কারক কাকে বলে — ছয় প্রকার কারক ও নির্ণয়ের নিয়ম
কারকের সংজ্ঞা, ছয় প্রকারভেদ এবং ক্রিয়াপদকে প্রশ্ন করে কারক নির্ণয়ের নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি।
সংজ্ঞা
বাক্যস্থিত ক্রিয়াপদের সঙ্গে বিশেষ্য বা সর্বনাম পদের যে সম্পর্ক, তাকে কারক বলে। বাংলায় কারক ছয় প্রকার।
ক্রিয়ার সঙ্গে নামপদের সম্পর্ক
বাক্যস্থিত ক্রিয়াপদের সঙ্গে নামপদের যে সম্পর্ক, তাকে কারক বলে। মূল কথাটি ওই সম্পর্ক শব্দে — কারক কোনো পদ নয়, পদের সঙ্গে ক্রিয়ার সম্পর্কের নাম।
এ কারণেই একই পদ ভিন্ন বাক্যে ভিন্ন কারক হতে পারে। ছেলেটি বই পড়ে — এখানে ছেলেটি কর্তা। ছেলেটিকে ডাকো — এখানে সেই ছেলেটিই কর্ম। পদ এক, সম্পর্ক আলাদা, তাই কারকও আলাদা।
কারক নির্ণয়ের একটিই পদ্ধতি: ক্রিয়াকে প্রশ্ন করা। কে, কী, কাকে, কী দিয়ে, কোথা থেকে, কোথায় — প্রশ্নটি যার উত্তর দেয়, সেই পদটিই সেই কারক। এই প্রশ্নপদ্ধতিই ছয়টি কারক চেনার চাবি।
- কারক = ক্রিয়ার সঙ্গে নামপদের সম্পর্ক।
- একই পদ ভিন্ন বাক্যে ভিন্ন কারক।
- নির্ণয়ের পদ্ধতি — ক্রিয়াকে প্রশ্ন করো।
- ✓ ছেলেটি বই পড়ে — ছেলেটি কর্তৃকারক
- ✓ ছেলেটিকে ডাকো — ছেলেটি কর্মকারক
ছয় কারক ও তাদের প্রশ্ন
বাংলায় কারক ছয়টি, আর প্রতিটির জন্য একটি নির্দিষ্ট প্রশ্ন আছে। ছকটি মুখস্থ না করে বুঝে নিলেই যেকোনো বাক্যে কারক বের করা যায় — প্রশ্ন করো, উত্তর মিললে কারক পেয়ে গেলে।
ছয় কারক ও নির্ণায়ক প্রশ্ন
| কারক | প্রশ্ন | কী বোঝায় | উদাহরণ |
|---|---|---|---|
| কর্তৃকারক | কে? কারা? | যে কাজ করে | রহিম বই পড়ে |
| কর্মকারক | কী? কাকে? | যাকে নিয়ে কাজ | রহিম বই পড়ে |
| করণকারক | কী দিয়ে? কীসের দ্বারা? | কাজের উপায় | কলম দিয়ে লিখি |
| সম্প্রদান | কাকে? (দান অর্থে) | স্বত্ব ত্যাগ করে দান | ভিক্ষুককে ভিক্ষা দাও |
| অপাদান | কোথা থেকে? | উৎস বা বিচ্যুতি | গাছ থেকে ফল পড়ে |
| অধিকরণ | কোথায়? কখন? | স্থান, কাল, বিষয় | ঘরে আছে |
- ✓ কে পড়ে? রহিম → কর্তৃকারক
- ✓ কী পড়ে? বই → কর্মকারক
কারক ও বিভক্তি আলাদা জিনিস
পরীক্ষায় প্রায় সব সময় “কারক ও বিভক্তি নির্ণয় করো” বলা হয়, আর দুটি আলাদা করে লিখতে হয়। কারক হলো সম্পর্কের নাম, আর বিভক্তি হলো সেই সম্পর্ক প্রকাশের চিহ্ন।
রহিমকে ডাকো — এখানে কারক কর্মকারক (সম্পর্ক) এবং বিভক্তি দ্বিতীয়া বা কে (চিহ্ন)। উত্তর লিখতে হবে “কর্মকারকে দ্বিতীয়া বিভক্তি” — দুটি একসঙ্গে।
