পদ কাকে বলে — পদের প্রকারভেদ ও উদাহরণ
পদের সংজ্ঞা, শব্দ ও পদের পার্থক্য এবং পাঁচ প্রকার পদের পরিচয় উদাহরণসহ।
সংজ্ঞা
বিভক্তিযুক্ত হয়ে বাক্যে ব্যবহৃত শব্দকে পদ বলে। বাংলায় পদ পাঁচ প্রকার — বিশেষ্য, বিশেষণ, সর্বনাম, ক্রিয়া ও অব্যয়।
শব্দ আর পদ এক নয়
বাক্যে ব্যবহৃত প্রতিটি অর্থবোধক শব্দকে পদ বলে। মূল কথাটি ওই “বাক্যে ব্যবহৃত” অংশে — অভিধানে পড়ে থাকা অবস্থায় সেটি কেবল শব্দ, আর বাক্যে বিভক্তি নিয়ে বসলে সেটি পদ।
বই শব্দটি একা দাঁড়িয়ে থাকলে শব্দ। কিন্তু বইটি পড়ো বাক্যে সেটি বইটি রূপে বসেছে, বাক্যে একটি ভূমিকা নিয়েছে — এখন সেটি পদ। শব্দ থেকে পদে যাওয়ার এই পথটিই ব্যাকরণের বাক্যতত্ত্ব অংশের ভিত্তি।
তাই পদ চেনা মানে শব্দটি বাক্যে কী কাজ করছে তা চেনা। একই শব্দ ভিন্ন বাক্যে ভিন্ন পদ হতে পারে, আর সেটিই এই অধ্যায়ের সবচেয়ে জরুরি উপলব্ধি।
| দিক | শব্দ | পদ |
|---|---|---|
| কোথায় | অভিধানে, একা | বাক্যে |
| বিভক্তি | নেই | থাকে বা থাকতে পারে |
| ভূমিকা | নেই | কর্তা, কর্ম, ক্রিয়া ইত্যাদি |
| উদাহরণ | বই | বইটি (বইটি পড়ো) |
- ✓ বই — শব্দ; বইটি পড়ো — এখানে বইটি পদ
- ✗ অভিধানের প্রতিটি শব্দই পদ ✓ বাক্যে বসলে তবেই পদ
পদের পাঁচ প্রকার
বাংলায় পদ পাঁচ প্রকার, আর এই পাঁচটির বাইরে কোনো পদ নেই। প্রতিটির কাজ আলাদা, তাই বাক্যে শব্দটি কী করছে দেখলেই প্রকার বলা যায়।
পাঁচ প্রকার পদ
| পদ | কী বোঝায় | উদাহরণ |
|---|---|---|
| বিশেষ্য | নাম — ব্যক্তি, বস্তু, স্থান, ভাব | রহিম, ঢাকা, বই, সৌন্দর্য |
| সর্বনাম | বিশেষ্যের পরিবর্তে বসে | আমি, তুমি, সে, এটি |
| বিশেষণ | গুণ বা অবস্থা বোঝায় | ভালো, লাল, দ্রুত |
| ক্রিয়া | কাজ বোঝায় | যায়, পড়ছি, করবে |
| অব্যয় | সম্পর্ক বা সংযোগ | এবং, কিন্তু, ও, আহা |
- ✓ রহিম ভালো ছেলে — রহিম বিশেষ্য, ভালো বিশেষণ, ছেলে বিশেষ্য
- ✓ সে এবং আমি যাব — সে ও আমি সর্বনাম, এবং অব্যয়, যাব ক্রিয়া
সব্যয় ও অব্যয় পদ
বিভক্তি যুক্ত হয় কি না, তার ভিত্তিতে পদকে আরেকভাবে দুই ভাগে দেখা হয়। যেসব পদের রূপ বিভক্তি বা কাল-পুরুষ অনুযায়ী বদলায়, তাদের বলে সব্যয় পদ। আর যাদের রূপ কখনো বদলায় না, তাদের বলে অব্যয় পদ।
বিশেষ্য, সর্বনাম ও ক্রিয়া সব্যয় — ছেলে থেকে ছেলেকে, আমি থেকে আমাকে, করি থেকে করব। বিশেষণও সীমিতভাবে বদলায়। কিন্তু এবং, কিন্তু, আহা কোনো অবস্থাতেই বদলায় না, তাই অব্যয়।
