সমোচ্চারিত ভিন্নার্থক শব্দ — অর্থসহ উদাহরণ
উচ্চারণে এক অথচ বানান ও অর্থে ভিন্ন শব্দজোড়ার ব্যাখ্যা এবং বাক্যে প্রয়োগের নিয়ম।
সংজ্ঞা
উচ্চারণে প্রায় একই শোনালেও বানান ও অর্থের দিক থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন — এমন শব্দগুলোকে সমোচ্চারিত ভিন্নার্থক শব্দ বলে।
উচ্চারণ এক, অর্থ আলাদা
যেসব শব্দের উচ্চারণ এক বা প্রায় এক অথচ বানান ও অর্থ আলাদা, তাদের সমোচ্চারিত শব্দ বলে। কূল মানে তীর আর কুল মানে বংশ — উচ্চারণে পার্থক্য প্রায় নেই, কিন্তু অর্থ সম্পূর্ণ ভিন্ন।
এই শব্দগুলো বাংলা বানানের সবচেয়ে বড় ফাঁদ, কারণ কান শুনে বানান ঠিক করা যায় না। শ, ষ, স একই রকম শোনায়; ই ও ঈ, উ ও ঊ, ন ও ণ — সবেরই একই সমস্যা।
তাই সমোচ্চারিত শব্দ শেখা মানে অর্থ ও বানান একসঙ্গে শেখা। শব্দটির অর্থ জানা না থাকলে বানানও ঠিক করা যায় না — দুটি অবিচ্ছেদ্য।
- উচ্চারণ এক, বানান ও অর্থ আলাদা।
- কান শুনে বানান ঠিক করা যায় না।
- অর্থ ও বানান একসঙ্গে শিখতে হয়।
- ✓ কূল (তীর) / কুল (বংশ)
- ✓ শব (মৃতদেহ) / সব (সকল)
শ, ষ, স ঘটিত জোড়া
সবচেয়ে বড় দলটি তিনটি উষ্মধ্বনি নিয়ে। বাংলায় শ, ষ ও স-এর উচ্চারণ প্রায় মিলে গেছে, অথচ বানানে তিনটি আলাদা — তাই ভুলও এখানেই সবচেয়ে বেশি।
শ / ষ / স ঘটিত সমোচ্চারিত শব্দ
| শব্দ | অর্থ | শব্দ | অর্থ |
|---|---|---|---|
| শব | মৃতদেহ | সব | সকল |
| শাপ | অভিশাপ | সাপ | সর্প |
| শোক | দুঃখ | শখ | ইচ্ছা |
| বিষ | গরল | বিশ | সংখ্যা ২০ |
| কেশ | চুল | কেস | মামলা |
| শ্বাস | নিঃশ্বাস | সাস | — |
- ✓ বিষ (গরল) / বিশ (২০)
- ✓ শাপ (অভিশাপ) / সাপ (সর্প)
হ্রস্ব ও দীর্ঘ স্বরের জোড়া
দ্বিতীয় বড় দলটি ই/ঈ ও উ/ঊ নিয়ে। বাংলায় হ্রস্ব ও দীর্ঘ স্বরের উচ্চারণগত পার্থক্য প্রায় মুছে গেছে, তাই বানানে কোনটি বসবে তা কেবল অর্থ থেকেই জানা যায়।
| শব্দ | অর্থ | শব্দ | অর্থ |
|---|---|---|---|
| কূল | তীর | কুল | বংশ |
| দিন | দিবস | দীন | দরিদ্র |
| নিরস | রসহীন | নীরস | শুষ্ক |
| শুর | বীর | সুর | ধ্বনি |
| পূত | পবিত্র | পুত | পুত্র |
| ভীত | ভয়প্রাপ্ত | ভিত | ভিত্তি |
- ✓ দিন (দিবস) / দীন (দরিদ্র)
- ✓ ভীত (ভয়প্রাপ্ত) / ভিত (ভিত্তি)
ন ও ণ, এবং অন্যান্য জোড়া
তৃতীয় দলটি দন্ত্য-ন ও মূর্ধন্য-ণ নিয়ে, আর সেখানেও উচ্চারণে পার্থক্য নেই। এ ছাড়া কিছু জোড়া আছে যেখানে যুক্তবর্ণ বা অনুস্বার পার্থক্য গড়ে দেয়।
