও
- ✓ মহা + ঋষি = মহর্ষি — আ + ঋ = অর্
এ, ঐ, ও, ঔ-এর পরে স্বর এলে
এই নিয়মটি বাদ পড়ে সবচেয়ে বেশি, অথচ প্রশ্নে বারবার আসে। এ, ঐ, ও, ঔ-এর পরে অন্য স্বর এলে এরা যথাক্রমে অয্, আয্, অব্, আব্ রূপ নেয়।
| পূর্বস্বর | পরিণত হয় | উদাহরণ |
|---|---|---|
| এ | অয্ | নে + অন = নয়ন |
| ঐ | আয্ | গৈ + অক = গায়ক |
| ও | অব্ | পো + অন = পবন |
| ঔ | আব্ | পৌ + অক = পাবক |
- ✓ শে + অন = শয়ন — এ → অয্
- ✓ ভো + অন = ভবন — ও → অব্
নিপাতনে সিদ্ধ স্বরসন্ধি
কিছু শব্দ কোনো নিয়মেই পড়ে না, কেবল প্রচলনের জোরে সিদ্ধ বলে গৃহীত। এগুলো নিয়ম খুঁজে বের করার চেষ্টা না করে মুখস্থ রাখাই কাজের।
- কুল + অটা = কুলটা
- গো + অক্ষ = গবাক্ষ
- প্র + ঊঢ় = প্রৌঢ়
- শুদ্ধ + ওদন = শুদ্ধোদন
- মার্ত + অণ্ড = মার্তণ্ড
- ✗ গবাক্ষ = গব + অক্ষ ✓ গবাক্ষ = গো + অক্ষ — নিপাতনে সিদ্ধ
- ✗ প্রৌঢ় = প্রৌ + ঢ় ✓ প্রৌঢ় = প্র + ঊঢ়
পরীক্ষায় বারবার আসা স্বরসন্ধি
নিয়ম জানা থাকলেও পরীক্ষার হলে সময় কম, তাই বহুবার আসা শব্দগুলো আগে থেকে চেনা থাকলে সুবিধা হয়। নিচের তালিকাটি বোর্ড প্রশ্নে সবচেয়ে বেশি ফিরে আসা স্বরসন্ধির সংকলন।
বহুল ব্যবহৃত স্বরসন্ধি
| শব্দ | সন্ধি বিচ্ছেদ | নিয়ম |
|---|---|---|
| মহাশয় | মহা + আশয় | আ + আ = আ |
| রাজেন্দ্র | রাজ + ইন্দ্র | অ + ই = এ |
| গঙ্গোর্মি | গঙ্গা + ঊর্মি | আ + ঊ = ও |
| সপ্তর্ষি | সপ্ত + ঋষি | অ + ঋ = অর্ |
| রাজৈশ্বর্য | রাজ + ঐশ্বর্য | অ + ঐ = ঐ |
| মহৌষধ | মহা + ঔষধ | আ + ঔ = ঔ |
| নাবিক | নৌ + ইক | ঔ → আব্ |
| ভাবুক | ভৌ + উক | ঔ → আব্ |
- ✓ যথা + অর্থ = যথার্থ — আ + অ = আ
- ✓ হিত + উপদেশ = হিতোপদেশ — অ + উ = ও
- ✓ এক + এক = একৈক — অ + এ = ঐ
খাঁটি বাংলা স্বরসন্ধি
তৎসম নিয়মগুলো সংস্কৃত থেকে আসা শব্দে খাটে। খাঁটি বাংলা শব্দেও স্বরসন্ধি হয়, তবে সেখানে কোনো বাঁধা সূত্র নেই — উচ্চারণে যেটুকু সহজ, সেটুকুই ঘটে। সাধারণত পাশাপাশি দুটি স্বরের একটি লোপ পায়, নয়তো দুটি মিলে একটি হয়।
- কাঁচা + কলা = কাঁচকলা — আ লোপ পেয়েছে।
- নাতি + বৌ = নাতবৌ — ই লোপ পেয়েছে।
- ঘোড়া + দৌড় = ঘোড়দৌড় — আ লোপ পেয়েছে।
- শাঁখা + আরি = শাঁখারি — দুটি আ মিলে এক আ।
- ✓ রূপা + আলি = রূপালি — আ + আ = আ, বাংলা রীতিতেও
