বিসর্গ সন্ধি — নিয়ম ও উদাহরণসহ ব্যাখ্যা
বিসর্গ সন্ধির নিয়ম ও উদাহরণ — মনোরম, নীরব, নিশ্চয় প্রভৃতির সন্ধি বিচ্ছেদসহ।
সংজ্ঞা
বিসর্গের (ঃ) সঙ্গে স্বর বা ব্যঞ্জনের মিলনে যে সন্ধি হয়, তাকে বিসর্গসন্ধি বলে। বিসর্গ মূলত র্ বা স্ ধ্বনির পরিবর্তিত রূপ, তাই সন্ধিতে সে আবার সেই রূপেই ফিরে যায়।
বিসর্গ কোথা থেকে আসে
বিসর্গ (ঃ) নিজে কোনো স্বাধীন ধ্বনি নয় — এটি র্ বা স্-এর পরিবর্তিত রূপ। কোন ধ্বনি থেকে এসেছে, তার ওপরেই সন্ধির ফল নির্ভর করে, তাই বিসর্গসন্ধি বুঝতে হলে প্রথমেই বিসর্গের উৎস চেনা দরকার।
- র-জাত বিসর্গ পরে সহজেই আবার র্ হয়ে ফিরে আসে।
- অ-কারের পরের স-জাত বিসর্গ প্রায়ই ও-কারে পরিণত হয়।
- বিসর্গ কখনো শব্দের শুরুতে বসে না।
| উৎস | নাম | উদাহরণ |
|---|---|---|
| র্ থেকে | র-জাত বিসর্গ | নিঃ (নির্), দুঃ (দুর্), অন্তঃ (অন্তর্) |
| স্ থেকে | স-জাত বিসর্গ | মনঃ (মনস্), তেজঃ (তেজস্), পুরঃ (পুরস্) |
বিসর্গের পরে স্বর বা নরম ব্যঞ্জন এলে
বিসর্গের পরে স্বরধ্বনি বা ঘোষ ব্যঞ্জন (বর্গের ৩য়–৫ম ধ্বনি, য র ল ব হ) থাকলে বিসর্গ র্-এ পরিণত হয়। তবে অ-কারের পরের বিসর্গ এই অবস্থায় ও-কার হয়ে যায় — দুটি নিয়ম আলাদা এবং এখানেই বেশি ভুল হয়।
| অবস্থা | বিসর্গ হয় | উদাহরণ |
|---|---|---|
| ই/উ-কারের পরে + স্বর | র্ | নিঃ + আকার = নিরাকার |
| ই/উ-কারের পরে + ঘোষ ব্যঞ্জন | র্ | নিঃ + ভয় = নির্ভয় |
| অ-কারের পরে + স্বর | ও | মনঃ + অভিলাষ = মনোভিলাষ |
| অ-কারের পরে + ঘোষ ব্যঞ্জন | ও | মনঃ + যোগ = মনোযোগ |
- ✓ দুঃ + আত্মা = দুরাত্মা — উ-কারের পরে, তাই র্
- ✓ তেজঃ + ময় = তেজোময় — অ-কারের পরে, তাই ও
- ✗ মনঃ + যোগ = মনর্যোগ ✓ মনঃ + যোগ = মনোযোগ
বিসর্গের পরে অঘোষ ব্যঞ্জন এলে
বিসর্গের পরে চ ছ ট ঠ ত থ ইত্যাদি অঘোষ ধ্বনি এলে বিসর্গ সেই ধ্বনির সমগোত্রীয় উষ্মধ্বনিতে পরিণত হয় — অর্থাৎ শ্, ষ্ বা স্ হয়ে যায়।
| বিসর্গের পরে | বিসর্গ হয় | উদাহরণ |
|---|---|---|
| চ্ বা ছ্ | শ্ | নিঃ + চয় = নিশ্চয় |
| ট্ বা ঠ্ | ষ্ | ধনুঃ + টঙ্কার = ধনুষ্টঙ্কার |
| ত্ বা থ্ | স্ | নমঃ + তে = নমস্তে |
| ক্, খ্, প্, ফ্ | অপরিবর্তিত | মনঃ + কষ্ট = মনঃকষ্ট |
- ✓ নিঃ + চিন্ত = নিশ্চিন্ত — চ্-এর আগে বিসর্গ → শ্
