সর্বনাম পদ — প্রকারভেদ ও উদাহরণ
সর্বনামের সংজ্ঞা এবং ব্যক্তিবাচক, আত্মবাচক, সাপেক্ষ, প্রশ্নবাচক ও অনির্দিষ্ট সর্বনামের উদাহরণ।
সংজ্ঞা
বিশেষ্যের পুনরাবৃত্তি এড়াতে তার পরিবর্তে যে পদ ব্যবহৃত হয়, তাকে সর্বনাম পদ বলে — যেমন আমি, তুমি, সে, এটি, যা, কেউ।
বিশেষ্যের পরিবর্তে যে পদ বসে
বিশেষ্য পদের পরিবর্তে যে পদ ব্যবহৃত হয়, তাকে সর্বনাম পদ বলে। রহিম এসেছে। রহিম ভাত খেয়েছে। — দুবার রহিম বলা কানে লাগে; দ্বিতীয়বার সে বললে বাক্য মসৃণ হয়। সেই সে-ই সর্বনাম।
সর্বনামের কাজ পুনরাবৃত্তি এড়ানো, আর সেই কারণেই এটি ভাষাকে সংক্ষিপ্ত ও প্রাঞ্জল করে। যে বিশেষ্যের বদলে সর্বনাম বসে, তাকে বলা হয় সেই সর্বনামের পূর্বসূরি।
সর্বনাম কেবল ব্যক্তির বদলে বসে না — বস্তু, স্থান, ভাব সবের বদলেই বসতে পারে। এটি, ওখানে, তা — তিনটিই সর্বনাম, যদিও কোনোটিই ব্যক্তি বোঝায় না।
- সর্বনামের কাজ পুনরাবৃত্তি এড়ানো।
- যে বিশেষ্যের বদলে বসে তাকে পূর্বসূরি বলে।
- ব্যক্তি, বস্তু, স্থান, ভাব — সবের বদলেই বসে।
- ✓ রহিম এসেছে। সে ভাত খেয়েছে। — সে = রহিমের সর্বনাম
- ✓ বইটি নাও। এটি ভালো। — এটি = বইয়ের সর্বনাম
সর্বনামের প্রকারভেদ
সর্বনাম কী কাজ করছে তার ভিত্তিতে কয়েক ভাগে ভাগ করা হয়। ভাগগুলো পরীক্ষায় উদাহরণসহ জিজ্ঞাসা করা হয়, আর প্রতিটির চেনার সূত্রও সহজ।
সর্বনামের প্রকার
| প্রকার | কী বোঝায় | উদাহরণ |
|---|---|---|
| ব্যক্তিবাচক | ব্যক্তি বা বস্তু | আমি, তুমি, সে, তারা |
| নির্দেশক | নির্দেশ করে | এই, ঐ, এটি, ওটি |
| সাপেক্ষ | জোড়ায় বসে | যে-সে, যিনি-তিনি, যারা-তারা |
| প্রশ্নবাচক | প্রশ্ন করে | কে, কী, কোন, কার |
| অনির্দিষ্ট | অনির্দিষ্ট কেউ | কেউ, কিছু, কেহ |
| সকলবাচক | সমষ্টি বোঝায় | সব, সকল, সমুদয় |
| আত্মবাচক | নিজেকে বোঝায় | নিজে, স্বয়ং, খোদ |
| অন্যবাচক | অন্য কাউকে | অন্য, অপর, পর |
- ✓ যে পরিশ্রম করে, সে সফল হয় — সাপেক্ষ সর্বনাম
- ✓ কেউ আসেনি — অনির্দিষ্ট সর্বনাম
ব্যক্তিবাচক সর্বনাম ও পুরুষ
ব্যক্তিবাচক সর্বনাম সরাসরি পুরুষের সঙ্গে যুক্ত। উত্তম পুরুষে আমি, আমরা; মধ্যম পুরুষে তুই, তুমি, আপনি; নাম পুরুষে সে, তিনি, তারা। ক্রিয়ার রূপও এই অনুযায়ীই বদলায়।
বাংলার একটি বিশেষত্ব হলো মধ্যম ও নাম পুরুষে সম্মানের স্তরভেদ। সে সাধারণ, তিনি সম্ভ্রমার্থক; তুই তুচ্ছার্থক, তুমি সাধারণ, আপনি সম্ভ্রমার্থক। ভুল স্তর ব্যবহার করলে ব্যাকরণ ঠিক থাকলেও সৌজন্য নষ্ট হয়।
