সমাস কাকে বলে — প্রকারভেদ ও ব্যাসবাক্য
সমাসের সংজ্ঞা, ছয় প্রকারভেদ, ব্যাসবাক্য ও সমস্তপদ — সমাস নির্ণয়ের নিয়মসহ।
সংজ্ঞা
পরস্পর অর্থসম্বন্ধযুক্ত দুই বা তার বেশি পদ মিলিত হয়ে যখন একটি নতুন পদ তৈরি করে, তাকে সমাস বলে। সমাসের মূল উদ্দেশ্য বাক্যকে সংক্ষিপ্ত ও শ্রুতিমধুর করা।
সমাসের তিনটি জরুরি পরিভাষা
পরস্পর সম্বন্ধযুক্ত দুই বা তার বেশি পদ মিলে যখন একটি পদে পরিণত হয়, তখন তাকে সমাস বলে। নীল আকাশ দুটি আলাদা পদ, কিন্তু নীলাকাশ একটি পদ — এই একপদীকরণই সমাস।
তিনটি নাম না জানলে সমাসের কোনো প্রশ্নের উত্তর লেখা যায় না। যে পদগুলো মিলছে তাদের বলে সমস্যমান পদ; মিলে যে নতুন পদ হলো তাকে বলে সমস্তপদ; আর সেই পদটিকে ভেঙে যে বাক্যাংশে অর্থ বোঝানো হয় তাকে বলে ব্যাসবাক্য বা বিগ্রহবাক্য।
সমস্যমান পদের মধ্যে প্রথমটিকে বলা হয় পূর্বপদ আর শেষেরটিকে পরপদ। কোন পদের অর্থ প্রধান, সেই প্রশ্নের উত্তরেই সমাসের প্রকার ঠিক হয়ে যায় — তাই এই দুটি নামও মনে রাখা দরকার।
নীলাকাশ শব্দটির বিশ্লেষণ
| পরিভাষা | কী বোঝায় | উদাহরণে |
|---|---|---|
| সমস্যমান পদ | যে পদগুলো মিলছে | নীল, আকাশ |
| পূর্বপদ | প্রথম পদ | নীল |
| পরপদ | শেষ পদ | আকাশ |
| সমস্তপদ | মিলিত নতুন পদ | নীলাকাশ |
| ব্যাসবাক্য | ভেঙে লেখা রূপ | নীল যে আকাশ |
- ✓ সিংহ চিহ্নিত আসন = সিংহাসন — ব্যাসবাক্য বাঁয়ে, সমস্তপদ ডানে
- ✗ সমস্তপদ মানে ভাঙা রূপ ✓ সমস্তপদ মানে মিলিত পদ; ভাঙা রূপ ব্যাসবাক্য
ছয় প্রকার সমাস — কোন পদের অর্থ প্রধান
সমাসের প্রকার নির্ণয়ের একটিই প্রশ্ন: সমস্তপদটিতে কোন পদের অর্থ প্রধান? উত্তরটি পেলে প্রকারও পাওয়া যায়। এই একটি ছক মুখস্থ থাকলে সমাসের বেশির ভাগ প্রশ্নের উত্তর মেলে।
অর্থপ্রাধান্য অনুযায়ী সমাস
| সমাস | কোন পদের অর্থ প্রধান | উদাহরণ |
|---|---|---|
| দ্বন্দ্ব | উভয় পদের | মাতা ও পিতা = মাতাপিতা |
| কর্মধারয় | পরপদের | নীল যে আকাশ = নীলাকাশ |
| তৎপুরুষ | পরপদের | বিপদকে আপন্ন = বিপদাপন্ন |
| বহুব্রীহি | অন্য পদের | নীল কণ্ঠ যার = নীলকণ্ঠ |
| দ্বিগু | পরপদের (সমাহার) | তিন ফলের সমাহার = ত্রিফলা |
| অব্যয়ীভাব | পূর্বপদের | মিলের অভাব = গরমিল |
- ✓ মাতাপিতা — দুটোর অর্থই আছে, তাই দ্বন্দ্ব
- ✓ নীলকণ্ঠ — নীলও নয় কণ্ঠও নয়, শিব; তাই বহুব্রীহি
কর্মধারয় ও তৎপুরুষ আলাদা করার নিয়ম
দুটিতেই পরপদের অর্থ প্রধান, তাই এই জোড়াটিই সবচেয়ে বেশি গুলিয়ে যায়। পার্থক্য পূর্বপদে। কর্মধারয়ে পূর্বপদ বিশেষণ, আর তৎপুরুষে পূর্বপদে বিভক্তি লোপ পেয়েছে।
