অপাদান কারক — বিচ্যুত, গৃহীত ও জাত অর্থে
অপাদানকারকের সংজ্ঞা, ছয় অর্থে এর প্রয়োগ এবং করণকারকের সঙ্গে পার্থক্য।
সংজ্ঞা
যা থেকে কিছু বিচ্যুত, গৃহীত, জাত, রক্ষিত বা দূরীভূত হয়, তাকে অপাদান বলে এবং ক্রিয়ার সঙ্গে তার সম্পর্ককে অপাদানকারক বলে।
যা থেকে কিছু সরে আসে
যা থেকে কিছু বিচ্যুত, গৃহীত, জাত, বিরত, রক্ষিত বা দূরীভূত হয়, তাকে অপাদান বলে; ক্রিয়ার সঙ্গে তার সম্পর্কই অপাদান কারক। গাছ থেকে ফল পড়ে — কোথা থেকে পড়ে? উত্তর গাছ, তাই গাছ অপাদান কারক।
সংজ্ঞার ছয়টি শব্দ — বিচ্যুত, গৃহীত, জাত, বিরত, রক্ষিত, দূরীভূত — মুখস্থ রাখা জরুরি, কারণ পরীক্ষায় ঠিক এই তালিকাই চাওয়া হয়। ছয়টির মধ্যে যেকোনো একটির ভাব থাকলেই সেটি অপাদান।
নির্ণায়ক প্রশ্ন কোথা থেকে বা কার থেকে। বিভক্তি সাধারণত পঞ্চমী — হতে, থেকে, চেয়ে। এই অনুসর্গগুলোই অপাদানের সবচেয়ে দৃশ্যমান চিহ্ন।
- ছয় ভাব — বিচ্যুত, গৃহীত, জাত, বিরত, রক্ষিত, দূরীভূত।
- প্রশ্ন — কোথা থেকে / কার থেকে।
- বিভক্তি সাধারণত পঞ্চমী — হতে, থেকে, চেয়ে।
- ✓ গাছ থেকে ফল পড়ে — বিচ্যুত
- ✓ বাবার কাছ থেকে টাকা পেলাম — গৃহীত
ছয় ভাবের ছয় উদাহরণ
অপাদানের ছয়টি ভাব আলাদা করে চেনা থাকলে যেকোনো বাক্যে অপাদান ধরা পড়ে। প্রতিটির জন্য একটি করে চেনা উদাহরণ মনে রাখলেই যথেষ্ট।
অপাদানের ছয় ভাব
| ভাব | অর্থ | উদাহরণ |
|---|---|---|
| বিচ্যুত | সরে পড়া | গাছ থেকে ফল পড়ে |
| গৃহীত | নেওয়া | বাবার কাছ থেকে টাকা পেলাম |
| জাত | জন্ম নেওয়া | দুধ থেকে দই হয় |
| বিরত | থেমে যাওয়া | পাপ থেকে বিরত থাকো |
| রক্ষিত | রক্ষা পাওয়া | বিপদ থেকে রক্ষা পেলাম |
| দূরীভূত | দূরে সরা | ঢাকা থেকে দূরে |
- ✓ দুধ থেকে দই হয় — জাত অর্থে অপাদান
- ✓ পাপ থেকে বিরত থাকো — বিরত অর্থে অপাদান
তুলনায়ও অপাদান
দুটি জিনিসের তুলনা করা হলে যার সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে, সেটিও অপাদান কারক। রহিম করিমের চেয়ে ভালো — এখানে করিম অপাদান, কারণ তুলনার ভিত্তি সে।
তুলনার চিহ্ন চেয়ে, থেকে, অপেক্ষা। এই শব্দগুলো দেখলে অপাদান ধরে নেওয়া নিরাপদ, কারণ তুলনায় সব সময় একটি ভিত্তি থেকে সরে গিয়েই পার্থক্য মাপা হয়।
