ক্রিয়াপদ — সকর্মক, অকর্মক ও প্রকারভেদ
ক্রিয়াপদের সংজ্ঞা, সকর্মক-অকর্মক-দ্বিকর্মক ভেদ এবং সমাপিকা ও অসমাপিকা ক্রিয়ার পার্থক্য।
সংজ্ঞা
যে পদ দ্বারা কোনো কাজ করা বা হওয়া বোঝায়, তাকে ক্রিয়াপদ বলে। ক্রিয়াপদ ছাড়া কোনো বাক্য সম্পূর্ণ হয় না।
যে পদ কাজ বোঝায়
যে পদ দ্বারা কোনো কাজ করা বা হওয়া বোঝায়, তাকে ক্রিয়াপদ বলে। সে বই পড়ে — এখানে পড়ে একটি কাজ বোঝাচ্ছে, তাই সেটি ক্রিয়াপদ।
ক্রিয়াপদ ছাড়া বাক্য সম্পূর্ণ হয় না। রহিম বই — এটি কোনো বাক্য নয়, কারণ কী ঘটছে তা বলা হয়নি। রহিম বই পড়ে বললে তবেই বাক্যটি পূর্ণ হয়। এ কারণেই ক্রিয়াপদকে বাক্যের প্রাণ বলা হয়।
গঠনের দিক থেকে ক্রিয়াপদ = ধাতু + ক্রিয়াবিভক্তি। পড়ে শব্দে √পড়্ ধাতু আর এ বিভক্তি। ধাতু অপরিবর্তিত থাকে, বিভক্তি কাল ও পুরুষ অনুযায়ী বদলায়।
- ক্রিয়াপদ কাজ করা বা হওয়া বোঝায়।
- ক্রিয়াপদ ছাড়া বাক্য সম্পূর্ণ হয় না।
- ক্রিয়াপদ = ধাতু + ক্রিয়াবিভক্তি।
- ✓ সে বই পড়ে — পড়ে ক্রিয়াপদ
- ✗ রহিম বই ✓ রহিম বই পড়ে — ক্রিয়া ছাড়া বাক্য অসম্পূর্ণ
কর্মের ভিত্তিতে ক্রিয়ার প্রকার
ক্রিয়ার সঙ্গে কর্ম আছে কি না, তার ভিত্তিতে ক্রিয়াপদকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়। যাচাইয়ের সহজ উপায়: ক্রিয়াকে কী বা কাকে প্রশ্ন করো — উত্তর পেলে কর্ম আছে।
কর্ম অনুযায়ী ক্রিয়া
| প্রকার | কর্ম | উদাহরণ |
|---|---|---|
| সকর্মক | একটি কর্ম আছে | সে বই পড়ে (কী পড়ে? বই) |
| অকর্মক | কোনো কর্ম নেই | সে ঘুমায় (কী ঘুমায়? উত্তর নেই) |
| দ্বিকর্মক | দুটি কর্ম আছে | তিনি আমাকে বই দিলেন |
- ✓ সে ভাত খায় — কী খায়? ভাত → সকর্মক
- ✓ শিশুটি হাসে — কী হাসে? উত্তর নেই → অকর্মক
- ✓ বাবা আমাকে টাকা দিলেন — দুটি কর্ম → দ্বিকর্মক
দ্বিকর্মক ক্রিয়ায় মুখ্য ও গৌণ কর্ম
দ্বিকর্মক ক্রিয়ায় দুটি কর্ম থাকে, আর তাদের মর্যাদা সমান নয়। বস্তুবাচক কর্মটিকে বলে মুখ্য কর্ম, আর ব্যক্তিবাচক কর্মটিকে গৌণ কর্ম।
বাবা আমাকে টাকা দিলেন — এখানে টাকা মুখ্য কর্ম (বস্তু) এবং আমাকে গৌণ কর্ম (ব্যক্তি)। লক্ষ করো, গৌণ কর্মে সাধারণত কে বিভক্তি থাকে, মুখ্য কর্মে থাকে না।
এই পার্থক্যটি কারক অধ্যায়ে কাজে লাগে, কারণ কর্মকারক নির্ণয় করতে গেলে কোনটি মুখ্য আর কোনটি গৌণ তা বলতে হয়।
