অব্যয় পদ — চার প্রকার ও উদাহরণ
অব্যয় পদের সংজ্ঞা এবং সমুচ্চয়ী, অনন্বয়ী, অনুকার ও বিদেশি অব্যয়ের পরিচয় উদাহরণসহ।
সংজ্ঞা
যে পদের কোনো রূপ পরিবর্তন হয় না, অর্থাৎ লিঙ্গ, বচন বা পুরুষভেদে যার রূপ একই থাকে, তাকে অব্যয় পদ বলে।
যে পদের রূপ কখনো বদলায় না
যে পদের রূপ কোনো অবস্থাতেই পরিবর্তিত হয় না — লিঙ্গ, বচন, পুরুষ, কাল বা বিভক্তি কিছুতেই — তাকে অব্যয় পদ বলে। অব্যয় শব্দের অর্থই “যার ব্যয় বা ক্ষয় নেই”, অর্থাৎ যা অপরিবর্তনীয়।
এবং শব্দটি সব বাক্যে এবং-ই থাকে। কিন্তু ছেলে বদলে ছেলেকে, ছেলেদের হয়; করি বদলে করব, করেছিলাম হয়। এই অপরিবর্তনীয়তাই অব্যয়ের একমাত্র ও নির্ভুল পরিচয়।
অব্যয় বাক্যে সরাসরি কর্তা বা কর্ম হয় না — এটি অন্য পদগুলোর মধ্যে সম্পর্ক তৈরি করে, বাক্য জোড়ে, কিংবা আবেগ প্রকাশ করে। তাই অব্যয়কে বলা যায় বাক্যের সংযোগকারী।
- অব্যয়ের রূপ কখনো বদলায় না।
- বাক্যে কর্তা বা কর্ম হয় না।
- সম্পর্ক, সংযোগ বা আবেগ প্রকাশ করে।
- ✓ রাম ও শ্যাম এল — ও একটি অব্যয়
- ✓ সে গেল, কিন্তু ফিরল না — কিন্তু একটি অব্যয়
অব্যয়ের চার প্রকার
অব্যয় কী কাজ করছে তার ভিত্তিতে চার ভাগে ভাগ করা হয়। প্রতিটির কাজ আলাদা, আর পরীক্ষায় প্রকার নির্ণয়ই মূল প্রশ্ন।
অব্যয়ের চার প্রকার
| প্রকার | কাজ | উদাহরণ |
|---|---|---|
| সমুচ্চয়ী | দুই পদ বা বাক্য জোড়ে | এবং, ও, আর, কিন্তু, অথবা |
| অনন্বয়ী | আবেগ বা সম্বোধন প্রকাশ | আহা, বাহ, হায়, ওহে |
| অনুসর্গ | বিভক্তির মতো কাজ করে | দিয়ে, হতে, চেয়ে, জন্য |
| অনুকার | ধ্বনি অনুকরণ | ঝমঝম, কলকল, শনশন |
- ✓ আহা, কী সুন্দর! — অনন্বয়ী অব্যয়
- ✓ বৃষ্টি ঝমঝম পড়ছে — অনুকার অব্যয়
সমুচ্চয়ী অব্যয়ের তিন ভাগ
সমুচ্চয়ী অব্যয় সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত, আর এর ভেতরেও তিনটি উপভাগ আছে — কীভাবে জোড়া লাগাচ্ছে তার ওপর নির্ভর করে।
সংযোজক অব্যয় দুটি পদ বা বাক্যকে যোগ করে (এবং, ও, আর)। বিয়োজক অব্যয় বিকল্প বা বিচ্ছেদ বোঝায় (অথবা, কিংবা, না হয়)। আর সংকোচক অব্যয় বিরোধ বা সংকোচ বোঝায় (কিন্তু, তবু, তথাপি)।
| উপভাগ | কী বোঝায় | উদাহরণ |
|---|---|---|
| সংযোজক | যোগ | এবং, ও, আর |
| বিয়োজক | বিকল্প | অথবা, কিংবা, বা |
| সংকোচক | বিরোধ | কিন্তু, তবু, তথাপি |
- ✓ রাম ও শ্যাম — সংযোজক
- ✓ চা অথবা কফি — বিয়োজক
- ✓ সে এল, কিন্তু বসল না — সংকোচক
অনন্বয়ী অব্যয় — বাক্যের সঙ্গে অন্বয় নেই
অনন্বয়ী মানে “অন্বয় নেই এমন” — অর্থাৎ এই অব্যয়টি বাক্যের অন্য পদের সঙ্গে ব্যাকরণগত সম্পর্কে যুক্ত নয়। এটি কেবল বক্তার আবেগ, সম্মতি, সম্বোধন বা সিদ্ধান্ত প্রকাশ করে।
