ব্যাকরণ কাকে বলে — আলোচ্য বিষয় ও প্রকারভেদ
ব্যাকরণের সংজ্ঞা এবং ধ্বনিতত্ত্ব, শব্দতত্ত্ব, বাক্যতত্ত্ব ও অর্থতত্ত্ব — চারটি আলোচ্য বিষয়ের পরিচয়।
সংজ্ঞা
যে শাস্ত্র ভাষার গঠন, রূপ ও ব্যবহারের নিয়ম বিশ্লেষণ করে, তাকে ব্যাকরণ বলে। ব্যাকরণ ভাষা তৈরি করে না, বরং প্রচলিত ভাষার ভেতরে যে নিয়ম আগে থেকেই কাজ করছে, তাকে খুঁজে বের করে সাজিয়ে দেখায়।
শব্দটি কোথা থেকে এল
ব্যাকরণ শব্দটি সংস্কৃত। এটি ভাঙলে দাঁড়ায় বি + আ + কৃ + অন — যার আক্ষরিক অর্থ বিশেষভাবে বিশ্লেষণ। নামটিই কাজটি বলে দেয়: ব্যাকরণ ভাষাকে টুকরো করে দেখায় কোন অংশ কী কাজ করছে।
ইংরেজি grammar শব্দটি এসেছে গ্রিক grammatikē থেকে, যার অর্থ অক্ষরবিদ্যা। দুই ভাষাতেই নামটি একই ইঙ্গিত দেয় — ভাষাকে তার ক্ষুদ্র উপাদানে ভেঙে দেখা।
- ব্যাকরণ বর্ণনামূলক — যা প্রচলিত আছে তা বর্ণনা করে।
- ব্যাকরণ বিধানমূলকও — শুদ্ধ-অশুদ্ধের সীমা টেনে দেয়।
- ব্যাকরণ ভাষার জন্মদাতা নয়, ভাষার নিয়ম-সংগ্রাহক।
ব্যাকরণের চার শাখা — কোনটিতে কী পড়ে
পরীক্ষায় সবচেয়ে বেশি আসে এই ভাগটি, এবং সবচেয়ে বেশি ভুলও এখানেই হয়। নিচের ছকটি একবার মিলিয়ে নিলে যেকোনো প্রশ্নের উত্তর বের করা যায়।
ব্যাকরণের শাখা ও আলোচ্য বিষয়
| শাখা | কী নিয়ে আলোচনা | অন্তর্ভুক্ত বিষয় |
|---|---|---|
| ধ্বনিতত্ত্ব | ভাষার ধ্বনি ও তার লিখিত রূপ | ধ্বনি, বর্ণ, সন্ধি, ণত্ব-ষত্ব বিধান, ধ্বনি পরিবর্তন |
| শব্দতত্ত্ব / রূপতত্ত্ব | শব্দের গঠন ও রূপান্তর | শব্দ, উপসর্গ, প্রত্যয়, সমাস, লিঙ্গ, বচন, পুরুষ, পদ |
| বাক্যতত্ত্ব / পদক্রম | বাক্যে পদের সম্পর্ক ও বিন্যাস | কারক, বিভক্তি, বাচ্য, উক্তি, বাক্য রূপান্তর |
| অর্থতত্ত্ব | শব্দ ও বাক্যের অর্থ | সমার্থক ও বিপরীত শব্দ, বাগধারা, এক কথায় প্রকাশ |
- ✓ সন্ধি → ধ্বনিতত্ত্ব — দুটি ধ্বনি মিলছে, তাই ধ্বনির আলোচনা
- ✓ সমাস → শব্দতত্ত্ব — দুটি শব্দ মিলছে, তাই শব্দের আলোচনা
- ✓ কারক → বাক্যতত্ত্ব — বাক্যে ক্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক দেখাচ্ছে
- ✗ বাগধারা → শব্দতত্ত্ব ✓ বাগধারা → অর্থতত্ত্ব — গঠন নয়, অর্থই এখানে মুখ্য
বাংলা ব্যাকরণের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস
বাংলা ভাষার প্রথম ব্যাকরণ লেখেন একজন ইংরেজ। ন্যাথানিয়েল ব্রাসি হ্যালহেড ১৭৭৮ সালে হুগলি থেকে প্রকাশ করেন A Grammar of the Bengal Language — বইটি ইংরেজিতে লেখা, উদ্দেশ্য ছিল কোম্পানির কর্মচারীদের বাংলা শেখানো।
