বিশেষ্য পদ — ছয় প্রকার ও উদাহরণ
বিশেষ্য পদের সংজ্ঞা এবং সংজ্ঞাবাচক, জাতিবাচক, বস্তুবাচক, সমষ্টিবাচক, গুণবাচক ও ভাববাচক বিশেষ্য।
সংজ্ঞা
যে পদ দিয়ে কোনো ব্যক্তি, বস্তু, স্থান, জাতি, সমষ্টি, গুণ বা ভাবের নাম বোঝায়, তাকে বিশেষ্য পদ বলে। বিশেষ্য ছয় প্রকার।
নামবাচক পদই বিশেষ্য
যে পদ দিয়ে কোনো ব্যক্তি, বস্তু, স্থান, জাতি, সমষ্টি, কাজ, গুণ বা ভাবের নাম বোঝায়, তাকে বিশেষ্য পদ বলে। এক কথায় — নাম বোঝালেই বিশেষ্য।
নাম বলতে কেবল ব্যক্তির নাম নয়। রহিম যেমন নাম, সৌন্দর্যও তেমনি একটি ভাবের নাম; গমন একটি কাজের নাম; জনতা একটি সমষ্টির নাম। তাই বিশেষ্যের পরিধি অনেক বড়।
বাক্যে বিশেষ্য সাধারণত কর্তা বা কর্ম হয়ে বসে। রহিম বই পড়ে — এখানে রহিম কর্তা এবং বই কর্ম, দুটিই বিশেষ্য। বাক্যের কাঠামো বিশেষ্যের ওপরেই দাঁড়ায়।
- নাম বোঝালেই বিশেষ্য।
- ব্যক্তি, বস্তু, স্থান, জাতি, সমষ্টি, কাজ, গুণ, ভাব — সবের নাম।
- বাক্যে সাধারণত কর্তা বা কর্ম হিসেবে বসে।
- ✓ রহিম বই পড়ে — রহিম ও বই দুটিই বিশেষ্য
- ✓ সৌন্দর্য চিরকালীন — সৌন্দর্য একটি ভাববাচক বিশেষ্য
বিশেষ্যের ছয় প্রকার
বিশেষ্য কী ধরনের নাম বোঝাচ্ছে, তার ভিত্তিতে ছয় ভাগে ভাগ করা হয়। ভাগগুলো পরীক্ষায় সরাসরি জিজ্ঞাসা করা হয়, আর প্রতিটির চেনার সূত্রও আলাদা।
বিশেষ্যের ছয় প্রকার
| প্রকার | কী বোঝায় | উদাহরণ |
|---|---|---|
| সংজ্ঞাবাচক / নামবাচক | নির্দিষ্ট ব্যক্তি, স্থান, নদী | রহিম, ঢাকা, পদ্মা, হিমালয় |
| জাতিবাচক | পুরো জাতি বা শ্রেণি | মানুষ, গরু, নদী, পাখি |
| বস্তুবাচক / দ্রব্যবাচক | পরিমাপযোগ্য বস্তু | পানি, লোহা, সোনা, চিনি |
| সমষ্টিবাচক | একাধিকের সমষ্টি | জনতা, সভা, ঝাঁক, বহর |
| ভাববাচক | ক্রিয়ার ভাব বা কাজ | গমন, দর্শন, ভোজন, শয়ন |
| গুণবাচক | গুণ বা ধর্ম | সৌন্দর্য, মধুরতা, তারুণ্য |
- ✓ পদ্মা — সংজ্ঞাবাচক; নদী — জাতিবাচক
- ✓ ঝাঁক — সমষ্টিবাচক (পাখির ঝাঁক)
সংজ্ঞাবাচক বনাম জাতিবাচক
এই জোড়াটি সবচেয়ে বেশি গুলিয়ে যায়। পার্থক্য নির্দিষ্টতায়: সংজ্ঞাবাচক বিশেষ্য একটি নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা বস্তু বোঝায়, আর জাতিবাচক বোঝায় গোটা শ্রেণি।
পদ্মা একটি নির্দিষ্ট নদী — সংজ্ঞাবাচক। নদী সব নদীকে বোঝায় — জাতিবাচক। একইভাবে রহিম সংজ্ঞাবাচক, মানুষ জাতিবাচক; ঢাকা সংজ্ঞাবাচক, শহর জাতিবাচক।
যাচাইয়ের সহজ প্রশ্ন: শব্দটির আগে একটি বা কোনো বসানো যায় কি? একটি নদী বলা যায়, তাই জাতিবাচক। একটি পদ্মা বলা যায় না, তাই সংজ্ঞাবাচক।
| সংজ্ঞাবাচক | জাতিবাচক |
|---|---|
| রহিম | মানুষ |
| পদ্মা | নদী |
| ঢাকা | শহর |
| হিমালয় | পর্বত |
| রবীন্দ্রনাথ | কবি |