ধারণাগতভাবে এটিও দূরীভূত ভাবেরই একটি রূপ — একটি জিনিস আরেকটি থেকে কতটা দূরে, সেটিই তুলনা। তাই আলাদা করে মনে রাখার দরকার নেই, ছয় ভাবের ভেতরেই পড়ে।
| বাক্য | অপাদান | চিহ্ন |
|---|---|---|
| রহিম করিমের চেয়ে ভালো | করিম | চেয়ে |
| সোনা রুপার চেয়ে দামি | রুপা | চেয়ে |
| তার থেকে সে বড় | তার | থেকে |
- ✓ তুলনার ভিত্তি → অপাদান কারক
অপাদান বনাম অধিকরণ
দুটিতেই স্থান জড়িত থাকে বলে গুলিয়ে যায়, কিন্তু সম্পর্ক সম্পূর্ণ বিপরীত। অপাদানে কিছু জায়গাটি থেকে সরে আসছে; অধিকরণে কিছু জায়গাটিতে অবস্থান করছে।
গাছ থেকে ফল পড়ে — ফল গাছ ছেড়ে আসছে, তাই অপাদান। গাছে ফল ধরেছে — ফল গাছেই আছে, তাই অধিকরণ। একই গাছ, দুই সম্পর্ক।
বিভক্তিও সাধারণত আলাদা: অপাদানে থেকে, হতে (পঞ্চমী); অধিকরণে এ, য়, তে (সপ্তমী)। তবে বিভক্তির চেয়ে সম্পর্কটিই নির্ভরযোগ্য সূত্র।
| বাক্য | সম্পর্ক | কারক |
|---|---|---|
| গাছ থেকে ফল পড়ে | সরে আসছে | অপাদান |
| গাছে ফল ধরেছে | অবস্থান করছে | অধিকরণ |
| ঘর থেকে বেরোলাম | সরে আসছে | অপাদান |
| ঘরে আছি | অবস্থান করছে | অধিকরণ |
- ✓ সরে আসা → অপাদান
- ✓ অবস্থান → অধিকরণ
অপাদান বনাম করণ
কখনো থেকে বা দিয়ে বিভক্তি দেখে করণ ও অপাদান গুলিয়ে যায়। পার্থক্য: করণ কাজটির হাতিয়ার, আর অপাদান কাজটির উৎস।
কলম দিয়ে লিখি — কলম হাতিয়ার, তাই করণ। দুধ থেকে দই হয় — দুধ উৎস, তাই অপাদান। প্রশ্নও আলাদা: করণে কী দিয়ে, অপাদানে কোথা থেকে।
| বাক্য | প্রশ্ন | কারক |
|---|---|---|
| কলম দিয়ে লিখি | কী দিয়ে? | করণ |
| দুধ থেকে দই হয় | কোথা থেকে? | অপাদান |
| ছুরিতে কাটা | কী দিয়ে? | করণ |
| গাছ থেকে পড়া | কোথা থেকে? | অপাদান |
- ✓ হাতিয়ার → করণ; উৎস → অপাদান
পরীক্ষায় কী আসে
অপাদান কারক থেকে প্রশ্ন সাধারণত দুই রকম — সংজ্ঞা ও ছয় ভাবের উদাহরণ, অথবা বাক্যে কারক নির্ণয়। প্রথমটিতে ছয়টি শব্দ মনে রাখাই আসল কাজ।
সংজ্ঞা লিখতে বললে ছয়টি ভাবের নাম লিখে দাও — বিচ্যুত, গৃহীত, জাত, বিরত, রক্ষিত, দূরীভূত। কেবল “যা থেকে কিছু সরে আসে” লিখলে উত্তর অসম্পূর্ণ থাকে।
নির্ণয়ের প্রশ্নে অধিকরণের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা এড়াতে একটাই প্রশ্ন করো — জিনিসটি কি জায়গাটি ছেড়ে আসছে, নাকি সেখানেই আছে? ছেড়ে এলে অপাদান, থাকলে অধিকরণ।
