পুরুষ — উত্তম, মধ্যম ও নাম পুরুষ
পুরুষের সংজ্ঞা, তিন প্রকারভেদ, মধ্যম পুরুষের তিন স্তর এবং ক্রিয়ার রূপভেদ।
সংজ্ঞা
বক্তা, শ্রোতা ও অন্য কারও মধ্যে সম্পর্ক বোঝাতে সর্বনাম ও ক্রিয়ার যে রূপভেদ হয়, তাকে পুরুষ বলে। বাংলায় পুরুষ তিন প্রকার।
কে বলছে, কাকে বলছে, কার কথা
বক্তা, শ্রোতা ও আলোচ্য ব্যক্তি — এই তিনটি সম্পর্ক প্রকাশ করতে সর্বনাম ও ক্রিয়ার যে রূপভেদ হয়, তাকে পুরুষ বলে। বাংলায় পুরুষ তিন প্রকার, আর তিনটি চেনার প্রশ্নও তিনটি: কে বলছে, কাকে বলছে, কার কথা বলা হচ্ছে।
যিনি বলছেন তিনি উত্তম পুরুষ — আমি, আমরা। যাকে বলা হচ্ছে তিনি মধ্যম পুরুষ — তুমি, তোমরা, তুই, আপনি। আর যার সম্পর্কে বলা হচ্ছে তিনি নাম পুরুষ — সে, তারা, তিনি, রহিম, বইটি।
ইংরেজিতে এদের বলা হয় first, second ও third person। বাংলায় নাম দুটি আলাদা হলেও ধারণাটি এক, তবে বাংলার মধ্যম পুরুষে সম্মানের স্তর আছে — যা ইংরেজিতে নেই।
তিন পুরুষ
| পুরুষ | কে | সর্বনাম |
|---|---|---|
| উত্তম পুরুষ | বক্তা নিজে | আমি, আমরা, মোরা |
| মধ্যম পুরুষ | শ্রোতা | তুমি, তোমরা, তুই, তোরা, আপনি |
| নাম পুরুষ | অন্য কেউ বা কিছু | সে, তারা, তিনি, এটি, রহিম |
- ✓ আমি যাব — উত্তম পুরুষ
- ✓ তুমি যাবে — মধ্যম পুরুষ
- ✓ সে যাবে — নাম পুরুষ
মধ্যম পুরুষের তিন স্তর
বাংলার একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো মধ্যম পুরুষে সম্মানের স্তরভেদ। একই “তুমি” বোঝাতে তিনটি আলাদা সর্বনাম আছে, আর প্রতিটির সঙ্গে ক্রিয়ার রূপও বদলায়।
তুই তুচ্ছার্থক বা ঘনিষ্ঠ — ছোট ভাইবোন, খুব কাছের বন্ধু। তুমি সাধারণ ও স্নেহসূচক। আপনি সম্ভ্রমার্থক — শিক্ষক, বয়োজ্যেষ্ঠ, অপরিচিত ব্যক্তি। ভুল স্তর ব্যবহার করলে ব্যাকরণ ঠিক থাকলেও সৌজন্য নষ্ট হয়।
| স্তর | সর্বনাম | ক্রিয়ারূপ | কার সঙ্গে |
|---|---|---|---|
| তুচ্ছার্থক | তুই, তোরা | তুই করিস | ছোট বা ঘনিষ্ঠ |
| সাধারণ | তুমি, তোমরা | তুমি করো | সমবয়সী, স্নেহভাজন |
| সম্ভ্রমার্থক | আপনি, আপনারা | আপনি করেন | গুরুজন, অপরিচিত |
- ✓ তুই কোথায় যাস? — তুচ্ছার্থক
- ✓ আপনি কোথায় যান? — সম্ভ্রমার্থক
- ✗ স্যার, তুমি কোথায় যাও? ✓ স্যার, আপনি কোথায় যান?