| শ্রেণি | রূপ বদলায়? | পদ |
|---|---|---|
| সব্যয় | হ্যাঁ | বিশেষ্য, সর্বনাম, ক্রিয়া |
| অব্যয় | না | অব্যয় পদ |
- ✓ ছেলে → ছেলেকে → ছেলেদের — সব্যয়
- ✓ এবং → এবং → এবং — অব্যয়, রূপ অপরিবর্তিত
একই শব্দ ভিন্ন বাক্যে ভিন্ন পদ
পদ নির্ণয়ের সবচেয়ে বড় শিক্ষা এটাই — শব্দটি দেখে পদ বলা যায় না, বাক্যে তার কাজ দেখে বলতে হয়। ভালো শব্দটি কখনো বিশেষণ, কখনো বিশেষ্য, কখনো ক্রিয়াবিশেষণ।
ভালো ছেলে — এখানে ভালো ছেলের গুণ বোঝাচ্ছে, তাই বিশেষণ। ভালোর জয় হোক — এখানে ভালো নিজেই একটি সত্তা, তাই বিশেষ্য। ভালো করে পড়ো — এখানে ভালো ক্রিয়াকে বিশেষিত করছে, তাই ক্রিয়াবিশেষণ।
পরীক্ষায় ঠিক এই ধরনের প্রশ্নই আসে: একটি বাক্য দিয়ে বলা হয় নির্দিষ্ট শব্দটি কোন পদ। উত্তর দেওয়ার আগে শব্দটি বাক্যে কী কাজ করছে, সেই প্রশ্নটি করতেই হবে।
| বাক্য | শব্দ | পদ |
|---|---|---|
| ভালো ছেলে পড়ে | ভালো | বিশেষণ |
| ভালোর জয় হোক | ভালো | বিশেষ্য |
| ভালো করে পড়ো | ভালো | ক্রিয়াবিশেষণ |
| সে দ্রুত চলে | দ্রুত | ক্রিয়াবিশেষণ |
| দ্রুত গাড়িটি এল | দ্রুত | বিশেষণ |
- ✓ বাক্যে কাজ দেখে পদ নির্ণয় করতে হয়
- ✗ “ভালো” সব সময় বিশেষণ ✓ বাক্যভেদে বিশেষ্য বা ক্রিয়াবিশেষণও হতে পারে
পদ নির্ণয়ের ধাপ
একটি শব্দের পদ নির্ণয় করতে তিনটি প্রশ্ন পরপর করলেই উত্তর মেলে। প্রথমে দেখো শব্দটি কোনো কাজ বোঝাচ্ছে কি না — বোঝালে সেটি ক্রিয়া। না হলে দেখো এটি কোনো নাম কি না — হলে বিশেষ্য, আর নামের বদলে বসলে সর্বনাম।
তারপরও না মিললে দেখো শব্দটি অন্য কোনো পদকে বিশেষিত করছে কি না — করলে বিশেষণ। আর কিছুই না হলে, শব্দটি যদি কেবল সংযোগ বা আবেগ প্রকাশ করে, তবে সেটি অব্যয়।
- ধাপ ১ — কাজ বোঝাচ্ছে? → ক্রিয়া।
- ধাপ ২ — নাম? → বিশেষ্য; নামের বদলে? → সর্বনাম।
- ধাপ ৩ — বিশেষিত করছে? → বিশেষণ।
- কিছুই না হলে → অব্যয়।
- ✓ তিনি ধীরে হাঁটেন — তিনি সর্বনাম, ধীরে ক্রিয়াবিশেষণ, হাঁটেন ক্রিয়া
- ✓ আহা, কী সুন্দর! — আহা অব্যয়, সুন্দর বিশেষণ
পরীক্ষায় কী আসে
পদ অধ্যায় থেকে প্রশ্ন প্রায় সব সময় দুই রকম — পদের প্রকারভেদ ও উদাহরণ, অথবা একটি বাক্যের প্রতিটি শব্দের পদ নির্ণয়। দ্বিতীয়টি বেশি নম্বরের এবং সেখানেই সতর্কতা দরকার।
