বাচ্য — কর্তৃ, কর্ম ও ভাববাচ্য এবং বাচ্য পরিবর্তন
বাচ্যের সংজ্ঞা, তিন প্রকারভেদ এবং কর্তৃবাচ্য থেকে কর্মবাচ্যে রূপান্তরের নিয়ম।
সংজ্ঞা
বাক্যে কর্তা, কর্ম না ক্রিয়ার ভাব — কোনটি প্রধান, তার ভিত্তিতে বাক্যের যে রূপভেদ হয়, তাকে বাচ্য বলে। বাচ্য তিন প্রকার।
বাক্যে কে প্রধান হয়ে বসে
ক্রিয়ার সঙ্গে কর্তা, কর্ম বা ক্রিয়ার ভাবের যে সম্পর্ক এবং তাদের মধ্যে কে প্রধান হয়ে বসে, সেই প্রকাশভঙ্গিকে বাচ্য বলে। একই ঘটনা তিনভাবে বলা যায়, আর তিনটিই ব্যাকরণসম্মত।
সে ভাত খায় — এখানে কর্তা প্রধান, তাই কর্তৃবাচ্য। তার দ্বারা ভাত খাওয়া হয় — এখানে কর্ম প্রধান, তাই কর্মবাচ্য। তার খাওয়া হলো না — এখানে ক্রিয়ার ভাবই প্রধান, তাই ভাববাচ্য।
বাচ্য বদলালে তথ্য বদলায় না, জোর বদলায়। কে কাজটি করেছে তা গুরুত্বপূর্ণ হলে কর্তৃবাচ্য; কাজটি কার ওপর ঘটল তা গুরুত্বপূর্ণ হলে কর্মবাচ্য; আর কাজটি ঘটল কি না সেটিই মুখ্য হলে ভাববাচ্য।
- বাচ্য তিন প্রকার — কর্তৃ, কর্ম, ভাব।
- বাচ্য বদলালে জোর বদলায়, তথ্য নয়।
- কে প্রধান — সেটিই বাচ্য ঠিক করে।
- ✓ সে ভাত খায় — কর্তৃবাচ্য
- ✓ তার দ্বারা ভাত খাওয়া হয় — কর্মবাচ্য
- ✓ তার খাওয়া হলো না — ভাববাচ্য
তিন বাচ্যের চেনার চিহ্ন
প্রতিটি বাচ্যের নিজস্ব গঠনগত চিহ্ন আছে — কর্তায় কোন বিভক্তি, ক্রিয়ার রূপ কেমন। ছকটি মিলিয়ে নিলে বাচ্য নির্ণয়ে আর ভুল হয় না।
তিন বাচ্যের গঠন
| বাচ্য | কে প্রধান | কর্তায় বিভক্তি | ক্রিয়ার রূপ |
|---|---|---|---|
| কর্তৃবাচ্য | কর্তা | শূন্য | সাধারণ — খায় |
| কর্মবাচ্য | কর্ম | দ্বারা / কর্তৃক | যৌগিক — খাওয়া হয় |
| ভাববাচ্য | ক্রিয়ার ভাব | র / এর (ষষ্ঠী) | ভাববাচক — খাওয়া হলো |
- ✓ কর্তায় “দ্বারা” → কর্মবাচ্য
- ✓ কর্তায় “র / এর” → ভাববাচ্য
কর্তৃবাচ্য থেকে কর্মবাচ্যে
বাচ্য পরিবর্তনের প্রশ্নে সবচেয়ে বেশি আসে কর্তৃ থেকে কর্মে রূপান্তর। নিয়মটি তিন ধাপের এবং প্রতিবার একই।
প্রথমে কর্তায় দ্বারা, দিয়ে বা কর্তৃক বসাও। তারপর কর্মে থাকা বিভক্তি তুলে দিয়ে শূন্য বিভক্তি করো। শেষে ক্রিয়াটিকে যৌগিক রূপে বদলাও — খায় থেকে খাওয়া হয়, পড়ে থেকে পড়া হয়।
সে ভাত খায় → তার দ্বারা ভাত খাওয়া হয়। লক্ষ করো, কর্তা সে বদলে তার হয়েছে, কারণ দ্বারা অনুসর্গের আগে সর্বনাম সম্বন্ধ পদের রূপ নেয়।
| কর্তৃবাচ্য | কর্মবাচ্য |
|---|---|
| সে ভাত খায় | তার দ্বারা ভাত খাওয়া হয় |