বাংলা ভাষায় লেখা প্রথম বাংলা ব্যাকরণ রাজা রামমোহন রায়ের গৌড়ীয় ব্যাকরণ, প্রকাশকাল ১৮৩৩। পরবর্তীকালে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্র বাঙ্গালা ব্যাকরণ (১৯৩৫) এই ধারাকে আধুনিক ভাষাবিজ্ঞানের সঙ্গে যুক্ত করে।
| গ্রন্থ | রচয়িতা | সাল |
|---|---|---|
| A Grammar of the Bengal Language | ন্যাথানিয়েল ব্রাসি হ্যালহেড | ১৭৭৮ |
| গৌড়ীয় ব্যাকরণ | রাজা রামমোহন রায় | ১৮৩৩ |
| বাঙ্গালা ব্যাকরণ | ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ | ১৯৩৫ |
ব্যাকরণ পড়ে আসলে কী লাভ
- শুদ্ধ ও অশুদ্ধ প্রয়োগ আলাদা করে চেনা যায় — বানান ও বাক্যগঠনের ভুল নিজেই ধরা পড়ে।
- একই কথা কয়েকভাবে বলা যায়, তার মধ্যে কোনটি প্রাঞ্জল তা বোঝা যায়।
- অন্য ভাষা শেখা সহজ হয়, কারণ ব্যাকরণের ধারণাগুলো ভাষা-নিরপেক্ষ।
- পরীক্ষায় ব্যাকরণ অংশে নম্বর তোলা তুলনামূলক সহজ, কারণ উত্তর নির্দিষ্ট।
- ✗ সে ভাত খেয়ে ফেলেছে গতকাল। ✓ সে গতকাল ভাত খেয়ে ফেলেছিল। — কালের সঙ্গতি
- ✗ আমি এই কাজটি করতে সক্ষম হইনি। ✓ আমি এই কাজটি করতে পারিনি। — অপ্রয়োজনীয় দীর্ঘায়ন
ব্যাকরণের প্রকারভেদ
ভাষাকে কোন দিক থেকে দেখা হচ্ছে, তার ওপর ভিত্তি করে ব্যাকরণ চর্চার কয়েকটি ধারা গড়ে উঠেছে। উচ্চমাধ্যমিক স্তরে এই ভাগগুলোর নাম ও কাজ আলাদা করে জানতে চাওয়া হয়।
- বিদ্যালয়ের পাঠ্যবই মূলত প্রায়োগিক ও বর্ণনামূলক ধারার।
- ভাষাবিজ্ঞান আর ব্যাকরণ এক নয় — ভাষাবিজ্ঞান ভাষার বৈজ্ঞানিক অধ্যয়ন, ব্যাকরণ তার একটি শাখা।
| ধারা | কী করে | উদাহরণ প্রশ্ন |
|---|---|---|
| বর্ণনামূলক ব্যাকরণ | ভাষার বর্তমান রূপ যেমন আছে তেমন বর্ণনা করে | আজকের চলিত বাংলায় ক্রিয়ার রূপ কী |
| ঐতিহাসিক ব্যাকরণ | কালক্রমে ভাষা কীভাবে বদলেছে দেখায় | প্রাকৃত থেকে বাংলা কীভাবে এল |
| তুলনামূলক ব্যাকরণ | দুই বা ততোধিক ভাষার গঠন মিলিয়ে দেখে | বাংলা ও হিন্দির কারক ব্যবস্থার মিল |
| প্রায়োগিক ব্যাকরণ | শেখানোর উপযোগী করে নিয়ম সাজায় | পাঠ্যবইয়ের ব্যাকরণ |
- ✓ সাধু ভাষার ক্রিয়ারূপ কেমন ছিল — ঐতিহাসিক ব্যাকরণ
- ✓ বাংলা ও অসমিয়ার বর্ণমালার মিল — তুলনামূলক ব্যাকরণ
পরীক্ষায় এই অধ্যায় থেকে কী আসে
ব্যাকরণ পরিচয় অধ্যায়টি ছোট, কিন্তু প্রতিটি বোর্ড পরীক্ষায় এখান থেকে অন্তত একটি প্রশ্ন আসে। প্রশ্নের ধরনগুলো মোটামুটি বাঁধা, তাই কী জিজ্ঞাসা হতে পারে তা আগে থেকে জানা থাকলে প্রস্তুতি অনেক সহজ।
- সংজ্ঞা — “ব্যাকরণ কাকে বলে” সরাসরি লিখতে বলা হয়।
- শাখা মেলানো — কোন বিষয় কোন শাখার আলোচ্য, বহুনির্বাচনিতে সবচেয়ে বেশি আসে।
- ইতিহাস — প্রথম ব্যাকরণ, প্রথম বাংলা ভাষায় লেখা ব্যাকরণ, রচয়িতা ও সাল।
- ব্যুৎপত্তি — “ব্যাকরণ” শব্দের গঠন ও অর্থ।
