বিশেষণ পদ — প্রকারভেদ ও উদাহরণ
বিশেষণ পদের সংজ্ঞা, নাম-বিশেষণ ও ভাব-বিশেষণের পার্থক্য এবং বিশেষণের বিশেষণ।
সংজ্ঞা
যে পদ বিশেষ্য, সর্বনাম বা ক্রিয়ার দোষ, গুণ, অবস্থা, সংখ্যা বা পরিমাণ প্রকাশ করে, তাকে বিশেষণ পদ বলে।
যে পদ অন্য পদকে বিশেষিত করে
যে পদ বিশেষ্য, সর্বনাম, ক্রিয়া বা অন্য বিশেষণের দোষ, গুণ, অবস্থা, সংখ্যা বা পরিমাণ প্রকাশ করে, তাকে বিশেষণ পদ বলে। ভালো ছেলে — এখানে ভালো ছেলের গুণ বোঝাচ্ছে, তাই সেটি বিশেষণ।
বিশেষণের বৈশিষ্ট্য হলো এটি একা দাঁড়াতে চায় না — কাউকে না কাউকে বিশেষিত করতেই বসে। বিশেষণ যাকে বিশেষিত করে তাকে বলা হয় বিশেষ্য বা বিশেষ্যস্থানীয় পদ।
বাংলায় বিশেষণ সাধারণত বিশেষ্যের আগে বসে — লাল ফুল, দ্রুত গাড়ি। তবে বিধেয় বিশেষণ হিসেবে ক্রিয়ার পরেও বসতে পারে — ফুলটি লাল, ছেলেটি ভালো।
- বিশেষণ একা দাঁড়ায় না — কাউকে বিশেষিত করে।
- সাধারণত বিশেষ্যের আগে বসে।
- বিধেয় বিশেষণ ক্রিয়ার পরেও বসে।
- ✓ লাল ফুল — লাল বিশেষণ
- ✓ ফুলটি লাল — বিধেয় বিশেষণ
বিশেষণের দুই প্রধান ভাগ
বিশেষণ কাকে বিশেষিত করছে, তার ভিত্তিতে দুই প্রধান ভাগ। বিশেষ্য বা সর্বনামকে বিশেষিত করলে নাম-বিশেষণ, আর ক্রিয়া বা অন্য বিশেষণকে বিশেষিত করলে ভাব-বিশেষণ।
দ্রুত গাড়িটি এল — এখানে দ্রুত গাড়িকে বিশেষিত করছে, তাই নাম-বিশেষণ। গাড়িটি দ্রুত চলে — এখানে দ্রুত চলাকে বিশেষিত করছে, তাই ভাব-বিশেষণ বা ক্রিয়াবিশেষণ। একই শব্দ, দুই ভূমিকা।
বিশেষণের দুই ভাগ
| ভাগ | কাকে বিশেষিত করে | উদাহরণ |
|---|---|---|
| নাম-বিশেষণ | বিশেষ্য বা সর্বনাম | ভালো ছেলে, লাল ফুল |
| ভাব-বিশেষণ | ক্রিয়া | দ্রুত চলে, ধীরে বলো |
| ভাব-বিশেষণ | অন্য বিশেষণ | অতি সুন্দর, খুব ভালো |
| ভাব-বিশেষণ | অব্যয় | ঠিক তখনই |
- ✓ দ্রুত গাড়ি — নাম-বিশেষণ
- ✓ দ্রুত চলে — ভাব-বিশেষণ
নাম-বিশেষণের প্রকারভেদ
নাম-বিশেষণ কী ধরনের তথ্য দিচ্ছে তার ভিত্তিতে কয়েক ভাগে ভাগ করা হয়। ভাগগুলো পরীক্ষায় উদাহরণসহ জিজ্ঞাসা করা হয়, তাই ছকটি মনে রাখা কাজে দেয়।
| প্রকার | কী বোঝায় | উদাহরণ |
|---|---|---|
| গুণবাচক | দোষ বা গুণ | ভালো ছেলে, মন্দ কাজ |
| রূপবাচক | রং বা আকৃতি | লাল ফুল, গোল টেবিল |
| অবস্থাবাচক | অবস্থা | ভাঙা ঘর, শুকনো পাতা |
| সংখ্যাবাচক | সংখ্যা | পাঁচটি বই, দ্বিতীয় স্থান |
| পরিমাণবাচক | পরিমাণ | অনেক পানি, সামান্য চিনি |
| ভাববাচক | ভাব | সুন্দর দৃশ্য, ভয়ংকর ঘটনা |
- ✓ ভাঙা ঘর — অবস্থাবাচক বিশেষণ
- ✓ অনেক পানি — পরিমাণবাচক বিশেষণ
বিশেষণের অতিশায়ন