| রহিম বই পড়ে | রহিম কর্তৃক বই পড়া হয় |
| শিক্ষক ছাত্রকে পুরস্কার দিলেন | শিক্ষক কর্তৃক ছাত্রকে পুরস্কার দেওয়া হলো |
| আমি কাজটি করেছি | আমার দ্বারা কাজটি করা হয়েছে |
- ✓ তিন ধাপ — কর্তায় দ্বারা, কর্মে শূন্য, ক্রিয়া যৌগিক
- ✗ সে দ্বারা ভাত খাওয়া হয় ✓ তার দ্বারা ভাত খাওয়া হয়
কর্তৃবাচ্য থেকে ভাববাচ্যে
ভাববাচ্যে ক্রিয়ার ভাবই প্রধান, কর্তা গৌণ হয়ে যায়। নিয়ম দুই ধাপের: কর্তায় ষষ্ঠী বিভক্তি (র, এর) বসাও, আর ক্রিয়াকে ভাববাচক রূপে বদলাও।
সে যাবে না → তার যাওয়া হবে না। আমি ঘুমাইনি → আমার ঘুমানো হয়নি। দুটিতেই কর্তা সম্বন্ধ পদের রূপ নিয়েছে এবং ক্রিয়া ভাববাচক বিশেষ্যে বদলেছে।
ভাববাচ্য বাংলায় খুব স্বাভাবিক, বিশেষত অক্ষমতা বা অনিচ্ছা বোঝাতে। আমার যাওয়া হলো না বললে দোষটি কারও ওপর না চাপিয়ে ঘটনাটি জানানো যায় — এটি ভাষার একটি সৌজন্যও।
| কর্তৃবাচ্য | ভাববাচ্য |
|---|---|
| সে যাবে না | তার যাওয়া হবে না |
| আমি ঘুমাইনি | আমার ঘুমানো হয়নি |
| তুমি এসো | তোমার আসা হোক |
| সে হাসল | তার হাসা হলো |
- ✓ কর্তায় ষষ্ঠী + ক্রিয়া ভাববাচক → ভাববাচ্য
- ✓ অক্ষমতা বা সৌজন্য বোঝাতে ভাববাচ্য স্বাভাবিক
কর্মকর্তৃবাচ্য — চতুর্থ একটি রূপ
কখনো কর্মই কর্তার মতো আচরণ করে, অর্থাৎ কর্ম নিজেই যেন কাজটি করছে — একে বলে কর্মকর্তৃবাচ্য। বাঁশি বাজে — বাঁশি নিজে বাজছে না, কেউ বাজাচ্ছে, তবু বাক্যে বাঁশিই কর্তার জায়গায়।
কাজটি শেষ হলো, ভাত ফুটছে, ঢাক বাজে — সব কটিতেই একই ব্যাপার। কর্তা উহ্য, কর্ম কর্তার জায়গা নিয়েছে, আর ক্রিয়া কর্মের অনুসারী হয়েছে।
এটি আলাদা বাচ্য না কর্মবাচ্যেরই একটি রূপ — সে নিয়ে ব্যাকরণবিদদের মতভেদ আছে। পাঠ্যবইয়ে সাধারণত আলাদা করেই দেখানো হয়, তাই পরীক্ষায় নাম জিজ্ঞাসা করলে কর্মকর্তৃবাচ্যই লিখতে হবে।
| বাক্য | উহ্য কর্তা | কর্ম |
|---|---|---|
| বাঁশি বাজে | কেউ | বাঁশি |
| কাজটি শেষ হলো | কেউ | কাজ |
| ভাত ফুটছে | কেউ | ভাত |
| ঢাক বাজে | কেউ | ঢাক |
- ✓ কর্ম কর্তার জায়গা নিয়েছে
- ✗ “বাঁশি বাজে” — কর্তৃবাচ্য ✓ কর্মকর্তৃবাচ্য
পরীক্ষায় কী আসে
বাচ্য অধ্যায় থেকে প্রশ্ন সাধারণত দুই রকম — একটি বাক্যের বাচ্য নির্ণয়, অথবা এক বাচ্য থেকে অন্য বাচ্যে রূপান্তর। দ্বিতীয়টি বেশি নম্বরের এবং সেখানেই নিয়ম মনে রাখা জরুরি।
রূপান্তরের প্রশ্নে সবচেয়ে বেশি ভুল হয় কর্তার রূপ বদলাতে ভুলে গিয়ে। সে থেকে তার, আমি থেকে আমার — সর্বনামের এই রূপবদল না করলে বাক্যটি অশুদ্ধ থেকে যায়।