আহা, কী সুন্দর দৃশ্য! — এখানে আহা বাদ দিলেও বাক্যটি ব্যাকরণসম্মত থাকে, কেবল আবেগটুকু হারায়। এই বিচ্ছিন্নতাই অনন্বয়ী অব্যয়ের বৈশিষ্ট্য, আর সে কারণেই এর পরে সাধারণত কমা বসে।
| ভাব | অব্যয় | উদাহরণ |
|---|---|---|
| আনন্দ | আহা, বাহ | বাহ, চমৎকার! |
| দুঃখ | হায়, আহা | হায়, কী হলো! |
| সম্বোধন | ওহে, ওগো | ওহে, শোনো |
| সম্মতি | হ্যাঁ, বেশ | হ্যাঁ, ঠিক আছে |
| ঘৃণা | ছি, ধিক | ছি, এ কী কাজ! |
- ✓ আহা বাদ দিলেও বাক্য ব্যাকরণসম্মত থাকে
- ✓ অনন্বয়ী অব্যয়ের পরে সাধারণত কমা বসে
অনুসর্গ — অব্যয় হয়েও বিভক্তির কাজ
কিছু অব্যয় বিশেষ্য বা সর্বনামের পরে বসে ঠিক বিভক্তির মতো কাজ করে — এদের বলে অনুসর্গ বা কর্মপ্রবচনীয় অব্যয়। দিয়ে, হতে, থেকে, চেয়ে, জন্য, দ্বারা, ছাড়া, পর্যন্ত।
পার্থক্য হলো বিভক্তি শব্দের সঙ্গে জুড়ে যায় (ছেলেকে), কিন্তু অনুসর্গ আলাদা শব্দ হিসেবে বসে (ছেলের জন্য)। কাজ এক, অবস্থান আলাদা।
অনুসর্গ কারক নির্ণয়ে বড় ভূমিকা রাখে, কারণ কোন অনুসর্গ বসেছে তা দেখেই কারক ঠিক করা যায় — দিয়ে করণ কারক, থেকে অপাদান কারক, জন্য সম্প্রদান বা নিমিত্ত।
| অনুসর্গ | যে সম্পর্ক | উদাহরণ |
|---|---|---|
| দিয়ে / দ্বারা | করণ | কলম দিয়ে লিখি |
| থেকে / হতে | অপাদান | গাছ থেকে ফল পড়ে |
| জন্য / নিমিত্ত | নিমিত্ত | তোমার জন্য এনেছি |
| চেয়ে | তুলনা | তার চেয়ে ভালো |
| পর্যন্ত | সীমা | সকাল পর্যন্ত |
- ✓ বিভক্তি জুড়ে বসে — ছেলেকে
- ✓ অনুসর্গ আলাদা বসে — ছেলের জন্য
পরীক্ষায় কী আসে
অব্যয় অধ্যায় থেকে প্রশ্ন সাধারণত তিন রকম — সংজ্ঞা ও প্রকারভেদ, বাক্য থেকে অব্যয় চিহ্নিত করা, আর একটি অব্যয় কোন প্রকারের তা নির্ণয়।
সবচেয়ে বেশি ভুল হয় অনুসর্গকে বিভক্তি ভেবে। মনে রাখো: বিভক্তি শব্দের সঙ্গে জুড়ে যায়, অনুসর্গ আলাদা শব্দ হিসেবে বসে। ছেলেকে বিভক্তি, ছেলের জন্য অনুসর্গ।
দ্বিতীয় সতর্কতা অনুকার অব্যয় নিয়ে। ঝমঝম বা কলকল দেখে অনেকে দ্বিরুক্ত শব্দ লিখে ফেলে। দুটিই ঠিক — এগুলো ধ্বন্যাত্মক দ্বিরুক্তি এবং অনুকার অব্যয় দুই-ই, তবে প্রশ্নে যদি পদ জানতে চাওয়া হয় তবে উত্তর অব্যয়।
- বিভক্তি জুড়ে বসে, অনুসর্গ আলাদা।
- পদ জানতে চাইলে অনুকার শব্দের উত্তর অব্যয়।
- অনন্বয়ী অব্যয় বাদ দিলেও বাক্য ব্যাকরণসম্মত থাকে।
- ✗ “জন্য” একটি বিভক্তি ✓ “জন্য” একটি অনুসর্গ অব্যয়
অব্যয় বাক্যকে কী দেয়
অব্যয় নিজে কর্তা বা কর্ম হয় না, তবু অব্যয় ছাড়া ভাষা প্রায় অচল। কারণ এটি বাক্যগুলোর মধ্যে যুক্তির সম্পর্ক তৈরি করে — যোগ, বিকল্প, বিরোধ, শর্ত। সে এল এবং বসল আর সে এল কিন্তু বসল না — একটি অব্যয় বদলে পুরো অর্থ উল্টে গেল।