| বাক্য | মুখ্য কর্ম | গৌণ কর্ম |
|---|---|---|
| বাবা আমাকে টাকা দিলেন | টাকা | আমাকে |
| শিক্ষক ছাত্রকে বই দিলেন | বই | ছাত্রকে |
| তিনি শিশুকে গল্প শোনালেন | গল্প | শিশুকে |
- ✓ বস্তু → মুখ্য কর্ম; ব্যক্তি → গৌণ কর্ম
- ✓ গৌণ কর্মে সাধারণত “কে” বিভক্তি থাকে
গঠনের ভিত্তিতে ক্রিয়ার প্রকার
ক্রিয়াপদ কীভাবে গঠিত, তার ভিত্তিতেও কয়েক ভাগে ভাগ করা হয়। সমাপিকা ও অসমাপিকা — এই জোড়াটি পরীক্ষায় সবচেয়ে বেশি আসে।
যে ক্রিয়া দিয়ে বাক্য শেষ হয়, তাকে সমাপিকা ক্রিয়া বলে; আর যে ক্রিয়ায় বাক্য শেষ হয় না, বরং পরের অংশের অপেক্ষায় থাকে, তাকে অসমাপিকা ক্রিয়া বলে। ভাত খেয়ে সে স্কুলে গেল — খেয়ে অসমাপিকা, গেল সমাপিকা।
| প্রকার | বৈশিষ্ট্য | উদাহরণ |
|---|---|---|
| সমাপিকা | বাক্য শেষ হয় | সে স্কুলে গেল |
| অসমাপিকা | বাক্য শেষ হয় না | ভাত খেয়ে…, বই পড়ে… |
| যৌগিক ক্রিয়া | দুটি ক্রিয়া মিলে এক ভাব | বলে ফেলল, দেখে নিল |
| প্রযোজক ক্রিয়া | অন্যকে দিয়ে করানো | সে আমাকে পড়ায় |
| নামধাতুর ক্রিয়া | নামশব্দ থেকে | সে ঘুমায়, বেতায় |
- ✓ ভাত খেয়ে সে স্কুলে গেল — খেয়ে অসমাপিকা, গেল সমাপিকা
- ✓ সে বইটি পড়ে ফেলল — যৌগিক ক্রিয়া
একই ক্রিয়া সকর্মক ও অকর্মক দুটোই হতে পারে
ক্রিয়াপদটি দেখে সকর্মক না অকর্মক বলা যায় না — বাক্যে কর্ম আছে কি না দেখতে হয়। একই ক্রিয়া এক বাক্যে সকর্মক, অন্য বাক্যে অকর্মক হতে পারে।
সে ভাত খায় — কর্ম আছে, তাই সকর্মক। সে ভালো খায় — এখানে ভালো কর্ম নয়, ক্রিয়াবিশেষণ; কী খায় বলা হয়নি, তাই ক্রিয়াটি অকর্মক। একই খায়, দুই রকম ভূমিকা।
তাই পরীক্ষায় ক্রিয়ার প্রকার জিজ্ঞাসা করলে সব সময় বাক্যটি দেখে উত্তর দিতে হবে। কী বা কাকে প্রশ্ন করে উত্তর মিললে সকর্মক, না মিললে অকর্মক।
- কী বা কাকে প্রশ্ন করে উত্তর মিললে সকর্মক।
- একই ক্রিয়া বাক্যভেদে দুই রকম হতে পারে।
- ক্রিয়াবিশেষণকে কর্ম ভেবো না।
- ✓ সে ভাত খায় — সকর্মক
- ✓ সে ভালো খায় — অকর্মক — ভালো কর্ম নয়, ক্রিয়াবিশেষণ
পরীক্ষায় কী আসে
ক্রিয়াপদ অধ্যায় থেকে প্রশ্ন সাধারণত তিন রকম — সংজ্ঞা ও প্রকারভেদ, একটি বাক্যের ক্রিয়া সকর্মক না অকর্মক তা নির্ণয়, আর সমাপিকা-অসমাপিকা চিহ্নিত করা।
সবচেয়ে বেশি ভুল হয় ক্রিয়াবিশেষণকে কর্ম ভেবে। সে দ্রুত চলে বাক্যে দ্রুত কর্ম নয়; কী চলে? প্রশ্নের উত্তর দ্রুত হয় না। তাই ক্রিয়াটি অকর্মক।