একই বিভক্তি ভিন্ন কারকে বসতে পারে, তাই বিভক্তি দেখে কারক অনুমান করা নিরাপদ নয়। কে বিভক্তি কর্মকারকেও বসে, সম্প্রদান কারকেও। অর্থ দেখে সিদ্ধান্ত নিতে হয়।
| দিক | কারক | বিভক্তি |
|---|---|---|
| কী | সম্পর্কের নাম | সম্পর্কের চিহ্ন |
| সংখ্যা | ছয়টি | সাতটি |
| উদাহরণ | কর্মকারক | দ্বিতীয়া (কে) |
| উত্তরে | দুটিই লিখতে হয় | কর্মকারকে দ্বিতীয়া বিভক্তি |
- ✗ উত্তর: দ্বিতীয়া বিভক্তি। ✓ উত্তর: কর্মকারকে দ্বিতীয়া বিভক্তি।
- ✓ “কে” বিভক্তি কর্ম ও সম্প্রদান দুটিতেই বসে
কর্ম ও সম্প্রদান — সবচেয়ে বড় ফাঁদ
দুটিতেই কাকে প্রশ্ন করা হয় এবং দুটিতেই কে বিভক্তি বসে, তাই এই জোড়াটিই সবচেয়ে বেশি গুলিয়ে যায়। পার্থক্য অর্থে: সম্প্রদানে দাতা বস্তুটির ওপর নিজের স্বত্ব ত্যাগ করেন, কর্মে করেন না।
ভিক্ষুককে ভিক্ষা দাও — ভিক্ষা দিলে সেটি আর ফেরত চাওয়া হয় না, স্বত্ব ত্যাগ হয়েছে, তাই সম্প্রদান। রহিমকে বইটি দাও — বইটি ধার দেওয়া হতে পারে, স্বত্ব ত্যাগ হয়নি, তাই কর্ম।
যাচাইয়ের সহজ প্রশ্ন: কাজটি কি নিঃস্বার্থ দান? দান, ভিক্ষা, পূজা, শ্রদ্ধা, উৎসর্গ — এই ধরনের শব্দ থাকলে প্রায় নিশ্চিতভাবে সম্প্রদান।
| বাক্য | কারক | কারণ |
|---|---|---|
| ভিক্ষুককে ভিক্ষা দাও | সম্প্রদান | স্বত্ব ত্যাগ |
| রহিমকে বইটি দাও | কর্ম | স্বত্ব ত্যাগ নয় |
| দেশের জন্য জীবন উৎসর্গ | সম্প্রদান | নিঃস্বার্থ |
| তাকে ডাকো | কর্ম | দান নয় |
- ✓ দান, ভিক্ষা, পূজা → সম্প্রদান
- ✗ রহিমকে বই দাও — সম্প্রদান ✓ কর্ম — স্বত্ব ত্যাগ হয়নি
কারক নির্ণয়ের ধাপ
কারক নির্ণয়ের একটি নির্দিষ্ট ক্রম আছে, আর সেই ক্রম মেনে চললে ভুল হওয়ার সুযোগ কমে যায়। প্রথমে বাক্যের ক্রিয়াপদটি খুঁজে বের করো — সব প্রশ্ন ওই ক্রিয়াকেই করতে হবে।
তারপর যে পদটির কারক জানতে চাওয়া হয়েছে, সেটিকে ক্রিয়ার সঙ্গে মিলিয়ে প্রশ্ন করো। শেষে বিভক্তিটি চিহ্নিত করে দুটি একসঙ্গে লেখো। বিভক্তি না থাকলে লিখতে হবে শূন্য বিভক্তি, “বিভক্তি নেই” নয়।
- ধাপ ১ — ক্রিয়াপদ খুঁজে বের করো।
- ধাপ ২ — ক্রিয়াকে প্রশ্ন করো (কে, কী, কাকে, কোথায়…)।
- ধাপ ৩ — বিভক্তি চিহ্নিত করো; না থাকলে শূন্য।
- ধাপ ৪ — কারক ও বিভক্তি একসঙ্গে লেখো।
- ✓ কলম দিয়ে লিখি → কী দিয়ে? কলম → করণকারকে তৃতীয়া বিভক্তি
- ✗ রহিম যায় — বিভক্তি নেই ✓ কর্তৃকারকে শূন্য বিভক্তি
পরীক্ষায় কী আসে
