কর্মকারক — মুখ্য, গৌণ ও সমধাতুজ কর্ম
কর্মকারকের সংজ্ঞা, মুখ্য ও গৌণ কর্মের পার্থক্য এবং সমধাতুজ কর্মের উদাহরণ।
সংজ্ঞা
কর্তা যা করে বা যাকে আশ্রয় করে ক্রিয়া সম্পন্ন হয়, তাকে কর্ম বলে এবং ক্রিয়ার সঙ্গে তার সম্পর্ককে কর্মকারক বলে।
যাকে আশ্রয় করে কাজ সম্পন্ন হয়
কর্তা যাকে আশ্রয় করে ক্রিয়া সম্পন্ন করে, তাকে কর্ম বলে; ক্রিয়ার সঙ্গে সেই কর্মের সম্পর্কই কর্মকারক। রহিম বই পড়ে — কী পড়ে? উত্তর বই, তাই বই কর্মকারক।
কর্ম খুঁজতে ক্রিয়াকে কী বা কাকে প্রশ্ন করতে হয়। অপ্রাণিবাচক কর্মে সাধারণত কী বসে (কী পড়ে? বই), আর প্রাণিবাচক কর্মে কাকে (কাকে ডাকে? রহিমকে)।
শুধু সকর্মক ক্রিয়ার কর্ম থাকে। সে ঘুমায় বাক্যে কী ঘুমায়? প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই, কারণ ক্রিয়াটি অকর্মক — সেখানে কর্মকারকও নেই।
- ক্রিয়াকে কী / কাকে প্রশ্ন করলেই কর্ম মেলে।
- কেবল সকর্মক ক্রিয়ার কর্ম থাকে।
- অপ্রাণিবাচকে কী, প্রাণিবাচকে কাকে।
- ✓ কী পড়ে? বই → কর্মকারক
- ✓ কাকে ডাকে? রহিমকে → কর্মকারক
প্রাণী ও অপ্রাণীতে বিভক্তি আলাদা
কর্মকারকে বিভক্তি বসবে কি না, তা নির্ভর করে কর্মটি প্রাণিবাচক না অপ্রাণিবাচক তার ওপর। প্রাণিবাচক কর্মে সাধারণত কে বা রে বসে; অপ্রাণিবাচক কর্মে বিভক্তি থাকে না, অর্থাৎ শূন্য বিভক্তি।
সে ভাত খায় — ভাত অপ্রাণিবাচক, তাই শূন্য বিভক্তি। সে রহিমকে ডাকে — রহিম প্রাণিবাচক, তাই কে বিভক্তি। এটি বাংলার নিজস্ব রীতি, সংস্কৃত থেকে আসা নয়।
কর্মকারকে বিভক্তি
| কর্ম | বিভক্তি | উদাহরণ |
|---|---|---|
| অপ্রাণিবাচক | শূন্য | সে ভাত খায় |
| অপ্রাণিবাচক | শূন্য | রহিম বই পড়ে |
| প্রাণিবাচক | কে | সে রহিমকে ডাকে |
| প্রাণিবাচক | রে | তারে ডাকো |
- ✓ ভাত খায় — কর্মকারকে শূন্য বিভক্তি
- ✓ রহিমকে ডাকে — কর্মকারকে দ্বিতীয়া বিভক্তি
মুখ্য ও গৌণ কর্ম
দ্বিকর্মক ক্রিয়ায় দুটি কর্ম থাকে, আর তাদের মর্যাদা সমান নয়। বস্তুবাচক কর্মটিকে বলে মুখ্য কর্ম, আর ব্যক্তিবাচক কর্মটিকে গৌণ কর্ম।
বাবা আমাকে টাকা দিলেন — টাকা মুখ্য কর্ম (বস্তু) এবং আমাকে গৌণ কর্ম (ব্যক্তি)। লক্ষ করো, গৌণ কর্মে কে বিভক্তি থাকে আর মুখ্য কর্মে থাকে না — প্রাণী-অপ্রাণীর নিয়মই এখানেও কাজ করছে।
পরীক্ষায় প্রায়ই দুটির নাম আলাদা করে জানতে চাওয়া হয়, তাই বস্তু ও ব্যক্তি — এই ভাগটি মনে রাখা দরকার।
| বাক্য | মুখ্য কর্ম | গৌণ কর্ম |
|---|---|---|
