সন্ধি কাকে বলে — প্রকারভেদ ও সন্ধি বিচ্ছেদের নিয়ম
সন্ধির সংজ্ঞা, প্রকারভেদ ও সন্ধি বিচ্ছেদের নিয়ম — উদাহরণসহ পূর্ণাঙ্গ আলোচনা।
সংজ্ঞা
পাশাপাশি দুটি ধ্বনি মিলিত হয়ে যখন একটি নতুন ধ্বনি বা রূপ তৈরি করে, তাকে সন্ধি বলে। উচ্চারণের সহজতা ও শ্রুতিমাধুর্যই সন্ধির মূল উদ্দেশ্য।
সন্ধির প্রকারভেদ — এক নজরে
সন্ধি চেনার কাজটি আসলে দুটি প্রশ্নের উত্তর দেওয়া: মিলনের সময় সামনের ধ্বনিটি কী ছিল, আর পেছনেরটি কী ছিল। সেই দুটি উত্তর মিলিয়ে নিলেই প্রকার বেরিয়ে আসে।
কোন সন্ধি কখন হয়
| প্রকার | পূর্বপদের শেষে | পরপদের শুরুতে | উদাহরণ |
|---|---|---|---|
| স্বরসন্ধি | স্বরধ্বনি | স্বরধ্বনি | বিদ্যা + আলয় = বিদ্যালয় |
| ব্যঞ্জনসন্ধি | ব্যঞ্জন বা স্বর | ব্যঞ্জন | দিক্ + অন্ত = দিগন্ত |
| বিসর্গসন্ধি | বিসর্গ (ঃ) | স্বর বা ব্যঞ্জন | নিঃ + আকার = নিরাকার |
- ✓ হিম + আলয় = হিমালয় — স্বর + স্বর, তাই স্বরসন্ধি
- ✓ উৎ + যোগ = উদ্যোগ — ব্যঞ্জন সামনে, তাই ব্যঞ্জনসন্ধি
- ✓ মনঃ + কষ্ট = মনঃকষ্ট — বিসর্গ আছে, তাই বিসর্গসন্ধি
খাঁটি বাংলা সন্ধি ও তৎসম সন্ধি
সব সন্ধি সংস্কৃত নিয়মে চলে না। খাঁটি বাংলা শব্দেও সন্ধি হয়, তবে সেখানে নিয়ম অনেক শিথিল এবং উচ্চারণই প্রধান বিবেচ্য। পরীক্ষায় প্রকার জিজ্ঞাসা করলে আগে দেখতে হয় শব্দটি তৎসম না খাঁটি বাংলা।
- তৎসম সন্ধিতে নিয়ম কড়া, ব্যতিক্রম কম।
- খাঁটি বাংলা সন্ধিতে উচ্চারণের সুবিধাই মুখ্য নিয়ম।
- বিদেশি শব্দে সাধারণত সন্ধি হয় না।
| ধরন | বৈশিষ্ট্য | উদাহরণ |
|---|---|---|
| খাঁটি বাংলা স্বরসন্ধি | দুই স্বরের সহজ মিলন | কাঁচা + কলা = কাঁচকলা |
| খাঁটি বাংলা ব্যঞ্জনসন্ধি | ব্যঞ্জনের পরিবর্তন | নাত + জামাই = নাতজামাই |
| তৎসম সন্ধি | সংস্কৃত নিয়ম মেনে | সম্ + কৃত = সংস্কৃত |
সন্ধি বিচ্ছেদ করার পদ্ধতি
সন্ধি বিচ্ছেদে সবচেয়ে বড় ভুল হলো অনুমানে ভাগ করা। কাজটি উল্টো দিক থেকে করতে হয় — মিলিত রূপটি দেখে ভাবতে হবে কোন দুটি ধ্বনি মিললে ঠিক এই রূপ দাঁড়ায়।
- প্রথমে চিহ্নিত করো মিলনস্থলে কোন স্বর বা ব্যঞ্জন বসেছে।
- সেই ধ্বনিটি কোন নিয়মের ফল, তা মিলিয়ে দেখো।
- ভাগ করার পর দুটি অংশই যেন অর্থবহ শব্দ হয় — না হলে ভাগটি ভুল।
- কোনো নিয়মে না মিললে সেটি নিপাতনে সিদ্ধ, মুখস্থ রাখতে হবে।
- ✗ পরীক্ষা = পরী + ক্ষা ✓ পরীক্ষা = পরি + ঈক্ষা — “পরী” এখানে অর্থবহ অংশ নয়
- ✗ সংস্কৃত = সং + স্কৃত ✓ সংস্কৃত = সম্ + কৃত
- ✓ জগৎ + ঈশ = জগদীশ — ৎ এর জায়গায় দ্ এসেছে
