সম্প্রদান কারক — স্বত্ব ত্যাগ ও কর্মকারকের সঙ্গে পার্থক্য
সম্প্রদানকারকের সংজ্ঞা, স্বত্ব ত্যাগের শর্ত এবং কর্মকারকের সঙ্গে পার্থক্য উদাহরণসহ।
সংজ্ঞা
স্বত্ব ত্যাগ করে কাউকে কিছু দান করা হলে যাকে দেওয়া হয়, তাকে সম্প্রদান বলে এবং ক্রিয়ার সঙ্গে তার সম্পর্ককে সম্প্রদানকারক বলে।
স্বত্ব ত্যাগ করে যাকে দান
যাকে স্বত্ব ত্যাগ করে কিছু দান করা হয়, তাকে সম্প্রদান বলে; ক্রিয়ার সঙ্গে তার সম্পর্কই সম্প্রদান কারক। ভিক্ষুককে ভিক্ষা দাও — ভিক্ষা দেওয়ার পর সেটি আর দাতার থাকে না, তাই ভিক্ষুক সম্প্রদান কারক।
সংজ্ঞার মূল শব্দ দুটি — স্বত্ব ত্যাগ ও দান। এই দুটি ভাব না থাকলে সেটি সম্প্রদান নয়, কর্ম। উত্তরে সংজ্ঞা লিখতে বললে এই দুটি শব্দ বাদ দেওয়া চলবে না।
সম্প্রদান কারকে সাধারণত চতুর্থী বিভক্তি বসে — কে, রে। কখনো জন্য, নিমিত্ত, তরে অনুসর্গও বসে, যেমন দেশের জন্য জীবন দাও।
- দুটি ভাব লাগবেই — স্বত্ব ত্যাগ ও দান।
- বিভক্তি সাধারণত চতুর্থী (কে, রে)।
- জন্য, নিমিত্ত, তরে অনুসর্গও বসে।
- ✓ ভিক্ষুককে ভিক্ষা দাও — সম্প্রদান
- ✓ দেবতাকে অর্ঘ্য দাও — সম্প্রদান
কোন শব্দ থাকলে সম্প্রদান
বাক্যে কিছু নির্দিষ্ট শব্দ থাকলে প্রায় নিশ্চিতভাবে সম্প্রদান কারক হয়। এগুলো সবই নিঃস্বার্থ প্রদান বা শ্রদ্ধা-নিবেদনের সঙ্গে যুক্ত, তাই শব্দগুলো চিনে রাখা সবচেয়ে কাজের কৌশল।
সম্প্রদানের সংকেত-শব্দ
| শব্দ | উদাহরণ বাক্য |
|---|---|
| দান | গরিবকে দান করো |
| ভিক্ষা | ভিক্ষুককে ভিক্ষা দাও |
| পূজা | দেবতাকে পূজা দাও |
| অর্ঘ্য | দেবীকে অর্ঘ্য নিবেদন |
| উৎসর্গ | দেশের জন্য জীবন উৎসর্গ |
| শ্রদ্ধা | শহিদদের শ্রদ্ধা জানাই |
| সাহায্য | বন্যার্তকে সাহায্য দাও |
- ✓ দান, ভিক্ষা, পূজা, অর্ঘ্য → সম্প্রদান
- ✓ শহিদদের শ্রদ্ধা জানাই — সম্প্রদান
সম্প্রদান বনাম কর্ম — নির্ণায়ক পরীক্ষা
দুটিতেই কাকে প্রশ্ন এবং কে বিভক্তি, তাই আলাদা করার একটিই নির্ভরযোগ্য পরীক্ষা: জিনিসটি কি ফেরত চাওয়া যায়? যায় না মানে স্বত্ব ত্যাগ হয়েছে, তাই সম্প্রদান; যায় মানে কর্ম।
ভিক্ষুককে ভিক্ষা দাও — ভিক্ষা ফেরত চাওয়া যায় না, সম্প্রদান। রহিমকে বইটি দাও — বইটি ফেরত চাওয়া যেতে পারে, কর্ম। এই একটি প্রশ্নেই বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ফয়সালা হয়।
আরেকটি সূত্র: সম্প্রদানে দান নিঃস্বার্থ, কোনো বিনিময় নেই। বেতন, ভাড়া বা মূল্য দিলে সেটি সম্প্রদান নয় — সেখানে বিনিময় আছে, তাই কর্ম।
| বাক্য | ফেরত চাওয়া যায়? | কারক |
