ব্যঞ্জনসন্ধি — নিয়ম ও উদাহরণসহ সন্ধি বিচ্ছেদ
ব্যঞ্জনসন্ধির নিয়ম ও উদাহরণ — দিগন্ত, সঞ্চয়, উজ্জ্বল প্রভৃতির সন্ধি বিচ্ছেদসহ।
সংজ্ঞা
ব্যঞ্জনের সঙ্গে ব্যঞ্জনের, কিংবা স্বরের সঙ্গে ব্যঞ্জনের মিলনে যে সন্ধি হয়, তাকে ব্যঞ্জনসন্ধি বলে। এখানে অন্তত একটি পাশে ব্যঞ্জনধ্বনি থাকবেই।
বর্গের প্রথম ধ্বনি তৃতীয় ধ্বনিতে বদলায়
বর্গের প্রথম ধ্বনির (ক্, চ্, ট্, ত্, প্) পরে যদি স্বরধ্বনি, কিংবা বর্গের তৃতীয়-চতুর্থ-পঞ্চম ধ্বনি, কিংবা য র ল ব হ থাকে, তবে প্রথম ধ্বনিটি নিজের বর্গের তৃতীয় ধ্বনিতে পরিণত হয়। কঠিন ধ্বনির পাশে নরম ধ্বনি এলে কঠিনটিও নরম হয়ে যায় — নিয়মটি আসলে এই সহজ প্রবণতারই নাম।
প্রথম ধ্বনি → তৃতীয় ধ্বনি
| পরিবর্তন | উদাহরণ | সন্ধি বিচ্ছেদ |
|---|---|---|
| ক্ → গ্ | দিগন্ত | দিক্ + অন্ত |
| ক্ → গ্ | বাগীশ | বাক্ + ঈশ |
| ত্ → দ্ | তদবধি | তৎ + অবধি |
| ত্ → দ্ | জগদীশ | জগৎ + ঈশ |
| প্ → ব্ | অব্জ | অপ্ + জ |
- ✓ বাক্ + দান = বাগদান — ক্ পরে দ্ (তৃতীয় ধ্বনি), তাই ক্ → গ্
- ✓ ষট্ + আনন = ষড়ানন — ট্ → ড্
- ✗ দিক্ + অন্ত = দিকান্ত ✓ দিক্ + অন্ত = দিগন্ত
ত্ ও দ্-এর পরে কী এলে কী হয়
ত্ বা দ্-এর পরে কোন ধ্বনি বসছে তার ওপর ফল বদলায়। এটি ব্যঞ্জনসন্ধির সবচেয়ে বেশি প্রশ্নে আসা অংশ, আর ছকটি ছাড়া মনে রাখা কঠিন।
| ত্/দ্-এর পরে | ফল | উদাহরণ |
|---|---|---|
| চ্ বা ছ্ | চ্চ / চ্ছ | সৎ + চরিত্র = সচ্চরিত্র |
| জ্ বা ঝ্ | জ্জ | সৎ + জন = সজ্জন |
| শ্ | চ্ছ | উৎ + শ্বাস = উচ্ছ্বাস |
| হ্ | দ্ধ | উৎ + হার = উদ্ধার |
| ল্ | ল্ল | উৎ + লাস = উল্লাস |
- ✓ উৎ + চারণ = উচ্চারণ — ত্ + চ্ = চ্চ
- ✓ তৎ + হিত = তদ্ধিত — ত্ + হ্ = দ্ধ
- ✓ উৎ + ছেদ = উচ্ছেদ — ত্ + ছ্ = চ্ছ
ম্-এর পরে ব্যঞ্জন এলে
ম্-এর পরে বর্গীয় ধ্বনি এলে ম্ সেই বর্গের পঞ্চম ধ্বনিতে (নাসিক্য ধ্বনিতে) পরিণত হয়, অথবা অনুস্বার (ং) হয়ে যায়। আর ম্-এর পরে শ ষ স হ থাকলে ম্ সব সময় অনুস্বার হয়।
| ম্-এর পরে | ম্ হয় | উদাহরণ |
|---|---|---|