নির্ণয়ের প্রশ্নে কর্তার বিভক্তি দেখো: শূন্য হলে কর্তৃবাচ্য, দ্বারা বা কর্তৃক হলে কর্মবাচ্য, র বা এর হলে ভাববাচ্য। এই একটি সূত্রেই বেশির ভাগ উত্তর মেলে।
- কর্তায় শূন্য → কর্তৃ; দ্বারা → কর্ম; র/এর → ভাব।
- রূপান্তরে সর্বনামের রূপ বদলাতে ভুলো না।
- কর্ম কর্তার জায়গায় বসলে কর্মকর্তৃবাচ্য।
- ✗ সে দ্বারা কাজটি করা হলো ✓ তার দ্বারা কাজটি করা হলো
বিস্তারিত আলোচনা
কর্তৃবাচ্যে কর্তাই প্রধান এবং ক্রিয়া কর্তাকে অনুসরণ করে — "রহিম বইটি পড়ে"। এটি বাংলার স্বাভাবিক ও সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত বাচ্য। এখানে কর্তা শূন্য বিভক্তিতে থাকে এবং ক্রিয়াপদ কর্তার পুরুষ অনুযায়ী রূপ নেয়।
কর্মবাচ্যে কর্মই প্রধান হয়ে ওঠে এবং কর্তা গৌণ হয়ে "কর্তৃক" বা "দ্বারা" নিয়ে বসে — "রহিম কর্তৃক বইটি পঠিত হয়"। এখানে ক্রিয়া কর্মের অনুসারী হয়। ভাববাচ্যে ক্রিয়ার ভাবটিই প্রধান, কর্তা ষষ্ঠী বা তৃতীয়া বিভক্তি নেয় এবং ক্রিয়া সর্বদা নাম পুরুষের রূপে থাকে — "আমার যাওয়া হবে না"।
বাচ্য পরিবর্তনের নিয়ম নির্দিষ্ট। কর্তৃবাচ্য থেকে কর্মবাচ্যে যেতে কর্তায় "কর্তৃক" বা "দ্বারা" যোগ করতে হয়, কর্মকে শূন্য বিভক্তিতে আনতে হয় এবং ক্রিয়াকে কর্মভাবাপন্ন করতে হয়। উল্টো পথে গেলে ঠিক বিপরীত ধাপগুলো প্রয়োগ করতে হয়। কাল ও অর্থ অপরিবর্তিত রাখাই বাচ্য পরিবর্তনের প্রধান শর্ত।
মনে রাখার কথা
বাচ্য বদলালেও বাক্যের কাল ও মূল অর্থ অবিকল একই থাকতে হবে, নইলে রূপান্তরটি ভুল।
সাধারণ ভুল
পরীক্ষায় এই ভুলগুলোই সবচেয়ে বেশি নম্বর কাটে। ভুল রূপটি দেখে নিলে নিজের লেখায় ধরা সহজ হয়।
- ✗ “সে দ্বারা ভাত খাওয়া হয়” ✓ “তার দ্বারা ভাত খাওয়া হয়” — সর্বনামের রূপ বদলাতে হয়।
- ✗ “বাঁশি বাজে” কর্তৃবাচ্য। ✓ কর্মকর্তৃবাচ্য — কর্ম কর্তার জায়গা নিয়েছে।
- ✗ ভাববাচ্যে কর্তায় “দ্বারা” বসে। ✓ ভাববাচ্যে ষষ্ঠী বিভক্তি বসে — তার, আমার।
- ✗ বাচ্য বদলালে বাক্যের তথ্য বদলে যায়। ✓ তথ্য এক থাকে, কেবল জোর বদলায়।
অনুশীলন
নিচের প্রশ্নগুলোর উত্তর নিজে লেখো, তারপর মিলিয়ে নাও।
- বাচ্য কাকে বলে ও কত প্রকার?
- কর্তৃবাচ্য থেকে কর্মবাচ্যে রূপান্তরের নিয়ম কী?
- ভাববাচ্যে রূপান্তরের নিয়ম কী?
- বাচ্য নির্ণয়ের সহজ সূত্র কী?
- কর্মকর্তৃবাচ্য কাকে বলে?
- ভাববাচ্য বাংলায় কেন এত স্বাভাবিক?
- বাচ্য পরিবর্তনে সবচেয়ে বেশি কোন ভুল হয়?