সবচেয়ে বেশি ভুল হয় বিশেষণ ও ক্রিয়াবিশেষণ আলাদা করতে গিয়ে। মনে রাখার সূত্র: বিশেষ্যকে বিশেষিত করলে বিশেষণ, ক্রিয়াকে বিশেষিত করলে ক্রিয়াবিশেষণ। দ্রুত গাড়ি — গাড়ি বিশেষ্য, তাই বিশেষণ; দ্রুত চলে — চলে ক্রিয়া, তাই ক্রিয়াবিশেষণ।
দ্বিতীয় সতর্কতা শব্দ ও পদের পার্থক্য নিয়ে। সংজ্ঞা লিখতে বললে “বাক্যে ব্যবহৃত” কথাটি বাদ দিয়ো না — ওই তিনটি শব্দই সংজ্ঞাটিকে সম্পূর্ণ করে।
- বিশেষ্যকে বিশেষিত → বিশেষণ; ক্রিয়াকে → ক্রিয়াবিশেষণ।
- সংজ্ঞায় “বাক্যে ব্যবহৃত” কথাটি বাধ্যতামূলক।
- একই শব্দ বাক্যভেদে ভিন্ন পদ — কাজ দেখে ঠিক করো।
- ✗ পদ মানে অর্থবোধক শব্দ ✓ পদ মানে বাক্যে ব্যবহৃত অর্থবোধক শব্দ
বিস্তারিত আলোচনা
শব্দ আর পদ এক জিনিস নয়। অভিধানে যা থাকে সেটি শব্দ, আর সেই শব্দ যখন বিভক্তি নিয়ে বাক্যের ভেতরে বসে তখন সেটি পদ হয়। "বই" একটি শব্দ, কিন্তু "বইটি টেবিলে আছে" বাক্যে "বইটি" একটি পদ। বাক্যের বাইরে কোনো পদ থাকতে পারে না — এই সূত্রটিই শব্দ ও পদের মূল পার্থক্য।
পদকে দুই বড় ভাগে ভাগ করা হয়। সব্যয় পদের রূপ বদলায় অর্থাৎ বিভক্তি নেয় — বিশেষ্য, বিশেষণ, সর্বনাম ও ক্রিয়া এই দলে পড়ে। অব্যয় পদের রূপ কখনো বদলায় না, লিঙ্গ-বচন-পুরুষ কোনো কারণেই নয়। এ কারণেই "অব্যয়" নামটি — যার ব্যয় বা পরিবর্তন নেই।
পদ নির্ণয় করতে হলে শব্দটি বাক্যে কী কাজ করছে সেটি দেখতে হয়, শব্দটি নিজে কী তা নয়। একই শব্দ ভিন্ন বাক্যে ভিন্ন পদ হতে পারে — "সে ভালো ছেলে" বাক্যে "ভালো" বিশেষণ, কিন্তু "ভালোর কোনো শেষ নেই" বাক্যে "ভালো" বিশেষ্য। তাই পদ নির্ণয়ের সময় বাক্যটি পুরোটা পড়া অপরিহার্য।
মনে রাখার কথা
শব্দ অভিধানের বস্তু, আর পদ বাক্যের বস্তু — এই পার্থক্যটি ধরতে পারলে পদ প্রকরণ সহজ হয়ে যায়।
সাধারণ ভুল
পরীক্ষায় এই ভুলগুলোই সবচেয়ে বেশি নম্বর কাটে। ভুল রূপটি দেখে নিলে নিজের লেখায় ধরা সহজ হয়।
- ✗ অভিধানের প্রতিটি শব্দই পদ। ✓ বাক্যে ব্যবহৃত হলে তবেই শব্দ পদে পরিণত হয়।
- ✗ “ভালো” সব সময় বিশেষণ। ✓ বাক্যভেদে বিশেষ্য বা ক্রিয়াবিশেষণও হতে পারে।
- ✗ বাংলায় পদ চার প্রকার। ✓ পাঁচ প্রকার — বিশেষ্য, সর্বনাম, বিশেষণ, ক্রিয়া ও অব্যয়।
- ✗ অব্যয় পদের রূপ বিভক্তিতে বদলায়। ✓ অব্যয়ের রূপ কখনো বদলায় না — সে কারণেই নাম অব্যয়।
অনুশীলন
নিচের প্রশ্নগুলোর উত্তর নিজে লেখো, তারপর মিলিয়ে নাও।
- পদ কাকে বলে?