|---|---|---|
| ভিক্ষুককে ভিক্ষা দাও | না | সম্প্রদান |
| রহিমকে বই দাও | হ্যাঁ | কর্ম |
| শ্রমিককে মজুরি দাও | বিনিময় আছে | কর্ম |
| দেবতাকে অর্ঘ্য দাও | না | সম্প্রদান |
- ✗ শ্রমিককে মজুরি দাও — সম্প্রদান ✓ কর্ম — বিনিময় আছে
নিমিত্ত অর্থে সম্প্রদান
সম্প্রদান কারক কেবল ব্যক্তিতে সীমিত নয়। কোনো উদ্দেশ্য বা কারণের জন্য কিছু দেওয়া হলে সেটিও সম্প্রদান — একে বলা হয় নিমিত্তার্থে সম্প্রদান। দেশের জন্য জীবন উৎসর্গ, শিক্ষার জন্য অর্থ দান।
এখানে বিভক্তির বদলে অনুসর্গ বসে — জন্য, নিমিত্ত, তরে। অনুসর্গটি দেখে অনেকে করণ বা অধিকরণ ভেবে ফেলে, কিন্তু বাক্যে দানের ভাব থাকলে সেটি সম্প্রদানই।
| বাক্য | অনুসর্গ | কারক |
|---|---|---|
| দেশের জন্য জীবন দাও | জন্য | সম্প্রদান |
| শিক্ষার নিমিত্ত অর্থ দান | নিমিত্ত | সম্প্রদান |
| তোমার তরে এনেছি | তরে | সম্প্রদান |
- ✓ জন্য / নিমিত্ত / তরে + দান → সম্প্রদান
সম্প্রদান নিয়ে একটি বিতর্ক
আধুনিক ভাষাবিজ্ঞানীদের অনেকে মনে করেন বাংলায় সম্প্রদান কারক আলাদা করে রাখার দরকার নেই, কারণ এটি আসলে কর্মকারকেরই একটি বিশেষ রূপ। বিভক্তি এক, প্রশ্নও এক — কেবল অর্থে পার্থক্য।
ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ সহ কয়েকজন ব্যাকরণবিদ এই মত পোষণ করেছেন। তবু বিদ্যালয়ের পাঠ্যবইয়ে সম্প্রদান আলাদা কারক হিসেবেই পড়ানো হয়, কারণ পরীক্ষায় এটি আলাদা করে জিজ্ঞাসা করা হয়।
পরীক্ষার উত্তরে অবশ্যই প্রচলিত ছয় কারকের হিসাবই লিখতে হবে। বিতর্কটি জানা থাকলে ভালো, কিন্তু উত্তরে সেটি লেখার জায়গা নেই।
- অনেক ভাষাবিজ্ঞানী একে কর্মকারকেরই রূপ মনে করেন।
- পাঠ্যবই ও পরীক্ষায় এটি আলাদা কারক।
- উত্তরে প্রচলিত ছয় কারকের হিসাব লেখো।
- ✓ পরীক্ষায় ছয় কারকই লিখতে হবে
পরীক্ষায় কী আসে
সম্প্রদান কারক থেকে প্রশ্ন সাধারণত দুই রকম — সংজ্ঞা ও উদাহরণ, অথবা একটি বাক্যে কারক নির্ণয়। দ্বিতীয়টিতে কর্মকারকের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলাই একমাত্র বড় ঝুঁকি।
সংজ্ঞা লিখতে বললে স্বত্ব ত্যাগ কথাটি বাদ দেওয়া চলবে না। “যাকে কিছু দান করা হয়” লিখে থামলে উত্তরটি কর্মকারকের সংজ্ঞার সঙ্গে মিলে যায় এবং নম্বর কাটা যায়।
নির্ণয়ের প্রশ্নে দুটি পরীক্ষা চালাও — জিনিসটি ফেরত চাওয়া যায় কি, আর কোনো বিনিময় আছে কি। দুটিরই উত্তর “না” হলে সম্প্রদান।
- সংজ্ঞায় স্বত্ব ত্যাগ কথাটি বাধ্যতামূলক।
- ফেরত চাওয়া যায় না + বিনিময় নেই → সম্প্রদান।