- কর্মবাচ্যে ক্রিয়ার রূপ কেমন হয়?
- বাচ্য বদলালে বাক্যের কী বদলায় আর কী বদলায় না?
উত্তর
- ক্রিয়ার সঙ্গে কর্তা, কর্ম বা ক্রিয়ার ভাবের সম্পর্ক এবং তাদের মধ্যে কে প্রধান — সেই প্রকাশভঙ্গিকে বাচ্য বলে। এটি তিন প্রকার: কর্তৃ, কর্ম ও ভাববাচ্য।
- কর্তায় দ্বারা বা কর্তৃক বসাও, কর্মে শূন্য বিভক্তি করো এবং ক্রিয়াকে যৌগিক রূপে বদলাও — “সে ভাত খায়” হয় “তার দ্বারা ভাত খাওয়া হয়”।
- কর্তায় ষষ্ঠী বিভক্তি (র, এর) বসাও এবং ক্রিয়াকে ভাববাচক রূপে বদলাও — “সে যাবে না” হয় “তার যাওয়া হবে না”।
- কর্তার বিভক্তি দেখো — শূন্য হলে কর্তৃবাচ্য, দ্বারা বা কর্তৃক হলে কর্মবাচ্য, আর র বা এর হলে ভাববাচ্য।
- যেখানে কর্মই কর্তার মতো আচরণ করে — যেমন “বাঁশি বাজে”, “কাজটি শেষ হলো”। কর্তা উহ্য থাকে এবং কর্ম কর্তার জায়গা নেয়।
- অক্ষমতা বা অনিচ্ছা বোঝাতে এটি সৌজন্যের সঙ্গে কাজ করে — “আমার যাওয়া হলো না” বললে দোষ কারও ওপর না চাপিয়ে ঘটনাটি জানানো যায়।
- সর্বনামের রূপ না বদলানো — “সে” থেকে “তার”, “আমি” থেকে “আমার” না করলে বাক্যটি অশুদ্ধ থাকে।
- যৌগিক — মূল ক্রিয়ার সঙ্গে “হওয়া” যুক্ত হয়। “খায়” হয় “খাওয়া হয়”, “পড়ে” হয় “পড়া হয়”, “করেছি” হয় “করা হয়েছে”।
- তথ্য বদলায় না, জোর বদলায়। কে কাজটি করেছে তা গুরুত্বপূর্ণ হলে কর্তৃবাচ্য, কাজটি কার ওপর ঘটল তা গুরুত্বপূর্ণ হলে কর্মবাচ্য, আর কাজটি ঘটল কি না সেটিই মুখ্য হলে ভাববাচ্য।
উপযোগী শ্রেণি: নবম, দশম, একাদশ, দ্বাদশ শ্রেণি।
সচরাচর জিজ্ঞাসা
বাক্যে কর্তা, কর্ম না ক্রিয়ার ভাব কোনটি প্রধান, তার ভিত্তিতে বাক্যের যে রূপভেদ হয়, তাকে বাচ্য বলে। এটি তিন প্রকার।
যে বাচ্যে ক্রিয়ার ভাবটিই প্রধান হয়, কর্তা ষষ্ঠী বা তৃতীয়া বিভক্তি নেয় এবং ক্রিয়া নাম পুরুষের রূপে থাকে — যেমন "আমার যাওয়া হবে না"।
কর্তায় "কর্তৃক" বা "দ্বারা" যোগ করতে হয়, কর্মকে শূন্য বিভক্তিতে আনতে হয় এবং ক্রিয়াকে কর্মভাবাপন্ন করতে হয়। কাল অপরিবর্তিত থাকবে।
কর্তার বিভক্তি দেখা। শূন্য হলে কর্তৃবাচ্য (সে ভাত খায়), “দ্বারা” বা “কর্তৃক” হলে কর্মবাচ্য (তার দ্বারা ভাত খাওয়া হয়), আর “র” বা “এর” হলে ভাববাচ্য (তার খাওয়া হলো না)।
আরও বাংলা ব্যাকরণ পড়ো
বাংলা ব্যাকরণ-এর পূর্ণ তালিকা ও বাংলা লেখার অন্যান্য অংশ এক জায়গায়।
আমাদের সাথে যুক্ত থাকো
পড়াশোনার আপডেট, সাজেশন ও প্রশ্নোত্তর সবার আগে পেতে আমাদের ফেসবুক পেজ ও গ্রুপে যুক্ত হও।






















