অধিকরণ কারক — কাল, ভাব ও আধারাধিকরণ
অধিকরণকারকের সংজ্ঞা ও তিন প্রকার, এবং ঐকদেশিক, বৈষয়িক ও অভিব্যাপক আধারাধিকরণ।
সংজ্ঞা
ক্রিয়া সম্পাদনের স্থান, কাল বা বিষয়কে অধিকরণ বলে এবং ক্রিয়ার সঙ্গে সেই অধিকরণের যে সম্পর্ক, তাকেই অধিকরণকারক বলা হয়।
কাজটি কোথায়, কখন, কীসে
ক্রিয়া সম্পাদনের স্থান, কাল বা বিষয়কে অধিকরণ বলে; ক্রিয়ার সঙ্গে তার সম্পর্কই অধিকরণ কারক। ঘরে আছে — কোথায় আছে? উত্তর ঘর, তাই ঘর অধিকরণ কারক।
তিনটি প্রশ্নে অধিকরণ ধরা পড়ে — কোথায়, কখন, কীসে। প্রথমটি স্থান, দ্বিতীয়টি কাল, তৃতীয়টি বিষয় বা ভাব বোঝায়। তিনটিই আলাদা প্রকার, আর পরীক্ষায় প্রকারও জিজ্ঞাসা করা হয়।
অধিকরণে সাধারণত সপ্তমী বিভক্তি বসে — এ, য়, তে। ঘরে, গাছে, সকালে, অঙ্কে — সব কটিতেই এই তিনটি চিহ্নের একটি।
- তিন প্রশ্ন — কোথায়, কখন, কীসে।
- বিভক্তি সাধারণত সপ্তমী — এ, য়, তে।
- তিন প্রকার — স্থান, কাল, বিষয় অধিকরণ।
- ✓ ঘরে আছে — কোথায়? স্থান অধিকরণ
- ✓ সকালে সে এল — কখন? কাল অধিকরণ
অধিকরণের তিন প্রকার
অধিকরণ কী নির্দেশ করছে তার ভিত্তিতে তিন ভাগে ভাগ করা হয়। প্রশ্নটিই প্রকার বলে দেয়, তাই আলাদা করে মনে রাখার কিছু নেই — কেবল কোন প্রশ্নের উত্তর মিলছে তা দেখলেই হয়।
অধিকরণের তিন প্রকার
| প্রকার | প্রশ্ন | উদাহরণ |
|---|---|---|
| স্থান অধিকরণ | কোথায়? | ঘরে আছে, গাছে ফল ধরেছে |
| কাল অধিকরণ | কখন? | সকালে সে এল, বর্ষায় বৃষ্টি হয় |
| বিষয় অধিকরণ | কীসে? | অঙ্কে সে ভালো, গানে তার দক্ষতা |
- ✓ অঙ্কে সে ভালো — বিষয় অধিকরণ
- ✓ বর্ষায় বৃষ্টি হয় — কাল অধিকরণ
ভাবাধিকরণ ও ঐকদেশিক অধিকরণ
স্থান অধিকরণকে আরও সূক্ষ্মভাবে ভাগ করা হয়। যখন জায়গাটির একটি অংশ বোঝানো হয়, তাকে বলে ঐকদেশিক অধিকরণ — পুকুরে মাছ আছে, অর্থাৎ পুকুরের একটি অংশে। আর পুরো জায়গা বোঝালে বৈষয়িক বা ব্যাপ্তি অধিকরণ।
আরেকটি প্রকার ভাবাধিকরণ — যেখানে একটি ক্রিয়ার পরে অন্য ক্রিয়া ঘটে, আর প্রথমটি সময় নির্দেশ করে। সূর্য ওঠায় অন্ধকার দূর হলো — সূর্য ওঠা এখানে সময়ের ভাব বোঝাচ্ছে।
এই সূক্ষ্ম ভাগগুলো উচ্চতর শ্রেণিতে আসে। নিচের শ্রেণিতে স্থান, কাল ও বিষয় — এই তিনটি জানলেই যথেষ্ট।
| প্রকার | বৈশিষ্ট্য | উদাহরণ |
|---|---|---|
| ঐকদেশিক | জায়গার একটি অংশ | পুকুরে মাছ আছে |