দ্বিতীয় সতর্কতা অসমাপিকা নিয়ে। অসমাপিকা ক্রিয়ার শেষে সাধারণত -ে, -য়ে, -লে, -তে থাকে — খেয়ে, পড়ে, গেলে, করতে। এই রূপগুলো দেখলে বুঝতে হবে বাক্য এখানে শেষ হয়নি।
- ক্রিয়াবিশেষণ কর্ম নয় — দ্রুত, ভালো, ধীরে।
- অসমাপিকার শেষে -ে, -য়ে, -লে, -তে।
- প্রকার নির্ণয়ে সব সময় বাক্য দেখো।
- ✗ “সে দ্রুত চলে” — সকর্মক ✓ অকর্মক — দ্রুত ক্রিয়াবিশেষণ, কর্ম নয়
বিস্তারিত আলোচনা
ক্রিয়াপদ গঠিত হয় ধাতুর সঙ্গে ক্রিয়াবিভক্তি যুক্ত হয়ে। "পড়ছি" শব্দে √পড় ধাতু আর "ছি" বিভক্তি। বাক্যে ক্রিয়াপদই কর্তার কাজ, কাল ও পুরুষ একসঙ্গে জানায়, তাই একে বাক্যের প্রাণ বলা হয়। কখনো ক্রিয়াপদ উহ্য থাকতে পারে, যেমন "আমি ছাত্র" বাক্যে "হই" উহ্য।
কর্মের ভিত্তিতে ক্রিয়া দুই প্রকার। সকর্মক ক্রিয়ার একটি কর্ম থাকে — "সে ভাত খায়" বাক্যে "ভাত" কর্ম। অকর্মক ক্রিয়ার কোনো কর্ম থাকে না — "শিশুটি ঘুমায়"। কিছু ক্রিয়ার দুটি কর্ম থাকে, এদের বলে দ্বিকর্মক ক্রিয়া — "শিক্ষক ছাত্রকে বই দিলেন" বাক্যে "ছাত্রকে" গৌণ কর্ম আর "বই" মুখ্য কর্ম।
গঠন অনুসারেও ক্রিয়ার ভাগ আছে। সমাপিকা ক্রিয়া বাক্য শেষ করে — "সে বাড়ি গেল"। অসমাপিকা ক্রিয়া বাক্য শেষ করে না, আরও কিছু বলার অপেক্ষায় থাকে — "সে বাড়ি গিয়ে"। এ ছাড়া যৌগিক ক্রিয়া (বলে ফেলল), মিশ্র ক্রিয়া (স্নান করা) ও প্রযোজক ক্রিয়া (পড়ানো) আলাদা শ্রেণি হিসেবে পড়ানো হয়।
মনে রাখার কথা
কর্ম আছে কি নেই — এই একটি প্রশ্নই সকর্মক ও অকর্মক ক্রিয়া আলাদা করার সবচেয়ে নিরাপদ উপায়।
সাধারণ ভুল
পরীক্ষায় এই ভুলগুলোই সবচেয়ে বেশি নম্বর কাটে। ভুল রূপটি দেখে নিলে নিজের লেখায় ধরা সহজ হয়।
- ✗ “সে দ্রুত চলে” — সকর্মক ক্রিয়া। ✓ অকর্মক — “দ্রুত” ক্রিয়াবিশেষণ, কর্ম নয়।
- ✗ ক্রিয়াপদ দেখেই সকর্মক না অকর্মক বলা যায়। ✓ বাক্যে কর্ম আছে কি না দেখে বলতে হয়।
- ✗ দ্বিকর্মক ক্রিয়ায় দুটি কর্মের মর্যাদা সমান। ✓ বস্তুবাচকটি মুখ্য কর্ম, ব্যক্তিবাচকটি গৌণ কর্ম।
- ✗ অসমাপিকা ক্রিয়ায় বাক্য শেষ হয়। ✓ হয় না — সমাপিকা ক্রিয়ায় বাক্য শেষ হয়।
অনুশীলন
নিচের প্রশ্নগুলোর উত্তর নিজে লেখো, তারপর মিলিয়ে নাও।
- ক্রিয়াপদ কাকে বলে?
- সকর্মক ও অকর্মক ক্রিয়ার পার্থক্য কী?
