করণ কারক — যন্ত্র, উপায় ও হেতু অর্থে
করণকারকের সংজ্ঞা, বিভক্তি ও উদাহরণ — যন্ত্র ছাড়াও উপায় ও হেতু অর্থে এর প্রয়োগ।
সংজ্ঞা
ক্রিয়া সম্পাদনের যন্ত্র, উপায় বা সহায়ককে করণ বলে এবং ক্রিয়ার সঙ্গে সেই করণের যে সম্পর্ক, তাকেই করণকারক বলা হয়।
যার সাহায্যে কাজ হয়
ক্রিয়া সম্পাদনের উপায়, যন্ত্র বা সহায়ককে করণ বলে; ক্রিয়ার সঙ্গে সেই করণের সম্পর্কই করণকারক। কলম দিয়ে লিখি — কী দিয়ে লিখি? উত্তর কলম, তাই কলম করণকারক।
করণ শব্দের অর্থই যন্ত্র বা উপায়। তাই যে জিনিসটি ছাড়া কাজটি করা যেত না, সেটিই করণ। নির্ণায়ক প্রশ্ন — কী দিয়ে, কীসের দ্বারা, কী উপায়ে।
করণকারকে সাধারণত তৃতীয়া বিভক্তি বসে — দ্বারা, দিয়া, দিয়ে, কর্তৃক। কখনো এ, য়, তে বিভক্তিও বসে, যেমন ছুরিতে কাটা, হাতে লেখা।
- ক্রিয়াকে কী দিয়ে / কীসের দ্বারা প্রশ্ন করো।
- সাধারণত তৃতীয়া বিভক্তি — দ্বারা, দিয়ে।
- করণ শব্দের অর্থই যন্ত্র বা উপায়।
- ✓ কী দিয়ে লিখি? কলম → করণকারক
- ✓ ছুরি দিয়ে ফল কাটো — করণকারক
করণের রকমফের
করণ সব সময় হাতে ধরা যন্ত্র নয়। উপায়, মাধ্যম, উপকরণ, চিহ্ন, এমনকি হেতু বা কারণও করণকারক হতে পারে। এই বিস্তারটি না জানলে অনেক বাক্যে করণ চিনতে অসুবিধা হয়।
করণকারকের রকমফের
| ধরন | উদাহরণ | ব্যাখ্যা |
|---|---|---|
| যন্ত্র | কলম দিয়ে লিখি | হাতের যন্ত্র |
| উপকরণ | ইট দিয়ে ঘর বানাই | যা দিয়ে তৈরি |
| মাধ্যম | ডাকে চিঠি পাঠাও | যার মাধ্যমে |
| উপায় | পরিশ্রমে সাফল্য আসে | যে উপায়ে |
| চিহ্ন | কাজেই তাকে চিনি | যা দেখে চেনা যায় |
| হেতু | অসুখে সে আসেনি | যে কারণে |
- ✓ পরিশ্রমে সাফল্য আসে — উপায় অর্থে করণ
- ✓ অসুখে সে আসেনি — হেতু অর্থে করণ
করণকারকে বিভক্তি
করণকারকে প্রধানত তৃতীয়া বিভক্তি বসে, তবে সপ্তমীর চিহ্নও দেখা যায়। কোন রূপটি বসবে তা ভাষারীতির ওপর নির্ভর করে — সাধু ভাষায় দ্বারা ও দিয়া, চলিত ভাষায় দিয়ে।
এ, য়, তে বিভক্তি করণে বসলে বিভ্রান্তি হয়, কারণ এই তিনটি অধিকরণেরও চিহ্ন। পার্থক্য অর্থে — ঘরে আছে (কোথায়? অধিকরণ) বনাম হাতে লেখা (কী দিয়ে? করণ)।
| বিভক্তি | ভাষারীতি | উদাহরণ |
|---|---|---|
| দ্বারা | সাধু | কলম দ্বারা লিখি |
| দিয়া | সাধু | ছুরি দিয়া কাটি |
| দিয়ে | চলিত | কলম দিয়ে লিখি |
| কর্তৃক | সাধু / আনুষ্ঠানিক | তার কর্তৃক সম্পাদিত |
| এ / য় / তে | উভয় | হাতে লেখা, ছুরিতে কাটা |