এ কারণেই রচনা বা প্রতিবেদনে অব্যয়ের ব্যবহার লেখার মান নির্ধারণ করে। কেবল এবং দিয়ে বাক্য জুড়ে গেলে লেখা একঘেয়ে হয়; তবে, অথচ, সুতরাং, যদিও ব্যবহার করলে যুক্তির স্তর তৈরি হয়।
অনন্বয়ী অব্যয় আবার আবেগের কাজ করে, যা সংলাপ ও গল্পে অপরিহার্য। আহা, হায়, বাহ — এই ছোট শব্দগুলোই চরিত্রের অনুভূতি ধরিয়ে দেয়, কোনো বর্ণনা ছাড়াই।
| সম্পর্ক | অব্যয় | উদাহরণ |
|---|---|---|
| যোগ | এবং, ও, আর | সে এল এবং বসল |
| বিরোধ | কিন্তু, তবে, অথচ | সে এল কিন্তু বসল না |
| কারণ | কারণ, যেহেতু | যেহেতু বৃষ্টি, তাই যাইনি |
| ফল | সুতরাং, তাই | সে পড়েনি, সুতরাং ফেল করেছে |
| শর্ত | যদি, তবে | যদি পড়ো, তবে পাশ করবে |
- ✓ একটি অব্যয় বদলে অর্থ উল্টে যায়
- ✓ যদিও, অথচ, সুতরাং — যুক্তির স্তর তৈরি করে
বিস্তারিত আলোচনা
"অব্যয়" শব্দের অর্থ যার ব্যয় বা ক্ষয় নেই। বিশেষ্য বা ক্রিয়ার মতো এদের সঙ্গে বিভক্তি যুক্ত হয়ে রূপ বদলায় না। অব্যয় বাক্যে পদ ও বাক্যের মধ্যে সংযোগ ঘটায়, বাক্যের অর্থে বিশেষ ভাব যোগ করে, কখনো আবার আবেগ প্রকাশ করে। তাই ছোট হলেও বাক্যে এদের ভূমিকা বড়।
বাংলা অব্যয় চার প্রকার। সমুচ্চয়ী অব্যয় পদ বা বাক্যকে যুক্ত করে — এবং, ও, আর, কিন্তু, অথবা, যদিও। এর ভেতর সংযোজক (ও, এবং), বিয়োজক (বা, অথবা), সংকোচক (কিন্তু, তবু) ও অন্বয়ী (যদি-তবে, যেহেতু-সেহেতু) — এই চারটি উপবিভাগ আছে।
দ্বিতীয় প্রকার অনন্বয়ী অব্যয়, যা বাক্যের সঙ্গে অন্বয় না রেখেই আবেগ, সম্মতি বা সম্বোধন প্রকাশ করে — আহা, বাহ, হায়, ওগো, হ্যাঁ। তৃতীয় প্রকার অনুকার বা ধ্বন্যাত্মক অব্যয়, যা শব্দ অনুকরণ করে — ঝমঝম, কলকল, মড়মড়। আর চতুর্থ প্রকার বিদেশি অব্যয়, যা অন্য ভাষা থেকে এসেছে — খুব, মারহাবা, বাহ, আলবত।
মনে রাখার কথা
রূপ বদলায় না — অব্যয় চেনার এই একটিমাত্র পরীক্ষাই সব প্রকারভেদের ক্ষেত্রে সমানভাবে কাজ করে।
সাধারণ ভুল
পরীক্ষায় এই ভুলগুলোই সবচেয়ে বেশি নম্বর কাটে। ভুল রূপটি দেখে নিলে নিজের লেখায় ধরা সহজ হয়।
- ✗ “জন্য” একটি বিভক্তি। ✓ এটি অনুসর্গ অব্যয় — আলাদা শব্দ হিসেবে বসে।
- ✗ অব্যয় পদের রূপ বিভক্তিতে বদলায়। ✓ অব্যয়ের রূপ কখনো বদলায় না — সে কারণেই নাম অব্যয়।
- ✗ অব্যয় বাক্যে কর্তা হতে পারে। ✓ পারে না — এটি সম্পর্ক, সংযোগ বা আবেগ প্রকাশ করে।
- ✗ “কিন্তু” একটি সংযোজক অব্যয়। ✓ সংকোচক — এটি বিরোধ বোঝায়; সংযোজক হলো এবং, ও, আর।
অনুশীলন
নিচের প্রশ্নগুলোর উত্তর নিজে লেখো, তারপর মিলিয়ে নাও।
- অব্যয় পদ কাকে বলে?