- শব্দ ও পদের পার্থক্য কী?
- পদ কত প্রকার ও কী কী?
- সব্যয় ও অব্যয় পদ বলতে কী বোঝ?
- “ভালো” শব্দটি তিন রকম পদ হতে পারে — উদাহরণসহ দেখাও।
- বিশেষণ ও ক্রিয়াবিশেষণ আলাদা করবে কীভাবে?
- পদ নির্ণয়ের তিনটি ধাপ কী?
- অব্যয় পদকে অব্যয় বলা হয় কেন?
উত্তর
- বাক্যে ব্যবহৃত প্রতিটি অর্থবোধক শব্দকে পদ বলে। বাক্যের বাইরে সেটি কেবল শব্দ।
- শব্দ অভিধানে একা থাকে, তার কোনো বাক্যভূমিকা নেই; পদ বাক্যে বসে এবং কর্তা, কর্ম বা ক্রিয়ার মতো একটি ভূমিকা নেয়।
- পাঁচ প্রকার — বিশেষ্য, সর্বনাম, বিশেষণ, ক্রিয়া ও অব্যয়।
- যেসব পদের রূপ বিভক্তি বা কাল-পুরুষে বদলায় তারা সব্যয় (বিশেষ্য, সর্বনাম, ক্রিয়া); যাদের রূপ কখনো বদলায় না তারা অব্যয়।
- ভালো ছেলে (বিশেষণ), ভালোর জয় হোক (বিশেষ্য), ভালো করে পড়ো (ক্রিয়াবিশেষণ)।
- বিশেষ্যকে বিশেষিত করলে বিশেষণ, আর ক্রিয়াকে বিশেষিত করলে ক্রিয়াবিশেষণ — দ্রুত গাড়ি বনাম দ্রুত চলে।
- এক, কাজ বোঝাচ্ছে কি না (ক্রিয়া); দুই, নাম বা নামের বদলে বসছে কি না (বিশেষ্য বা সর্বনাম); তিন, অন্য পদকে বিশেষিত করছে কি না (বিশেষণ)। কিছুই না হলে অব্যয়।
- কারণ এর রূপ কখনো বদলায় না — বিভক্তি, কাল বা পুরুষ কোনো কিছুতেই নয়। “এবং” সব বাক্যে “এবং”-ই থাকে, যেখানে বিশেষ্য বা ক্রিয়ার রূপ বদলে যায়।
উপযোগী শ্রেণি: নবম, দশম, একাদশ, দ্বাদশ শ্রেণি।
সচরাচর জিজ্ঞাসা
বিভক্তিযুক্ত হয়ে বাক্যে ব্যবহৃত শব্দকে পদ বলে। বাক্যের বাইরে কোনো শব্দ পদ হতে পারে না — এটিই শব্দ ও পদের মূল পার্থক্য।
পাঁচ প্রকার — বিশেষ্য, বিশেষণ, সর্বনাম, ক্রিয়া ও অব্যয়। প্রথম চারটি সব্যয় পদ, অর্থাৎ এদের রূপ বদলায়; অব্যয়ের রূপ বদলায় না।
হ্যাঁ, বাক্যে কাজ অনুযায়ী বদলায়। "সে ভালো ছেলে" বাক্যে ভালো বিশেষণ, আর "ভালোর শেষ নেই" বাক্যে ভালো বিশেষ্য।
পারে, এবং এটিই পদ নির্ণয়ের মূল কথা। “ভালো ছেলে”-তে ভালো বিশেষণ, “ভালোর জয় হোক”-এ বিশেষ্য, আর “ভালো করে পড়ো”-তে ক্রিয়াবিশেষণ। শব্দ দেখে নয়, বাক্যে তার কাজ দেখে পদ ঠিক করতে হয়।
আরও বাংলা ব্যাকরণ পড়ো
বাংলা ব্যাকরণ-এর পূর্ণ তালিকা ও বাংলা লেখার অন্যান্য অংশ এক জায়গায়।
আমাদের সাথে যুক্ত থাকো
পড়াশোনার আপডেট, সাজেশন ও প্রশ্নোত্তর সবার আগে পেতে আমাদের ফেসবুক পেজ ও গ্রুপে যুক্ত হও।






