| পুরুষ | সাধারণ | সম্ভ্রমার্থক | তুচ্ছার্থক |
|---|---|---|---|
| উত্তম | আমি, আমরা | — | মুই, মোরা |
| মধ্যম | তুমি, তোমরা | আপনি, আপনারা | তুই, তোরা |
| নাম | সে, তারা | তিনি, তাঁরা | — |
- ✓ তিনি এসেছেন — নাম পুরুষ, সম্ভ্রমার্থক
- ✗ স্যার, তুমি এসেছ ✓ স্যার, আপনি এসেছেন
সাপেক্ষ সর্বনাম — জোড়ায় বসে
কিছু সর্বনাম একা বসে না, জোড়ায় বসে — এদের বলে সাপেক্ষ সর্বনাম। যে-এর সঙ্গে সে, যিনি-র সঙ্গে তিনি, যারা-র সঙ্গে তারা, যেমন-এর সঙ্গে তেমন।
যে পরিশ্রম করে, সে সফল হয় — দুটি সর্বনাম মিলে একটি শর্ত ও ফলের সম্পর্ক তৈরি করেছে। জোড়ার একটি বাদ দিলে বাক্যটি অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
পরীক্ষায় প্রায়ই বাক্য পূরণ করতে বলা হয়, আর সেখানে সঠিক জোড়াটি বসানোই মূল কাজ। যিনি দিয়ে শুরু করলে তিনি বসাতে হবে, সে নয় — সম্মানের স্তরও মিলতে হবে।
| প্রথম পদ | জোড়া পদ | উদাহরণ |
|---|---|---|
| যে | সে | যে আসে, সে জানে |
| যিনি | তিনি | যিনি বলেন, তিনি করেন |
| যারা | তারা | যারা পড়ে, তারা শেখে |
| যেমন | তেমন | যেমন কর্ম, তেমন ফল |
| যত | তত | যত পড়বে, তত জানবে |
- ✗ যিনি বলেন, সে করেন ✓ যিনি বলেন, তিনি করেন
- ✓ যেমন কর্ম, তেমন ফল
সর্বনামেও বিভক্তি বসে
সর্বনাম একটি সব্যয় পদ — বাক্যে ভূমিকা অনুযায়ী এর রূপ বদলায়। আমি কর্তা, আমাকে কর্ম, আমার সম্বন্ধ, আমাতে অধিকরণ। বিশেষ্যের মতোই সর্বনামেও বিভক্তি যুক্ত হয়।
তবে সর্বনামের রূপ বিশেষ্যের চেয়ে বেশি অনিয়মিত। আমি থেকে আমাকে হয়, কিন্তু আমিকে নয়; সে থেকে তাকে হয়, সেকে নয়। এই অনিয়মিত রূপগুলো মুখস্থ রাখতে হয়।
| কর্তা | কর্ম | সম্বন্ধ | অধিকরণ |
|---|---|---|---|
| আমি | আমাকে | আমার | আমাতে |
| তুমি | তোমাকে | তোমার | তোমাতে |
| সে | তাকে | তার | তাতে |
| তিনি | তাঁকে | তাঁর | তাঁতে |
| আমরা | আমাদের | আমাদের | আমাদিগে |
- ✗ সেকে বলো ✓ তাকে বলো
- ✗ আমিকে দাও ✓ আমাকে দাও
পরীক্ষায় কী আসে
সর্বনাম অধ্যায় থেকে প্রশ্ন সাধারণত তিন রকম — সংজ্ঞা ও প্রকারভেদ, বাক্য থেকে সর্বনাম চিহ্নিত করা, আর সাপেক্ষ সর্বনামের জোড়া পূরণ করা। শেষটিতে সম্মানের স্তর মেলানোই মূল সতর্কতা।
দ্বিতীয় ফাঁদ নির্দেশক ও প্রশ্নবাচকে। কোন শব্দটি প্রশ্নে বসলে প্রশ্নবাচক সর্বনাম (কোনটি নেবে?), আর নির্দেশ করলে নির্দেশক বিশেষণ (কোন বইটি?)। বাক্যে কাজ দেখে ঠিক করতে হয়।