কারক অধ্যায়টি বাংলা ব্যাকরণের সবচেয়ে বেশি নম্বরের অংশ। প্রশ্ন সাধারণত দুই রকম — একটি বাক্যে নির্দিষ্ট পদের কারক ও বিভক্তি নির্ণয়, অথবা একটি কারকের সংজ্ঞা ও উদাহরণ।
প্রথম ধরনের প্রশ্নে উত্তর সব সময় দুই অংশে লিখতে হয় — কারকের নাম ও বিভক্তির নাম। কেবল একটি লিখলে অর্ধেক নম্বর কাটা যায়, আর এই ভুলটিই সবচেয়ে বেশি হয়।
দ্বিতীয় সতর্কতা কর্ম ও সম্প্রদান নিয়ে। কে বিভক্তি দেখলেই কর্ম লিখে ফেলা চলবে না — বাক্যে দান বা নিঃস্বার্থ প্রদানের ভাব আছে কি না দেখতে হবে।
- উত্তরে কারক + বিভক্তি দুটিই লেখো।
- কে দেখলেই কর্ম নয় — দান থাকলে সম্প্রদান।
- চিহ্ন না থাকলে শূন্য বিভক্তি।
- ✗ উত্তর: কর্মকারক। ✓ উত্তর: কর্মকারকে দ্বিতীয়া বিভক্তি।
বিস্তারিত আলোচনা
"কারক" শব্দের অর্থ যে করে বা যা ক্রিয়া সম্পাদনে অংশ নেয়। বাক্যের ক্রিয়াপদের সঙ্গে যেসব পদের সরাসরি সম্পর্ক আছে, সেগুলোই কারক। যে পদের সঙ্গে ক্রিয়ার কোনো সম্পর্ক নেই, সেটি কারক নয় — যেমন সম্বন্ধ পদ ও সম্বোধন পদ কারকের বাইরে থাকে, যদিও বিভক্তি নেয়।
ছয়টি কারক হলো কর্তৃকারক, কর্মকারক, করণকারক, সম্প্রদানকারক, অপাদানকারক ও অধিকরণকারক। কারক নির্ণয়ের নিয়ম একটিই — ক্রিয়াপদকে ধরে নির্দিষ্ট প্রশ্ন করা। "কে" বা "কারা" প্রশ্নে কর্তৃকারক, "কী" বা "কাকে" প্রশ্নে কর্মকারক, "কী দিয়ে" প্রশ্নে করণকারক পাওয়া যায়।
বাকি তিনটির প্রশ্নও নির্দিষ্ট। স্বত্ব ত্যাগ করে কাকে দেওয়া হলো — তাতে সম্প্রদানকারক। কোথা থেকে বা কী থেকে সরে এল — তাতে অপাদানকারক। আর কোথায়, কখন বা কীসের মধ্যে ঘটল — তাতে অধিকরণকারক। প্রশ্ন না করে কেবল বিভক্তি দেখে কারক ঠিক করতে গেলে ভুল হয়, কারণ একই বিভক্তি একাধিক কারকে বসতে পারে।
মনে রাখার কথা
ক্রিয়াপদকে ধরে নির্দিষ্ট প্রশ্নটি করো — কারক নির্ণয়ের এর চেয়ে নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি আর নেই।
সাধারণ ভুল
পরীক্ষায় এই ভুলগুলোই সবচেয়ে বেশি নম্বর কাটে। ভুল রূপটি দেখে নিলে নিজের লেখায় ধরা সহজ হয়।
- ✗ কারক ও বিভক্তি একই জিনিস। ✓ কারক সম্পর্কের নাম, বিভক্তি সেই সম্পর্কের চিহ্ন।
- ✗ “রহিমকে বই দাও” — সম্প্রদান কারক। ✓ কর্মকারক — স্বত্ব ত্যাগ হয়নি।
- ✗ উত্তরে কেবল বিভক্তির নাম লেখা। ✓ কারক ও বিভক্তি দুটিই লিখতে হয়।
- ✗ একটি পদ সব বাক্যে একই কারক। ✓ সম্পর্ক বদলালে কারকও বদলায়।
অনুশীলন
নিচের প্রশ্নগুলোর উত্তর নিজে লেখো, তারপর মিলিয়ে নাও।
- কারক কাকে বলে?