- জন্য / নিমিত্ত + দান → নিমিত্তার্থে সম্প্রদান।
- ✗ সংজ্ঞা: যাকে কিছু দান করা হয় ✓ যাকে স্বত্ব ত্যাগ করে দান করা হয়
বিস্তারিত আলোচনা
সম্প্রদানকারকের মূল শর্ত হলো স্বত্ব ত্যাগ — অর্থাৎ দাতা জিনিসটির ওপর নিজের অধিকার ছেড়ে দিচ্ছেন এবং ফেরত চাইছেন না। "ভিক্ষুককে ভিক্ষা দাও" বাক্যে "ভিক্ষুককে" সম্প্রদানকারক। এখানে চতুর্থী বিভক্তি "কে" বসেছে, এবং "জন্য", "নিমিত্ত", "তরে" প্রভৃতি অনুসর্গও বসতে পারে।
সম্প্রদান ও কর্মকারকের পার্থক্যেই বেশিরভাগ ভুল হয়। দুটিতেই "কে" বিভক্তি বসে, কিন্তু কর্মে স্বত্ব ত্যাগ নেই। "শিক্ষক ছাত্রকে বই দিলেন" বাক্যে বইটি ফেরত পাওয়ার প্রশ্ন থাকলে "ছাত্রকে" গৌণ কর্ম; কিন্তু "গরিবকে বস্ত্র দান করো" বাক্যে স্বত্ব ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে, তাই "গরিবকে" সম্প্রদান।
ধর্মীয় ও সামাজিক দানের প্রসঙ্গেই সম্প্রদানকারকের উদাহরণ বেশি মেলে — "অন্ধজনে দেহ আলো", "দেশের জন্য প্রাণ দাও", "মসজিদে দান করো"। উল্লেখ্য, আধুনিক অনেক ব্যাকরণবিদ সম্প্রদানকে আলাদা কারক না ধরে কর্মকারকের অন্তর্ভুক্ত করার পক্ষে মত দেন, তবে পাঠ্যবইয়ে এটি স্বতন্ত্র কারক হিসেবেই পড়ানো হয়।
মনে রাখার কথা
স্বত্ব ত্যাগ আছে কি নেই — সম্প্রদান ও কর্মকারক আলাদা করার একমাত্র নির্ভরযোগ্য প্রশ্ন এটিই।
সাধারণ ভুল
পরীক্ষায় এই ভুলগুলোই সবচেয়ে বেশি নম্বর কাটে। ভুল রূপটি দেখে নিলে নিজের লেখায় ধরা সহজ হয়।
- ✗ “শ্রমিককে মজুরি দাও” — সম্প্রদান কারক। ✓ কর্মকারক — বিনিময় আছে, নিঃস্বার্থ দান নয়।
- ✗ সংজ্ঞায় “স্বত্ব ত্যাগ” বাদ দেওয়া। ✓ এই শব্দ দুটিই সম্প্রদানকে কর্ম থেকে আলাদা করে।
- ✗ “দেশের জন্য জীবন দাও” — করণ কারক। ✓ নিমিত্তার্থে সম্প্রদান কারক।
- ✗ সম্প্রদান কেবল ব্যক্তিতে হয়। ✓ উদ্দেশ্য বা কারণেও হয় — নিমিত্তার্থে সম্প্রদান।
অনুশীলন
নিচের প্রশ্নগুলোর উত্তর নিজে লেখো, তারপর মিলিয়ে নাও।
- সম্প্রদান কারক কাকে বলে?
- সম্প্রদান ও কর্ম আলাদা করার নির্ণায়ক পরীক্ষা কী?
- সম্প্রদান কারকে কোন বিভক্তি বসে?
- নিমিত্তার্থে সম্প্রদান কাকে বলে? উদাহরণ দাও।
- “শ্রমিককে মজুরি দাও” সম্প্রদান নয় কেন?
- সম্প্রদান কারক নিয়ে ভাষাবিজ্ঞানীদের বিতর্কটি কী?
- কোন শব্দগুলো থাকলে সম্প্রদান কারক হয়?
- সম্প্রদান কারক কি কেবল মানুষ বোঝায়?
- বিনিময় থাকলে সম্প্রদান হয় না কেন?
- সম্প্রদান কারকে অনুসর্গ কখন বসে?
- সম্প্রদান কারক চেনার দুটি পরীক্ষা কী?
- সম্প্রদান কারকে কোন শব্দগুলো সংকেত দেয়?