- ✗ সমাস ধ্বনিতত্ত্বের বিষয় ✓ সমাস শব্দতত্ত্বের বিষয় — সবচেয়ে বেশি আসা ভুল
- ✗ উক্তি অর্থতত্ত্বের বিষয় ✓ উক্তি বাক্যতত্ত্বের বিষয়
বিস্তারিত আলোচনা
অনেকে ভাবে ব্যাকরণ ভাষার ওপর নিয়ম চাপিয়ে দেয়। আসলে ঘটনাটি উল্টো। মানুষ আগে কথা বলতে শিখেছে, তারপর সেই কথার ভেতরের নিয়মগুলো লক্ষ করে ব্যাকরণ লেখা হয়েছে। একটি শিশু ব্যাকরণ না জেনেই শুদ্ধ বাক্য বলে, কারণ নিয়মটি সে অনুকরণ করে শিখে নিয়েছে। ব্যাকরণ সেই অনুকরণে শেখা নিয়মকেই স্পষ্ট ভাষায় লিখে রাখে, যাতে ভুল ধরা যায় এবং শেখানো যায়।
বাংলা ব্যাকরণের আলোচ্য বিষয় প্রধানত চারটি। ধ্বনিতত্ত্বে ধ্বনি, বর্ণ, সন্ধি, ণত্ব-ষত্ব বিধান আলোচিত হয়। শব্দতত্ত্ব বা রূপতত্ত্বে শব্দ, উপসর্গ, প্রত্যয়, সমাস, লিঙ্গ, বচন, পুরুষ ও পদ প্রকরণ আসে। বাক্যতত্ত্ব বা পদক্রমে কারক, বিভক্তি, বাচ্য, উক্তি ও বাক্যের গঠন আলোচিত হয়। আর অর্থতত্ত্বে শব্দের অর্থ, সমার্থক ও বিপরীত শব্দ, বাগধারা ইত্যাদি বিবেচিত হয়।
পরীক্ষায় প্রায়ই জিজ্ঞাসা করা হয় কোন বিষয়টি ব্যাকরণের কোন অংশের আলোচ্য। এর উত্তর মনে রাখার সহজ উপায় হলো প্রশ্নটি করা — বিষয়টি কি ধ্বনি নিয়ে, শব্দ নিয়ে, বাক্য নিয়ে, নাকি অর্থ নিয়ে। সন্ধি ধ্বনি জোড়া লাগায়, তাই ধ্বনিতত্ত্ব; সমাস শব্দ জোড়া লাগায়, তাই শব্দতত্ত্ব; কারক বাক্যে ক্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক দেখায়, তাই বাক্যতত্ত্ব। এই একটি প্রশ্নেই বেশির ভাগ উত্তর মিলে যায়।
মনে রাখার কথা
ব্যাকরণ মুখস্থ করার বিষয় নয়, বোঝার বিষয়। নিয়মটি কেন দাঁড়িয়েছে তা বুঝলে উদাহরণ নিজে থেকেই মনে থাকে।
সাধারণ ভুল
পরীক্ষায় এই ভুলগুলোই সবচেয়ে বেশি নম্বর কাটে। ভুল রূপটি দেখে নিলে নিজের লেখায় ধরা সহজ হয়।
- ✗ ব্যাকরণ ভাষা সৃষ্টি করে। ✓ ব্যাকরণ ভাষার নিয়ম বিশ্লেষণ করে। — ভাষা আগে, ব্যাকরণ পরে
- ✗ বাংলা ব্যাকরণের আলোচ্য বিষয় তিনটি। ✓ প্রধানত চারটি — ধ্বনি, শব্দ, বাক্য ও অর্থতত্ত্ব।
- ✗ প্রথম বাংলা ব্যাকরণ লেখেন রামমোহন রায়। ✓ প্রথম ব্যাকরণ হ্যালহেডের (১৭৭৮); রামমোহনেরটি বাংলা ভাষায় লেখা প্রথম।
- ✗ সন্ধি শব্দতত্ত্বের আলোচ্য বিষয়। ✓ সন্ধি ধ্বনিতত্ত্বের আলোচ্য বিষয়। — ধ্বনি মিলছে, শব্দ নয়
- ✗ ব্যাকরণ ও ভাষাবিজ্ঞান একই বিষয়। ✓ ব্যাকরণ ভাষাবিজ্ঞানের একটি শাখা মাত্র।
- ✗ উক্তি অর্থতত্ত্বের আলোচ্য। ✓ উক্তি বাক্যতত্ত্বের আলোচ্য।
অনুশীলন
নিচের প্রশ্নগুলোর উত্তর নিজে লেখো, তারপর মিলিয়ে নাও।
- ব্যাকরণ শব্দের ব্যুৎপত্তিগত অর্থ কী?
- “ণত্ব-ষত্ব বিধান” ব্যাকরণের কোন অংশে আলোচিত হয়?
