ধ্বনি ও বর্ণ — পার্থক্য, প্রকারভেদ ও উদাহরণ
ধ্বনি ও বর্ণের পার্থক্য, স্বরবর্ণ ও ব্যঞ্জনবর্ণ, কার ও ফলা — উদাহরণসহ ব্যাখ্যা।
সংজ্ঞা
ভাষার ক্ষুদ্রতম একককে ধ্বনি বলে, আর সেই ধ্বনির লিখিত প্রতীককে বলে বর্ণ। ধ্বনি শোনা যায়, বর্ণ দেখা যায় — এটিই দুটির মূল পার্থক্য।
বাংলা বর্ণমালার হিসাব
সংখ্যাগুলো নির্দিষ্ট, তাই এই ছকটি মুখস্থ না করে একবার বুঝে নিলেই যথেষ্ট।
- অ-এর কোনো কার-চিহ্ন নেই, তাই স্বরচিহ্ন ১১টি নয়, ১০টি।
- ং (অনুস্বার), ঃ (বিসর্গ) ও ঁ (চন্দ্রবিন্দু) — এই তিনটিকে বলে আশ্রয়স্থানভিত্তিক বর্ণ; এরা একা বসে না।
- ৎ (খণ্ড ত) একটি পূর্ণ ব্যঞ্জনবর্ণ, যুক্তবর্ণ নয়।
| বিভাগ | সংখ্যা | উদাহরণ |
|---|---|---|
| স্বরবর্ণ | ১১টি | অ, আ, ই, ঈ, উ, ঊ, ঋ, এ, ঐ, ও, ঔ |
| ব্যঞ্জনবর্ণ | ৩৯টি | ক, খ, গ … ৎ, ং, ঃ, ঁ |
| মোট বর্ণ | ৫০টি | ১১ + ৩৯ |
| স্বরচিহ্ন (কার) | ১০টি | া, ি, ী, ু, ূ, ৃ, ে, ৈ, ো, ৌ |
| ব্যঞ্জনচিহ্ন (ফলা) | ৬টি | য-ফলা, র-ফলা, ল-ফলা, ম-ফলা, ন-ফলা, ব-ফলা |
স্বরধ্বনি ও ব্যঞ্জনধ্বনির পার্থক্য
| দিক | স্বরধ্বনি | ব্যঞ্জনধ্বনি |
|---|---|---|
| বাতাসের গতি | কোথাও বাধা পায় না | কোথাও না কোথাও বাধা পায় |
| স্বাধীনতা | নিজে নিজেই উচ্চারিত হয় | স্বরের সাহায্য লাগে |
| সংখ্যা (বর্ণ) | ১১টি | ৩৯টি |
| উদাহরণ | অ, ই, উ | ক, চ, ট, ত, প |
- ✓ ক্ + অ = ক — ব্যঞ্জন স্বরের সাহায্যে পূর্ণ হলো
- ✓ আ — একাই উচ্চারিত — স্বরধ্বনির স্বাধীনতা
উচ্চারণস্থান অনুযায়ী ব্যঞ্জনধ্বনি
মুখের কোন জায়গায় বাতাস বাধা পাচ্ছে, তার ওপর ভিত্তি করে ব্যঞ্জনবর্ণকে পাঁচটি বর্গে ভাগ করা হয়। প্রতিটি বর্গের নাম এসেছে তার প্রথম বর্ণ থেকে।
- প্রতিটি বর্গের পঞ্চম বর্ণ (ঙ ঞ ণ ন ম) নাসিক্য ধ্বনি — বাতাস নাক দিয়ে বেরোয়।
- বর্গের ১ম ও ৩য় বর্ণ অল্পপ্রাণ, ২য় ও ৪র্থ মহাপ্রাণ।
| বর্গ | বর্ণ | উচ্চারণস্থান |
|---|---|---|
| ক-বর্গ | ক খ গ ঘ ঙ | কণ্ঠ (জিহ্বামূল) |
| চ-বর্গ | চ ছ জ ঝ ঞ | তালু |
| ট-বর্গ | ট ঠ ড ঢ ণ | মূর্ধা |
| ত-বর্গ | ত থ দ ধ ন | দন্ত |
| প-বর্গ | প ফ ব ভ ম | ওষ্ঠ |
বর্ণ আর ধ্বনি সমান নয়
একটি বর্ণ সব জায়গায় একই ধ্বনি দেয় না। অ শব্দের শুরুতে অ-ধ্বনি (অমল), কিন্তু কোথাও ও-ধ্বনির মতো শোনায় (অতি → ওতি)। আবার এ কখনো অ্যা-এর মতো উচ্চারিত হয় — এক বনাম এমন।
