নিপাতনে সিদ্ধ সন্ধি — তালিকা ও উদাহরণ
নিয়মে ব্যাখ্যা করা যায় না এমন সন্ধিগুলোর তালিকা — কুলটা, ষোড়শ, পরস্পর প্রভৃতিসহ।
সংজ্ঞা
যে সন্ধিগুলো কোনো প্রচলিত নিয়মে ব্যাখ্যা করা যায় না, অথচ ভাষায় সিদ্ধ বলে গৃহীত, সেগুলোকে নিপাতনে সিদ্ধ সন্ধি বলে। এগুলোর জন্য যুক্তি খোঁজা বৃথা — মনে রাখাই একমাত্র উপায়।
নিপাতন বলতে কী বোঝায়
ব্যাকরণে নিপাতন মানে নিয়মের বাইরে গিয়ে প্রচলনের জোরে সিদ্ধ হওয়া। কিছু শব্দের গঠন কোনো প্রচলিত সন্ধিসূত্রে ব্যাখ্যা করা যায় না, অথচ শব্দগুলো ভাষায় বহুকাল ধরে চালু। ব্যাকরণ সেগুলোকে ভুল না বলে আলাদা করে সিদ্ধ বলে স্বীকার করে নেয়।
এ কারণেই নিপাতনে সিদ্ধ সন্ধি বোঝার বিষয় নয়, চেনার বিষয়। পরীক্ষায় এগুলো সরাসরি জিজ্ঞাসা করা হয়, তাই তালিকা ধরে মনে রাখাই একমাত্র পথ।
- নিয়ম খোঁজার চেষ্টা করলে সময় নষ্ট হয় — এগুলো নিয়মের ব্যতিক্রম।
- তিন প্রকার সন্ধিতেই নিপাতনে সিদ্ধ উদাহরণ আছে।
- প্রশ্নে সাধারণত “নিপাতনে সিদ্ধ সন্ধির উদাহরণ দাও” বলা হয়।
নিপাতনে সিদ্ধ স্বরসন্ধি
| শব্দ | সন্ধি বিচ্ছেদ |
|---|---|
| কুলটা | কুল + অটা |
| গবাক্ষ | গো + অক্ষ |
| প্রৌঢ় | প্র + ঊঢ় |
| মার্তণ্ড | মার্ত + অণ্ড |
| শুদ্ধোদন | শুদ্ধ + ওদন |
| স্বৈর | স্ব + ঈর |
- ✗ কুলটা = কুলট + আ ✓ কুলটা = কুল + অটা
- ✗ স্বৈর = স্বৈ + র ✓ স্বৈর = স্ব + ঈর
নিপাতনে সিদ্ধ ব্যঞ্জনসন্ধি
| শব্দ | সন্ধি বিচ্ছেদ |
|---|---|
| একাদশ | এক + দশ |
| গোষ্পদ | গো + পদ |
| বনস্পতি | বন + পতি |
| পরস্পর | পর + পর |
| বৃহস্পতি | বৃহৎ + পতি |
| তন্বী | তনু + ঈ |
- ✗ একাদশ = একা + দশ ✓ একাদশ = এক + দশ
- ✗ বনস্পতি = বনস + পতি ✓ বনস্পতি = বন + পতি
নিপাতনে সিদ্ধ বিসর্গসন্ধি
| শব্দ | সন্ধি বিচ্ছেদ |
|---|---|
| ভাস্কর | ভাঃ + কর |
| পুরস্কার | পুরঃ + কার |
| বাচস্পতি | বাচঃ + পতি |
| অন্তস্তল | অন্তঃ + তল |
| শিরশ্ছেদ | শিরঃ + ছেদ |
- ✓ তিরস্কার = তিরঃ + কার — পুরস্কারের মতোই গঠন
মনে রাখার কৌশল
- শব্দটি ভাঙার পর যদি কোনো পরিচিত সূত্রে না মেলে, প্রথমেই নিপাতনের কথা ভাবো।
- একই গঠনের শব্দ জোড়ায় মনে রাখো — পুরস্কার/তিরস্কার, বনস্পতি/বৃহস্পতি।
- গো- দিয়ে শুরু দুটি শব্দ আলাদা করে মনে রাখো — গবাক্ষ (স্বরসন্ধি) ও গোষ্পদ (ব্যঞ্জনসন্ধি)।
নিপাতন কেন ঘটে