| চ-বর্গ | ঞ্ | সম্ + চয় = সঞ্চয় |
| ত-বর্গ | ন্ | সম্ + তোষ = সন্তোষ |
| ক-বর্গ | ঙ্ বা ং | সম্ + গীত = সঙ্গীত |
| প-বর্গ | ম্ | সম্ + পূর্ণ = সম্পূর্ণ |
| শ, ষ, স, হ | ং | সম্ + সার = সংসার |
- ✓ সম্ + হার = সংহার — হ-এর আগে ম্ → ং
- ✓ সম্ + বাদ = সংবাদ
- ✗ সম্ + চয় = সমচয় ✓ সম্ + চয় = সঞ্চয়
খাঁটি বাংলা ব্যঞ্জনসন্ধি
খাঁটি বাংলা শব্দে সংস্কৃত নিয়ম খাটে না; এখানে উচ্চারণের সুবিধাই একমাত্র নিয়ম। সাধারণত অঘোষ ধ্বনির পাশে ঘোষ ধ্বনি এলে অঘোষটি ঘোষ হয়ে যায়, বা দুটি ধ্বনি মিলে একটিই থাকে।
- ছাপ + খানা = ছাপাখানা — স্বরাগম
- নাত + জামাই = নাতজামাই — ত্ অপরিবর্তিত
- কাঁচা + কলা = কাঁচকলা — স্বরলোপ
- পাঁচ + সেরি = পাঁশসেরি
- ✓ বদ + জাত = বজ্জাত — দ্ + জ্ = জ্জ, বাংলা রীতিতেও
ত্ ও দ্-এর আরও দুটি পরিবর্তন
ত্ বা দ্-এর পরে ন্ বা ম্ এলে ফল আবার আলাদা হয়। এই দুটি নিয়ম আগের ছকে ছিল না, অথচ উন্নয়ন-জাতীয় বহুল ব্যবহৃত শব্দ এখান থেকেই আসে।
| ত্/দ্-এর পরে | ফল | উদাহরণ |
|---|---|---|
| ন্ | ন্ন | উৎ + নয়ন = উন্নয়ন |
| ম্ | ন্ম | তৎ + ময় = তন্ময় |
| ড্ বা ঢ্ | ড্ড | উৎ + ডীন = উড্ডীন |
- ✓ উৎ + নত = উন্নত — ত্ + ন্ = ন্ন
- ✓ উৎ + মুখ = উন্মুখ — ত্ + ম্ = ন্ম
- ✗ উন্নয়ন = উন + নয়ন ✓ উন্নয়ন = উৎ + নয়ন
ছ-এর আগে হ্রস্বস্বর থাকলে দ্বিত্ব
হ্রস্ব স্বরধ্বনির পরে ছ্ এলে সেই ছ্ দ্বিত্ব হয়ে চ্ছ হয়ে যায়। নিয়মটি ছোট, কিন্তু আচ্ছাদন, বিচ্ছেদ জাতীয় বহু পরিচিত শব্দ এখান থেকেই তৈরি।
- আ + ছাদন = আচ্ছাদন
- বি + ছেদ = বিচ্ছেদ
- পরি + ছদ = পরিচ্ছদ
- প্র + ছদ = প্রচ্ছদ
- ✗ বিচ্ছেদ = বিচ্ + ছেদ ✓ বিচ্ছেদ = বি + ছেদ
- ✓ অনু + ছেদ = অনুচ্ছেদ — একই নিয়ম
বর্গের প্রথম ধ্বনি পঞ্চম ধ্বনিতেও বদলায়
বর্গের প্রথম ধ্বনির পরে যদি ন্ বা ম্ আসে, তবে সেটি নিজের বর্গের পঞ্চম ধ্বনিতে পরিণত হয় — তৃতীয়তে নয়। নাসিক্য ধ্বনির পাশে এসে ধ্বনিটিও নাসিক্য হয়ে যায়, কারণ বাতাসের পথ আগেই নাকের দিকে খুলে গেছে।
| পরিবর্তন | উদাহরণ | সন্ধি বিচ্ছেদ |