যাচাইয়ের সহজ উপায়: ব্যাসবাক্যে যে বসলে কর্মধারয়, আর কে, দ্বারা, থেকে, জন্য, এর, এ জাতীয় বিভক্তি বসলে তৎপুরুষ। নীল যে আকাশ — কর্মধারয়। বিপদকে আপন্ন — তৎপুরুষ।
| দিক | কর্মধারয় | তৎপুরুষ |
|---|---|---|
| পূর্বপদ | বিশেষণ | বিভক্তিযুক্ত বিশেষ্য |
| ব্যাসবাক্যে | “যে” বসে | বিভক্তি বসে |
| উদাহরণ | মহৎ যে জন = মহাজন | রাজার পুত্র = রাজপুত্র |
| প্রকারভেদ | রূপক, উপমান, উপমিত | দ্বিতীয়া থেকে সপ্তমী |
- ✓ নীল যে পদ্ম = নীলপদ্ম — কর্মধারয়
- ✓ ঘোড়ার গাড়ি = ঘোড়াগাড়ি — তৎপুরুষ
- ✗ রাজপুত্র কর্মধারয় ✓ রাজপুত্র তৎপুরুষ — রাজার পুত্র
বহুব্রীহি চেনার একমাত্র সূত্র
বহুব্রীহিতে সমস্তপদটি এমন কিছু বোঝায় যা পূর্বপদেও নেই, পরপদেও নেই। নীলকণ্ঠ মানে নীল নয়, কণ্ঠও নয় — শিব। বহুব্রীহি শব্দটি নিজেই এর উদাহরণ: বহু ব্রীহি অর্থাৎ ধান আছে যার, সেই ধনী ব্যক্তি।
ব্যাসবাক্যে যার, যাতে, যাদের জাতীয় শব্দ থাকলে প্রায় নিশ্চিতভাবে বহুব্রীহি। কারণ এই শব্দগুলোই ইঙ্গিত করে যে অর্থ তৃতীয় কোনো কিছুর দিকে যাচ্ছে।
| সমস্তপদ | ব্যাসবাক্য | আসলে বোঝায় |
|---|---|---|
| নীলকণ্ঠ | নীল কণ্ঠ যার | শিব |
| দশানন | দশ আনন যার | রাবণ |
| বীণাপাণি | বীণা পাণিতে যার | সরস্বতী |
| একগুঁয়ে | এক গোঁ যার | জেদি মানুষ |
| হাতাহাতি | হাতে হাতে যে যুদ্ধ | সংঘর্ষ |
- ✓ ব্যাসবাক্যে “যার” আছে → বহুব্রীহি
- ✗ দশানন দ্বিগু সমাস ✓ দশানন বহুব্রীহি — রাবণ বোঝাচ্ছে
দ্বিগু ও অব্যয়ীভাব
দ্বিগু সমাসে পূর্বপদ সংখ্যাবাচক এবং সমস্তপদে সমাহার বা মিলন বোঝায়। ত্রিফলা মানে তিন ফলের সমাহার, শতাব্দী মানে শত অব্দের সমাহার। সংখ্যা থাকলেই দ্বিগু নয় — সমাহারের ভাব থাকতে হবে, নইলে সেটি বহুব্রীহি হয়ে যায়।
অব্যয়ীভাব সমাসে পূর্বপদ একটি অব্যয় এবং তার অর্থই প্রধান। গরমিল মানে মিলের অভাব, এখানে গর অব্যয়ের অর্থই মুখ্য। অভাব, সামীপ্য, পর্যন্ত, সাদৃশ্য — এই ভাবগুলো অব্যয়ীভাবেই প্রকাশ পায়।
| সমাস | পূর্বপদ | ভাব | উদাহরণ |
|---|---|---|---|
| দ্বিগু | সংখ্যাবাচক | সমাহার | ত্রিফলা, শতাব্দী, পঞ্চনদ |
| অব্যয়ীভাব | অব্যয় | অভাব | গরমিল, নির্ভুল |
| অব্যয়ীভাব | অব্যয় | পর্যন্ত | আকণ্ঠ, আমরণ |
| অব্যয়ীভাব | অব্যয় | সামীপ্য | উপকূল, উপনদী |
- ✓ তিন ফলের সমাহার = ত্রিফলা — দ্বিগু
- ✓ দশ আনন যার = দশানন — বহুব্রীহি — সংখ্যা আছে, তবু সমাহার নেই
- ✓ কণ্ঠ পর্যন্ত = আকণ্ঠ — অব্যয়ীভাব
সমাস ও সন্ধি এক নয়
দুটিই জোড়া লাগানোর মতো দেখতে বলে শিক্ষার্থীরা প্রায়ই গুলিয়ে ফেলে, অথচ কাজ সম্পূর্ণ আলাদা। সন্ধিতে মিলছে ধ্বনি, আর সমাসে মিলছে পদ। সেই কারণেই সন্ধি ধ্বনিতত্ত্বের বিষয় আর সমাস শব্দতত্ত্বের।