- ✓ হাতে লেখা — কী দিয়ে? হাত → করণ
- ✓ ঘরে আছে — কোথায়? ঘর → অধিকরণ
করণ বনাম অধিকরণ
এ, য়, তে বিভক্তি দুই কারকেই বসে বলে করণ ও অধিকরণ প্রায়ই গুলিয়ে যায়। নির্ণায়ক প্রশ্ন আলাদা: করণে কী দিয়ে, অধিকরণে কোথায় বা কখন।
ছুরিতে ফল কাটা হলো — কী দিয়ে কাটা হলো? ছুরি দিয়ে, তাই করণ। গাছে ফল ধরেছে — কোথায় ধরেছে? গাছে, তাই অধিকরণ। একই এ বিভক্তি, দুই কারক।
সহজ সূত্র: পদটি যদি কাজটির হাতিয়ার হয় তবে করণ; যদি কাজটির জায়গা বা সময় হয় তবে অধিকরণ।
| বাক্য | প্রশ্ন | কারক |
|---|---|---|
| ছুরিতে ফল কাটা | কী দিয়ে? | করণ |
| গাছে ফল ধরেছে | কোথায়? | অধিকরণ |
| হাতে লেখা চিঠি | কী দিয়ে? | করণ |
| সকালে সে এল | কখন? | অধিকরণ |
- ✓ হাতিয়ার → করণ
- ✓ জায়গা বা সময় → অধিকরণ
করণ বনাম কর্তৃকারক
কর্মবাচ্যে দ্বারা ও কর্তৃক বিভক্তি কর্তায় বসে, অথচ এই দুটি করণকারকেরও চিহ্ন। ফলে শিক্ষক কর্তৃক ছাত্র পুরস্কৃত হলো বাক্যে অনেকে শিক্ষককে করণ ভেবে ফেলে।
পার্থক্যটি সহজ: করণ একটি নিষ্প্রাণ উপায়, আর কর্তা কাজটির সম্পাদক। শিক্ষক কাজটি করছেন, তাই তিনি কর্তা; কলম কাজটি করছে না, কলম দিয়ে কাজ হচ্ছে, তাই কলম করণ।
যাচাইয়ের প্রশ্ন: পদটি কি নিজে সিদ্ধান্ত নিয়ে কাজ করছে? করলে কর্তা, না করলে করণ।
| বাক্য | পদ | কারক | কারণ |
|---|---|---|---|
| শিক্ষক কর্তৃক পুরস্কৃত | শিক্ষক | কর্তৃকারক | কাজটির সম্পাদক |
| কলম দ্বারা লিখিত | কলম | করণকারক | নিষ্প্রাণ উপায় |
| তার দ্বারা সম্ভব নয় | তার | কর্তৃকারক | সম্পাদক |
- ✗ শিক্ষক কর্তৃক — করণকারক ✓ কর্তৃকারক — শিক্ষক কাজটি করছেন
পরীক্ষায় কী আসে
করণকারক থেকে প্রশ্ন সাধারণত দুই রকম — বাক্যে করণ চিহ্নিত করে কারক ও বিভক্তি লেখা, অথবা করণকারকের সংজ্ঞা ও উদাহরণ। প্রথমটিতে অধিকরণের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলাই প্রধান ভুল।
এ, তে বিভক্তি দেখলে থেমে প্রশ্ন করো — কী দিয়ে নাকি কোথায়? উত্তরটিই কারক ঠিক করে দেবে। ছুরিতে কাটা করণ, ঘরে আছে অধিকরণ।
দ্বিতীয় সতর্কতা কর্মবাচ্যে। কর্তৃক ও দ্বারা দেখলেই করণ লিখে ফেলা চলবে না — পদটি প্রাণবান ও কাজটির সম্পাদক হলে সেটি কর্তৃকারক।
- এ / তে দেখলে প্রশ্ন করো — কী দিয়ে নাকি কোথায়?
- প্রাণবান সম্পাদক → কর্তা; নিষ্প্রাণ উপায় → করণ।
- উত্তরে কারক + বিভক্তি দুটিই লেখো।
- ✗ “ছুরিতে কাটা” — অধিকরণ ✓ করণ — কী দিয়ে কাটা হলো?