পুরুষভেদে ক্রিয়ার রূপ বদলায়
বাংলায় লিঙ্গভেদে ক্রিয়ার রূপ বদলায় না, কিন্তু পুরুষভেদে বদলায়। এটিই বাংলা ক্রিয়ারূপের প্রধান নিয়ন্ত্রক, আর ক্রিয়ার রূপ দেখেই বলা যায় বাক্যের কর্তা কোন পুরুষ।
নিচের ছকে একই ধাতুর ছয়টি রূপ দেখানো হলো। লক্ষ করো, আপনি ও তিনি — দুটির ক্রিয়ারূপ এক, কারণ দুটিই সম্ভ্রমার্থক। এই মিলটিই মাঝে মাঝে বিভ্রান্তি তৈরি করে।
√কর্ ধাতুর বর্তমান কালের রূপ
| পুরুষ | সর্বনাম | ক্রিয়ারূপ |
|---|---|---|
| উত্তম | আমি | করি |
| মধ্যম (তুচ্ছ) | তুই | করিস |
| মধ্যম (সাধারণ) | তুমি | করো |
| মধ্যম (সম্ভ্রম) | আপনি | করেন |
| নাম (সাধারণ) | সে | করে |
| নাম (সম্ভ্রম) | তিনি | করেন |
- ✓ আমি করি / তুমি করো / সে করে — তিন পুরুষ, তিন রূপ
- ✗ তুমি করেন ✓ তুমি করো — স্তর মেলেনি
নাম পুরুষ সবচেয়ে বিস্তৃত
উত্তম ও মধ্যম পুরুষে কেবল সর্বনাম বসে, কিন্তু নাম পুরুষে বসতে পারে যেকোনো বিশেষ্য। রহিম আসছে, বইটি পড়ে আছে, নদীটি শুকিয়ে গেছে — তিনটিতেই কর্তা নাম পুরুষ, যদিও কোনোটিতেই সর্বনাম নেই।
এ কারণেই বাংলা বাক্যের বেশির ভাগ কর্তা নাম পুরুষ। প্রশ্নে যদি বলা হয় বাক্যের কর্তা কোন পুরুষ, আর কর্তা একটি নাম বা বস্তু হয়, তবে উত্তর নাম পুরুষ — এটি প্রায় নিশ্চিত।
নাম পুরুষেও সম্ভ্রমের স্তর আছে। সে সাধারণ, তিনি সম্ভ্রমার্থক — এবং সেই অনুযায়ী ক্রিয়ার রূপও বদলায়: সে করে, তিনি করেন।
- নাম পুরুষে যেকোনো বিশেষ্য বসতে পারে।
- বাংলা বাক্যের বেশির ভাগ কর্তা নাম পুরুষ।
- সে সাধারণ, তিনি সম্ভ্রমার্থক।
- ✓ রহিম আসছে — নাম পুরুষ
- ✓ বইটি পড়ে আছে — নাম পুরুষ
- ✓ তিনি এসেছেন — নাম পুরুষ, সম্ভ্রমার্থক
উক্তি পরিবর্তনে পুরুষ বদলায়
প্রত্যক্ষ উক্তি থেকে পরোক্ষ উক্তিতে যাওয়ার সময় সবচেয়ে আগে যা বদলায় তা হলো সর্বনামের পুরুষ। নিয়মটি নির্দিষ্ট: উত্তম পুরুষ বদলে হয় বক্তার পুরুষ অনুযায়ী, মধ্যম পুরুষ বদলে হয় শ্রোতার অনুযায়ী, আর নাম পুরুষ অপরিবর্তিত থাকে।
রহিম বলল, “আমি যাব।” → রহিম বলল যে সে যাবে। এখানে আমি (উত্তম) বদলে সে (নাম) হয়েছে, কারণ বক্তা রহিম নাম পুরুষ। এই একটি নিয়ম জানা থাকলে উক্তি পরিবর্তনের অর্ধেক কাজ হয়ে যায়।
| প্রত্যক্ষ | পরোক্ষ | যা বদলাল |
|---|---|---|
| রহিম বলল, “আমি যাব।” | রহিম বলল যে সে যাবে। | উত্তম → নাম |
| সে বলল, “তুমি এসো।” | সে আমাকে আসতে বলল। | মধ্যম → উত্তম |
| তিনি বললেন, “রহিম ভালো।” | তিনি বললেন যে রহিম ভালো। | নাম অপরিবর্তিত |
- ✓ নাম পুরুষ উক্তি পরিবর্তনে বদলায় না
