ণত্ব বিধান — নিয়ম ও উদাহরণসহ ব্যাখ্যা
তৎসম শব্দে কখন ণ হয় — ণত্ব বিধানের সব নিয়ম, ব্যতিক্রম ও উদাহরণ।
সংজ্ঞা
তৎসম শব্দে কখন দন্ত্য-ন না হয়ে মূর্ধন্য-ণ হবে, সেই নিয়মকে ণত্ব বিধান বলে। এটি কেবল তৎসম শব্দে খাটে — খাঁটি বাংলা ও বিদেশি শব্দে ণ-এর এই নিয়ম প্রযোজ্য নয়।
নিয়মটি কেবল তৎসম শব্দে খাটে
ণত্ব বিধান হলো তৎসম বা সংস্কৃত শব্দে কখন দন্ত্য-ন-এর বদলে মূর্ধন্য-ণ লিখতে হবে তার নিয়ম। খাঁটি বাংলা, তদ্ভব, দেশি ও বিদেশি শব্দে এই বিধান খাটে না — সেখানে সব সময় দন্ত্য-ন বসে।
তাই বানান নিয়ে সন্দেহ হলে প্রথম প্রশ্নটি হবে: শব্দটি কি তৎসম? উত্তর “না” হলে ণ লেখার প্রশ্নই ওঠে না।
- তৎসম শব্দ = সংস্কৃত থেকে অপরিবর্তিত রূপে আসা শব্দ।
- বিদেশি শব্দে ণ বসে না — ইংরেজ, কলম, জানালা।
- ব্যতিক্রম হিসেবে কিছু শব্দে প্রচলনের জোরে ণ টিকে গেছে।
ঋ, র, ষ-এর পরে ণ হয়
ণত্ব বিধানের প্রধান সূত্র এটিই। ঋ-কার, র্ বা ষ-এর পরে যদি দন্ত্য-ন আসে, তবে সেটি মূর্ধন্য-ণ হয়ে যায়। মাঝখানে স্বরধ্বনি, ক-বর্গ, প-বর্গ, য, ব, হ বা ং থাকলেও নিয়মটি কাজ করে।
ঋ / র / ষ-এর পরে ণ
| পূর্বে আছে | উদাহরণ | বিশ্লেষণ |
|---|---|---|
| ঋ | ঋণ, তৃণ, বৃণ্দ | ঋ-কারের পরেই ণ |
| র | বর্ণ, কর্ণ, চরণ, হরিণ | র্-এর পরে ণ |
| ষ | কৃষ্ণ, বিষ্ণু, উষ্ণ | ষ-এর পরে ণ |
| মাঝে স্বর | রামায়ণ, নারায়ণ | র ও ণ-এর মাঝে স্বর থাকলেও ণ |
- ✓ পরিণাম — র-এর পরে ণ
- ✓ প্রবীণ — র-এর পরে ণ
- ✗ কৃষ্ন ✓ কৃষ্ণ — ষ-এর পরে ণ
ট-বর্গের আগে ণ হয়
ট ঠ ড ঢ — এই ট-বর্গের ধ্বনির আগে নাসিক্য ধ্বনি এলে সেটি সব সময় ণ হয়, কারণ ট-বর্গ ও ণ দুটিরই উচ্চারণস্থান মূর্ধা। উচ্চারণস্থান এক বলেই বর্ণটিও এক হয়ে যায়।
| শব্দ | কারণ |
|---|---|
| ঘণ্টা | ট-এর আগে ণ |
| লুণ্ঠন | ঠ-এর আগে ণ |
| কাণ্ড | ড-এর আগে ণ |
| ষণ্ড | ড-এর আগে ণ |
- ✗ ঘন্টা ✓ ঘণ্টা
- ✗ কান্ড ✓ কাণ্ড
ত-বর্গের আগে কখনো ণ নয়
ত থ দ ধ ন — এই ত-বর্গের ধ্বনির আগে সব সময় দন্ত্য-ন বসবে, কখনো ণ নয়। কারণ আগের নিয়মের ঠিক উল্টো: ত-বর্গ ও ন দুটিরই উচ্চারণস্থান দন্ত।
- নিয়মটি সহজ করে মনে রাখো: ট-বর্গে ণ, ত-বর্গে ন।
- উচ্চারণস্থানের মিলই এই দুই নিয়মের ভিত্তি।
- ✓ অন্ত, জন্ম, বন্ধু, শান্ত — সবগুলোতেই দন্ত্য-ন