বিস্তারিত আলোচনা
"করণ" শব্দের অর্থ যন্ত্র বা উপায়। ক্রিয়াপদকে "কী দিয়ে" বা "কীসের দ্বারা" প্রশ্ন করলে যে উত্তর মেলে, সেটিই করণকারক। "কলম দিয়ে লিখি" বাক্যে "কী দিয়ে লিখি" প্রশ্নের উত্তর "কলম", তাই এটি করণকারক। এখানে "দিয়ে" অনুসর্গটি করণের ভাব প্রকাশ করছে।
করণকারকে তৃতীয়া বিভক্তি বসে — দ্বারা, দিয়া, দিয়ে, কর্তৃক। তবে শূন্য বিভক্তিও দেখা যায়, যেমন "ছুরিতে হাত কাটল" বাক্যে "ছুরিতে" করণকারকে সপ্তমী বিভক্তি। এ কারণেই কেবল বিভক্তি দেখে কারক ঠিক করা বিপজ্জনক — প্রশ্নটিই আসল পরীক্ষা।
করণকারক কেবল বস্তুগত যন্ত্র নয়, উপায় বা কারণও বোঝাতে পারে। "পরিশ্রমে সফলতা আসে" বাক্যে "পরিশ্রমে" করণকারক, কারণ পরিশ্রমই সফলতার উপায়। "রোগে ভুগছে" বাক্যেও "রোগে" করণ, কারণ রোগ ভোগার হেতু। এই বিস্তৃত অর্থটি মাথায় না রাখলে অনেক উদাহরণে ভুল হয়। পরীক্ষায় করণকারক নির্ণয়ের সময় তাই প্রথমেই দেখো ক্রিয়াটি কীসের সাহায্যে সম্পন্ন হচ্ছে; উত্তরটি হাতে ধরা কোনো বস্তু না হয়ে একটি গুণ বা অবস্থাও হতে পারে, তাতে কারক বদলায় না।
মনে রাখার কথা
যন্ত্র, উপায় ও হেতু — তিনটিই করণকারকের অধীনে পড়ে, কেবল হাতে ধরা যন্ত্র নয়।
সাধারণ ভুল
পরীক্ষায় এই ভুলগুলোই সবচেয়ে বেশি নম্বর কাটে। ভুল রূপটি দেখে নিলে নিজের লেখায় ধরা সহজ হয়।
- ✗ “ছুরিতে ফল কাটা” — অধিকরণ কারক। ✓ করণকারক — কী দিয়ে কাটা হলো, ছুরি দিয়ে।
- ✗ “শিক্ষক কর্তৃক পুরস্কৃত” — করণ কারক। ✓ কর্তৃকারক — শিক্ষক কাজটির সম্পাদক।
- ✗ করণ মানে কেবল হাতে ধরা যন্ত্র। ✓ উপায়, মাধ্যম, উপকরণ, চিহ্ন ও হেতুও করণ হতে পারে।
- ✗ করণকারকে কেবল তৃতীয়া বিভক্তি বসে। ✓ এ, য়, তে বিভক্তিও বসে — হাতে লেখা।
অনুশীলন
নিচের প্রশ্নগুলোর উত্তর নিজে লেখো, তারপর মিলিয়ে নাও।
- করণকারক কাকে বলে?
- করণ চেনার প্রশ্ন কী?
- করণকারকে সাধারণত কোন বিভক্তি বসে?
- করণ ও অধিকরণ আলাদা করবে কীভাবে?
- “পরিশ্রমে সাফল্য আসে” — কোন কারক ও কেন?
- কর্মবাচ্যে “কর্তৃক” থাকলে কারক কী হয়?
- হেতু অর্থে করণকারকের উদাহরণ দাও।
- করণকারক কি কেবল যন্ত্র বোঝায়?
- করণকারকে সাধু ও চলিত রূপ কীভাবে বদলায়?
- করণ ও কর্তা আলাদা করার প্রশ্ন কী?
- করণকারকের সংজ্ঞায় “করণ” শব্দের অর্থ কী?
- করণকারক নির্ণয়ে বিভক্তির চেয়ে কী বেশি নির্ভরযোগ্য?