- দ্বিকর্মক ক্রিয়ায় মুখ্য ও গৌণ কর্ম কী?
- সমাপিকা ও অসমাপিকা ক্রিয়া কাকে বলে?
- “ভাত খেয়ে সে স্কুলে গেল” — ক্রিয়া দুটি চিহ্নিত করো।
- একই ক্রিয়া সকর্মক ও অকর্মক দুটোই হতে পারে — উদাহরণ দাও।
- যৌগিক ক্রিয়া কাকে বলে?
- অসমাপিকা ক্রিয়ার চেহারা কেমন হয়?
- প্রযোজক ক্রিয়া কাকে বলে?
উত্তর
- যে পদ দ্বারা কোনো কাজ করা বা হওয়া বোঝায়, তাকে ক্রিয়াপদ বলে। ক্রিয়াপদ ছাড়া বাক্য সম্পূর্ণ হয় না।
- ক্রিয়াকে “কী” বা “কাকে” প্রশ্ন করে উত্তর পাওয়া গেলে সকর্মক, না পেলে অকর্মক।
- বস্তুবাচক কর্মটি মুখ্য এবং ব্যক্তিবাচক কর্মটি গৌণ — “বাবা আমাকে টাকা দিলেন”-এ টাকা মুখ্য, আমাকে গৌণ।
- যে ক্রিয়ায় বাক্য শেষ হয় তাকে সমাপিকা, আর যে ক্রিয়ায় বাক্য শেষ হয় না তাকে অসমাপিকা ক্রিয়া বলে।
- “খেয়ে” অসমাপিকা ক্রিয়া এবং “গেল” সমাপিকা ক্রিয়া।
- “সে ভাত খায়” সকর্মক, কিন্তু “সে ভালো খায়” অকর্মক — কারণ ভালো কর্ম নয়, ক্রিয়াবিশেষণ।
- দুটি ক্রিয়া মিলে যখন একটিই ভাব প্রকাশ করে — যেমন “বলে ফেলল”, “দেখে নিল”।
- শেষে সাধারণত -ে, -য়ে, -লে বা -তে থাকে — খেয়ে, পড়ে, গেলে, করতে। এই রূপগুলো দেখলে বুঝতে হবে বাক্য এখানে শেষ হয়নি।
- যে ক্রিয়ায় কর্তা নিজে কাজ না করে অন্যকে দিয়ে করান, তাকে প্রযোজক ক্রিয়া বলে — যেমন “সে আমাকে বই পড়ায়”।
উপযোগী শ্রেণি: নবম, দশম, একাদশ, দ্বাদশ শ্রেণি।
সচরাচর জিজ্ঞাসা
যে পদ দ্বারা কোনো কাজ করা বা হওয়া বোঝায়, তাকে ক্রিয়াপদ বলে। ধাতুর সঙ্গে ক্রিয়াবিভক্তি যুক্ত হয়ে ক্রিয়াপদ গঠিত হয়।
সকর্মক ক্রিয়ার কর্ম থাকে, যেমন "সে ভাত খায়"; অকর্মক ক্রিয়ার কর্ম থাকে না, যেমন "শিশুটি ঘুমায়"। ক্রিয়াকে "কী" প্রশ্ন করে যাচাই করা যায়।
যে ক্রিয়া দিয়ে বাক্যের অর্থ শেষ হয় না, আরও কিছু বলার অপেক্ষায় থাকে — যেমন "সে বাড়ি গিয়ে", "খেয়ে", "পড়ে"।
কারণ ক্রিয়াপদ ছাড়া বাক্য সম্পূর্ণ হয় না। “রহিম বই” কোনো বাক্য নয়, কারণ কী ঘটছে তা বলা হয়নি; “রহিম বই পড়ে” বললে তবেই বাক্যটি পূর্ণ অর্থ দেয়।
আরও বাংলা ব্যাকরণ পড়ো
বাংলা ব্যাকরণ-এর পূর্ণ তালিকা ও বাংলা লেখার অন্যান্য অংশ এক জায়গায়।
আমাদের সাথে যুক্ত থাকো
পড়াশোনার আপডেট, সাজেশন ও প্রশ্নোত্তর সবার আগে পেতে আমাদের ফেসবুক পেজ ও গ্রুপে যুক্ত হও।






