- ✗ শাণ্ত ✓ শান্ত
- ✗ অণ্ত ✓ অন্ত
কিছু ব্যতিক্রম
- কয়েকটি শব্দে নিয়ম না মেনেও ণ লেখা হয় — ত্রিনয়ন, সnিহিত নয়, বরং প্রচলিত রূপ দেখে নিতে হয়।
- সমাসবদ্ধ শব্দে দুই পদের সীমানা পেরিয়ে ণত্ব সাধারণত হয় না — ত্রিনয়ন।
- বিদেশি শব্দে কখনো ণ নয় — জার্মান, কর্নেল।
- ✗ কর্ণেল ✓ কর্নেল — বিদেশি শব্দ, তাই ন
সমাসবদ্ধ পদে ণত্ব হয় না
দুটি আলাদা শব্দ মিলে সমাসবদ্ধ পদ তৈরি হলে ণত্ব বিধান সাধারণত সেই সীমানা পেরোয় না। কারণ ণত্ব একটি ধ্বনিগত প্রভাব, আর সমাসে দুটি শব্দ নিজেদের স্বাধীনতা কিছুটা ধরে রাখে।
- নিয়মটি মনে রাখার সূত্র: এক শব্দের ভেতরে ণত্ব, দুই শব্দের মাঝে নয়।
- তবে দীর্ঘ ব্যবহারে কিছু সমাসবদ্ধ পদেও ণ থিতু হয়ে গেছে — অভিধান দেখে নেওয়াই নিরাপদ।
| পদ | গঠন | কেন ন, ণ নয় |
|---|---|---|
| ত্রিনয়ন | ত্রি + নয়ন | দুই পদের সীমানা পেরিয়ে প্রভাব যায় না |
| সর্বনাম | সর্ব + নাম | র থাকলেও সমাসবদ্ধ, তাই ন |
| দুর্নাম | দুর্ + নাম | একই কারণ |
- ✗ ত্রিণয়ন ✓ ত্রিনয়ন — সমাসবদ্ধ পদ
- ✗ সর্বণাম ✓ সর্বনাম
ণ ও ন — বানান যাচাইয়ের ধাপ
পরীক্ষার খাতায় ণ না ন লিখব, এই দ্বিধা কাটাতে তিনটি প্রশ্ন পরপর করলেই উত্তর মেলে। ধাপগুলো একবার অভ্যাস হয়ে গেলে বানান নিয়ে আর থমকাতে হয় না।
- ধাপ ১ — শব্দটি কি তৎসম? না হলে সোজা দন্ত্য-ন।
- ধাপ ২ — আগে কি ঋ, র বা ষ আছে? থাকলে ণ।
- ধাপ ৩ — পরে কি ট-বর্গ (ট ঠ ড ঢ) আছে? থাকলে ণ। ত-বর্গ থাকলে সব সময় ন।
- তিন ধাপেই “না” হলে দন্ত্য-ন লেখো।
- ✓ হরিণ — তৎসম, র আছে → ণ
- ✓ ঘণ্টা — তৎসম, পরে ট → ণ
- ✓ শান্ত — তৎসম, পরে ত-বর্গ → ন
- ✓ জানালা — তৎসম নয় → ন
কোন কোন শব্দে সব সময় ণ
কিছু তৎসম শব্দে ণ এতটাই থিতু যে নিয়ম মেলানোর দরকার পড়ে না — এগুলো চিনে রাখাই দ্রুততম পথ। বোর্ড প্রশ্নে বানান শুদ্ধিকরণে এই শব্দগুলোই বারবার ফেরে।
সব সময় ণ হয় এমন শব্দ
| শ্রেণি | শব্দ |
|---|---|
| ঋ-জাত | ঋণ, তৃণ, বর্ণ, পূর্ণ |
| র-জাত | কর্ণ, চরণ, হরিণ, শরণ, বরণ |
| ষ-জাত | কৃষ্ণ, বিষ্ণু, উষ্ণ, তৃষ্ণা |
| ট-বর্গ সংলগ্ন | ঘণ্টা, কাণ্ড, লুণ্ঠন, ষণ্ড, পণ্ড |
- ✗ তৃষ্না ✓ তৃষ্ণা
- ✗ পুর্ন ✓ পূর্ণ
- ✗ লুন্ঠন ✓ লুণ্ঠন
ণ ও ন — বিভ্রান্তিকর জোড়া