- ✓ একটি নদী — বলা যায়, তাই জাতিবাচক
- ✗ একটি পদ্মা ✓ পদ্মা সংজ্ঞাবাচক, তাই “একটি” বসে না
ভাববাচক ও গুণবাচক বিশেষ্য
ভাববাচক বিশেষ্য ক্রিয়ার ভাব বা কাজটির নাম বোঝায়। গমন, দর্শন, ভোজন, শয়ন — প্রতিটিই একটি কাজের নাম, আর প্রায় সবই ধাতু থেকে কৃৎ প্রত্যয় যোগে তৈরি।
গুণবাচক বিশেষ্য বোঝায় কোনো গুণ বা ধর্মের নাম। সৌন্দর্য, মধুরতা, তারুণ্য, মনুষ্যত্ব — এগুলো বিশেষণ থেকে তদ্ধিত প্রত্যয় যোগে তৈরি হয়েছে।
দুটিই বিমূর্ত, তাই মাঝে মাঝে গুলিয়ে যায়। পার্থক্য মনে রাখার সূত্র: কাজের নাম হলে ভাববাচক, গুণের নাম হলে গুণবাচক। দর্শন একটি কাজ, সৌন্দর্য একটি গুণ।
| প্রকার | কোথা থেকে তৈরি | উদাহরণ |
|---|---|---|
| ভাববাচক | ধাতু + কৃৎ প্রত্যয় | গমন (√গম্ + অন), দর্শন, ভোজন |
| গুণবাচক | বিশেষণ + তদ্ধিত প্রত্যয় | মধুরতা (মধুর + তা), সৌন্দর্য, তারুণ্য |
- ✓ গমন — কাজের নাম, ভাববাচক
- ✓ মধুরতা — গুণের নাম, গুণবাচক
সমষ্টিবাচক বিশেষ্যের নিজস্ব সঙ্গী
সমষ্টিবাচক বিশেষ্য একাধিক ব্যক্তি বা বস্তুর সমষ্টি বোঝায়, আর বাংলায় কোন সমষ্টির জন্য কোন শব্দ বসবে তা প্রায় বাঁধা। পাখির জন্য ঝাঁক, নৌকার জন্য বহর, মানুষের জন্য জনতা বা ভিড়।
ভুল শব্দ বসালে বাক্য অস্বাভাবিক শোনায় — পাখির বহর বা নৌকার ঝাঁক কেউ বলে না। তাই সমষ্টিবাচক শব্দ শেখা মানে জোড়াগুলো শেখা।
| সমষ্টিবাচক শব্দ | কার সমষ্টি |
|---|---|
| ঝাঁক | পাখি, মাছ |
| বহর | নৌকা, জাহাজ |
| জনতা / ভিড় | মানুষ |
| সভা / সমিতি | সদস্য |
| পাল | গরু, মেষ |
| গুচ্ছ | ফুল, চাবি |
| সারি | গাছ, মানুষ |
- ✓ পাখির ঝাঁক, নৌকার বহর, ফুলের গুচ্ছ
- ✗ পাখির বহর ✓ পাখির ঝাঁক
পরীক্ষায় কী আসে
বিশেষ্য অধ্যায় থেকে প্রশ্ন সাধারণত তিন রকম — প্রকারভেদ ও উদাহরণ, একটি শব্দ দিয়ে প্রকার নির্ণয়, আর বাক্য থেকে বিশেষ্য চিহ্নিত করা। প্রথম দুটি সবচেয়ে বেশি আসে।
সবচেয়ে বেশি ভুল হয় সংজ্ঞাবাচক ও জাতিবাচকে। একটি বসানোর পরীক্ষাটি মনে রাখলে ভুল হবে না — একটি নদী চলে, তাই জাতিবাচক; একটি পদ্মা চলে না, তাই সংজ্ঞাবাচক।
দ্বিতীয় ফাঁদ ভাববাচক ও গুণবাচক নিয়ে। কাজের নাম হলে ভাববাচক, গুণের নাম হলে গুণবাচক। দর্শন ও সৌন্দর্য — এই জোড়াটি উদাহরণ হিসেবে মনে রাখলে পার্থক্য আর ভোলা যায় না।
- একটি বসানো গেলে জাতিবাচক, না গেলে সংজ্ঞাবাচক।
- কাজের নাম → ভাববাচক; গুণের নাম → গুণবাচক।
- সমষ্টিবাচক শব্দ জোড়ায় মনে রাখো — পাখির ঝাঁক, নৌকার বহর।
- ✗ নদী একটি সংজ্ঞাবাচক বিশেষ্য ✓ নদী জাতিবাচক; পদ্মা সংজ্ঞাবাচক
- ✗ সৌন্দর্য ভাববাচক বিশেষ্য ✓ সৌন্দর্য গুণবাচক — এটি একটি গুণের নাম
বিশেষ্য কীভাবে তৈরি হয়