- সংজ্ঞায় ছয়টি ভাবের নাম লেখো।
- ছেড়ে আসছে → অপাদান; আছে → অধিকরণ।
- তুলনার ভিত্তিও অপাদান।
- ✗ “গাছে ফল ধরেছে” — অপাদান ✓ অধিকরণ — ফল গাছেই আছে
বিস্তারিত আলোচনা
অপাদানের মূল ভাব হলো সরে আসা বা উৎস। ক্রিয়াপদকে "কোথা থেকে" বা "কী থেকে" প্রশ্ন করলে যে উত্তর মেলে, সেটিই অপাদানকারক। "গাছ থেকে পাতা পড়ে" বাক্যে "গাছ" অপাদান, কারণ পাতাটি গাছ থেকে বিচ্যুত হচ্ছে। এখানে পঞ্চমী বিভক্তি "থেকে" বসেছে।
অপাদানের কয়েকটি স্বতন্ত্র ভাব আলাদাভাবে চিনে রাখা দরকার। বিচ্যুত অর্থে — "গাছ থেকে ফল পড়ে"। গৃহীত অর্থে — "দুধ থেকে ঘি হয়"। জাত অর্থে — "জমি থেকে ফসল পাই"। রক্ষিত অর্থে — "বিপদ থেকে বাঁচাও"। দূরীভূত অর্থে — "পাপ থেকে দূরে থাকো"। ভীত অর্থেও অপাদান হয় — "বাঘকে ভয় পাই"।
অপাদান ও করণকারক গুলিয়ে যাওয়া সাধারণ ভুল। করণে যন্ত্র বা উপায় বোঝায়, আর অপাদানে উৎস বা বিচ্যুতি। "ছুরি দিয়ে কাটল" করণ, কিন্তু "ছুরির ভয়ে পালাল" অপাদান। প্রশ্নটি ঠিকমতো করলে দুটি আলাদা করা কঠিন নয় — একটিতে "কী দিয়ে", অন্যটিতে "কী থেকে"।
মনে রাখার কথা
সরে আসা, উৎস কিংবা ভয় — এই ভাবগুলো থাকলেই কারকটি অপাদান বলে ধরে নেওয়া যায়।
সাধারণ ভুল
পরীক্ষায় এই ভুলগুলোই সবচেয়ে বেশি নম্বর কাটে। ভুল রূপটি দেখে নিলে নিজের লেখায় ধরা সহজ হয়।
- ✗ “গাছে ফল ধরেছে” — অপাদান কারক। ✓ অধিকরণ — ফল গাছ ছেড়ে আসছে না।
- ✗ “দুধ থেকে দই হয়” — করণ কারক। ✓ অপাদান — দুধ এখানে উৎস, হাতিয়ার নয়।
- ✗ তুলনার ভিত্তি অধিকরণ কারক। ✓ অপাদান — “রহিম করিমের চেয়ে ভালো”-তে করিম অপাদান।
- ✗ সংজ্ঞায় কেবল “যা থেকে সরে আসে” লেখা। ✓ ছয়টি ভাবের নামও লিখতে হয়।
অনুশীলন
নিচের প্রশ্নগুলোর উত্তর নিজে লেখো, তারপর মিলিয়ে নাও।
- অপাদান কারক কাকে বলে?
- অপাদানের ছয়টি ভাব লেখো।
- অপাদান কারকে কোন বিভক্তি বসে?
- অপাদান ও অধিকরণ আলাদা করবে কীভাবে?
- “দুধ থেকে দই হয়” — কোন ভাবের অপাদান?
- তুলনায় অপাদান কীভাবে হয়?
- অপাদান ও করণ আলাদা করবে কীভাবে?
- অপাদান কারকে সব সময় কি “থেকে” বসে?
- অপাদান ও অধিকরণ গুলিয়ে গেলে কোন প্রশ্নটি করবে?
- অপাদান কারকের সংজ্ঞায় ছয়টি ভাব লেখা কেন জরুরি?
- অপাদান কারক কেবল স্থান বোঝায়?
- অপাদান কারকে সাধু ও চলিত রূপ কী?