কিছু শব্দজোড়া দেখতে প্রায় এক, অথচ একটিতে ণ আর অন্যটিতে ন। কারণ প্রায় সব ক্ষেত্রেই একটি তৎসম আর অন্যটি নয়, কিংবা একটিতে আগে র বা ষ আছে আর অন্যটিতে নেই।
| ণ হয় | ন হয় | পার্থক্যের কারণ |
|---|---|---|
| হরিণ | হরিন নয় | তৎসম, আগে র |
| ব্রাহ্মণ | ব্রাহ্মন নয় | তৎসম, ঋ-প্রভাব |
| কারণ | কারন নয় | তৎসম, আগে র |
| জানালা | ণ নয় | তদ্ভব শব্দ |
| কর্নেল | ণ নয় | বিদেশি শব্দ |
| ত্রিনয়ন | ণ নয় | সমাসবদ্ধ পদ |
- ✗ কারন ✓ কারণ
- ✗ হরিন ✓ হরিণ
- ✗ ব্রাহ্মন ✓ ব্রাহ্মণ
বিস্তারিত আলোচনা
ণত্ব বিধানের প্রধান শর্ত হলো ঋ, র, ষ — এই তিনটি ধ্বনির উপস্থিতি। ঋ-কার, র্ বা ষ-এর পরে ন থাকলে সেই ন সাধারণত ণ হয়ে যায়। যেমন ঋণ, তৃণ, বর্ণ, চরণ, কারণ, ভীষণ, ভাষণ, ঊষ্ণ। উচ্চারণের সময় জিহ্বা মূর্ধায় পৌঁছে যায় বলেই এই পরিবর্তন ঘটে, তাই নিয়মটি নিছক আরোপিত নয়।
এই তিনটি ধ্বনির পর সরাসরি ন না থেকে মাঝখানে স্বরধ্বনি, ক-বর্গ, প-বর্গ, য, ব, হ বা অনুস্বার থাকলেও ণ হয়। যেমন রামায়ণ, হরিণ, লক্ষ্মণ, ব্রাহ্মণ। তবে মাঝখানে ত-বর্গ, চ-বর্গ, ট-বর্গ বা ল, শ, স থাকলে ণ হয় না — যেমন অর্চনা, বর্তন, দর্শন।
কয়েকটি শব্দে ণ ব্যবহৃত হয় কোনো নিয়ম ছাড়াই, শুধু প্রচলনের কারণে — যেমন গণ, বাণ, মণি, পুণ্য, লবণ, কল্যাণ, নিপুণ, চাণক্য। আবার সমাসবদ্ধ পদে দুটি শব্দ আলাদা অর্থে থাকলে ণ হয় না, যেমন ত্রিনয়ন। খাঁটি বাংলা শব্দে যেমন ধরন, সোনা, কান — সেখানে দন্ত্য-ন-ই থাকে।
মনে রাখার কথা
ঋ, র, ষ — এই তিনটি অক্ষর মনে রাখলে ণত্ব বিধানের অর্ধেক কাজ হয়ে যায়; বাকিটা ব্যতিক্রমের তালিকা।
সাধারণ ভুল
পরীক্ষায় এই ভুলগুলোই সবচেয়ে বেশি নম্বর কাটে। ভুল রূপটি দেখে নিলে নিজের লেখায় ধরা সহজ হয়।
- ✗ ঘন্টা ✓ ঘণ্টা — ট-বর্গের আগে ণ
- ✗ কৃষ্ন ✓ কৃষ্ণ — ষ-এর পরে ণ
- ✗ শাণ্ত ✓ শান্ত — ত-বর্গের আগে সব সময় ন
- ✗ ণত্ব বিধান বাংলা সব শব্দে খাটে। ✓ কেবল তৎসম শব্দে খাটে।
- ✗ ত্রিণয়ন ✓ ত্রিনয়ন — সমাসবদ্ধ পদে ণত্ব যায় না
- ✗ সর্বণাম ✓ সর্বনাম
অনুশীলন
নিচের প্রশ্নগুলোর উত্তর নিজে লেখো, তারপর মিলিয়ে নাও।
- ণত্ব বিধান কাকে বলে?
- ট-বর্গের আগে কোন নাসিক্য বর্ণ বসে?
- “রামায়ণ” শব্দে ণ হলো কেন?
- ত-বর্গের আগে কোন বর্ণ বসে?
- বিদেশি শব্দে ণ বসে কি?