বিশেষ্য শুধু মৌলিক শব্দ নয় — বাংলায় বহু বিশেষ্য প্রত্যয় যোগে তৈরি, আর কোন প্রত্যয় কোন ধরনের বিশেষ্য গড়ে তা জানা থাকলে প্রকার নির্ণয়ও সহজ হয়ে যায়।
ভাববাচক বিশেষ্য আসে ধাতু থেকে কৃৎ প্রত্যয় যোগে — √গম্ + অন = গমন, √দৃশ্ + অন = দর্শন। এই কারণেই ভাববাচক বিশেষ্য প্রায় সব সময় একটি কাজ বোঝায়, কারণ তার উৎসই ক্রিয়ামূল।
গুণবাচক বিশেষ্য আসে বিশেষণ থেকে তদ্ধিত প্রত্যয় যোগে — মধুর + তা = মধুরতা, সুন্দর + য = সৌন্দর্য, তরুণ + য = তারুণ্য। উৎস বিশেষণ বলেই এরা গুণ বোঝায়।
| উৎস | প্রত্যয় | গঠিত বিশেষ্য | প্রকার |
|---|---|---|---|
| √গম্ | অন | গমন | ভাববাচক |
| √ভুজ্ | অন | ভোজন | ভাববাচক |
| মধুর | তা | মধুরতা | গুণবাচক |
| সুন্দর | য | সৌন্দর্য | গুণবাচক |
| মনুষ্য | ত্ব | মনুষ্যত্ব | গুণবাচক |
- ✓ ধাতু + কৃৎ প্রত্যয় → ভাববাচক বিশেষ্য
- ✓ বিশেষণ + তদ্ধিত প্রত্যয় → গুণবাচক বিশেষ্য
বিস্তারিত আলোচনা
বিশেষ্য পদ বাক্যে নাম বোঝায়, তাই একে নামপদও বলা হয়। ছয় প্রকারের প্রথমটি সংজ্ঞাবাচক বা নামবাচক বিশেষ্য — নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তি, স্থান বা বস্তুর নাম, যেমন রবীন্দ্রনাথ, ঢাকা, পদ্মা। দ্বিতীয়টি জাতিবাচক বিশেষ্য, যা একটি গোটা জাতি বা শ্রেণিকে বোঝায় — মানুষ, পাখি, গরু, নদী।
তৃতীয়টি বস্তুবাচক বা দ্রব্যবাচক বিশেষ্য, যা মাপা বা ওজন করা যায় এমন বস্তু বোঝায় — পানি, লোহা, চিনি, দুধ। চতুর্থটি সমষ্টিবাচক বিশেষ্য, যা একই জাতীয় বহু কিছুর সমষ্টি বোঝায় — সভা, জনতা, বহর, ঝাঁক, শ্রেণি। এই দুটিকে পরীক্ষায় প্রায়ই গুলিয়ে ফেলা হয়, তাই উদাহরণ দিয়ে আলাদা করে মনে রাখা ভালো।
পঞ্চম প্রকার গুণবাচক বিশেষ্য, যা কোনো গুণ বা অবস্থার নাম বোঝায় — সততা, তারুণ্য, মধুরতা, সৌন্দর্য। আর ষষ্ঠ প্রকার ভাববাচক বা ক্রিয়াবাচক বিশেষ্য, যা কাজের নাম বোঝায় — গমন, দর্শন, শয়ন, পড়া, খাওয়া। গুণবাচক ও ভাববাচক বিশেষ্য বিমূর্ত, তাই এদের ছুঁয়ে দেখা যায় না।
মনে রাখার কথা
নামবাচক নির্দিষ্ট একজনকে বোঝায়, জাতিবাচক গোটা শ্রেণিকে — এই দুইয়ের ফারাক সবচেয়ে বেশি পরীক্ষায় আসে।
সাধারণ ভুল
পরীক্ষায় এই ভুলগুলোই সবচেয়ে বেশি নম্বর কাটে। ভুল রূপটি দেখে নিলে নিজের লেখায় ধরা সহজ হয়।
- ✗ “নদী” সংজ্ঞাবাচক বিশেষ্য। ✓ জাতিবাচক — “পদ্মা” সংজ্ঞাবাচক।
- ✗ “সৌন্দর্য” ভাববাচক বিশেষ্য। ✓ গুণবাচক — এটি একটি গুণের নাম, কাজের নয়।
- ✗ “পাখির বহর” ✓ “পাখির ঝাঁক” — সমষ্টিবাচক শব্দ জোড়া বাঁধা।
- ✗ বিশেষ্য মানে কেবল ব্যক্তির নাম। ✓ বস্তু, স্থান, জাতি, সমষ্টি, কাজ ও গুণের নামও বিশেষ্য।
অনুশীলন
নিচের প্রশ্নগুলোর উত্তর নিজে লেখো, তারপর মিলিয়ে নাও।
- বিশেষ্য পদ কাকে বলে?