- ✗ কাঁচকলা তৎসম স্বরসন্ধি ✓ কাঁচকলা খাঁটি বাংলা স্বরসন্ধি
অ/আ-এর পরে এ, ঐ, ও, ঔ এলে
গুণসন্ধির ছকে অ/আ-এর পরে ই, উ ও ঋ-এর কথা এসেছে। পরে যদি এ, ঐ, ও বা ঔ থাকে, ফল আবার আলাদা — একে বলে বৃদ্ধিসন্ধি, এবং প্রশ্নে এটি আলাদা করে চাওয়া হয়।
বৃদ্ধিসন্ধি
| যোগ | ফল | উদাহরণ |
|---|---|---|
| অ/আ + এ | ঐ | এক + এক = একৈক |
| অ/আ + ঐ | ঐ | মত + ঐক্য = মতৈক্য |
| অ/আ + ও | ঔ | বন + ওষধি = বনৌষধি |
| অ/আ + ঔ | ঔ | মহা + ঔষধ = মহৌষধ |
- ✓ জন + এক = জনৈক — অ + এ = ঐ
- ✓ পরম + ঔষধ = পরমৌষধ — অ + ঔ = ঔ
- ✗ মতৈক্য = মতৈ + ক্য ✓ মতৈক্য = মত + ঐক্য
বিস্তারিত আলোচনা
স্বরসন্ধির প্রথম ও সবচেয়ে প্রচলিত নিয়ম হলো সমবর্ণের মিলন। অ বা আ-এর পরে অ বা আ থাকলে দুটি মিলে আ হয়। যেমন হিম + আলয় = হিমালয়, বিদ্যা + আলয় = বিদ্যালয়। একইভাবে ই বা ঈ-এর পরে ই বা ঈ থাকলে হয় ঈ — অতি + ইব = অতীব, পরি + ঈক্ষা = পরীক্ষা। উ বা ঊ-এর ক্ষেত্রেও একই নিয়ম — সু + উক্তি = সূক্তি।
দ্বিতীয় নিয়ম বিপরীত বর্ণের মিলন নিয়ে। অ বা আ-এর পরে ই বা ঈ থাকলে দুটি মিলে হয় এ — যেমন শুভ + ইচ্ছা = শুভেচ্ছা, নর + ইন্দ্র = নরেন্দ্র। অ বা আ-এর পরে উ বা ঊ থাকলে হয় ও — যেমন সূর্য + উদয় = সূর্যোদয়, নীল + উৎপল = নীলোৎপল। আর অ বা আ-এর পরে ঋ থাকলে হয় অর্ — দেব + ঋষি = দেবর্ষি।
তৃতীয় নিয়মে এ, ঐ, ও, ঔ-এর পরে অন্য স্বর এলে সেগুলো যথাক্রমে অয্, আয্, অব্, আব্ হয়ে যায়। যেমন নে + অন = নয়ন, গৈ + অক = গায়ক, পো + অন = পবন, পৌ + অক = পাবক। এই নিয়মটি পরীক্ষায় বারবার আসে, অথচ শিক্ষার্থীরা প্রায়ই এটি বাদ দিয়ে পড়ে।
মনে রাখার কথা
স্বরসন্ধিতে দুই পাশে দুটোই স্বর থাকবে — এটি নিশ্চিত করে নিলে প্রকারভেদে আর ভুল হয় না।
সাধারণ ভুল
পরীক্ষায় এই ভুলগুলোই সবচেয়ে বেশি নম্বর কাটে। ভুল রূপটি দেখে নিলে নিজের লেখায় ধরা সহজ হয়।
- ✗ শুভেচ্ছা = শুভ + এচ্ছা ✓ শুভেচ্ছা = শুভ + ইচ্ছা — অ + ই = এ
- ✗ পরীক্ষা = পরী + ক্ষা ✓ পরীক্ষা = পরি + ঈক্ষা
- ✗ নয়ন = নয় + অন ✓ নয়ন = নে + অন — এ → অয্
- ✗ মহর্ষি = মহ + ঋষি ✓ মহর্ষি = মহা + ঋষি — আ + ঋ = অর্
অনুশীলন
নিচের প্রশ্নগুলোর উত্তর নিজে লেখো, তারপর মিলিয়ে নাও।
- সন্ধি বিচ্ছেদ করো: জনৈক।
- সন্ধি বিচ্ছেদ করো: সূক্তি।
- সন্ধি বিচ্ছেদ করো: গায়ক।
- “দেবর্ষি” কোন নিয়মে গঠিত?