- অব্যয় কত প্রকার ও কী কী?
- সমুচ্চয়ী অব্যয়ের তিনটি উপভাগ লেখো।
- অনন্বয়ী অব্যয়কে “অনন্বয়ী” বলা হয় কেন?
- অনুসর্গ ও বিভক্তির পার্থক্য কী?
- পাঁচটি অনুসর্গের নাম লেখো।
- “ছি, এ কী কাজ!” — এখানে “ছি” কোন অব্যয়?
উত্তর
- যে পদের রূপ লিঙ্গ, বচন, পুরুষ, কাল বা বিভক্তি কিছুতেই বদলায় না, তাকে অব্যয় পদ বলে।
- চার প্রকার — সমুচ্চয়ী, অনন্বয়ী, অনুসর্গ ও অনুকার অব্যয়।
- সংযোজক (এবং, ও), বিয়োজক (অথবা, কিংবা) ও সংকোচক (কিন্তু, তবু)।
- কারণ এটি বাক্যের অন্য পদের সঙ্গে ব্যাকরণগত সম্পর্কে যুক্ত নয় — বাদ দিলেও বাক্য ব্যাকরণসম্মত থাকে, কেবল আবেগটুকু হারায়।
- বিভক্তি শব্দের সঙ্গে জুড়ে বসে (ছেলেকে), আর অনুসর্গ আলাদা শব্দ হিসেবে বসে (ছেলের জন্য) — কাজ এক, অবস্থান আলাদা।
- দিয়ে, থেকে, জন্য, চেয়ে ও পর্যন্ত।
- অনন্বয়ী অব্যয়, ঘৃণা প্রকাশ করছে।
উপযোগী শ্রেণি: নবম, দশম, একাদশ, দ্বাদশ শ্রেণি।
সচরাচর জিজ্ঞাসা
যে পদের রূপ লিঙ্গ, বচন বা পুরুষভেদে কখনো পরিবর্তিত হয় না, তাকে অব্যয় পদ বলে — যেমন এবং, কিন্তু, আহা, ঝমঝম।
চার প্রকার — সমুচ্চয়ী, অনন্বয়ী, অনুকার বা ধ্বন্যাত্মক এবং বিদেশি অব্যয়। প্রতিটির কাজ বাক্যে আলাদা।
যে অব্যয় বাক্যের অন্য পদের সঙ্গে অন্বয় না রেখেই আবেগ, সম্মতি বা সম্বোধন প্রকাশ করে — যেমন আহা, বাহ, হায়, ওগো।
একই শব্দকে দুই দিক থেকে দেখা। “ঝমঝম” গঠনের দিক থেকে ধ্বন্যাত্মক দ্বিরুক্তি, আর পদ হিসেবে অনুকার অব্যয়। প্রশ্নে পদ জানতে চাইলে উত্তর অব্যয়, আর দ্বিরুক্তির প্রকার জানতে চাইলে ধ্বন্যাত্মক।
আরও বাংলা ব্যাকরণ পড়ো
বাংলা ব্যাকরণ-এর পূর্ণ তালিকা ও বাংলা লেখার অন্যান্য অংশ এক জায়গায়।
আমাদের সাথে যুক্ত থাকো
পড়াশোনার আপডেট, সাজেশন ও প্রশ্নোত্তর সবার আগে পেতে আমাদের ফেসবুক পেজ ও গ্রুপে যুক্ত হও।






