- ✓ দুঃ + তর = দুস্তর — ত্-এর আগে বিসর্গ → স্
- ✓ অন্তঃ + করণ = অন্তঃকরণ — ক্-এর আগে বিসর্গ অপরিবর্তিত
নিপাতনে সিদ্ধ বিসর্গসন্ধি
- ভাঃ + কর = ভাস্কর
- অন্তঃ + তল = অন্তস্তল
- পুরঃ + কার = পুরস্কার
- বাচঃ + পতি = বাচস্পতি
- শিরঃ + ছেদ = শিরশ্ছেদ
- ✗ পুরস্কার = পুরস + কার ✓ পুরস্কার = পুরঃ + কার — নিপাতনে সিদ্ধ
- ✗ ভাস্কর = ভাস + কর ✓ ভাস্কর = ভাঃ + কর
বিসর্গের পরে র্ থাকলে বিসর্গ লোপ পায়
বিসর্গের পরেই যদি র্ আসে, তবে বিসর্গটি লোপ পায় এবং তার আগের হ্রস্ব স্বর দীর্ঘ হয়ে যায়। বাংলায় খুব পরিচিত কয়েকটি শব্দ ঠিক এই নিয়মে গড়া, অথচ নিয়মটি প্রায়ই পড়া হয় না।
| সন্ধি | ফল | কী ঘটল |
|---|---|---|
| নিঃ + রব | নীরব | বিসর্গ লোপ, ই → ঈ |
| নিঃ + রস | নীরস | বিসর্গ লোপ, ই → ঈ |
| নিঃ + রোগ | নীরোগ | বিসর্গ লোপ, ই → ঈ |
| দুঃ + রন্ত | দূরন্ত | বিসর্গ লোপ, উ → ঊ |
- ✗ নীরব = নীর + ব ✓ নীরব = নিঃ + রব
- ✗ দূরন্ত = দূর + অন্ত ✓ দূরন্ত = দুঃ + রন্ত
পরীক্ষায় বারবার আসা বিসর্গসন্ধি
বিসর্গসন্ধিতে নিয়মের চেয়ে চেনা শব্দের তালিকা বেশি কাজে দেয়, কারণ প্রশ্নে প্রায়ই একই শব্দগুলো ফিরে আসে। তালিকাটি একবার মিলিয়ে নিলে বিচ্ছেদ করতে আর থামতে হয় না।
বহুল ব্যবহৃত বিসর্গসন্ধি
| শব্দ | সন্ধি বিচ্ছেদ | নিয়ম |
|---|---|---|
| মনোরম | মনঃ + রম | অ-কারের পরে বিসর্গ → ও |
| অধোগতি | অধঃ + গতি | অ-কারের পরে বিসর্গ → ও |
| দুর্যোগ | দুঃ + যোগ | উ-কারের পরে বিসর্গ → র্ |
| নিষ্ঠুর | নিঃ + ঠুর | ঠ-এর আগে বিসর্গ → ষ্ |
| দুশ্চরিত্র | দুঃ + চরিত্র | চ-এর আগে বিসর্গ → শ্ |
| নিস্তব্ধ | নিঃ + তব্ধ | ত-এর আগে বিসর্গ → স্ |
- ✓ পুনঃ + আয় = পুনরায় — অ-কার নয়, তাই র্
- ✓ অহঃ + নিশ = অহর্নিশ — র-জাত বিসর্গ ফিরে র্ হলো
স-জাত ও র-জাত বিসর্গ আলাদা আচরণ করে
বিসর্গ কোথা থেকে এসেছে, সেটিই ঠিক করে দেয় সন্ধিতে সে কী হবে। অ-কারের পরের স-জাত বিসর্গ ও-কারে বদলায়, আর র-জাত বিসর্গ একই অবস্থায় র্-এ ফিরে যায়। একই চেহারার দুটি বিসর্গ, অথচ ফল সম্পূর্ণ আলাদা।
- উৎস চিনতে শব্দটির অন্য রূপ ভাবো — মনস্তত্ত্ব বলে বোঝা যায় মনঃ স-জাত।
- পুনর্বার, অহর্নিশ বলে বোঝা যায় পুনঃ ও অহঃ র-জাত।