- ✓ কম — এখানে অ ও-ধ্বনির মতো — বর্ণ এক, ধ্বনি ভিন্ন
- ✓ একটি — এখানে এ অ্যা-এর মতো — উচ্চারণ প্রসঙ্গনির্ভর
- ✗ ক্ষ একটি মৌলিক বর্ণ ✓ ক্ষ = ক্ + ষ, একটি যুক্তবর্ণ
- ✗ ৎ একটি যুক্তবর্ণ ✓ ৎ একটি স্বতন্ত্র ব্যঞ্জনবর্ণ
মাত্রা অনুযায়ী বর্ণের ভাগ
বাংলা লিপির মাথায় যে আড়াআড়ি রেখা টানা হয়, তাকেই মাত্রা বলে। সব বর্ণে সমান মাত্রা পড়ে না, আর এই হিসাবটি পরীক্ষায় সরাসরি জিজ্ঞাসা করা হয়। তিন ভাগের সংখ্যা যোগ করলে মোট ৫০-ই হয় — মিলিয়ে নিলে মনে রাখা সহজ।
- ৩২ + ৮ + ১০ = ৫০ — যোগফল না মিললে কোথাও ভুল হয়েছে।
- অর্ধমাত্রার সাতটি ব্যঞ্জন মনে রাখার বাক্য: খ গ ণ থ ধ প শ।
মাত্রা অনুযায়ী ৫০টি বর্ণ
| ভাগ | মোট | স্বরবর্ণ | ব্যঞ্জনবর্ণ |
|---|---|---|---|
| পূর্ণমাত্রা | ৩২টি | ৬টি — অ, আ, ই, ঈ, উ, ঊ | ২৬টি |
| অর্ধমাত্রা | ৮টি | ১টি — ঋ | ৭টি — খ, গ, ণ, থ, ধ, প, শ |
| মাত্রাহীন | ১০টি | ৪টি — এ, ঐ, ও, ঔ | ৬টি — ঙ, ঞ, ৎ, ং, ঃ, ঁ |
- ✗ ঋ পূর্ণমাত্রার বর্ণ ✓ ঋ অর্ধমাত্রার বর্ণ
- ✗ ও অর্ধমাত্রার বর্ণ ✓ ও মাত্রাহীন বর্ণ
যুক্তবর্ণ কীভাবে তৈরি হয়
দুই বা তার বেশি ব্যঞ্জনধ্বনি যখন মাঝখানে কোনো স্বর ছাড়াই পাশাপাশি উচ্চারিত হয়, তখন লেখায় তাদের জুড়ে দেওয়া হয় — সেটিই যুক্তবর্ণ। যুক্তবর্ণকে আলাদা বর্ণ ধরা হয় না, তাই বর্ণমালার ৫০-এর হিসাবে এরা নেই।
| যুক্তবর্ণ | গঠন | উদাহরণ শব্দ |
|---|---|---|
| ক্ষ | ক্ + ষ | ক্ষমা, পক্ষ |
| জ্ঞ | জ্ + ঞ | জ্ঞান, বিজ্ঞান |
| ঞ্জ | ঞ্ + জ | কুঞ্জ, ব্যঞ্জন |
| ষ্ণ | ষ্ + ণ | কৃষ্ণ, উষ্ণ |
| হ্ম | হ্ + ম | ব্রাহ্মণ, চিহ্ন |
| ত্র | ত্ + র | ত্রাণ, পত্র |
- ✗ ক্ষ একটি মৌলিক বর্ণ ✓ ক্ষ = ক্ + ষ, একটি যুক্তবর্ণ
- ✗ জ্ঞ = জ্ + ঙ ✓ জ্ঞ = জ্ + ঞ — ঞ, ঙ নয়
ঘোষ-অঘোষ ও নাসিক্য ধ্বনি
উচ্চারণের সময় স্বরতন্ত্রী কাঁপে কি না, তার ওপর ভিত্তি করে ব্যঞ্জনধ্বনিকে ঘোষ ও অঘোষ ভাগে ভাগ করা হয়। এই ভাগটি সন্ধির নিয়ম বুঝতেও কাজে লাগে — কারণ কঠিন ধ্বনির পাশে নরম ধ্বনি এলে কঠিনটি নরম হয়ে যায়।
- অঘোষ = স্বরতন্ত্রী কাঁপে না; ঘোষ = কাঁপে।
- অল্পপ্রাণ = কম শ্বাস; মহাপ্রাণ = বেশি শ্বাস।
- এই ছকটিই ব্যঞ্জনসন্ধির “প্রথম ধ্বনি তৃতীয় ধ্বনিতে বদলায়” নিয়মের ভিত্তি।