আরেকটি পার্থক্য ভাঙার নামে। সন্ধি ভাঙাকে বলে সন্ধি বিচ্ছেদ, আর সমাস ভাঙাকে বলে ব্যাসবাক্য। প্রশ্নে কোন শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে দেখলেই বোঝা যায় কী চাওয়া হচ্ছে।
একটি শব্দে সন্ধি ও সমাস দুটিই থাকতে পারে। সিংহাসন সমাসবদ্ধ পদ, আবার সিংহ + আসন মিলে ধ্বনিও জুড়েছে। তাই প্রশ্নটি ঠিক কী চাইছে তা আগে বুঝে নিতে হয়।
| দিক | সন্ধি | সমাস |
|---|---|---|
| কী মিলছে | ধ্বনি | পদ |
| শাখা | ধ্বনিতত্ত্ব | শব্দতত্ত্ব |
| ভাঙার নাম | সন্ধি বিচ্ছেদ | ব্যাসবাক্য |
| উদাহরণ | বিদ্যা + আলয় = বিদ্যালয় | নীল যে আকাশ = নীলাকাশ |
- ✗ সমাস ধ্বনিতত্ত্বের বিষয় ✓ সমাস শব্দতত্ত্বের বিষয়
- ✗ সমাস ভাঙাকে সন্ধি বিচ্ছেদ বলে ✓ সমাস ভাঙাকে ব্যাসবাক্য বলে
বিস্তারিত আলোচনা
"নীল যে আকাশ" বললে তিনটি পদ লাগে, কিন্তু "নীলাকাশ" বললে একটিতেই কাজ হয়। এই সংক্ষেপণই সমাসের কাজ। সমাসে যে পদগুলো মিলিত হয় তাদের বলে সমস্যমান পদ, মিলিত নতুন পদটিকে বলে সমস্তপদ, আর সমস্তপদকে ভেঙে যে বাক্যাংশ পাওয়া যায় তাকে বলে ব্যাসবাক্য বা সমাসবাক্য।
সমাসের দুটি অংশ থাকে — পূর্বপদ ও পরপদ বা উত্তরপদ। কোন পদটি অর্থের দিক থেকে প্রধান, তার ওপরেই সমাসের শ্রেণি নির্ভর করে। পূর্বপদ প্রধান হলে অব্যয়ীভাব, পরপদ প্রধান হলে তৎপুরুষ, উভয় পদ প্রধান হলে দ্বন্দ্ব, আর কোনো পদই প্রধান না হয়ে তৃতীয় কোনো অর্থ বোঝালে বহুব্রীহি সমাস হয়।
বাংলা সমাস প্রধানত ছয় প্রকার — দ্বন্দ্ব, কর্মধারয়, তৎপুরুষ, বহুব্রীহি, দ্বিগু ও অব্যয়ীভাব। সমাস নির্ণয়ের সবচেয়ে নিরাপদ পদ্ধতি হলো আগে ব্যাসবাক্য লেখা, তারপর দেখা কোন পদ প্রধান। ব্যাসবাক্য ছাড়া সমাস নির্ণয় করতে গেলে প্রায়ই ভুল হয়।
মনে রাখার কথা
সমাসে শব্দের সঙ্গে শব্দের মিলন, আর সন্ধিতে ধ্বনির সঙ্গে ধ্বনির — এই পার্থক্যটি সবার আগে পাকা করো।
সাধারণ ভুল
পরীক্ষায় এই ভুলগুলোই সবচেয়ে বেশি নম্বর কাটে। ভুল রূপটি দেখে নিলে নিজের লেখায় ধরা সহজ হয়।
- ✗ সমাস ধ্বনিতত্ত্বের আলোচ্য বিষয়। ✓ সমাস শব্দতত্ত্বের আলোচ্য — মিলছে পদ, ধ্বনি নয়।
- ✗ রাজপুত্র কর্মধারয় সমাস। ✓ রাজপুত্র তৎপুরুষ — ব্যাসবাক্য “রাজার পুত্র”।
- ✗ দশানন দ্বিগু সমাস। ✓ দশানন বহুব্রীহি — রাবণ বোঝাচ্ছে, সমাহার নয়।
- ✗ সমস্তপদ মানে ভাঙা রূপ। ✓ সমস্তপদ মিলিত পদ; ভাঙা রূপের নাম ব্যাসবাক্য।
অনুশীলন
নিচের প্রশ্নগুলোর উত্তর নিজে লেখো, তারপর মিলিয়ে নাও।
- সমাস কাকে বলে?