সন্ধি বনাম সমাস — গুলিয়ে ফেলার জায়গা
দুটিই শব্দ জোড়া লাগানোর মতো দেখতে, কিন্তু কাজ আলাদা। সন্ধিতে ধ্বনি মিলে যায় এবং মিলনস্থলে একটি ধ্বনি বদলায়; সমাসে শব্দ মিলে যায় এবং অর্থের সম্পর্ক তৈরি হয়।
| দিক | সন্ধি | সমাস |
|---|---|---|
| কী মিলছে | ধ্বনি | শব্দ বা পদ |
| ব্যাকরণের শাখা | ধ্বনিতত্ত্ব | শব্দতত্ত্ব |
| ভাঙার নাম | সন্ধি বিচ্ছেদ | ব্যাসবাক্য |
| উদাহরণ | বিদ্যা + আলয় = বিদ্যালয় | সিংহ চিহ্নিত আসন = সিংহাসন |
সন্ধি কেন করা হয়
সন্ধি নিছক ব্যাকরণের নিয়ম নয় — এর পেছনে দুটি বাস্তব কারণ আছে, এবং পরীক্ষায় “সন্ধির উদ্দেশ্য কী” এই প্রশ্নে সেই দুটিই লিখতে হয়।
- উচ্চারণের সহজতা — দুটি শব্দ আলাদা করে বলার চেয়ে জোড়া রূপটি বলা কম শ্রমসাধ্য।
- শ্রুতিমাধুর্য — জোড়া রূপ কানে বেশি মসৃণ শোনায়, বিশেষ করে কবিতায়।
- সংক্ষেপণ — দীর্ঘ পদবন্ধ ছোট হয়ে আসে, তাই লেখাও দ্রুত হয়।
- ✓ বিদ্যা + আলয় = বিদ্যালয় — উচ্চারণে এক ঝোঁক কমে গেল
- ✓ সিংহ + আসন = সিংহাসন — শ্রুতিমাধুর্য বাড়ল
পরীক্ষায় সন্ধি কীভাবে আসে
সন্ধি অধ্যায় থেকে প্রশ্ন প্রায় সব সময় তিনটি ছাঁচের একটিতে আসে। ছাঁচ চিনে নিলে উত্তর লেখার পদ্ধতিও ঠিক হয়ে যায়।
- বিচ্ছেদের পর দুটি অংশই অর্থবহ হতে হবে — এটাই নিজের উত্তর যাচাইয়ের সহজতম উপায়।
- প্রকার লিখতে বলা হলে কেবল নাম নয়, নিয়মটিও এক বাক্যে লেখো — পূর্ণ নম্বর সেখানেই।
| প্রশ্নের ধরন | কী চাওয়া হচ্ছে | উত্তরের কাঠামো |
|---|---|---|
| সন্ধি বিচ্ছেদ করো | জোড়া রূপ ভেঙে দুই অংশ | পদ্মা + আসন ধরনের সমীকরণ |
| সন্ধি করো | দুই অংশ জুড়ে এক রূপ | জোড়া শব্দটি + প্রকারের নাম |
| প্রকার নির্ণয় করো | কোন সন্ধি ও কেন | প্রকার + নিয়মটির এক বাক্য ব্যাখ্যা |
- ✗ উত্তর: স্বরসন্ধি। ✓ উত্তর: স্বরসন্ধি — আ ও আ মিলে আ হয়েছে। — নিয়ম না লিখলে নম্বর কাটে
- ✓ সন্ধি করো: পর + উপকার = পরোপকার — অ + উ = ও
সন্ধি বিচ্ছেদে যে ভুলগুলো নম্বর কাটে
সন্ধি অধ্যায়ে নম্বর হারানোর কারণ প্রায় সব সময় একই কয়েকটি। ভুলগুলো চিনে রাখলে নিজের উত্তর নিজেই যাচাই করা যায়, আর সেটিই এই অধ্যায়ে সবচেয়ে কাজের অভ্যাস।
- ভাঙার পর দুটি অংশ আলাদাভাবে অর্থবহ কি না — এটিই প্রথম যাচাই।
- জোড়া লাগিয়ে দেখো মূল শব্দটিই ফিরে আসছে কি না — দ্বিতীয় যাচাই।
| ভুলের ধরন | উদাহরণ | কেন ভুল |
|---|---|---|
| অর্থহীন অংশে ভাঙা | পরীক্ষা = পরী + ক্ষা | “ক্ষা” কোনো শব্দ নয় |