| ভাগ | বর্গের কোন বর্ণ | উদাহরণ |
|---|---|---|
| অঘোষ অল্পপ্রাণ | ১ম | ক, চ, ট, ত, প |
| অঘোষ মহাপ্রাণ | ২য় | খ, ছ, ঠ, থ, ফ |
| ঘোষ অল্পপ্রাণ | ৩য় | গ, জ, ড, দ, ব |
| ঘোষ মহাপ্রাণ | ৪র্থ | ঘ, ঝ, ঢ, ধ, ভ |
| নাসিক্য | ৫ম | ঙ, ঞ, ণ, ন, ম |
- ✓ ক অঘোষ অল্পপ্রাণ, গ ঘোষ অল্পপ্রাণ — তাই দিক্ + অন্ত = দিগন্ত
- ✓ প অঘোষ, ব ঘোষ — একই কারণে অপ্ + জ = অব্জ
বিস্তারিত আলোচনা
কথা বলার সময় আমাদের মুখ থেকে যে ছোট ছোট আওয়াজ বেরোয়, তার প্রতিটিই এক-একটি ধ্বনি। বই শব্দটি উচ্চারণ করলে ব্, ও, ই — তিনটি ধ্বনি শোনা যায়। এই ধ্বনিগুলোকে কাগজে ধরে রাখার জন্য যে চিহ্ন ব্যবহার করি, সেটিই বর্ণ। তাই ধ্বনি ভাষার উপাদান আর বর্ণ লেখার উপাদান।
বাংলা বর্ণমালায় বর্ণ ৫০টি — স্বরবর্ণ ১১টি এবং ব্যঞ্জনবর্ণ ৩৯টি। যে ধ্বনি উচ্চারণের সময় বাতাস মুখগহ্বরে কোথাও বাধা পায় না, তাকে স্বরধ্বনি বলে; আর যে ধ্বনি উচ্চারণে বাতাস কোথাও না কোথাও বাধা পায়, তাকে ব্যঞ্জনধ্বনি বলে। ব্যঞ্জনধ্বনি স্বরের সাহায্য ছাড়া পূর্ণ উচ্চারিত হয় না, তাই তাকে স্বরের ওপর নির্ভরশীল বলা হয়।
বর্ণ ও ধ্বনির সংখ্যা সব সময় সমান নয়, এবং পরীক্ষায় এখানেই বেশি ভুল হয়। একই বর্ণ ভিন্ন জায়গায় ভিন্ন ধ্বনি দিতে পারে — অ কখনো অ-ধ্বনি, কখনো ও-ধ্বনির মতো শোনায়। আবার একাধিক বর্ণ মিলে একটি ধ্বনিও হতে পারে, যেমন যুক্তবর্ণে। তাই বর্ণ গোনা আর ধ্বনি গোনা আলাদা কাজ।
মনে রাখার কথা
বর্ণ চোখের বিষয়, ধ্বনি কানের — এই একটি বাক্য মনে রাখলে দুটিকে আর গুলিয়ে ফেলার কথা নয়।
সাধারণ ভুল
পরীক্ষায় এই ভুলগুলোই সবচেয়ে বেশি নম্বর কাটে। ভুল রূপটি দেখে নিলে নিজের লেখায় ধরা সহজ হয়।
- ✗ বাংলা বর্ণমালায় বর্ণ ৫১টি। ✓ বর্ণ ৫০টি — ১১টি স্বরবর্ণ ও ৩৯টি ব্যঞ্জনবর্ণ।
- ✗ স্বরচিহ্ন ১১টি। ✓ স্বরচিহ্ন ১০টি — অ-এর কোনো কার নেই।
- ✗ ধ্বনি ও বর্ণ একই জিনিস। ✓ ধ্বনি উচ্চারিত হয়, বর্ণ লেখা হয়।
- ✗ ঙ ক-বর্গের বাইরে। ✓ ঙ ক-বর্গেরই পঞ্চম বর্ণ, নাসিক্য ধ্বনি।
- ✗ ঋ পূর্ণমাত্রার বর্ণ। ✓ ঋ অর্ধমাত্রার বর্ণ — অর্ধমাত্রার একমাত্র স্বরবর্ণ।
- ✗ জ্ঞ = জ্ + ঙ ✓ জ্ঞ = জ্ + ঞ
অনুশীলন
নিচের প্রশ্নগুলোর উত্তর নিজে লেখো, তারপর মিলিয়ে নাও।
- ধ্বনি ও বর্ণের মূল পার্থক্য এক বাক্যে লেখো।
- বাংলা ব্যঞ্জনবর্ণ কয়টি?