- সমস্তপদ ও ব্যাসবাক্য কী?
- সমাস কত প্রকার ও কী কী?
- কর্মধারয় ও তৎপুরুষ আলাদা করবে কীভাবে?
- বহুব্রীহি সমাস চেনার সূত্র কী?
- দ্বিগু ও বহুব্রীহি — সংখ্যা থাকলেই দ্বিগু কি?
- সন্ধি ও সমাসের পার্থক্য এক বাক্যে লেখো।
- একই শব্দে সন্ধি ও সমাস দুটিই থাকতে পারে?
উত্তর
- পরস্পর সম্বন্ধযুক্ত দুই বা তার বেশি পদ মিলে এক পদে পরিণত হলে তাকে সমাস বলে — যেমন নীল আকাশ থেকে নীলাকাশ।
- সমাসে গঠিত মিলিত পদটিকে সমস্তপদ বলে, আর সেটিকে ভেঙে অর্থ বোঝানোর বাক্যাংশকে বলে ব্যাসবাক্য বা বিগ্রহবাক্য।
- ছয় প্রকার — দ্বন্দ্ব, কর্মধারয়, তৎপুরুষ, বহুব্রীহি, দ্বিগু ও অব্যয়ীভাব।
- ব্যাসবাক্যে “যে” বসলে কর্মধারয় আর বিভক্তি (কে, দ্বারা, এর, এ) বসলে তৎপুরুষ। দুটিতেই পরপদের অর্থ প্রধান।
- সমস্তপদটি এমন কিছু বোঝায় যা পূর্বপদেও নেই পরপদেও নেই; ব্যাসবাক্যে “যার” বা “যাতে” থাকে। যেমন নীল কণ্ঠ যার = নীলকণ্ঠ অর্থাৎ শিব।
- না। দ্বিগুতে সমাহারের ভাব থাকতে হবে (তিন ফলের সমাহার = ত্রিফলা); সমাহার না থাকলে সেটি বহুব্রীহি (দশ আনন যার = দশানন)।
- সন্ধিতে ধ্বনি মিলিত হয় আর সমাসে পদ মিলিত হয়; প্রথমটি ধ্বনিতত্ত্বের, দ্বিতীয়টি শব্দতত্ত্বের বিষয়।
- পারে। “সিংহাসন” একটি সমাসবদ্ধ পদ, আবার সিংহ ও আসন মিলতে গিয়ে ধ্বনিও জুড়েছে। তাই প্রশ্নে সন্ধি বিচ্ছেদ চাওয়া হয়েছে না ব্যাসবাক্য, সেটি আগে দেখে নিতে হয়।
উপযোগী শ্রেণি: নবম, দশম, একাদশ, দ্বাদশ শ্রেণি।
সচরাচর জিজ্ঞাসা
পরস্পর অর্থসম্বন্ধযুক্ত দুই বা তার বেশি পদ মিলিত হয়ে একটি নতুন পদ গঠন করলে তাকে সমাস বলে। যেমন নীল যে আকাশ = নীলাকাশ।
প্রধানত ছয় প্রকার — দ্বন্দ্ব, কর্মধারয়, তৎপুরুষ, বহুব্রীহি, দ্বিগু ও অব্যয়ীভাব সমাস। কোন পদ প্রধান, তার ভিত্তিতেই এই ভাগ করা হয়।
সমস্তপদকে ভেঙে যে বাক্যাংশ পাওয়া যায়, তাকে ব্যাসবাক্য বা সমাসবাক্য বলে। সমাস নির্ণয়ের আগে ব্যাসবাক্য লেখা সবচেয়ে নিরাপদ পদ্ধতি।
একটিই প্রশ্ন করো — সমস্তপদে কোন পদের অর্থ প্রধান? উভয় পদের হলে দ্বন্দ্ব, পূর্বপদের হলে অব্যয়ীভাব, অন্য পদের হলে বহুব্রীহি, আর পরপদের হলে কর্মধারয়, তৎপুরুষ বা দ্বিগু।
আরও বাংলা ব্যাকরণ পড়ো
বাংলা ব্যাকরণ-এর পূর্ণ তালিকা ও বাংলা লেখার অন্যান্য অংশ এক জায়গায়।
আমাদের সাথে যুক্ত থাকো
পড়াশোনার আপডেট, সাজেশন ও প্রশ্নোত্তর সবার আগে পেতে আমাদের ফেসবুক পেজ ও গ্রুপে যুক্ত হও।






