- “বাচ্য” কোন শাখার আলোচ্য বিষয়?
- বাংলা ভাষায় রচিত প্রথম বাংলা ব্যাকরণ কোনটি ও কার লেখা?
- “এক কথায় প্রকাশ” কোন শাখায় পড়ে?
- ব্যাকরণকে ভাষার “বিশ্লেষক” বলা হয় কেন?
- বর্ণনামূলক ও ঐতিহাসিক ব্যাকরণের পার্থক্য কী?
- পাঠ্যবইয়ের ব্যাকরণ কোন ধারার?
- ভাষাবিজ্ঞান ও ব্যাকরণ কি এক?
উত্তর
- বি + আ + কৃ + অন = বিশেষভাবে বিশ্লেষণ।
- ধ্বনিতত্ত্বে — এটি বর্ণ ও ধ্বনির প্রয়োগসংক্রান্ত নিয়ম।
- বাক্যতত্ত্ব বা পদক্রমের — কর্তা ও কর্মের সম্পর্ক বাক্যেই বদলায়।
- গৌড়ীয় ব্যাকরণ, রাজা রামমোহন রায়ের লেখা, প্রকাশকাল ১৮৩৩।
- অর্থতত্ত্বে — এখানে শব্দের গঠন নয়, অর্থই বিবেচ্য।
- কারণ এটি ভাষার নিয়ম নতুন করে তৈরি করে না, প্রচলিত ভাষার ভেতরে থাকা নিয়ম খুঁজে বের করে দেখায়।
- বর্ণনামূলক ব্যাকরণ ভাষার বর্তমান রূপ যেমন আছে তেমন বর্ণনা করে, আর ঐতিহাসিক ব্যাকরণ দেখায় কালক্রমে ভাষাটি কীভাবে বদলেছে।
- মূলত প্রায়োগিক ও বর্ণনামূলক ধারার — নিয়মগুলো শেখানোর উপযোগী করে সাজানো হয়।
- না। ভাষাবিজ্ঞান ভাষার সামগ্রিক বৈজ্ঞানিক অধ্যয়ন, আর ব্যাকরণ তার একটি শাখা যা ভাষার গঠন ও নিয়ম নিয়ে কাজ করে।
উপযোগী শ্রেণি: নবম, দশম, একাদশ, দ্বাদশ শ্রেণি।
সচরাচর জিজ্ঞাসা
যে শাস্ত্র ভাষার গঠন, রূপ ও ব্যবহারের নিয়ম বিশ্লেষণ করে ও সেগুলো সূত্রাকারে দেখায়, তাকে ব্যাকরণ বলে। এটি ভাষা তৈরি করে না, প্রচলিত ভাষার নিয়ম খুঁজে বের করে।
প্রধানত চারটি — ধ্বনিতত্ত্ব, শব্দতত্ত্ব বা রূপতত্ত্ব, বাক্যতত্ত্ব বা পদক্রম এবং অর্থতত্ত্ব। কোন বিষয় কোন অংশে পড়ে তা বুঝতে দেখো সেটি ধ্বনি, শব্দ, বাক্য না অর্থ নিয়ে কাজ করছে।
পরে। মানুষ আগে ভাষা ব্যবহার করেছে, পরে সেই ব্যবহারের ভেতরের নিয়ম লক্ষ করে ব্যাকরণ রচিত হয়েছে। তাই ব্যাকরণকে ভাষার নিয়ন্ত্রক নয়, বিশ্লেষক বলা হয়।
ন্যাথানিয়েল ব্রাসি হ্যালহেড, ১৭৭৮ সালে হুগলি থেকে প্রকাশিত A Grammar of the Bengal Language। বইটি ইংরেজিতে লেখা; বাংলা ভাষায় লেখা প্রথম ব্যাকরণ রামমোহন রায়ের গৌড়ীয় ব্যাকরণ (১৮৩৩)।
শুদ্ধ ও অশুদ্ধ প্রয়োগ আলাদা করে চেনা যায়, নিজের লেখার ভুল নিজেই ধরা পড়ে, এবং অন্য ভাষা শেখাও সহজ হয় — কারণ ব্যাকরণের মূল ধারণাগুলো ভাষা-নিরপেক্ষ।
আরও বাংলা ব্যাকরণ পড়ো
বাংলা ব্যাকরণ-এর পূর্ণ তালিকা ও বাংলা লেখার অন্যান্য অংশ এক জায়গায়।
আমাদের সাথে যুক্ত থাকো
পড়াশোনার আপডেট, সাজেশন ও প্রশ্নোত্তর সবার আগে পেতে আমাদের ফেসবুক পেজ ও গ্রুপে যুক্ত হও।






