উত্তর
- যা থেকে কিছু বিচ্যুত, গৃহীত, জাত, বিরত, রক্ষিত বা দূরীভূত হয় তাকে অপাদান বলে, আর ক্রিয়ার সঙ্গে তার সম্পর্কই অপাদান কারক।
- বিচ্যুত, গৃহীত, জাত, বিরত, রক্ষিত ও দূরীভূত।
- সাধারণত পঞ্চমী বিভক্তি — হতে, থেকে, চেয়ে।
- জিনিসটি জায়গাটি ছেড়ে আসছে কি না দেখো। ছেড়ে এলে অপাদান (গাছ থেকে ফল পড়ে), সেখানেই থাকলে অধিকরণ (গাছে ফল ধরেছে)।
- জাত ভাবের — দই দুধ থেকে জন্ম নিচ্ছে।
- যার সঙ্গে তুলনা করা হয় সেটিই অপাদান — “রহিম করিমের চেয়ে ভালো” বাক্যে করিম অপাদান কারক।
- করণ কাজটির হাতিয়ার (কলম দিয়ে লিখি), আর অপাদান কাজটির উৎস (দুধ থেকে দই হয়)।
- না। “হতে” ও “চেয়ে”ও পঞ্চমী বিভক্তির রূপ — “গৃহ হতে বাহির হয়ে”, “তার চেয়ে ভালো”। সাধু ভাষায় “হতে”, চলিত ভাষায় “থেকে” বেশি চলে।
- জিনিসটি জায়গাটি ছেড়ে আসছে, নাকি সেখানেই আছে — এই একটিই প্রশ্ন। ছেড়ে এলে অপাদান, থাকলে অধিকরণ। বিভক্তির চেয়ে এই সম্পর্কটিই নির্ভরযোগ্য।
- কারণ ছয়টির যেকোনো একটির ভাব থাকলেই সেটি অপাদান, আর পরীক্ষায় ঠিক এই তালিকাটিই চাওয়া হয়। কেবল “যা থেকে সরে আসে” লিখলে গৃহীত, জাত বা বিরত ভাবগুলো বাদ পড়ে যায়।
- না। উৎস (দুধ থেকে দই), তুলনা (তার চেয়ে ভালো), বিরতি (পাপ থেকে বিরত) ও রক্ষা (বিপদ থেকে রক্ষা) — সবই অপাদান। স্থান তার একটি রূপ মাত্র।
- সাধু ভাষায় “হইতে”, চলিত ভাষায় “থেকে” — দুটিই পঞ্চমী বিভক্তির রূপ। “গৃহ হইতে বাহির হয়ে” আর “ঘর থেকে বেরিয়ে” একই কথা।
উপযোগী শ্রেণি: নবম, দশম, একাদশ, দ্বাদশ শ্রেণি।
সচরাচর জিজ্ঞাসা
যা থেকে কিছু বিচ্যুত, গৃহীত, জাত, রক্ষিত বা দূরীভূত হয়, তাকে অপাদান বলে এবং ক্রিয়ার সঙ্গে তার সম্পর্ককে অপাদানকারক বলে।
করণে যন্ত্র বা উপায় বোঝায়, অপাদানে উৎস বা বিচ্যুতি। "ছুরি দিয়ে কাটল" করণ, আর "ছুরির ভয়ে পালাল" অপাদান।
অপাদানকারক হয়। "বাঘকে ভয় পাই" বাক্যে ভয়ের উৎস বাঘ, তাই এখানে "বাঘকে" অপাদানকারক হিসেবে গণ্য।
প্রতিটির সঙ্গে একটি করে চেনা উদাহরণ গেঁথে নাও — বিচ্যুত (গাছ থেকে ফল পড়ে), গৃহীত (বাবার কাছ থেকে টাকা), জাত (দুধ থেকে দই), বিরত (পাপ থেকে বিরত), রক্ষিত (বিপদ থেকে রক্ষা), দূরীভূত (ঢাকা থেকে দূরে)।
আরও বাংলা ব্যাকরণ পড়ো
বাংলা ব্যাকরণ-এর পূর্ণ তালিকা ও বাংলা লেখার অন্যান্য অংশ এক জায়গায়।
আমাদের সাথে যুক্ত থাকো
পড়াশোনার আপডেট, সাজেশন ও প্রশ্নোত্তর সবার আগে পেতে আমাদের ফেসবুক পেজ ও গ্রুপে যুক্ত হও।






