|---|---|---|
| ক্ → ঙ্ | বাঙ্ময় | বাক্ + ময় |
| ত্ → ন্ | তন্ময় | তৎ + ময় |
| ত্ → ন্ | জগন্নাথ | জগৎ + নাথ |
| ৎ → ন্ | চিন্ময় | চিৎ + ময় |
- ✓ উৎ + নয়ন = উন্নয়ন — ত্ পরে ন্ পেয়ে ন্ হলো
- ✗ জগন্নাথ = জগন + নাথ ✓ জগন্নাথ = জগৎ + নাথ
বিস্তারিত আলোচনা
ব্যঞ্জনসন্ধির একটি বড় দল গঠিত হয় বর্গের প্রথম বর্ণের পরিবর্তন নিয়ে। বর্গের প্রথম বর্ণের পরে স্বর কিংবা বর্গের তৃতীয়-চতুর্থ বর্ণ বা য, র, ল, ব থাকলে প্রথম বর্ণটি তৃতীয় বর্ণে পরিণত হয়। যেমন দিক্ + অন্ত = দিগন্ত, বাক্ + ঈশ = বাগীশ, ষট্ + আনন = ষড়ানন। উচ্চারণের সময় কণ্ঠ কম পরিশ্রম করে বলেই এই পরিবর্তন ঘটে।
আরেকটি দল ম্ ও ন্ ধ্বনি নিয়ে। ম্-এর পরে বর্গীয় ধ্বনি থাকলে ম্ সেই বর্গের পঞ্চম বর্ণে পরিণত হয় — সম্ + চয় = সঞ্চয়, সম্ + তোষ = সন্তোষ, সম্ + কল্প = সংকল্প। আবার ত্ বা দ্-এর পরে চ, ছ থাকলে তা চ্ হয়, জ, ঝ থাকলে জ্ হয় — সৎ + চিন্তা = সচ্চিন্তা, উৎ + জ্বল = উজ্জ্বল।
ম্-এর পরে অন্তঃস্থ বা উষ্ম ধ্বনি থাকলে ম্ অনুস্বার হয়ে যায় — সম্ + যম = সংযম, সম্ + সার = সংসার। আর কিছু ব্যঞ্জনসন্ধি কোনো নিয়মেই ব্যাখ্যা করা যায় না, যেমন এক + দশ = একাদশ, ষট্ + দশ = ষোড়শ। এগুলোকে নিপাতনে সিদ্ধ ধরা হয় এবং আলাদাভাবে মনে রাখতে হয়।
মনে রাখার কথা
ব্যঞ্জনসন্ধিতে নিয়মের সংখ্যা বেশি, তাই প্রতিটি নিয়মের সঙ্গে অন্তত দুটি উদাহরণ একসঙ্গে মুখস্থ করাই কার্যকর।
সাধারণ ভুল
পরীক্ষায় এই ভুলগুলোই সবচেয়ে বেশি নম্বর কাটে। ভুল রূপটি দেখে নিলে নিজের লেখায় ধরা সহজ হয়।
- ✗ উচ্ছ্বাস = উচ্ + শ্বাস ✓ উচ্ছ্বাস = উৎ + শ্বাস — ত্ + শ্ = চ্ছ
- ✗ সংসার = সং + সার ✓ সংসার = সম্ + সার — ম্ → ং
- ✗ উদ্ধার = উদ্ + ধার ✓ উদ্ধার = উৎ + হার — ত্ + হ্ = দ্ধ
- ✗ জগদীশ = জগ + দীশ ✓ জগদীশ = জগৎ + ঈশ
অনুশীলন
নিচের প্রশ্নগুলোর উত্তর নিজে লেখো, তারপর মিলিয়ে নাও।
- সন্ধি বিচ্ছেদ করো: সজ্জন।
- সন্ধি বিচ্ছেদ করো: সঞ্চয়।
- সন্ধি বিচ্ছেদ করো: উল্লাস।
- বর্গের প্রথম ধ্বনি কখন তৃতীয় ধ্বনিতে বদলায়?