- ✗ রহিম বলল যে আমি যাব ✓ রহিম বলল যে সে যাবে
পরীক্ষায় কী আসে
পুরুষ অধ্যায় থেকে প্রশ্ন সাধারণত তিন রকম — সংজ্ঞা ও প্রকারভেদ, বাক্যের কর্তা কোন পুরুষ তা নির্ণয়, আর ক্রিয়ার রূপ ঠিক করা। তিনটিই সরাসরি প্রশ্ন, ব্যাখ্যা লিখতে হয় না।
সবচেয়ে বেশি ভুল হয় আপনি ও তিনি নিয়ে। দুটির ক্রিয়ারূপ এক (করেন), তাই অনেকে একই পুরুষ ভেবে ফেলে। কিন্তু আপনি শ্রোতা, তাই মধ্যম পুরুষ; আর তিনি আলোচ্য ব্যক্তি, তাই নাম পুরুষ। কাকে বলা হচ্ছে — এই প্রশ্নেই পার্থক্য ধরা পড়ে।
দ্বিতীয় ভুল ক্রিয়ার স্তর মেলাতে গিয়ে। তুমি করেন বা আপনি করো — দুটিই অশুদ্ধ। সর্বনাম যে স্তরের, ক্রিয়াও সেই স্তরের হতে হবে।
- আপনি মধ্যম পুরুষ, তিনি নাম পুরুষ — ক্রিয়ারূপ এক হলেও।
- সর্বনামের স্তর ও ক্রিয়ার স্তর মিলতে হবে।
- কর্তা কোনো নাম বা বস্তু হলে সেটি নাম পুরুষ।
- ✗ আপনি নাম পুরুষ ✓ আপনি মধ্যম পুরুষ — শ্রোতা
- ✗ তুমি করেন ✓ তুমি করো
বিস্তারিত আলোচনা
উত্তম পুরুষ বলতে বক্তা নিজে — আমি, আমরা, মোরা। মধ্যম পুরুষ বলতে শ্রোতা অর্থাৎ যাকে বলা হচ্ছে — তুমি, তোমরা, তুই, তোরা, আপনি, আপনারা। আর নাম পুরুষ বলতে বক্তা ও শ্রোতা ছাড়া তৃতীয় কেউ বা কিছু — সে, তারা, তিনি, তাঁরা, এটি, ওগুলো।
বাংলায় মধ্যম পুরুষের তিনটি স্তর আছে, যা অন্য অনেক ভাষায় নেই। সাধারণ বা সম্ভ্রমাত্মক রূপ "আপনি", স্বাভাবিক রূপ "তুমি", আর তুচ্ছার্থক বা ঘনিষ্ঠ রূপ "তুই"। কোন রূপ ব্যবহৃত হবে তা বক্তা ও শ্রোতার সম্পর্ক ও বয়সের ওপর নির্ভর করে, এবং ক্রিয়ার রূপও সেই অনুযায়ী বদলায়।
পুরুষ অনুযায়ী ক্রিয়ার রূপ বদলায় বলে এটি ব্যাকরণে গুরুত্বপূর্ণ। "আমি যাই", "তুমি যাও", "তুই যা", "আপনি যান", "সে যায়" — একই ধাতুর পাঁচটি ভিন্ন রূপ। বাক্যে কর্তা ও ক্রিয়ার এই সামঞ্জস্য না থাকলে বাক্যটি অশুদ্ধ হয়ে যায়, যেমন "আমি যায়" লেখা ভুল।
মনে রাখার কথা
কর্তা যে পুরুষের, ক্রিয়াকেও সেই পুরুষের রূপ নিতে হবে — নইলে বাক্য অশুদ্ধ।
সাধারণ ভুল
পরীক্ষায় এই ভুলগুলোই সবচেয়ে বেশি নম্বর কাটে। ভুল রূপটি দেখে নিলে নিজের লেখায় ধরা সহজ হয়।
- ✗ “আপনি” নাম পুরুষ। ✓ “আপনি” মধ্যম পুরুষ — শ্রোতাকে বোঝায়।
- ✗ তুমি করেন / আপনি করো ✓ তুমি করো / আপনি করেন — স্তর মিলতে হবে।
- ✗ বাংলায় পুরুষভেদে ক্রিয়ার রূপ বদলায় না। ✓ বদলায় — আমি করি, তুমি করো, সে করে।
- ✗ উক্তি পরিবর্তনে নাম পুরুষ বদলায়। ✓ নাম পুরুষ অপরিবর্তিত থাকে।
অনুশীলন
নিচের প্রশ্নগুলোর উত্তর নিজে লেখো, তারপর মিলিয়ে নাও।
- পুরুষ কাকে বলে ও কত প্রকার?