- নিপাতনে সিদ্ধ দুটি স্বরসন্ধির উদাহরণ দাও।
- “বনৌষধি” শব্দের সন্ধি বিচ্ছেদ কী?
- বৃদ্ধিসন্ধি কাকে বলে? একটি উদাহরণ দাও।
- খাঁটি বাংলা স্বরসন্ধিতে নিয়ম কেমন?
উত্তর
- জন + এক। অ-এর পরে এ এলে দুটি মিলে ঐ হয়।
- সু + উক্তি। উ ও উ মিলে ঊ হয়েছে, এটি সমবর্ণ স্বরসন্ধি।
- গৈ + অক। ঐ-এর পরে স্বর এলে ঐ আয্-এ পরিণত হয়।
- দেব + ঋষি। অ বা আ-এর পরে ঋ এলে দুটি মিলে অর্ হয়।
- কুলটা (কুল + অটা) এবং গবাক্ষ (গো + অক্ষ) — এগুলো প্রচলিত নিয়মে পড়ে না।
- বন + ওষধি। অ-এর পরে ও এলে দুটি মিলে ঔ হয়।
- অ বা আ-এর পরে এ, ঐ, ও বা ঔ থাকলে দুটি মিলে ঐ বা ঔ হয় — একে বৃদ্ধিসন্ধি বলে। যেমন মত + ঐক্য = মতৈক্য।
- কোনো বাঁধা সূত্র নেই, উচ্চারণের সুবিধাই একমাত্র বিবেচ্য। সাধারণত একটি স্বর লোপ পায় বা দুটি মিলে একটি হয় — যেমন কাঁচা + কলা = কাঁচকলা।
উপযোগী শ্রেণি: নবম, দশম, একাদশ, দ্বাদশ শ্রেণি।
সচরাচর জিজ্ঞাসা
স্বরধ্বনির সঙ্গে স্বরধ্বনির মিলনে যে সন্ধি হয়, তাকে স্বরসন্ধি বলে। যেমন বিদ্যা + আলয় = বিদ্যালয়, এখানে আ ও আ মিলে আ হয়েছে।
শুভ + ইচ্ছা = শুভেচ্ছা। নিয়ম হলো অ বা আ-এর পরে ই বা ঈ থাকলে দুটি মিলে এ হয়, যেমন নর + ইন্দ্র = নরেন্দ্র।
সূর্য + উদয় = সূর্যোদয়। অ বা আ-এর পরে উ বা ঊ থাকলে দুটি মিলে ও হয় — এটিই স্বরসন্ধির অন্যতম প্রধান নিয়ম।
এরা যথাক্রমে অয্, আয্, অব্ ও আব্ রূপ নেয় — যেমন নে + অন = নয়ন, গৈ + অক = গায়ক, পো + অন = পবন, পৌ + অক = পাবক।
আরও বাংলা ব্যাকরণ পড়ো
বাংলা ব্যাকরণ-এর পূর্ণ তালিকা ও বাংলা লেখার অন্যান্য অংশ এক জায়গায়।
আমাদের সাথে যুক্ত থাকো
পড়াশোনার আপডেট, সাজেশন ও প্রশ্নোত্তর সবার আগে পেতে আমাদের ফেসবুক পেজ ও গ্রুপে যুক্ত হও।






