উত্তরে প্রকারের নাম লেখার সঙ্গে কারণটিও এক বাক্যে জানাও। “যে-সে — সাপেক্ষ সর্বনাম, কারণ দুটি জোড়ায় বসে শর্ত ও ফলের সম্পর্ক তৈরি করেছে” — এই কাঠামোই পূর্ণ নম্বর দেয়।
- সাপেক্ষ জোড়ায় সম্মানের স্তর মেলাও — যিনি–তিনি।
- সর্বনামের বিভক্তিরূপ অনিয়মিত — তাকে, আমাকে।
- উত্তরে প্রকার + কারণ দুটিই লেখো।
- ✗ যিনি বলেন, সে করেন ✓ যিনি বলেন, তিনি করেন
বিস্তারিত আলোচনা
"করিম বাজারে গেল। করিম চাল কিনল। করিম বাড়ি ফিরল।" — এভাবে লিখলে ভাষা ভারী হয়ে যায়। তাই দ্বিতীয়বার থেকে "সে" বসানো হয়। এই কাজটিই সর্বনামের। যে বিশেষ্যের বদলে সর্বনাম বসে, তাকে সেই সর্বনামের পূর্বপদ বা বিশেষ্যপদ বলা হয়, এবং বাক্যে সেটি আগে উল্লেখ থাকা দরকার নইলে অর্থ অস্পষ্ট হয়।
সর্বনামের কয়েকটি প্রধান শ্রেণি আছে। ব্যক্তিবাচক সর্বনাম — আমি, আমরা, তুমি, সে, তারা। আত্মবাচক — নিজে, স্বয়ং, খোদ। সাপেক্ষ সর্বনাম জোড়ায় বসে — যে-সে, যিনি-তিনি, যেমন-তেমন। সাকল্যবাচক সবাইকে বোঝায় — সকল, সব, তাবৎ। সংযোগজ্ঞাপক — যে, যিনি, যা।
আরও কয়েকটি শ্রেণি পরীক্ষায় আসে। প্রশ্নবাচক সর্বনাম — কে, কী, কোন, কারা। অনির্দিষ্ট সর্বনাম — কেউ, কিছু, কোনো, একজন। নির্দিষ্টতা বোঝাতে বসে নির্দেশক সর্বনাম — এই, এটি, ঐ, সেটি। আর অন্যাদিবাচক সর্বনাম অন্য কাউকে বোঝায় — অন্য, পর, অপর। প্রতিটির অন্তত দুটি উদাহরণ মনে রাখলে পদ নির্ণয়ে ভুল হয় না।
মনে রাখার কথা
সর্বনাম বসানোর আগে যে বিশেষ্যের বদলে বসছে সেটি বাক্যে স্পষ্ট আছে কি না দেখে নিতে হয়।
সাধারণ ভুল
পরীক্ষায় এই ভুলগুলোই সবচেয়ে বেশি নম্বর কাটে। ভুল রূপটি দেখে নিলে নিজের লেখায় ধরা সহজ হয়।
- ✗ সেকে বলো / আমিকে দাও ✓ তাকে বলো / আমাকে দাও — সর্বনামের রূপ অনিয়মিত।
- ✗ যিনি বলেন, সে করেন। ✓ যিনি বলেন, তিনি করেন — সাপেক্ষ জোড়ার স্তর মিলতে হবে।
- ✗ সর্বনাম কেবল ব্যক্তির বদলে বসে। ✓ বস্তু, স্থান ও ভাবের বদলেও বসে — এটি, ওখানে, তা।
- ✗ সর্বনাম একটি অব্যয় পদ। ✓ সর্বনাম সব্যয় — বিভক্তিতে রূপ বদলায়।
অনুশীলন
নিচের প্রশ্নগুলোর উত্তর নিজে লেখো, তারপর মিলিয়ে নাও।
- সর্বনাম পদ কাকে বলে?
- সর্বনামের ছয়টি প্রকার লেখো।
- সাপেক্ষ সর্বনাম কাকে বলে? দুটি জোড়া লেখো।
- “কেউ আসেনি” — এখানে “কেউ” কোন সর্বনাম?
- সর্বনামের বিভক্তিরূপ অনিয়মিত — উদাহরণ দাও।
- আত্মবাচক সর্বনামের তিনটি উদাহরণ দাও।
- ব্যক্তিবাচক সর্বনামে সম্মানের স্তর কীভাবে প্রকাশ পায়?
- নির্দেশক সর্বনাম ও নির্দেশক বিশেষণ আলাদা করব কীভাবে?