- “আপনি” ও “তিনি” — দুটি কোন পুরুষ?
- মধ্যম পুরুষের তিনটি স্তর কী কী?
- √কর্ ধাতুর বর্তমান কালে তিন পুরুষের রূপ লেখো।
- উক্তি পরিবর্তনে কোন পুরুষ অপরিবর্তিত থাকে?
- “বইটি পড়ে আছে” — কর্তা কোন পুরুষ?
- বাংলায় লিঙ্গ নয়, পুরুষ ক্রিয়ার রূপ নিয়ন্ত্রণ করে — ব্যাখ্যা করো।
উত্তর
- বক্তা, শ্রোতা ও আলোচ্য ব্যক্তির সম্পর্ক প্রকাশে সর্বনাম ও ক্রিয়ার রূপভেদকে পুরুষ বলে। বাংলায় পুরুষ তিন প্রকার — উত্তম, মধ্যম ও নাম পুরুষ।
- “আপনি” মধ্যম পুরুষ, কারণ শ্রোতাকে বোঝায়; “তিনি” নাম পুরুষ, কারণ আলোচ্য ব্যক্তিকে বোঝায়। ক্রিয়ারূপ এক হলেও পুরুষ আলাদা।
- তুচ্ছার্থক (তুই), সাধারণ (তুমি) ও সম্ভ্রমার্থক (আপনি) — প্রতিটির সঙ্গে ক্রিয়ার রূপও বদলায়।
- আমি করি (উত্তম), তুমি করো (মধ্যম), সে করে (নাম পুরুষ)।
- নাম পুরুষ। উত্তম পুরুষ বদলে হয় বক্তার পুরুষ অনুযায়ী এবং মধ্যম পুরুষ শ্রোতার অনুযায়ী।
- নাম পুরুষ। নাম পুরুষে যেকোনো বিশেষ্য বসতে পারে, সর্বনাম হওয়া জরুরি নয়।
- ছেলেটি গেল ও মেয়েটি গেল — লিঙ্গ বদলালেও ক্রিয়া একই। কিন্তু আমি করি, তুমি করো, সে করে — পুরুষ বদলালে ক্রিয়ার রূপ বদলে যায়।
উপযোগী শ্রেণি: নবম, দশম, একাদশ, দ্বাদশ শ্রেণি।
সচরাচর জিজ্ঞাসা
তিন প্রকার — উত্তম পুরুষ (আমি, আমরা), মধ্যম পুরুষ (তুমি, তুই, আপনি) এবং নাম পুরুষ (সে, তারা, তিনি)।
তিনটি — সম্ভ্রমাত্মক "আপনি", স্বাভাবিক "তুমি" এবং তুচ্ছার্থক বা ঘনিষ্ঠ "তুই"। ক্রিয়ার রূপও সেই অনুযায়ী বদলায়।
কারণ কর্তা উত্তম পুরুষ হলে ক্রিয়াকেও উত্তম পুরুষের রূপ নিতে হয়। শুদ্ধ রূপ "আমি যাই"; "যায়" নাম পুরুষের রূপ।
কারণ পুরুষ ঠিক হয় সম্পর্ক দেখে, ক্রিয়ারূপ দেখে নয়। “আপনি” বলতে শ্রোতাকে বোঝানো হয়, তাই মধ্যম পুরুষ; “তিনি” বলতে আলোচ্য ব্যক্তিকে বোঝানো হয়, তাই নাম পুরুষ। দুটিই সম্ভ্রমার্থক বলে ক্রিয়ার রূপ মিলে গেছে।
আরও বাংলা ব্যাকরণ পড়ো
বাংলা ব্যাকরণ-এর পূর্ণ তালিকা ও বাংলা লেখার অন্যান্য অংশ এক জায়গায়।
আমাদের সাথে যুক্ত থাকো
পড়াশোনার আপডেট, সাজেশন ও প্রশ্নোত্তর সবার আগে পেতে আমাদের ফেসবুক পেজ ও গ্রুপে যুক্ত হও।






