- বিশেষ্য কত প্রকার ও কী কী?
- সংজ্ঞাবাচক ও জাতিবাচক আলাদা করার সহজ পরীক্ষা কী?
- ভাববাচক ও গুণবাচক বিশেষ্যের পার্থক্য কী?
- সমষ্টিবাচক বিশেষ্যের চারটি উদাহরণ দাও।
- ভাববাচক বিশেষ্য কীভাবে তৈরি হয়?
- “জনতা” ও “মানুষ” — দুটি কোন প্রকারের বিশেষ্য?
উত্তর
- যে পদ দিয়ে ব্যক্তি, বস্তু, স্থান, জাতি, সমষ্টি, কাজ, গুণ বা ভাবের নাম বোঝায়, তাকে বিশেষ্য পদ বলে।
- ছয় প্রকার — সংজ্ঞাবাচক, জাতিবাচক, বস্তুবাচক, সমষ্টিবাচক, ভাববাচক ও গুণবাচক।
- শব্দটির আগে “একটি” বসানো যায় কি না দেখো — একটি নদী চলে (জাতিবাচক), একটি পদ্মা চলে না (সংজ্ঞাবাচক)।
- ভাববাচক কাজের নাম বোঝায় (গমন, দর্শন) আর গুণবাচক গুণের নাম বোঝায় (সৌন্দর্য, মধুরতা)।
- ঝাঁক (পাখির), বহর (নৌকার), জনতা (মানুষের) ও গুচ্ছ (ফুলের)।
- সাধারণত ধাতুর সঙ্গে কৃৎ প্রত্যয় যোগে — যেমন √গম্ + অন = গমন।
- “জনতা” সমষ্টিবাচক, কারণ এটি একাধিক মানুষের সমষ্টি বোঝায়; “মানুষ” জাতিবাচক, কারণ এটি গোটা শ্রেণি বোঝায়।
উপযোগী শ্রেণি: নবম, দশম, একাদশ, দ্বাদশ শ্রেণি।
সচরাচর জিজ্ঞাসা
যে পদ দিয়ে ব্যক্তি, বস্তু, স্থান, জাতি, সমষ্টি, গুণ বা ভাবের নাম বোঝায়, তাকে বিশেষ্য পদ বলে। একে নামপদও বলা হয়।
ছয় প্রকার — সংজ্ঞাবাচক, জাতিবাচক, বস্তুবাচক, সমষ্টিবাচক, গুণবাচক এবং ভাববাচক বা ক্রিয়াবাচক বিশেষ্য। এর মধ্যে শেষ দুটি বিমূর্ত, অর্থাৎ এদের ছুঁয়ে দেখা যায় না।
গুণবাচক বিশেষ্য গুণ বা অবস্থার নাম বোঝায় যেমন সততা, সৌন্দর্য; আর ভাববাচক বিশেষ্য কাজের নাম বোঝায় যেমন গমন, পড়া, দর্শন।
না। ব্যক্তি ছাড়াও বস্তু (বই), স্থান (ঢাকা), জাতি (মানুষ), সমষ্টি (জনতা), কাজ (গমন) ও গুণের (সৌন্দর্য) নামও বিশেষ্য। নাম বোঝালেই বিশেষ্য।
আরও বাংলা ব্যাকরণ পড়ো
বাংলা ব্যাকরণ-এর পূর্ণ তালিকা ও বাংলা লেখার অন্যান্য অংশ এক জায়গায়।
আমাদের সাথে যুক্ত থাকো
পড়াশোনার আপডেট, সাজেশন ও প্রশ্নোত্তর সবার আগে পেতে আমাদের ফেসবুক পেজ ও গ্রুপে যুক্ত হও।






