| শব্দ | বিসর্গের উৎস | ফল |
|---|---|---|
| মনঃ + যোগ = মনোযোগ | স-জাত (মনস্) | বিসর্গ → ও |
| পুনঃ + আয় = পুনরায় | র-জাত (পুনর্) | বিসর্গ → র্ |
| অহঃ + নিশ = অহর্নিশ | র-জাত (অহর্) | বিসর্গ → র্ |
| তেজঃ + ময় = তেজোময় | স-জাত (তেজস্) | বিসর্গ → ও |
- ✗ পুনরায় = পুনো + আয় ✓ পুনরায় = পুনঃ + আয় — র-জাত, তাই র্
- ✓ মনঃ + রম = মনোরম — স-জাত, তাই ও
বিস্তারিত আলোচনা
বিসর্গসন্ধি বোঝার আগে জানা দরকার বিসর্গ কোথা থেকে এসেছে। সংস্কৃতে শব্দের শেষে থাকা র্ বা স্ ধ্বনি উচ্চারণে দুর্বল হয়ে বিসর্গে পরিণত হয়। সন্ধিতে যখন পরের ধ্বনির প্রভাব পড়ে, বিসর্গ আবার র্ বা স্-এর দিকে ফিরে যায় কিংবা ও-কারে বদলে যায়। এই উৎসটুকু মনে রাখলে নিয়মগুলো অনেক যুক্তিসংগত মনে হয়।
প্রধান নিয়মগুলোর একটি হলো অ-কারের পরে বিসর্গ এবং তার পরে অ বা ঘোষধ্বনি থাকলে বিসর্গ ও-কারে পরিণত হয়। যেমন মনঃ + রম = মনোরম, তপঃ + বন = তপোবন, অধঃ + গতি = অধোগতি। আবার ই বা উ-কারের পরে বিসর্গ থাকলে এবং পরে ঘোষধ্বনি থাকলে বিসর্গ র্-এ পরিণত হয় — নিঃ + আকার = নিরাকার, দুঃ + যোগ = দুর্যোগ।
বিসর্গের পরে যদি অঘোষ ধ্বনি বা উষ্ম ধ্বনি থাকে, তবে বিসর্গ প্রায়ই স্, শ্ বা ষ্ হয়ে যায় — যেমন নিঃ + চয় = নিশ্চয়, দুঃ + কর = দুষ্কর, নিঃ + কলঙ্ক = নিষ্কলঙ্ক। আর কিছু ক্ষেত্রে বিসর্গ লোপ পায় এবং আগের স্বর দীর্ঘ হয়ে যায়, যেমন নিঃ + রব = নীরব।
মনে রাখার কথা
বিসর্গকে স্বাধীন ধ্বনি না ভেবে র্ বা স্-এর ছদ্মরূপ ভাবলে বিসর্গসন্ধির নিয়ম অনেক সহজে মনে থাকে।
সাধারণ ভুল
পরীক্ষায় এই ভুলগুলোই সবচেয়ে বেশি নম্বর কাটে। ভুল রূপটি দেখে নিলে নিজের লেখায় ধরা সহজ হয়।
- ✗ নিরাকার = নির + আকার ✓ নিরাকার = নিঃ + আকার — বিসর্গ র্-এ পরিণত
- ✗ মনোযোগ = মনো + যোগ ✓ মনোযোগ = মনঃ + যোগ
- ✗ নিশ্চয় = নিশ + চয় ✓ নিশ্চয় = নিঃ + চয়
- ✗ অ-কারের পরের বিসর্গ সব সময় র্ হয়। ✓ অ-কারের পরে বিসর্গ ও-কারে পরিণত হয়।
অনুশীলন
নিচের প্রশ্নগুলোর উত্তর নিজে লেখো, তারপর মিলিয়ে নাও।
- সন্ধি বিচ্ছেদ করো: নির্ভয়।
- সন্ধি বিচ্ছেদ করো: তেজোময়।
- সন্ধি বিচ্ছেদ করো: ধনুষ্টঙ্কার।
- র-জাত ও স-জাত বিসর্গ বলতে কী বোঝ?