তুলনা বোঝাতে বিশেষণের রূপ বদলায় — একে বলে অতিশায়ন। বাংলায় তিনটি স্তর: সাধারণ, তুলনামূলক ও অতিশায়ন। ভালো, ভালোতর, ভালোতম — তবে বাংলায় সংস্কৃত ধারার এই রূপ কম ব্যবহৃত হয়।
বাংলায় তুলনা সাধারণত আলাদা শব্দ দিয়ে বোঝানো হয় — চেয়ে, থেকে, সবচেয়ে। রহিম করিমের চেয়ে ভালো, সে সবচেয়ে ভালো — এই গঠনই স্বাভাবিক।
তৎসম শব্দে অবশ্য সংস্কৃত রূপ টিকে আছে — গুরু, গরীয়ান, গরিষ্ঠ; শ্রেষ্ঠ, জ্যেষ্ঠ, কনিষ্ঠ। এগুলো পরীক্ষায় আসে, তাই আলাদা করে মনে রাখা দরকার।
| সাধারণ | তুলনামূলক | অতিশায়ন |
|---|---|---|
| গুরু | গরীয়ান | গরিষ্ঠ |
| লঘু | লঘীয়ান | লঘিষ্ঠ |
| বৃদ্ধ | বর্ষীয়ান | বর্ষিষ্ঠ |
| ভালো | ভালোতর | ভালোতম |
- ✓ রহিম করিমের চেয়ে ভালো — বাংলা ধারা
- ✓ সে সবচেয়ে ভালো — অতিশায়ন, বাংলা ধারা
বিশেষণ বনাম বিশেষ্য — একই শব্দ দুই পদ
অনেক শব্দ প্রসঙ্গভেদে বিশেষণ বা বিশেষ্য হয়ে যায়, আর পদ নির্ণয়ের প্রশ্নে ঠিক এখানেই ভুল হয়। শব্দটি কাউকে বিশেষিত করছে, নাকি নিজেই একটি সত্তা হয়ে দাঁড়িয়েছে — এই প্রশ্নেই ফয়সালা।
সুন্দর দৃশ্য — সুন্দর দৃশ্যকে বিশেষিত করছে, তাই বিশেষণ। সুন্দরের পূজারি — সুন্দর এখানে নিজেই একটি ভাব, তাই বিশেষ্য। ভালো, মন্দ, সত্য, মিথ্যা — সব কটিতেই একই দ্বৈততা।
| বাক্য | শব্দ | পদ |
|---|---|---|
| সুন্দর দৃশ্য | সুন্দর | বিশেষণ |
| সুন্দরের পূজারি | সুন্দর | বিশেষ্য |
| সত্য কথা বলো | সত্য | বিশেষণ |
| সত্যের জয় হয় | সত্য | বিশেষ্য |
- ✓ বিশেষিত করছে → বিশেষণ
- ✓ নিজেই সত্তা → বিশেষ্য
পরীক্ষায় কী আসে
বিশেষণ অধ্যায় থেকে প্রশ্ন সাধারণত তিন রকম — সংজ্ঞা ও প্রকারভেদ, বাক্য থেকে বিশেষণ চিহ্নিত করা, আর একটি শব্দ কোন প্রকারের বিশেষণ তা নির্ণয়।
সবচেয়ে বেশি ভুল হয় নাম-বিশেষণ ও ভাব-বিশেষণ আলাদা করতে গিয়ে। সূত্রটি সহজ: বিশেষ্যকে বিশেষিত করলে নাম-বিশেষণ, ক্রিয়াকে করলে ভাব-বিশেষণ। বাক্যে শব্দটির ঠিক পরে বা আগে কী আছে দেখলেই বোঝা যায়।
দ্বিতীয় ফাঁদ বিশেষণ ও বিশেষ্যের দ্বৈততা নিয়ে। ভালোর জয় হোক বাক্যে ভালো বিশেষণ নয়, বিশেষ্য — কারণ এটি কাউকে বিশেষিত করছে না, নিজেই কর্তা হয়ে বসেছে।
- বিশেষ্যকে → নাম-বিশেষণ; ক্রিয়াকে → ভাব-বিশেষণ।
- কাউকে বিশেষিত না করলে সেটি বিশেষ্য।
- অতিশায়নের তৎসম রূপগুলো আলাদা করে মনে রাখো।
- ✗ “ভালোর জয় হোক” — ভালো বিশেষণ ✓ এখানে ভালো বিশেষ্য
- ✗ “দ্রুত চলে” — দ্রুত নাম-বিশেষণ ✓ ক্রিয়াকে বিশেষিত করছে, তাই ভাব-বিশেষণ
বিশেষণের অবস্থান ও অর্থের বদল