উত্তর
- যাকে স্বত্ব ত্যাগ করে কিছু দান করা হয় তাকে সম্প্রদান বলে, আর ক্রিয়ার সঙ্গে তার সম্পর্কই সম্প্রদান কারক।
- জিনিসটি ফেরত চাওয়া যায় কি না দেখা। যায় না মানে স্বত্ব ত্যাগ হয়েছে, তাই সম্প্রদান; যায় মানে কর্ম।
- সাধারণত চতুর্থী বিভক্তি — কে, রে। কখনো জন্য, নিমিত্ত, তরে অনুসর্গও বসে।
- কোনো উদ্দেশ্য বা কারণের জন্য কিছু দেওয়া হলে — যেমন “দেশের জন্য জীবন উৎসর্গ”।
- কারণ এখানে বিনিময় আছে — শ্রমের বিনিময়ে মজুরি। নিঃস্বার্থ দান না হলে সেটি কর্মকারক।
- অনেকে মনে করেন এটি কর্মকারকেরই একটি বিশেষ রূপ, কারণ বিভক্তি ও প্রশ্ন এক — কেবল অর্থে পার্থক্য। তবু পাঠ্যবইয়ে এটি আলাদা কারক হিসেবেই পড়ানো হয়।
- দান, ভিক্ষা, পূজা, অর্ঘ্য, উৎসর্গ, শ্রদ্ধা ও সাহায্য — এসব শব্দ নিঃস্বার্থ প্রদানের ভাব বহন করে।
- না। দেবতা (দেবতাকে অর্ঘ্য), প্রতিষ্ঠান (বিদ্যালয়ে দান) এমনকি উদ্দেশ্যও (দেশের জন্য জীবন) সম্প্রদান হতে পারে — শেষটিকে বলে নিমিত্তার্থে সম্প্রদান।
- কারণ সম্প্রদানের শর্তই নিঃস্বার্থ প্রদান। মজুরি, ভাড়া বা মূল্য দিলে সেখানে বিনিময় আছে, স্বত্ব ত্যাগ নয় — তাই সেটি কর্মকারক।
- নিমিত্তার্থে সম্প্রদানে — যেখানে ব্যক্তির বদলে উদ্দেশ্য বা কারণ থাকে। তখন “জন্য”, “নিমিত্ত” বা “তরে” বসে, যেমন “দেশের জন্য জীবন উৎসর্গ”।
- এক, জিনিসটি ফেরত চাওয়া যায় কি না; দুই, কোনো বিনিময় আছে কি না। দুটিরই উত্তর “না” হলে সেটি সম্প্রদান, নইলে কর্মকারক।
- দান, ভিক্ষা, পূজা, অর্ঘ্য, উৎসর্গ, শ্রদ্ধা ও সাহায্য — এই শব্দগুলো নিঃস্বার্থ প্রদানের ভাব বহন করে, তাই এদের উপস্থিতি প্রায় নিশ্চিতভাবে সম্প্রদান বোঝায়।
উপযোগী শ্রেণি: নবম, দশম, একাদশ, দ্বাদশ শ্রেণি।
সচরাচর জিজ্ঞাসা
স্বত্ব ত্যাগ করে কাউকে কিছু দান করা হলে যাকে দেওয়া হয়, তাকে সম্প্রদান বলে এবং ক্রিয়ার সঙ্গে তার সম্পর্ককে সম্প্রদানকারক বলে।
দুটিতেই "কে" বিভক্তি বসতে পারে, কিন্তু সম্প্রদানে স্বত্ব ত্যাগ থাকে অর্থাৎ ফেরত চাওয়া হয় না; কর্মকারকে সেই শর্ত নেই।
চতুর্থী বিভক্তি "কে" বসে, আর অনুসর্গ হিসেবে জন্য, নিমিত্ত, তরে প্রভৃতি ব্যবহৃত হয় — যেমন "দেশের জন্য প্রাণ দাও"।
“স্বত্ব ত্যাগ”। কেবল “যাকে কিছু দান করা হয়” লিখলে সেটি কর্মকারকের সংজ্ঞার সঙ্গে মিলে যায়; স্বত্ব ত্যাগের কথাটিই সম্প্রদানকে আলাদা করে।
আরও বাংলা ব্যাকরণ পড়ো
বাংলা ব্যাকরণ-এর পূর্ণ তালিকা ও বাংলা লেখার অন্যান্য অংশ এক জায়গায়।
আমাদের সাথে যুক্ত থাকো
পড়াশোনার আপডেট, সাজেশন ও প্রশ্নোত্তর সবার আগে পেতে আমাদের ফেসবুক পেজ ও গ্রুপে যুক্ত হও।






