| বাবা আমাকে টাকা দিলেন | টাকা | আমাকে |
| শিক্ষক ছাত্রকে বই দিলেন | বই | ছাত্রকে |
| তিনি শিশুকে গল্প শোনালেন | গল্প | শিশুকে |
- ✓ বস্তু → মুখ্য কর্ম
- ✓ ব্যক্তি → গৌণ কর্ম
সমধাতুজ কর্ম
কখনো ক্রিয়ার ধাতু থেকেই তৈরি একটি বিশেষ্য সেই ক্রিয়ার কর্ম হয়ে বসে — একে বলে সমধাতুজ কর্ম বা ধাত্বর্থক কর্ম। সে খুব ভালো খেলা খেলে — খেলা এসেছে √খেল্ ধাতু থেকেই।
সে গভীর ঘুম ঘুমাল, তিনি সুন্দর হাসি হাসলেন — দুটিতেই একই ব্যাপার। মজার ব্যাপার হলো, মূল ক্রিয়াটি অকর্মক হলেও সমধাতুজ কর্ম বসিয়ে তাকে সকর্মকের মতো ব্যবহার করা যায়।
পরীক্ষায় এটি আলাদা করে জিজ্ঞাসা করা হয়, আর উদাহরণ সীমিত বলে দুটি-তিনটি মনে রাখলেই যথেষ্ট।
| বাক্য | ধাতু | সমধাতুজ কর্ম |
|---|---|---|
| সে ভালো খেলা খেলে | √খেল্ | খেলা |
| সে গভীর ঘুম ঘুমাল | √ঘুমা | ঘুম |
| তিনি সুন্দর হাসি হাসলেন | √হাস্ | হাসি |
| সে বড় লড়াই লড়ল | √লড়্ | লড়াই |
- ✓ ধাতু ও কর্ম একই মূল থেকে এসেছে
- ✓ অকর্মক ক্রিয়াও সমধাতুজ কর্ম নিতে পারে
কর্ম বনাম সম্প্রদান
দুটিতেই কাকে প্রশ্ন করা হয় এবং কে বিভক্তি বসে, তাই এই দুটি আলাদা করাই কারক অধ্যায়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। নির্ণায়ক প্রশ্নটি হলো — বস্তুটির ওপর দাতা কি স্বত্ব ত্যাগ করেছেন?
রহিমকে বইটি দাও — বইটি ফেরত চাওয়া যেতে পারে, স্বত্ব ত্যাগ হয়নি, তাই কর্ম। ভিক্ষুককে ভিক্ষা দাও — ভিক্ষা ফেরত চাওয়া হয় না, স্বত্ব ত্যাগ হয়েছে, তাই সম্প্রদান।
শব্দসংকেতও কাজে লাগে। বাক্যে দান, ভিক্ষা, পূজা, শ্রদ্ধা, উৎসর্গ, অর্ঘ্য জাতীয় শব্দ থাকলে প্রায় নিশ্চিতভাবে সম্প্রদান; নইলে কর্ম।
| বাক্য | কারক | কারণ |
|---|---|---|
| রহিমকে বই দাও | কর্ম | স্বত্ব ত্যাগ নয় |
| ভিক্ষুককে ভিক্ষা দাও | সম্প্রদান | স্বত্ব ত্যাগ |
| তাকে ডাকো | কর্ম | দান নয় |
| দেবতাকে অর্ঘ্য দাও | সম্প্রদান | নিঃস্বার্থ |
- ✗ রহিমকে বই দাও — সম্প্রদান ✓ কর্ম — স্বত্ব ত্যাগ হয়নি
পরীক্ষায় কী আসে
কর্মকারক থেকে প্রশ্ন সাধারণত তিন রকম — বাক্যে কর্ম চিহ্নিত করে কারক ও বিভক্তি লেখা, মুখ্য-গৌণ কর্ম আলাদা করা, আর সমধাতুজ কর্মের উদাহরণ দেওয়া।
সবচেয়ে বেশি ভুল হয় সম্প্রদানের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলায়। মনে রাখো — কে বিভক্তি দেখলেই কর্ম নয়; বাক্যে নিঃস্বার্থ দানের ভাব আছে কি না দেখতে হবে।