| লিখিত রূপ ধরে ভাঙা | সংসার = সং + সার | “সং” অর্থবহ পদ নয় |
| প্রকার না লেখা | শুধু “হিম + আলয়” | নিয়ম চাওয়া হলে অসম্পূর্ণ |
| নিপাতন না চেনা | গবাক্ষ-এ নিয়ম খোঁজা | সময় নষ্ট হয় |
- ✗ সন্তোষ = সন্ + তোষ ✓ সন্তোষ = সম্ + তোষ
- ✗ উদ্যোগ = উদ + যোগ ✓ উদ্যোগ = উৎ + যোগ
বিস্তারিত আলোচনা
কথা বলার সময় আমরা স্বাভাবিকভাবেই সহজ পথ খুঁজি। "বিদ্যা" আর "আলয়" আলাদা করে বলার চেয়ে "বিদ্যালয়" বলা সহজ, তাই আ আর আ মিলে আ হয়ে গেছে। সন্ধি এই স্বাভাবিক প্রবণতারই নাম। এ কারণেই সন্ধিকে ধ্বনিতত্ত্বের আলোচ্য বিষয় ধরা হয় — এখানে শব্দ নয়, ধ্বনি জোড়া লাগছে।
বাংলা সন্ধি প্রধানত দুই ভাগে বিভক্ত। খাঁটি বাংলা শব্দের সন্ধি এবং তৎসম বা সংস্কৃত শব্দের সন্ধি। তৎসম সন্ধিকে আবার তিন ভাগে ভাগ করা হয় — স্বরসন্ধি, ব্যঞ্জনসন্ধি ও বিসর্গসন্ধি। কোন সন্ধি কোন প্রকারের, তা বোঝার সহজ উপায় হলো দেখা যে মিলনের সময় সামনের ও পেছনের ধ্বনি দুটির প্রকৃতি কী ছিল।
সন্ধি বিচ্ছেদ করার সময় সবচেয়ে বড় ভুল হলো অনুমানে ভাগ করা। নিয়ম হলো, মিলিত রূপটি দেখে ভাবতে হবে কোন দুটি ধ্বনি মিললে এই রূপ হতে পারে। "পরীক্ষা" ভাঙলে হয় পরি + ঈক্ষা, "সংস্কৃত" ভাঙলে হয় সম্ + কৃত। কিছু সন্ধি আবার কোনো নিয়মেই পড়ে না, সেগুলোকে বলে নিপাতনে সিদ্ধ সন্ধি — সেগুলো মুখস্থ রাখতেই হয়।
মনে রাখার কথা
সন্ধি মানে ধ্বনির মিলন, সমাস মানে শব্দের মিলন — এই পার্থক্যটি গুলিয়ে ফেললেই ভুল শুরু হয়।
সাধারণ ভুল
পরীক্ষায় এই ভুলগুলোই সবচেয়ে বেশি নম্বর কাটে। ভুল রূপটি দেখে নিলে নিজের লেখায় ধরা সহজ হয়।
- ✗ সন্ধি শব্দতত্ত্বের আলোচ্য। ✓ সন্ধি ধ্বনিতত্ত্বের আলোচ্য। — মিলছে ধ্বনি, শব্দ নয়
- ✗ সন্ধি তিন প্রকার। ✓ তৎসম সন্ধি তিন প্রকার; সন্ধি প্রধানত খাঁটি বাংলা ও তৎসম — দুই ভাগে।
- ✗ বিদেশি শব্দেও নিয়মিত সন্ধি হয়। ✓ বিদেশি শব্দে সাধারণত সন্ধি হয় না।
- ✗ সন্ধি বিচ্ছেদে অংশ অর্থবহ না হলেও চলে। ✓ ভাগ করা দুটি অংশই অর্থবহ হতে হবে।
- ✗ উত্তরে শুধু “স্বরসন্ধি” লেখা। ✓ প্রকারের সঙ্গে নিয়মটিও এক বাক্যে লেখা। — ব্যাখ্যা ছাড়া নম্বর কাটে
- ✗ সন্ধি বিচ্ছেদের পর একটি অংশ অর্থহীন হলেও চলে। ✓ দুটি অংশই অর্থবহ হতে হবে।
অনুশীলন
নিচের প্রশ্নগুলোর উত্তর নিজে লেখো, তারপর মিলিয়ে নাও।
- সন্ধি বিচ্ছেদ করো: হিমালয়।
- সন্ধি বিচ্ছেদ করো: দিগন্ত।
- সন্ধি বিচ্ছেদ করো: নিরাকার।
- সন্ধি ও সমাসের পার্থক্য এক বাক্যে লেখো।
- “কাঁচকলা” কোন ধরনের সন্ধি?