- ট-বর্গের উচ্চারণস্থান কী?
- প্রতিটি বর্গের পঞ্চম বর্ণের বৈশিষ্ট্য কী?
- “ক্ষ” কি মৌলিক বর্ণ?
- স্বরধ্বনি উচ্চারণে বাতাসের কী হয়?
- পূর্ণমাত্রার বর্ণ কয়টি ও কীভাবে ভাগ?
- মাত্রাহীন স্বরবর্ণ কয়টি ও কী কী?
- “জ্ঞ” যুক্তবর্ণটি কোন দুটি বর্ণ নিয়ে গঠিত?
উত্তর
- ধ্বনি ভাষার উচ্চারিত ক্ষুদ্রতম একক, আর বর্ণ সেই ধ্বনির লিখিত প্রতীক।
- ৩৯টি।
- মূর্ধা — তাই এদের মূর্ধন্য ধ্বনি বলা হয়।
- এগুলো নাসিক্য ধ্বনি — উচ্চারণে বাতাস নাক দিয়ে বেরোয়। যেমন ঙ, ঞ, ণ, ন, ম।
- না, এটি ক্ ও ষ-এর যুক্তবর্ণ।
- মুখগহ্বরে কোথাও বাধা পায় না, তাই স্বরধ্বনি স্বাধীনভাবে উচ্চারিত হতে পারে।
- ৩২টি — ৬টি স্বরবর্ণ (অ, আ, ই, ঈ, উ, ঊ) এবং ২৬টি ব্যঞ্জনবর্ণ।
- ৪টি — এ, ঐ, ও, ঔ। এদের মাথায় কোনো মাত্রা পড়ে না।
- জ্ ও ঞ। অনেকে ভুল করে ঙ ভাবে, কিন্তু এটি চ-বর্গের পঞ্চম বর্ণ ঞ।
উপযোগী শ্রেণি: নবম, দশম, একাদশ, দ্বাদশ শ্রেণি।
সচরাচর জিজ্ঞাসা
কথা বলার সময় মুখ থেকে নির্গত ভাষার ক্ষুদ্রতম একককে ধ্বনি বলে। এটি কানে শোনা যায়, চোখে দেখা যায় না — দেখা যায় তার লিখিত প্রতীক বর্ণকে।
মোট ৫০টি — ১১টি স্বরবর্ণ এবং ৩৯টি ব্যঞ্জনবর্ণ। এর সঙ্গে ১০টি স্বরচিহ্ন বা কার এবং ৬টি ব্যঞ্জনচিহ্ন বা ফলা ব্যবহৃত হয়।
স্বরবর্ণ ১১টি হলেও অ-এর কোনো আলাদা কার-চিহ্ন নেই — ব্যঞ্জনের সঙ্গে অ-ধ্বনি এমনিতেই যুক্ত থাকে। তাই কার-চিহ্ন ১০টি।
যে ধ্বনি উচ্চারণে কম শ্বাসবায়ু লাগে তা অল্পপ্রাণ (বর্গের ১ম ও ৩য় বর্ণ), আর যাতে বেশি শ্বাসবায়ু লাগে তা মহাপ্রাণ (২য় ও ৪র্থ বর্ণ)।
না। একই বর্ণ ভিন্ন জায়গায় ভিন্ন ধ্বনি দিতে পারে — অ কখনো অ-ধ্বনি, কখনো ও-ধ্বনির মতো শোনায়। আবার যুক্তবর্ণে একাধিক বর্ণ মিলে একটি ধ্বনিও হতে পারে।
আরও বাংলা ব্যাকরণ পড়ো
বাংলা ব্যাকরণ-এর পূর্ণ তালিকা ও বাংলা লেখার অন্যান্য অংশ এক জায়গায়।
আমাদের সাথে যুক্ত থাকো
পড়াশোনার আপডেট, সাজেশন ও প্রশ্নোত্তর সবার আগে পেতে আমাদের ফেসবুক পেজ ও গ্রুপে যুক্ত হও।






