নিপাতনে সিদ্ধ শব্দগুলো এলোমেলোভাবে তৈরি হয়নি। প্রায় প্রতিটির পেছনেই একটি ভাষা-ঐতিহাসিক কারণ আছে — কোনোটি সংস্কৃত থেকে আসার পথে বদলে গেছে, কোনোটির উচ্চারণ বহু শতকে সরে গেছে, কোনোটি আবার অন্য ভাষার প্রভাবে গড়ে উঠেছে।
ব্যাকরণ এই শব্দগুলোকে ভুল বলে বাদ দিতে পারে না, কারণ ভাষায় এরা প্রতিষ্ঠিত। আবার নিয়মও বানাতে পারে না, কারণ নিয়মটি আর কোথাও খাটবে না। তাই আলাদা করে “নিপাতনে সিদ্ধ” নাম দিয়ে স্বীকার করে নেওয়া হয়।
- নিপাতন = নিয়মের বাইরে গিয়ে প্রচলনে সিদ্ধ।
- এগুলো ব্যাকরণের ব্যর্থতা নয়, ভাষার জীবন্ততার প্রমাণ।
- সংখ্যায় কম, তাই তালিকা ধরে মনে রাখা বাস্তবসম্মত।
- ✓ গো + অক্ষ = গবাক্ষ — ও-এর জায়গায় অব্ হলো, স্বরসন্ধির চেনা নিয়মে নয়
- ✓ বৃহৎ + পতি = বৃহস্পতি — ৎ-এর জায়গায় স্ এল, নিয়ম নেই
পরীক্ষায় কীভাবে জিজ্ঞাসা করা হয়
নিপাতনে সিদ্ধ সন্ধি নিয়ে প্রশ্ন সাধারণত দুই রকম — হয় সরাসরি সংজ্ঞা ও উদাহরণ চাওয়া হয়, নয়তো একটি শব্দ দিয়ে প্রকার নির্ণয় করতে বলা হয়। দ্বিতীয়টিতেই বেশি ভুল হয়, কারণ শিক্ষার্থী নিয়ম খুঁজতে গিয়ে সময় নষ্ট করে।
- ভাগ করা অংশ অর্থহীন হলে বুঝবে নিয়ম খুঁজে লাভ নেই — সেটি নিপাতন।
- উত্তরে “নিপাতনে সিদ্ধ” কথাটি লিখতে ভুলো না, নইলে ব্যাখ্যা অসম্পূর্ণ থাকে।
| প্রশ্ন | ফাঁদ | সঠিক পথ |
|---|---|---|
| “একাদশ”-এর সন্ধি বিচ্ছেদ | একা + দশ ভাবা | এক + দশ, নিপাতনে সিদ্ধ |
| “পরস্পর”-এর সন্ধি বিচ্ছেদ | পরস + পর ভাবা | পর + পর, নিপাতনে সিদ্ধ |
| “তন্বী”-এর সন্ধি বিচ্ছেদ | তন + বী ভাবা | তনু + ঈ, নিপাতনে সিদ্ধ |
- ✗ একাদশ = একা + দশ ✓ একাদশ = এক + দশ (নিপাতনে সিদ্ধ)
- ✗ পরস্পর = পরস + পর ✓ পরস্পর = পর + পর (নিপাতনে সিদ্ধ)
নিপাতনে সিদ্ধ শব্দ পরীক্ষায় কীভাবে চেনা যায়
পরীক্ষার হলে সময় কম, তাই নিয়ম খুঁজে সময় নষ্ট করার আগেই বোঝা দরকার শব্দটি নিপাতনে সিদ্ধ কি না। সবচেয়ে দ্রুত পরীক্ষা হলো ভাগ করে দেখা — ভাঙা অংশ দুটি অর্থবহ শব্দ হচ্ছে কি না।
একাদশ ভাঙলে একা ও দশ পাওয়া যায়, কিন্তু একা এখানে অর্থবহ নয়। ঠিক ভাগ এক + দশ, অথচ সন্ধির কোনো নিয়মে এই রূপ দাঁড়ায় না — তাই এটি নিপাতনে সিদ্ধ।
দ্বিতীয় সূত্র হলো তালিকা-চেনা। নিপাতনে সিদ্ধ শব্দের সংখ্যা সীমিত, আর পরীক্ষায় প্রায় একই কয়েকটি ঘুরেফিরে আসে। তালিকাটি একবার মিলিয়ে নিলে সন্দেহই থাকে না।