- নিপাতনে সিদ্ধ সন্ধি বলতে কী বোঝ?
- সন্ধির দুটি উদ্দেশ্য লেখো।
- সন্ধি করো: পর + উপকার।
- প্রকার নির্ণয়ের প্রশ্নে পূর্ণ নম্বর পেতে কী লিখতে হবে?
উত্তর
- হিম + আলয়। আ-কারের সঙ্গে আ মিলে আ হয়েছে, তাই এটি স্বরসন্ধি।
- দিক্ + অন্ত। ক্ পরিবর্তিত হয়ে গ্ হয়েছে, তাই এটি ব্যঞ্জনসন্ধি।
- নিঃ + আকার। বিসর্গ র্-এ পরিণত হয়েছে, তাই এটি বিসর্গসন্ধি।
- সন্ধিতে ধ্বনি মিলিত হয় আর সমাসে শব্দ মিলিত হয়; প্রথমটি ধ্বনিতত্ত্বের, দ্বিতীয়টি শব্দতত্ত্বের বিষয়।
- খাঁটি বাংলা স্বরসন্ধি — কাঁচা + কলা, এখানে সংস্কৃত নিয়ম নয়, উচ্চারণের সুবিধাই কাজ করেছে।
- যে সন্ধিগুলো প্রচলিত কোনো নিয়ম মেনে হয় না, ব্যবহারের কারণে সিদ্ধ বলে গৃহীত হয়েছে, সেগুলোই নিপাতনে সিদ্ধ সন্ধি।
- উচ্চারণের সহজতা এবং শ্রুতিমাধুর্য — দুটি শব্দ আলাদা বলার চেয়ে জোড়া রূপটি বলা সহজ ও কানে মসৃণ।
- পরোপকার। অ-এর পরে উ থাকায় দুটি মিলে ও হয়েছে, তাই এটি স্বরসন্ধি।
- কেবল প্রকারের নাম নয়, নিয়মটিও এক বাক্যে লিখতে হবে — যেমন “স্বরসন্ধি, কারণ আ ও আ মিলে আ হয়েছে”।
উপযোগী শ্রেণি: নবম, দশম, একাদশ, দ্বাদশ শ্রেণি।
সচরাচর জিজ্ঞাসা
পাশাপাশি অবস্থিত দুটি ধ্বনি মিলিত হয়ে যখন একটি নতুন ধ্বনি বা রূপ সৃষ্টি করে, তাকে সন্ধি বলে। উচ্চারণের সহজতা ও শ্রুতিমাধুর্যের জন্যই সন্ধি ঘটে।
প্রধানত দুই প্রকার — খাঁটি বাংলা শব্দের সন্ধি ও তৎসম শব্দের সন্ধি। তৎসম সন্ধি আবার তিন ভাগে বিভক্ত: স্বরসন্ধি, ব্যঞ্জনসন্ধি ও বিসর্গসন্ধি।
ধ্বনিতত্ত্বের। কারণ সন্ধিতে ধ্বনির সঙ্গে ধ্বনির মিলন ঘটে। শব্দের সঙ্গে শব্দের মিলন ঘটে সমাসে, যা শব্দতত্ত্বের আলোচ্য বিষয়।
সন্ধিতে দুটি ধ্বনি মিলিত হয় এবং মিলনস্থলে একটি ধ্বনি বদলে যায়; সমাসে দুটি শব্দ বা পদ মিলিত হয়ে অর্থের সম্পর্ক তৈরি করে। প্রথমটি ধ্বনিতত্ত্বের, দ্বিতীয়টি শব্দতত্ত্বের আলোচ্য বিষয়।
আরও বাংলা ব্যাকরণ পড়ো
বাংলা ব্যাকরণ-এর পূর্ণ তালিকা ও বাংলা লেখার অন্যান্য অংশ এক জায়গায়।
আমাদের সাথে যুক্ত থাকো
পড়াশোনার আপডেট, সাজেশন ও প্রশ্নোত্তর সবার আগে পেতে আমাদের ফেসবুক পেজ ও গ্রুপে যুক্ত হও।






