- কারক কত প্রকার ও কী কী?
- কারক নির্ণয়ের পদ্ধতি কী?
- কারক ও বিভক্তির পার্থক্য কী?
- কর্ম ও সম্প্রদান কারক আলাদা করবে কীভাবে?
- “রহিম যায়” — কারক ও বিভক্তি নির্ণয় করো।
- একই পদ ভিন্ন কারক হতে পারে — উদাহরণ দাও।
- একই বিভক্তি ভিন্ন কারকে বসতে পারে?
- কারক নির্ণয়ে প্রথম ধাপ কী?
উত্তর
- বাক্যস্থিত ক্রিয়াপদের সঙ্গে নামপদের যে সম্পর্ক, তাকে কারক বলে। কারক কোনো পদ নয়, সম্পর্কের নাম।
- ছয় প্রকার — কর্তৃ, কর্ম, করণ, সম্প্রদান, অপাদান ও অধিকরণ কারক।
- ক্রিয়াপদকে প্রশ্ন করা — কে, কী, কাকে, কী দিয়ে, কোথা থেকে, কোথায়। প্রশ্নটির উত্তর যে পদ দেয়, সেটিই সেই কারক।
- কারক ক্রিয়ার সঙ্গে পদের সম্পর্ক বোঝায়, আর বিভক্তি সেই সম্পর্ক প্রকাশের চিহ্ন। উত্তরে দুটিই লিখতে হয়।
- সম্প্রদানে দাতা বস্তুটির ওপর স্বত্ব ত্যাগ করেন (ভিক্ষুককে ভিক্ষা দাও), কর্মে করেন না (রহিমকে বই দাও)।
- কর্তৃকারকে শূন্য বিভক্তি। কোনো চিহ্ন না থাকলেও সেটি একটি বৈধ অবস্থা।
- “ছেলেটি বই পড়ে”-তে ছেলেটি কর্তৃকারক, আর “ছেলেটিকে ডাকো”-তে সেই ছেলেটিই কর্মকারক।
- পারে। “কে” বিভক্তি কর্মকারকেও বসে (রহিমকে ডাকো), সম্প্রদান কারকেও (ভিক্ষুককে ভিক্ষা দাও)। তাই বিভক্তি দেখে কারক অনুমান করা নিরাপদ নয়, অর্থ দেখতে হয়।
- বাক্যের ক্রিয়াপদটি খুঁজে বের করা, কারণ সব প্রশ্ন ওই ক্রিয়াকেই করতে হবে। ক্রিয়া না চিনলে কোনো প্রশ্নেরই সঠিক উত্তর মেলে না।
উপযোগী শ্রেণি: নবম, দশম, একাদশ, দ্বাদশ শ্রেণি।
সচরাচর জিজ্ঞাসা
বাক্যস্থিত ক্রিয়াপদের সঙ্গে বিশেষ্য বা সর্বনাম পদের যে সম্পর্ক, তাকে কারক বলে। বাংলায় কারক ছয় প্রকার।
না। সম্বন্ধ পদ ও সম্বোধন পদের সঙ্গে ক্রিয়ার সরাসরি সম্পর্ক নেই, তাই এ দুটিকে কারকের বাইরে রাখা হয়।
ক্রিয়াপদকে ধরে নির্দিষ্ট প্রশ্ন করা — কে, কী, কাকে, কী দিয়ে, কোথা থেকে, কোথায়। কেবল বিভক্তি দেখে নির্ণয় করলে ভুল হয়।
কারক ও বিভক্তি দুটিই — যেমন “কর্মকারকে দ্বিতীয়া বিভক্তি”। কেবল একটি লিখলে উত্তর অসম্পূর্ণ থাকে, আর এটিই এই অধ্যায়ে সবচেয়ে বেশি হওয়া ভুল।
আরও বাংলা ব্যাকরণ পড়ো
বাংলা ব্যাকরণ-এর পূর্ণ তালিকা ও বাংলা লেখার অন্যান্য অংশ এক জায়গায়।
আমাদের সাথে যুক্ত থাকো
পড়াশোনার আপডেট, সাজেশন ও প্রশ্নোত্তর সবার আগে পেতে আমাদের ফেসবুক পেজ ও গ্রুপে যুক্ত হও।






