- ভাঙা অংশ অর্থবহ না হলে নিপাতনের কথা ভাবো।
- সংখ্যায় সীমিত — তালিকা ধরে মনে রাখা যায়।
- উত্তরে “নিপাতনে সিদ্ধ” কথাটি লিখতে ভুলো না।
- ✗ একাদশ = একা + দশ ✓ একাদশ = এক + দশ (নিপাতনে সিদ্ধ)
- ✗ তন্বী = তন + বী ✓ তন্বী = তনু + ঈ (নিপাতনে সিদ্ধ)
বিস্তারিত আলোচনা
ভাষা সবসময় নিয়ম মেনে চলে না। বহু শব্দ দীর্ঘদিনের ব্যবহারে এমন রূপ নিয়েছে যা কোনো সন্ধিসূত্রে ফেলা যায় না, কিন্তু শুদ্ধ বলে স্বীকৃত। ব্যাকরণে এগুলোকে আলাদা করে "নিপাতনে সিদ্ধ" বলা হয়, অর্থাৎ নিয়মে নয়, প্রয়োগেই সিদ্ধ। পরীক্ষায় এ ধরনের শব্দের সন্ধি বিচ্ছেদ চাওয়া হলে নিয়ম খুঁজতে গিয়ে সময় নষ্ট করা উচিত নয়।
স্বরসন্ধিতে নিপাতনে সিদ্ধ উদাহরণের মধ্যে আছে কুল + অটা = কুলটা, প্র + ঊঢ় = প্রৌঢ়, অন্য + অন্য = অন্যান্য, মার্ত + অণ্ড = মার্তণ্ড, শুদ্ধ + ওদন = শুদ্ধোদন। প্রতিটিরই মিলিত রূপ প্রচলিত নিয়মে যা হওয়ার কথা ছিল, তার চেয়ে আলাদা।
ব্যঞ্জনসন্ধিতেও এমন উদাহরণ কম নয় — এক + দশ = একাদশ, ষট্ + দশ = ষোড়শ, পর + পর = পরস্পর, বন + পতি = বনস্পতি, গো + পদ = গোষ্পদ, তৎ + কর = তস্কর। আর বিসর্গসন্ধিতে আছে ভাঃ + কর = ভাস্কর, অহঃ + অহ = অহরহ। এগুলোর তালিকা খুব দীর্ঘ নয়, তাই একবারে মুখস্থ করে নেওয়া সম্ভব।
মনে রাখার কথা
নিপাতনে সিদ্ধ শব্দ বেশি নয়, কিন্তু পরীক্ষায় নিয়মিত আসে — তাই তালিকাটি আলাদা খাতায় লিখে রাখা লাভজনক।
সাধারণ ভুল
পরীক্ষায় এই ভুলগুলোই সবচেয়ে বেশি নম্বর কাটে। ভুল রূপটি দেখে নিলে নিজের লেখায় ধরা সহজ হয়।
- ✗ নিপাতনে সিদ্ধ মানে ভুল সন্ধি। ✓ নিয়মে না পড়লেও প্রচলনের জোরে সিদ্ধ বলে স্বীকৃত।
- ✗ নিপাতন কেবল স্বরসন্ধিতে হয়। ✓ তিন প্রকার সন্ধিতেই নিপাতনে সিদ্ধ উদাহরণ আছে।
- ✗ গোষ্পদ = গোষ + পদ ✓ গোষ্পদ = গো + পদ
- ✗ বৃহস্পতি = বৃহস + পতি ✓ বৃহস্পতি = বৃহৎ + পতি
অনুশীলন
নিচের প্রশ্নগুলোর উত্তর নিজে লেখো, তারপর মিলিয়ে নাও।
- নিপাতনে সিদ্ধ সন্ধি কাকে বলে?
- সন্ধি বিচ্ছেদ করো: একাদশ।
- সন্ধি বিচ্ছেদ করো: পুরস্কার।
- সন্ধি বিচ্ছেদ করো: গবাক্ষ।
- “তন্বী” শব্দের সন্ধি বিচ্ছেদ কী?
- নিপাতনে সিদ্ধ দুটি বিসর্গসন্ধির উদাহরণ দাও।
- নিপাতনে সিদ্ধ শব্দ চেনার দ্রুততম উপায় কী?
- নিপাতনে সিদ্ধ শব্দ কি ভাষার দুর্বলতা?