| ব্যাপ্তি | পুরো জায়গা জুড়ে | আকাশে মেঘ |
| ভাবাধিকরণ | এক ক্রিয়ার পর অন্য | সূর্য ওঠায় অন্ধকার দূর হলো |
- ✓ পুকুরে মাছ আছে — ঐকদেশিক অধিকরণ
- ✓ সূর্য ওঠায় অন্ধকার দূর — ভাবাধিকরণ
অধিকরণ বনাম করণ
এ, য়, তে বিভক্তি দুই কারকেই বসে, তাই এই জোড়াটি সবচেয়ে বেশি গুলিয়ে যায়। নির্ণায়ক প্রশ্ন আলাদা: অধিকরণে কোথায় বা কখন, করণে কী দিয়ে।
ছুরিতে ফল কাটা হলো — কী দিয়ে কাটা হলো? ছুরি দিয়ে, তাই করণ। গাছে ফল ধরেছে — কোথায় ধরেছে? গাছে, তাই অধিকরণ। একই বিভক্তি, দুই কারক।
সহজ সূত্র: পদটি কাজের হাতিয়ার হলে করণ; কাজের জায়গা, সময় বা বিষয় হলে অধিকরণ।
| বাক্য | প্রশ্ন | কারক |
|---|---|---|
| ছুরিতে ফল কাটা | কী দিয়ে? | করণ |
| গাছে ফল ধরেছে | কোথায়? | অধিকরণ |
| হাতে লেখা চিঠি | কী দিয়ে? | করণ |
| অঙ্কে সে ভালো | কীসে? | অধিকরণ |
- ✓ হাতিয়ার → করণ
- ✓ জায়গা, সময় বা বিষয় → অধিকরণ
অধিকরণ বনাম অপাদান
দুটিতেই স্থান জড়িত, কিন্তু সম্পর্ক বিপরীত। অধিকরণে জিনিসটি জায়গাটিতে আছে; অপাদানে জিনিসটি জায়গাটি ছেড়ে আসছে।
গাছে ফল ধরেছে — ফল গাছেই আছে, অধিকরণ। গাছ থেকে ফল পড়ে — ফল গাছ ছেড়ে আসছে, অপাদান। বিভক্তিও আলাদা: অধিকরণে এ, অপাদানে থেকে।
তবে বিভক্তির চেয়ে সম্পর্কটিই নির্ভরযোগ্য, কারণ ব্যতিক্রম থাকে। প্রতিবার প্রশ্ন করো — জিনিসটি সেখানে আছে, নাকি সেখান থেকে সরছে?
| বাক্য | সম্পর্ক | কারক |
|---|---|---|
| গাছে ফল ধরেছে | আছে | অধিকরণ |
| গাছ থেকে ফল পড়ে | সরছে | অপাদান |
| ঘরে আছি | আছে | অধিকরণ |
| ঘর থেকে বেরোলাম | সরছে | অপাদান |
- ✓ আছে → অধিকরণ; সরছে → অপাদান
পরীক্ষায় কী আসে
অধিকরণ কারক থেকে প্রশ্ন সাধারণত দুই রকম — তিন প্রকারের সংজ্ঞা ও উদাহরণ, অথবা বাক্যে কারক নির্ণয়। প্রকার জিজ্ঞাসা করা হলে স্থান, কাল না বিষয় — সেটিও লিখতে হয়।
নির্ণয়ের প্রশ্নে করণের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলাই প্রধান ঝুঁকি। এ বা তে দেখলে থেমে প্রশ্ন করো — কী দিয়ে নাকি কোথায়? উত্তরটিই কারক ঠিক করে দেবে।
উত্তরে প্রকারসহ লিখলে পূর্ণ নম্বর মেলে। “সকালে সে এল — কাল অধিকরণে সপ্তমী বিভক্তি” — এই কাঠামোয় কারক, প্রকার ও বিভক্তি তিনটিই আছে।
- প্রকারসহ লেখো — স্থান / কাল / বিষয় অধিকরণ।
- এ / তে দেখলে প্রশ্ন করো — কী দিয়ে নাকি কোথায়?