দ্বিতীয় সতর্কতা শূন্য বিভক্তি নিয়ে। সে ভাত খায় বাক্যে ভাত-এ কোনো চিহ্ন নেই দেখে অনেকে কর্ম চিনতে পারে না। কিন্তু কী খায়? প্রশ্নের উত্তর ভাত, তাই সেটি কর্মকারকে শূন্য বিভক্তি।
- কে দেখলেই কর্ম নয় — দান থাকলে সম্প্রদান।
- অপ্রাণিবাচক কর্মে শূন্য বিভক্তি।
- বস্তু → মুখ্য কর্ম, ব্যক্তি → গৌণ কর্ম।
- ✗ “সে ভাত খায়” — ভাত কর্ম নয় ✓ কর্মকারকে শূন্য বিভক্তি
বিস্তারিত আলোচনা
ক্রিয়াপদকে "কী" বা "কাকে" প্রশ্ন করলে যে উত্তর মেলে, সেটিই কর্মকারক। "সে ভাত খায়" বাক্যে "কী খায়" প্রশ্নের উত্তর "ভাত", তাই "ভাত" কর্মকারক। কর্মকারকে শূন্য বিভক্তি ছাড়াও "কে" ও "রে" বিভক্তি বসে — "ছেলেটিকে ডাকো" বাক্যের মতো।
কর্ম দুই ধরনের হতে পারে। প্রাণিবাচক কর্মে সাধারণত "কে" বিভক্তি বসে, আর অপ্রাণিবাচক কর্মে শূন্য বিভক্তি থাকে। "শিক্ষক ছাত্রকে বই দিলেন" বাক্যে দুটি কর্ম — "ছাত্রকে" গৌণ কর্ম, কারণ সে কর্মটি গ্রহণ করছে, আর "বই" মুখ্য কর্ম, কারণ ক্রিয়াটি সরাসরি তার ওপর ঘটছে।
কখনো একই ধাতু থেকে গঠিত পদ কর্ম হিসেবে বসে, একে বলে সমধাতুজ কর্ম — "সে খেলা খেলছে", "আমি ঘুম ঘুমাচ্ছি"। সতর্ক থাকতে হবে যে অকর্মক ক্রিয়ার কোনো কর্ম থাকে না, তাই সেখানে কর্মকারক খোঁজা অর্থহীন — "শিশুটি ঘুমায়" বাক্যে কোনো কর্ম নেই।
মনে রাখার কথা
অকর্মক ক্রিয়ার বাক্যে কর্মকারক খুঁজতে যেয়ো না — সেখানে কর্ম বলে কিছু থাকেই না।
সাধারণ ভুল
পরীক্ষায় এই ভুলগুলোই সবচেয়ে বেশি নম্বর কাটে। ভুল রূপটি দেখে নিলে নিজের লেখায় ধরা সহজ হয়।
- ✗ “রহিমকে বই দাও” — সম্প্রদান কারক। ✓ কর্মকারক — স্বত্ব ত্যাগ হয়নি।
- ✗ অপ্রাণিবাচক কর্মে “কে” বিভক্তি বসে। ✓ শূন্য বিভক্তি বসে — সে ভাত খায়।
- ✗ অকর্মক ক্রিয়ারও কর্ম থাকে। ✓ থাকে না — কেবল সকর্মক ক্রিয়ার কর্ম থাকে।
- ✗ দ্বিকর্মকে ব্যক্তিবাচকটি মুখ্য কর্ম। ✓ বস্তুবাচকটি মুখ্য, ব্যক্তিবাচকটি গৌণ কর্ম।
অনুশীলন
নিচের প্রশ্নগুলোর উত্তর নিজে লেখো, তারপর মিলিয়ে নাও।
- কর্মকারক কাকে বলে?
- কর্ম চেনার প্রশ্ন কী?
- কর্মকারকে বিভক্তি কখন বসে, কখন বসে না?
- মুখ্য ও গৌণ কর্ম কাকে বলে?
- সমধাতুজ কর্ম কাকে বলে? উদাহরণ দাও।
- কর্ম ও সম্প্রদান আলাদা করার নির্ণায়ক প্রশ্ন কী?
- “সে ভাত খায়” — কারক ও বিভক্তি নির্ণয় করো।
- সমধাতুজ কর্ম অকর্মক ক্রিয়ায় বসতে পারে?
- দ্বিকর্মক ক্রিয়ায় কোন কর্মে বিভক্তি থাকে?
- কর্মকারক ও কর্মবাচ্য কি এক?
- কর্ম চেনার সময় ক্রিয়াবিশেষণকে কর্ম ভেবে ফেলা এড়াব কীভাবে?