- নিপাতনে সিদ্ধ সন্ধি কোন কোন প্রকারে পাওয়া যায়?
- নিপাতনে সিদ্ধ শব্দ কেন নিয়মে ফেলা যায় না?
উত্তর
- যে সন্ধিগুলো প্রচলিত কোনো নিয়ম মেনে হয় না, কিন্তু দীর্ঘ ব্যবহারের কারণে সিদ্ধ বলে গৃহীত, সেগুলোকেই নিপাতনে সিদ্ধ সন্ধি বলে।
- এক + দশ। এটি নিপাতনে সিদ্ধ ব্যঞ্জনসন্ধি।
- পুরঃ + কার। এটি নিপাতনে সিদ্ধ বিসর্গসন্ধি।
- গো + অক্ষ। এটি নিপাতনে সিদ্ধ স্বরসন্ধি।
- তনু + ঈ। নিয়মে উ + ঈ মিললে এই রূপ হয় না, তাই এটি নিপাতনে সিদ্ধ।
- ভাস্কর (ভাঃ + কর) এবং বাচস্পতি (বাচঃ + পতি)।
- ভাগ করে দেখা — ভাঙা অংশ দুটি অর্থবহ শব্দ হচ্ছে কি না। “একাদশ” ভাঙলে “একা” অর্থবহ নয়; ঠিক ভাগ “এক + দশ”, অথচ কোনো সন্ধিসূত্রে এই রূপ দাঁড়ায় না।
- না, বরং জীবন্ততার প্রমাণ। শব্দগুলো নিয়মের আগে থেকেই ভাষায় ছিল, তাই ব্যাকরণ এদের ভুল বলে বাদ দিতে পারেনি — আলাদা করে সিদ্ধ বলে স্বীকার করে নিয়েছে।
- তিন প্রকারেই — স্বরসন্ধিতে (কুলটা, গবাক্ষ), ব্যঞ্জনসন্ধিতে (একাদশ, বনস্পতি) এবং বিসর্গসন্ধিতে (ভাস্কর, পুরস্কার)।
- কারণ শব্দগুলো নিয়ম তৈরির আগেই ভাষায় প্রতিষ্ঠিত ছিল। কোনোটি সংস্কৃত থেকে আসার পথে বদলে গেছে, কোনোটির উচ্চারণ শতাব্দীর পর শতাব্দী সরে গেছে। নিয়ম বানালে সেটি আর কোথাও খাটত না, তাই ব্যাকরণ এদের আলাদা করে সিদ্ধ বলে স্বীকার করে নিয়েছে।
উপযোগী শ্রেণি: নবম, দশম, একাদশ, দ্বাদশ শ্রেণি।
সচরাচর জিজ্ঞাসা
যে সন্ধিগুলো কোনো প্রচলিত নিয়মে ব্যাখ্যা করা যায় না অথচ ভাষায় শুদ্ধ বলে স্বীকৃত, সেগুলোকে নিপাতনে সিদ্ধ সন্ধি বলে। যেমন কুল + অটা = কুলটা।
ষট্ + দশ = ষোড়শ। এটি কোনো সাধারণ নিয়মে ব্যাখ্যা করা যায় না, তাই একে নিপাতনে সিদ্ধ ব্যঞ্জনসন্ধি ধরা হয়।
নেই। এগুলোর পেছনে কোনো সূত্র নেই বলেই এদের আলাদা নাম দেওয়া হয়েছে। তবে সংখ্যা সীমিত, তাই তালিকা করে পড়লে সহজেই আয়ত্তে আসে।
না। এগুলো প্রচলিত সূত্রে ব্যাখ্যা করা যায় না ঠিকই, কিন্তু দীর্ঘকালের ব্যবহারে ভাষায় প্রতিষ্ঠিত, তাই ব্যাকরণ এগুলোকে সিদ্ধ বলে স্বীকার করে নেয়।
আরও বাংলা ব্যাকরণ পড়ো
বাংলা ব্যাকরণ-এর পূর্ণ তালিকা ও বাংলা লেখার অন্যান্য অংশ এক জায়গায়।
আমাদের সাথে যুক্ত থাকো
পড়াশোনার আপডেট, সাজেশন ও প্রশ্নোত্তর সবার আগে পেতে আমাদের ফেসবুক পেজ ও গ্রুপে যুক্ত হও।






