- বিসর্গের পরে ক্ বা প্ থাকলে কী হয়?
- “ভাস্কর” কোন ধরনের সন্ধি?
- একই চেহারার বিসর্গ দুরকম আচরণ করে কেন?
- সন্ধি বিচ্ছেদ করো: নীরোগ।
উত্তর
- নিঃ + ভয়। ই-কারের পরে ঘোষ ব্যঞ্জন থাকায় বিসর্গ র্-এ পরিণত হয়েছে।
- তেজঃ + ময়। অ-কারের পরে ঘোষ ধ্বনি থাকায় বিসর্গ ও-কার হয়েছে।
- ধনুঃ + টঙ্কার। ট্-এর আগে বিসর্গ ষ্-এ পরিণত হয়।
- যে বিসর্গ র্ থেকে এসেছে তা র-জাত (নিঃ, দুঃ), আর যা স্ থেকে এসেছে তা স-জাত (মনঃ, তেজঃ)।
- বিসর্গ অপরিবর্তিত থাকে — যেমন মনঃ + কষ্ট = মনঃকষ্ট, অন্তঃ + করণ = অন্তঃকরণ।
- নিপাতনে সিদ্ধ বিসর্গসন্ধি — ভাঃ + কর, প্রচলিত কোনো নিয়মে এটি ব্যাখ্যা করা যায় না।
- কারণ উৎস আলাদা। অ-কারের পরে স-জাত বিসর্গ ও-কারে বদলায় (মনঃ + যোগ = মনোযোগ), আর র-জাত বিসর্গ র্-এ ফিরে যায় (পুনঃ + আয় = পুনরায়)।
- নিঃ + রোগ। বিসর্গের পরে র্ থাকায় বিসর্গ লোপ পেয়েছে এবং আগের ই দীর্ঘ হয়ে ঈ হয়েছে।
উপযোগী শ্রেণি: নবম, দশম, একাদশ, দ্বাদশ শ্রেণি।
সচরাচর জিজ্ঞাসা
বিসর্গের (ঃ) সঙ্গে স্বরধ্বনি বা ব্যঞ্জনধ্বনির মিলনে যে সন্ধি হয়, তাকে বিসর্গ সন্ধি বলে। যেমন মনঃ + রম = মনোরম।
নিঃ + রব = নীরব। এখানে বিসর্গ লোপ পেয়েছে এবং আগের ই-কার দীর্ঘ হয়ে ঈ-কারে পরিণত হয়েছে।
নিঃ + চয় = নিশ্চয়। বিসর্গের পরে চ বা ছ থাকলে বিসর্গ শ্-এ পরিণত হয় — এটিই বিসর্গসন্ধির অন্যতম নিয়ম।
পরে স্বর বা ঘোষ ব্যঞ্জন থাকলে বিসর্গ ও-কারে পরিণত হয় — যেমন মনঃ + যোগ = মনোযোগ, তেজঃ + ময় = তেজোময়। ই বা উ-কারের পরে একই অবস্থায় বিসর্গ র্ হয়।
আরও বাংলা ব্যাকরণ পড়ো
বাংলা ব্যাকরণ-এর পূর্ণ তালিকা ও বাংলা লেখার অন্যান্য অংশ এক জায়গায়।
আমাদের সাথে যুক্ত থাকো
পড়াশোনার আপডেট, সাজেশন ও প্রশ্নোত্তর সবার আগে পেতে আমাদের ফেসবুক পেজ ও গ্রুপে যুক্ত হও।






