- আছে → অধিকরণ; সরছে → অপাদান।
- ✗ উত্তর: অধিকরণ কারক। ✓ উত্তর: কাল অধিকরণে সপ্তমী বিভক্তি।
বিস্তারিত আলোচনা
ক্রিয়াপদকে "কোথায়", "কখন" বা "কীসে" প্রশ্ন করলে যে উত্তর মেলে, সেটিই অধিকরণকারক। "সে ঘরে আছে" বাক্যে "কোথায় আছে" প্রশ্নের উত্তর "ঘরে", তাই এটি অধিকরণ। অধিকরণে সাধারণত সপ্তমী বিভক্তি বসে — এ, য়, তে, এতে।
অধিকরণ তিন প্রকার। কালাধিকরণে সময় বোঝায় — "প্রভাতে সূর্য ওঠে", "সোমবারে পরীক্ষা"। ভাবাধিকরণে ভাব বা অবস্থা বোঝায় — "দুঃখে কাতর", "আনন্দে নাচে"। আর আধারাধিকরণে স্থান বা আধার বোঝায় — "নদীতে নৌকা চলে", "ঘরে বসে আছে"।
আধারাধিকরণকে আবার তিনটি উপভাগে ভাগ করা হয়। ঐকদেশিক আধারাধিকরণে বৃহৎ স্থানের একটি অংশ বোঝায় — "পুকুরে সাঁতার কাটে"। বৈষয়িক আধারাধিকরণে কোনো বিষয়ে দক্ষতা বোঝায় — "সে অঙ্কে পাকা"। আর অভিব্যাপক আধারাধিকরণে সমগ্র আধার জুড়ে থাকা বোঝায় — "তিলে তেল আছে", "সারা গায়ে ব্যথা"। এই তিনটি উপভাগ আলাদা করতে হলে দেখতে হয় আধারটির কতখানি অংশ জুড়ে ক্রিয়াটি ঘটছে, আর সেটি স্থানের কথা বলছে নাকি কোনো বিষয়ে দক্ষতার কথা বলছে।
মনে রাখার কথা
কোথায়, কখন, কীসে — এই তিনটি প্রশ্নের যেকোনো একটির উত্তর হলেই সেটি অধিকরণকারক।
সাধারণ ভুল
পরীক্ষায় এই ভুলগুলোই সবচেয়ে বেশি নম্বর কাটে। ভুল রূপটি দেখে নিলে নিজের লেখায় ধরা সহজ হয়।
- ✗ “ছুরিতে ফল কাটা” — অধিকরণ কারক। ✓ করণ — কী দিয়ে কাটা হলো, ছুরি দিয়ে।
- ✗ “গাছ থেকে ফল পড়ে” — অধিকরণ কারক। ✓ অপাদান — ফল গাছ ছেড়ে আসছে।
- ✗ অধিকরণ কেবল স্থান বোঝায়। ✓ কাল ও বিষয়ও বোঝায় — সকালে এল, অঙ্কে ভালো।
- ✗ উত্তরে কেবল “অধিকরণ কারক” লেখা। ✓ প্রকারসহ লেখো — কাল অধিকরণে সপ্তমী বিভক্তি।
অনুশীলন
নিচের প্রশ্নগুলোর উত্তর নিজে লেখো, তারপর মিলিয়ে নাও।
- অধিকরণ কারক কাকে বলে?
- অধিকরণ কত প্রকার ও কী কী?
- অধিকরণে কোন বিভক্তি বসে?
- “অঙ্কে সে ভালো” — কোন প্রকারের অধিকরণ?
- অধিকরণ ও করণ আলাদা করবে কীভাবে?
- অধিকরণ ও অপাদানের পার্থক্য কী?
- ঐকদেশিক অধিকরণ কাকে বলে?
- ভাবাধিকরণ কাকে বলে?
- অধিকরণ কারকে সপ্তমী ছাড়া অন্য বিভক্তি বসে?
- অধিকরণ কারকের তিন প্রকার মনে রাখার উপায় কী?
- একই বাক্যে অধিকরণ ও অপাদান দুটিই থাকতে পারে?
- অধিকরণ কারকের নামটির অর্থ কী?
- অধিকরণ কারক নির্ণয়ে বিভক্তির চেয়ে কী বেশি নির্ভরযোগ্য?