- সর্বনামের পূর্বসূরি বলতে কী বোঝ?
- সর্বনাম ভাষাকে কী দেয়?
- সর্বনাম কোন পুরুষে কোন রূপ নেয়?
উত্তর
- বিশেষ্য পদের পরিবর্তে যে পদ ব্যবহৃত হয়, তাকে সর্বনাম পদ বলে। এর কাজ পুনরাবৃত্তি এড়ানো।
- ব্যক্তিবাচক, নির্দেশক, সাপেক্ষ, প্রশ্নবাচক, অনির্দিষ্ট ও আত্মবাচক।
- যে সর্বনাম জোড়ায় বসে শর্ত ও ফলের সম্পর্ক তৈরি করে — যেমন যে-সে, যিনি-তিনি।
- অনির্দিষ্ট সর্বনাম, কারণ এটি নির্দিষ্ট কাউকে বোঝাচ্ছে না।
- “সে” থেকে “তাকে” হয়, “সেকে” নয়; “আমি” থেকে “আমাকে” হয়, “আমিকে” নয়।
- নিজে, স্বয়ং ও খোদ — যেমন “সে নিজেই করেছে”।
- নাম পুরুষে “সে” সাধারণ ও “তিনি” সম্ভ্রমার্থক; মধ্যম পুরুষে “তুই” তুচ্ছার্থক, “তুমি” সাধারণ ও “আপনি” সম্ভ্রমার্থক।
- শব্দটি একা বসে বিশেষ্যের বদলে কাজ করলে সর্বনাম — “এটি ভালো”। আর কোনো বিশেষ্যকে নির্দেশ করলে বিশেষণ — “এই বইটি ভালো”।
- যে বিশেষ্য পদের বদলে সর্বনামটি বসেছে, তাকেই সেই সর্বনামের পূর্বসূরি বলে। “রহিম এসেছে। সে ভাত খেয়েছে।” — এখানে রহিম হলো “সে”-এর পূর্বসূরি।
- সংক্ষেপ ও প্রাঞ্জলতা। একই বিশেষ্য বারবার না লিখে সর্বনাম বসালে বাক্য মসৃণ হয় — “রহিম এসেছে। রহিম ভাত খেয়েছে।” বদলে “রহিম এসেছে। সে ভাত খেয়েছে।”
- উত্তম পুরুষে আমি ও আমরা; মধ্যম পুরুষে তুই, তুমি ও আপনি; নাম পুরুষে সে, তিনি ও তারা। মধ্যম ও নাম পুরুষে সম্মানের স্তরভেদ আছে।
উপযোগী শ্রেণি: নবম, দশম, একাদশ, দ্বাদশ শ্রেণি।
সচরাচর জিজ্ঞাসা
বিশেষ্যের পুনরাবৃত্তি এড়াতে তার পরিবর্তে যে পদ ব্যবহৃত হয়, তাকে সর্বনাম পদ বলে — যেমন আমি, তুমি, সে, এটি, কেউ।
যে সর্বনাম জোড়ায় জোড়ায় বসে পরস্পরের ওপর নির্ভর করে অর্থ প্রকাশ করে — যেমন যে-সে, যিনি-তিনি, যেমন-তেমন, যত-তত।
নিজে, স্বয়ং, খোদ, আপনি — এগুলো আত্মবাচক সর্বনাম। যেমন "সে নিজে কাজটি করেছে" বাক্যে "নিজে" আত্মবাচক সর্বনাম।
কারণ সম্মানের স্তরও মিলতে হয়। “যিনি” দিয়ে শুরু করলে “তিনি” বসাতে হবে, “সে” নয়; “যারা” দিয়ে শুরু করলে “তারা”। জোড়ার একটি বাদ দিলে বা স্তর না মিললে বাক্যটি অশুদ্ধ হয়।
আরও বাংলা ব্যাকরণ পড়ো
বাংলা ব্যাকরণ-এর পূর্ণ তালিকা ও বাংলা লেখার অন্যান্য অংশ এক জায়গায়।
আমাদের সাথে যুক্ত থাকো
পড়াশোনার আপডেট, সাজেশন ও প্রশ্নোত্তর সবার আগে পেতে আমাদের ফেসবুক পেজ ও গ্রুপে যুক্ত হও।






