বাংলায় বিশেষণ সাধারণত বিশেষ্যের ঠিক আগে বসে, আর এই অবস্থানটি বদলালে অর্থও বদলে যেতে পারে। একমাত্র ছেলে আর ছেলে একমাত্র — দুটি বাক্যের ভার আলাদা।
একাধিক বিশেষণ পাশাপাশি বসলে ক্রমটিও অর্থ বহন করে। বড় লাল বাড়ি আর লাল বড় বাড়ি — প্রথমটি স্বাভাবিক শোনায়, কারণ বাংলায় আকারবাচক বিশেষণ রংবাচকের আগে বসে। নিয়মটি লেখা নেই, কিন্তু ভাষাভাষীরা মেনে চলেন।
বিধেয় বিশেষণে অবস্থান সম্পূর্ণ আলাদা — সেটি ক্রিয়ার পরে বসে এবং কর্তার সম্পর্কে কিছু জানায়। ফুলটি লাল বাক্যে লাল বিশেষ্যের আগে নেই, তবু সেটি বিশেষণ।
| ধরন | অবস্থান | উদাহরণ |
|---|---|---|
| সাধারণ বিশেষণ | বিশেষ্যের আগে | লাল ফুল, ভালো ছেলে |
| বিধেয় বিশেষণ | ক্রিয়ার পরে | ফুলটি লাল, ছেলেটি ভালো |
| একাধিক বিশেষণ | আকার → রং → গুণ | বড় লাল সুন্দর বাড়ি |
- ✓ বড় লাল বাড়ি — আকার আগে, রং পরে
- ✗ লাল বড় বাড়ি ✓ বড় লাল বাড়ি — বাংলার স্বাভাবিক ক্রম
বিস্তারিত আলোচনা
বিশেষণের কাজ অন্য পদকে বিশেষিত করা, অর্থাৎ তার সম্পর্কে বাড়তি তথ্য দেওয়া। যাকে বিশেষিত করা হয় তাকে বলে বিশেষ্য বা বিশেষ্যস্থানীয় পদ। "সুন্দর ফুল" বললে "ফুল" বিশেষ্য আর "সুন্দর" বিশেষণ। বিশেষণ কেবল বিশেষ্যের নয়, সর্বনাম ও ক্রিয়ারও হতে পারে।
বিশেষণকে প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করা হয়। নাম-বিশেষণ বিশেষ্য বা সর্বনামকে বিশেষিত করে — নীল আকাশ, দশটি বই, সৎ লোক, অনেক পানি। এর ভেতরেই আছে গুণবাচক (ভালো, মন্দ), অবস্থাবাচক (ভেজা, শুকনো), সংখ্যাবাচক (তিন, দশম) ও পরিমাণবাচক (অনেক, সামান্য) বিশেষণ।
ভাব-বিশেষণ ক্রিয়া, বিশেষণ বা অব্যয়কে বিশেষিত করে। "সে দ্রুত হাঁটে" বাক্যে "দ্রুত" ক্রিয়াবিশেষণ। আবার "অত্যন্ত সুন্দর" বললে "অত্যন্ত" বিশেষণের বিশেষণ। বাংলায় একই শব্দ প্রসঙ্গভেদে বিশেষ্য বা বিশেষণ হতে পারে, তাই পদ নির্ণয়ের সময় সেটি কাকে বিশেষিত করছে সেটিই দেখার বিষয়।
মনে রাখার কথা
বিশেষণ কাকে বিশেষিত করছে সেটি খুঁজে বের করলেই তার প্রকারভেদ নির্ণয় করা সহজ হয়ে যায়।
সাধারণ ভুল
পরীক্ষায় এই ভুলগুলোই সবচেয়ে বেশি নম্বর কাটে। ভুল রূপটি দেখে নিলে নিজের লেখায় ধরা সহজ হয়।
- ✗ “ভালোর জয় হোক” — ভালো বিশেষণ। ✓ এখানে ভালো বিশেষ্য — এটি নিজেই কর্তা।
- ✗ “দ্রুত চলে” — দ্রুত নাম-বিশেষণ। ✓ ভাব-বিশেষণ — ক্রিয়াকে বিশেষিত করছে।
- ✗ বিশেষণ সব সময় বিশেষ্যের আগে বসে। ✓ বিধেয় বিশেষণ ক্রিয়ার পরেও বসে — ফুলটি লাল।
- ✗ বিশেষণ কেবল বিশেষ্যকে বিশেষিত করে। ✓ সর্বনাম, ক্রিয়া ও অন্য বিশেষণকেও করে।
অনুশীলন
নিচের প্রশ্নগুলোর উত্তর নিজে লেখো, তারপর মিলিয়ে নাও।
- বিশেষণ পদ কাকে বলে?