উত্তর
- ক্রিয়া সম্পাদনের স্থান, কাল বা বিষয়কে অধিকরণ বলে, আর ক্রিয়ার সঙ্গে তার সম্পর্কই অধিকরণ কারক।
- তিন প্রকার — স্থান অধিকরণ (কোথায়), কাল অধিকরণ (কখন) ও বিষয় অধিকরণ (কীসে)।
- সাধারণত সপ্তমী বিভক্তি — এ, য়, তে। যেমন ঘরে, গাছে, সকালে, অঙ্কে।
- বিষয় অধিকরণ — “কীসে ভালো?” প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে।
- পদটি কাজের হাতিয়ার হলে করণ (ছুরিতে কাটা), আর কাজের জায়গা, সময় বা বিষয় হলে অধিকরণ (গাছে ফল ধরেছে)।
- অধিকরণে জিনিসটি জায়গাটিতে আছে (গাছে ফল ধরেছে), আর অপাদানে জিনিসটি জায়গাটি ছেড়ে আসছে (গাছ থেকে ফল পড়ে)।
- যখন জায়গাটির একটি অংশ বোঝানো হয় — যেমন “পুকুরে মাছ আছে”, অর্থাৎ পুকুরের একটি অংশে।
- যেখানে একটি ক্রিয়ার পরে অন্য ক্রিয়া ঘটে এবং প্রথমটি সময় নির্দেশ করে — যেমন “সূর্য ওঠায় অন্ধকার দূর হলো”। এখানে সূর্য ওঠা সময়ের ভাব বোঝাচ্ছে।
- সাধারণত সপ্তমীই (এ, য়, তে) বসে, তবে “পর্যন্ত” জাতীয় অনুসর্গও সীমা অর্থে অধিকরণ বোঝাতে পারে — যেমন “সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করলাম”।
- তিনটি প্রশ্ন মনে রাখো — কোথায় (স্থান), কখন (কাল), কীসে (বিষয়)। প্রশ্নটিই প্রকার বলে দেয়, আলাদা করে মুখস্থ করার কিছু নেই।
- পারে। “সকালে ঘর থেকে বেরোলাম” বাক্যে “সকালে” কাল অধিকরণ আর “ঘর” অপাদান — একটি সময় বোঝাচ্ছে, অন্যটি উৎস।
- “অধিকরণ” মানে আধার বা আশ্রয়। ক্রিয়াটি যে স্থান, কাল বা বিষয়ে আশ্রয় নিচ্ছে, সেটিই অধিকরণ।
- প্রশ্নটি। “এ” বা “তে” করণ ও অধিকরণ দুটিতেই বসে, তাই “কোথায়”, “কখন” বা “কীসে” প্রশ্নের উত্তর মিলছে কি না — সেটিই শেষ বিচারক।
উপযোগী শ্রেণি: নবম, দশম, একাদশ, দ্বাদশ শ্রেণি।
সচরাচর জিজ্ঞাসা
ক্রিয়া সম্পাদনের স্থান, কাল বা বিষয়কে অধিকরণ বলে এবং ক্রিয়ার সঙ্গে তার সম্পর্ককে অধিকরণকারক বলে — যেমন "সে ঘরে আছে"।
তিন প্রকার — কালাধিকরণ (প্রভাতে সূর্য ওঠে), ভাবাধিকরণ (দুঃখে কাতর) এবং আধারাধিকরণ (নদীতে নৌকা চলে)।
যেখানে সমগ্র আধার জুড়ে বিষয়টি ব্যাপ্ত থাকে, তাকে অভিব্যাপক আধারাধিকরণ বলে — যেমন "তিলে তেল আছে", "সারা গায়ে ব্যথা"।
কারণ প্রশ্নে সাধারণত প্রকারসহ চাওয়া হয়। “সকালে সে এল” বাক্যে উত্তর হবে “কাল অধিকরণে সপ্তমী বিভক্তি” — কেবল “অধিকরণ কারক” লিখলে উত্তরটি অসম্পূর্ণ থাকে।
আরও বাংলা ব্যাকরণ পড়ো
বাংলা ব্যাকরণ-এর পূর্ণ তালিকা ও বাংলা লেখার অন্যান্য অংশ এক জায়গায়।
আমাদের সাথে যুক্ত থাকো
পড়াশোনার আপডেট, সাজেশন ও প্রশ্নোত্তর সবার আগে পেতে আমাদের ফেসবুক পেজ ও গ্রুপে যুক্ত হও।






