- ঋ-কারের পরে ণ হয় — দুটি উদাহরণ দাও।
- সমাসবদ্ধ পদে ণত্ব হয় না কেন?
- ণ না ন — যাচাইয়ের তিনটি ধাপ কী?
- “জানালা” শব্দে ন কেন, ণ নয়?
- ণত্ব বিধান মেনে চলে এমন চারটি শব্দ লেখো।
- বানান শুদ্ধ করো: তৃষ্না, পুর্ন, লুন্ঠন।
উত্তর
- তৎসম শব্দে কোথায় দন্ত্য-ন-এর বদলে মূর্ধন্য-ণ বসবে, তার নিয়মকেই ণত্ব বিধান বলে।
- ণ — কারণ ট-বর্গ ও ণ দুটিরই উচ্চারণস্থান মূর্ধা। যেমন ঘণ্টা, কাণ্ড।
- র-এর পরে ণ হয়, মাঝখানে স্বরধ্বনি থাকলেও নিয়মটি কাজ করে।
- সব সময় দন্ত্য-ন, কখনো ণ নয় — যেমন অন্ত, শান্ত, বন্ধু।
- না। ণত্ব বিধান কেবল তৎসম শব্দে প্রযোজ্য, তাই বিদেশি শব্দে সব সময় দন্ত্য-ন লেখা হয়।
- ঋণ এবং তৃণ — দুটিতেই ঋ-কারের পরে মূর্ধন্য-ণ বসেছে।
- ণত্ব একটি ধ্বনিগত প্রভাব, আর সমাসে দুটি শব্দ নিজেদের স্বাতন্ত্র্য কিছুটা ধরে রাখে — তাই প্রভাবটি পদের সীমানা পেরোয় না। যেমন ত্রিনয়ন, সর্বনাম।
- এক, শব্দটি তৎসম কি না; দুই, আগে ঋ, র বা ষ আছে কি না; তিন, পরে ট-বর্গ আছে কি না। তিনটিতেই “না” হলে দন্ত্য-ন।
- শব্দটি তৎসম নয় বলে ণত্ব বিধানই প্রযোজ্য নয়, তাই সব সময় দন্ত্য-ন বসে।
- ঋণ, বর্ণ, কৃষ্ণ ও ঘণ্টা। প্রথমটিতে ঋ, দ্বিতীয়টিতে র, তৃতীয়টিতে ষ এবং চতুর্থটিতে পরের ট-বর্গ ণ আনছে।
- তৃষ্ণা, পূর্ণ, লুণ্ঠন। তিনটিতেই ণত্ব বিধান প্রযোজ্য।
উপযোগী শ্রেণি: নবম, দশম, একাদশ, দ্বাদশ শ্রেণি।
সচরাচর জিজ্ঞাসা
তৎসম শব্দে কোন অবস্থায় দন্ত্য-ন না হয়ে মূর্ধন্য-ণ হবে, তার নিয়মকে ণত্ব বিধান বলে। এটি কেবল তৎসম শব্দের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।
ঋ, র বা ষ-এর পরে ন থাকলে তা ণ হয় — যেমন ঋণ, বর্ণ, ভীষণ। মাঝে স্বরধ্বনি, ক-বর্গ, প-বর্গ, য, ব, হ থাকলেও ণ হয়, যেমন রামায়ণ, ব্রাহ্মণ।
ধ্বনিতত্ত্বে। কারণ এটি ধ্বনির পারস্পরিক প্রভাবে উচ্চারণ ও বানানের পরিবর্তন নিয়ে আলোচনা করে, শব্দ বা বাক্যের গঠন নিয়ে নয়।
না, কেবল তৎসম বা সংস্কৃত শব্দে। খাঁটি বাংলা, তদ্ভব, দেশি ও বিদেশি শব্দে সব সময় দন্ত্য-ন বসে — যেমন কলম, জানালা, কর্নেল।
আরও বাংলা ব্যাকরণ পড়ো
বাংলা ব্যাকরণ-এর পূর্ণ তালিকা ও বাংলা লেখার অন্যান্য অংশ এক জায়গায়।
আমাদের সাথে যুক্ত থাকো
পড়াশোনার আপডেট, সাজেশন ও প্রশ্নোত্তর সবার আগে পেতে আমাদের ফেসবুক পেজ ও গ্রুপে যুক্ত হও।






