উত্তর
- ক্রিয়া সম্পাদনের উপায়, যন্ত্র বা সহায়ককে করণ বলে, আর ক্রিয়ার সঙ্গে সেই করণের সম্পর্কই করণকারক।
- ক্রিয়াকে “কী দিয়ে”, “কীসের দ্বারা” বা “কী উপায়ে” প্রশ্ন করা।
- তৃতীয়া বিভক্তি — দ্বারা, দিয়া, দিয়ে, কর্তৃক। কখনো এ, য়, তে বিভক্তিও বসে।
- পদটি কাজের হাতিয়ার হলে করণ (ছুরিতে কাটা), আর কাজের জায়গা বা সময় হলে অধিকরণ (গাছে ফল ধরেছে)।
- করণকারক — পরিশ্রম এখানে সাফল্য পাওয়ার উপায়।
- পদটি প্রাণবান ও কাজটির সম্পাদক হলে কর্তৃকারক — “শিক্ষক কর্তৃক পুরস্কৃত”। নিষ্প্রাণ উপায় হলে করণ — “কলম দ্বারা লিখিত”।
- “অসুখে সে আসেনি” — এখানে অসুখ না-আসার কারণ, তাই করণকারক।
- না। যন্ত্র ছাড়াও উপকরণ (ইট দিয়ে ঘর), মাধ্যম (ডাকে চিঠি), উপায় (পরিশ্রমে সাফল্য), চিহ্ন ও হেতুও (অসুখে সে আসেনি) করণকারক হতে পারে।
- সাধু ভাষায় “দ্বারা” ও “দিয়া” বসে, চলিত ভাষায় “দিয়ে”। অর্থ এক, কেবল ভাষারীতি আলাদা — “কলম দ্বারা লিখি” বনাম “কলম দিয়ে লিখি”।
- পদটি কি নিজে সিদ্ধান্ত নিয়ে কাজ করছে? করলে কর্তা (শিক্ষক কর্তৃক পুরস্কৃত), না করলে করণ (কলম দ্বারা লিখিত)। প্রাণবান সম্পাদক ও নিষ্প্রাণ উপায় — এই পার্থক্যই নির্ণায়ক।
- “করণ” মানে যন্ত্র বা উপায়। তাই যে জিনিসটি ছাড়া কাজটি করা যেত না, সেটিই করণ — নামটিই কারকের কাজ বলে দিচ্ছে।
- প্রশ্নটি। “এ” বা “তে” বিভক্তি করণ ও অধিকরণ দুটিতেই বসে, তাই “কী দিয়ে?” প্রশ্নের উত্তর মিলছে কি না — সেটিই শেষ বিচারক।
উপযোগী শ্রেণি: নবম, দশম, একাদশ, দ্বাদশ শ্রেণি।
সচরাচর জিজ্ঞাসা
ক্রিয়া সম্পাদনের যন্ত্র, উপায় বা সহায়ককে করণ বলে এবং ক্রিয়ার সঙ্গে তার সম্পর্ককে করণকারক বলে — যেমন "কলম দিয়ে লিখি"।
সাধারণত তৃতীয়া বিভক্তি — দ্বারা, দিয়া, দিয়ে, কর্তৃক। তবে "ছুরিতে হাত কাটল" বাক্যের মতো সপ্তমী বিভক্তিও বসতে পারে।
না, উপায় ও হেতুও বোঝায়। "পরিশ্রমে সফলতা আসে" বাক্যে পরিশ্রম কোনো যন্ত্র নয়, তবু সেটি করণকারক।
প্রশ্ন করে দেখো। “কী দিয়ে?” প্রশ্নের উত্তর মিললে করণ (ছুরিতে ফল কাটা), আর “কোথায়?” বা “কখন?” প্রশ্নের উত্তর মিললে অধিকরণ (গাছে ফল ধরেছে)। একই বিভক্তি, দুই কারক।
আরও বাংলা ব্যাকরণ পড়ো
বাংলা ব্যাকরণ-এর পূর্ণ তালিকা ও বাংলা লেখার অন্যান্য অংশ এক জায়গায়।
আমাদের সাথে যুক্ত থাকো
পড়াশোনার আপডেট, সাজেশন ও প্রশ্নোত্তর সবার আগে পেতে আমাদের ফেসবুক পেজ ও গ্রুপে যুক্ত হও।






