- নাম-বিশেষণ ও ভাব-বিশেষণের পার্থক্য কী?
- নাম-বিশেষণের চারটি প্রকার লেখো।
- অতিশায়ন কী? একটি তৎসম উদাহরণ দাও।
- বাংলায় তুলনা সাধারণত কীভাবে বোঝানো হয়?
- “সত্যের জয় হয়” — এখানে “সত্য” কোন পদ?
- বিধেয় বিশেষণ কাকে বলে?
- একাধিক বিশেষণ পাশাপাশি বসলে ক্রম কেমন হয়?
উত্তর
- যে পদ বিশেষ্য, সর্বনাম, ক্রিয়া বা অন্য বিশেষণের দোষ, গুণ, অবস্থা, সংখ্যা বা পরিমাণ প্রকাশ করে, তাকে বিশেষণ পদ বলে।
- নাম-বিশেষণ বিশেষ্য বা সর্বনামকে বিশেষিত করে (দ্রুত গাড়ি), আর ভাব-বিশেষণ ক্রিয়া বা অন্য বিশেষণকে (দ্রুত চলে, অতি সুন্দর)।
- গুণবাচক (ভালো), রূপবাচক (লাল), অবস্থাবাচক (ভাঙা) ও সংখ্যাবাচক (পাঁচটি)।
- তুলনা বোঝাতে বিশেষণের রূপভেদকে অতিশায়ন বলে — যেমন গুরু, গরীয়ান, গরিষ্ঠ।
- আলাদা শব্দ দিয়ে — চেয়ে, থেকে, সবচেয়ে। যেমন “রহিম করিমের চেয়ে ভালো”, “সে সবচেয়ে ভালো”।
- বিশেষ্য। এটি কাউকে বিশেষিত করছে না, নিজেই একটি সত্তা হয়ে বসেছে।
- যে বিশেষণ বিশেষ্যের আগে না বসে ক্রিয়ার পরে বসে — যেমন “ফুলটি লাল”, “ছেলেটি ভালো”।
- বাংলায় আকারবাচক বিশেষণ রংবাচকের আগে বসে — “বড় লাল বাড়ি” স্বাভাবিক, “লাল বড় বাড়ি” নয়। নিয়মটি লেখা নেই, কিন্তু ভাষাভাষীরা মেনে চলেন।
উপযোগী শ্রেণি: নবম, দশম, একাদশ, দ্বাদশ শ্রেণি।
সচরাচর জিজ্ঞাসা
যে পদ বিশেষ্য, সর্বনাম বা ক্রিয়ার দোষ, গুণ, অবস্থা, সংখ্যা বা পরিমাণ প্রকাশ করে, তাকে বিশেষণ পদ বলে — যেমন সুন্দর ফুল।
নাম-বিশেষণ বিশেষ্য বা সর্বনামকে বিশেষিত করে (নীল আকাশ); ভাব-বিশেষণ ক্রিয়া, বিশেষণ বা অব্যয়কে বিশেষিত করে (দ্রুত হাঁটে)।
হ্যাঁ, হয়। "অত্যন্ত সুন্দর" বললে "অত্যন্ত" শব্দটি "সুন্দর" বিশেষণকেই বিশেষিত করছে, তাই এটি বিশেষণের বিশেষণ।
শব্দটি কাকে বিশেষিত করছে দেখো। বিশেষ্যকে করলে নাম-বিশেষণ — “দ্রুত গাড়ি”। ক্রিয়াকে করলে ভাব-বিশেষণ বা ক্রিয়াবিশেষণ — “দ্রুত চলে”। একই শব্দ, দুই ভূমিকা।
আরও বাংলা ব্যাকরণ পড়ো
বাংলা ব্যাকরণ-এর পূর্ণ তালিকা ও বাংলা লেখার অন্যান্য অংশ এক জায়গায়।
আমাদের সাথে যুক্ত থাকো
পড়াশোনার আপডেট, সাজেশন ও প্রশ্নোত্তর সবার আগে পেতে আমাদের ফেসবুক পেজ ও গ্রুপে যুক্ত হও।






