উত্তর
- কর্তা যাকে আশ্রয় করে ক্রিয়া সম্পন্ন করে তাকে কর্ম বলে, আর ক্রিয়ার সঙ্গে সেই কর্মের সম্পর্কই কর্মকারক।
- ক্রিয়াকে “কী” বা “কাকে” প্রশ্ন করা — অপ্রাণিবাচকে কী, প্রাণিবাচকে কাকে।
- প্রাণিবাচক কর্মে “কে” বা “রে” বসে; অপ্রাণিবাচক কর্মে শূন্য বিভক্তি থাকে।
- দ্বিকর্মক ক্রিয়ায় বস্তুবাচক কর্মটি মুখ্য এবং ব্যক্তিবাচক কর্মটি গৌণ — “বাবা আমাকে টাকা দিলেন”-এ টাকা মুখ্য, আমাকে গৌণ।
- ক্রিয়ার ধাতু থেকেই তৈরি বিশেষ্য সেই ক্রিয়ার কর্ম হলে তাকে সমধাতুজ কর্ম বলে — যেমন “সে ভালো খেলা খেলে”।
- দাতা কি বস্তুটির ওপর স্বত্ব ত্যাগ করেছেন? করলে সম্প্রদান, না করলে কর্ম।
- কর্মকারকে শূন্য বিভক্তি। ভাত অপ্রাণিবাচক বলে কোনো চিহ্ন বসেনি।
- পারে, এবং সেটিই এর মজার দিক। “সে ঘুমায়” অকর্মক, কিন্তু “সে গভীর ঘুম ঘুমাল” বললে ধাতু থেকেই তৈরি একটি কর্ম বসে গেল।
- গৌণ কর্মে, কারণ সেটি ব্যক্তিবাচক — “আমাকে”। মুখ্য কর্ম বস্তুবাচক বলে সেখানে শূন্য বিভক্তি থাকে — “টাকা”। প্রাণী-অপ্রাণীর নিয়মই এখানে কাজ করছে।
- না। কর্মকারক একটি পদের সঙ্গে ক্রিয়ার সম্পর্ক, আর কর্মবাচ্য বাক্যের একটি গঠনরীতি যেখানে কর্মই প্রধান হয়ে বসে। কর্মবাচ্যেও কর্মকারক থাকে, কিন্তু দুটি আলাদা ধারণা।
- “কী?” প্রশ্নের উত্তরে পদটি বসছে কি না দেখো। “সে ভালো খায়” বাক্যে “কী খায়?” প্রশ্নের উত্তর “ভালো” হয় না — তাই সেটি ক্রিয়াবিশেষণ, কর্ম নয়, আর ক্রিয়াটি অকর্মক।
উপযোগী শ্রেণি: নবম, দশম, একাদশ, দ্বাদশ শ্রেণি।
সচরাচর জিজ্ঞাসা
কর্তা যাকে আশ্রয় করে ক্রিয়া সম্পন্ন করে, তাকে কর্ম বলে এবং ক্রিয়ার সঙ্গে তার সম্পর্ককে কর্মকারক বলে। "কী" বা "কাকে" প্রশ্নে এটি পাওয়া যায়।
দ্বিকর্মক ক্রিয়ায় বস্তুবাচক কর্মটি মুখ্য কর্ম আর প্রাণিবাচক কর্মটি গৌণ কর্ম — "শিক্ষক ছাত্রকে বই দিলেন" বাক্যে বই মুখ্য, ছাত্রকে গৌণ।
ক্রিয়ার ধাতু থেকেই গঠিত পদ যখন কর্ম হিসেবে বসে, তাকে সমধাতুজ কর্ম বলে — যেমন "সে খেলা খেলছে", "আমি ঘুম ঘুমাচ্ছি"।
এটি বাংলার নিজস্ব রীতি। প্রাণিবাচক কর্মে “কে” বসে (রহিমকে ডাকে) কারণ সেখানে কর্তা ও কর্ম গুলিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে; অপ্রাণিবাচক কর্মে সেই ঝুঁকি নেই, তাই শূন্য বিভক্তিই যথেষ্ট।
আরও বাংলা ব্যাকরণ পড়ো
বাংলা ব্যাকরণ-এর পূর্ণ তালিকা ও বাংলা লেখার অন্যান্য অংশ এক জায়গায়।
আমাদের সাথে যুক্ত থাকো
পড়াশোনার আপডেট, সাজেশন ও প্রশ্নোত্তর সবার আগে পেতে আমাদের ফেসবুক পেজ ও গ্রুপে যুক্ত হও।






