- “ষড়ানন” শব্দটির সন্ধি বিচ্ছেদ কী?
- ম্-এর পরে শ, ষ, স বা হ থাকলে কী হয়?
- বর্গের প্রথম ধ্বনি কখন পঞ্চম ধ্বনিতে বদলায়?
- সন্ধি বিচ্ছেদ করো: আচ্ছাদন।
উত্তর
- সৎ + জন। ত্-এর পরে জ্ এলে দুটি মিলে জ্জ হয়।
- সম্ + চয়। ম্-এর পরে চ-বর্গের ধ্বনি এলে ম্ সেই বর্গের পঞ্চম ধ্বনি ঞ্-এ পরিণত হয়।
- উৎ + লাস। ত্-এর পরে ল্ এলে দুটি মিলে ল্ল হয়।
- পরে স্বরধ্বনি, বর্গের তৃতীয়-চতুর্থ-পঞ্চম ধ্বনি, কিংবা য র ল ব হ থাকলে।
- ষট্ + আনন। ট্ পরে স্বর পেয়ে নিজের বর্গের তৃতীয় ধ্বনি ড্-এ পরিণত হয়েছে।
- ম্ অনুস্বারে (ং) পরিণত হয় — যেমন সম্ + হার = সংহার, সম্ + সার = সংসার।
- পরে ন্ বা ম্ থাকলে — যেমন বাক্ + ময় = বাঙ্ময়, তৎ + ময় = তন্ময়। নাসিক্য ধ্বনির প্রভাবে আগের ধ্বনিটিও নাসিক্য হয়ে যায়।
- আ + ছাদন। হ্রস্ব স্বরের পরে ছ্ এলে সেটি দ্বিত্ব হয়ে চ্ছ হয়।
উপযোগী শ্রেণি: নবম, দশম, একাদশ, দ্বাদশ শ্রেণি।
সচরাচর জিজ্ঞাসা
ব্যঞ্জনের সঙ্গে ব্যঞ্জনের, অথবা স্বরের সঙ্গে ব্যঞ্জনের মিলনে যে সন্ধি হয় তাকে ব্যঞ্জনসন্ধি বলে। যেমন দিক্ + অন্ত = দিগন্ত।
সম্ + চয় = সঞ্চয়। নিয়ম হলো ম্-এর পরে বর্গীয় ধ্বনি থাকলে ম্ সেই বর্গের পঞ্চম বর্ণে পরিণত হয়; চ বর্গের পঞ্চম বর্ণ ঞ।
উৎ + জ্বল = উজ্জ্বল। ত্ বা দ্-এর পরে জ, ঝ থাকলে ত্/দ্ জ্-এ পরিণত হয় — এটি ব্যঞ্জনসন্ধির একটি প্রচলিত নিয়ম।
ম্ সেই বর্গের পঞ্চম বা নাসিক্য ধ্বনিতে পরিণত হয় — যেমন সম্ + চয় = সঞ্চয়, সম্ + তোষ = সন্তোষ। আর শ, ষ, স বা হ থাকলে ম্ অনুস্বার (ং) হয়ে যায়।
আরও বাংলা ব্যাকরণ পড়ো
বাংলা ব্যাকরণ-এর পূর্ণ তালিকা ও বাংলা লেখার অন্যান্য অংশ এক জায়গায়।
আমাদের সাথে যুক্ত থাকো
পড়াশোনার আপডেট, সাজেশন ও প্রশ্নোত্তর সবার আগে পেতে আমাদের ফেসবুক পেজ ও গ্রুপে যুক্ত হও।






