| শব্দ | অর্থ | শব্দ | অর্থ |
|---|---|---|---|
| অনু | পশ্চাৎ | অণু | ক্ষুদ্র কণা |
| পাণি | হাত | পানি | জল |
| কণা | ক্ষুদ্র অংশ | কনা | — |
| বাণী | কথা | বানি | মজুরি |
| আশা | ভরসা | আসা | আগমন |
| অংশ | ভাগ | অংস | কাঁধ |
- ✓ অনু (পশ্চাৎ) / অণু (ক্ষুদ্র কণা)
- ✓ বাণী (কথা) / বানি (মজুরি)
বাক্যে প্রয়োগ করে অর্থ দেখানো
পরীক্ষায় প্রায়ই বলা হয় সমোচ্চারিত শব্দ দুটিকে আলাদা বাক্যে প্রয়োগ করে অর্থ স্পষ্ট করতে। এটিই সবচেয়ে নম্বরের প্রশ্ন, কারণ এতে অর্থ ও বানান দুটিই যাচাই হয়।
বাক্যটি এমন হতে হবে যাতে শব্দটির অর্থ প্রসঙ্গ থেকেই বোঝা যায়। নদীর কূলে বসে আছি — এখানে কূল যে তীর তা স্পষ্ট। সে উচ্চ কুলে জন্মেছে — এখানে কুল যে বংশ তা স্পষ্ট।
কেবল শব্দটি বসিয়ে দিলে হবে না। কূল ভালো লিখলে অর্থ বোঝা যায় না, তাই নম্বরও মেলে না — প্রসঙ্গটিই আসল।
| শব্দ | বাক্যে প্রয়োগ |
|---|---|
| কূল | নদীর কূলে বসে আছি |
| কুল | সে উচ্চ কুলে জন্মেছে |
| দিন | আজ শুভ দিন |
| দীন | দীন-দুঃখীর সেবা করো |
| শাপ | মুনির শাপে সে পাথর হলো |
| সাপ | বনে সাপ দেখা গেল |
- ✗ কূল ভালো ✓ নদীর কূলে বসে আছি — প্রসঙ্গে অর্থ স্পষ্ট
পরীক্ষায় কী আসে
সমোচ্চারিত শব্দ থেকে প্রশ্ন সাধারণত দুই রকম — জোড়া দুটির অর্থ লেখা, অথবা আলাদা বাক্যে প্রয়োগ করে দেখানো। দ্বিতীয়টিতে বেশি নম্বর।
প্রস্তুতির সেরা উপায় ধ্বনিভিত্তিক ভাগ — শ/ষ/স-এর জোড়াগুলো একসঙ্গে, ই/ঈ-র জোড়াগুলো একসঙ্গে, ন/ণ-এর জোড়াগুলো একসঙ্গে। একই ধ্বনির ভুল একসঙ্গে দেখলে পার্থক্যও স্পষ্ট হয়।
সবচেয়ে বেশি ভুল হয় কূল/কুল ও দিন/দীন নিয়ে। এই দুটি জোড়া আলাদা করে মনে রাখলে বাকিগুলোর ধরনও চেনা হয়ে যায়।
- ধ্বনিভিত্তিক ভাগ করে মুখস্থ করো।
- বাক্যে প্রয়োগে প্রসঙ্গই অর্থ স্পষ্ট করে।
- সমোচ্চারিত ও সমার্থক গুলিয়ো না।
- ✓ শ/ষ/স একসঙ্গে, ই/ঈ একসঙ্গে — এভাবে সাজাও
সমোচ্চারিত শব্দ ভুল হলে কী হয়
সমোচ্চারিত শব্দের ভুল বানান কেবল নম্বর কাটে না, অর্থই বদলে দেয়। দীন-দুঃখীর সেবা লিখতে গিয়ে দিন-দুঃখীর সেবা লিখলে বাক্যটি অর্থহীন হয়ে যায়।
একইভাবে নদীর কূলে লিখতে গিয়ে নদীর কুলে লিখলে নদীর বংশের কথা বলা হয়ে যায়। বানানের একটি মাত্রা-চিহ্নের হেরফেরে বাক্যের বক্তব্যই পাল্টে যায়।
এ কারণেই এই অধ্যায়টি কেবল মুখস্থের নয়, বোঝার। শব্দটির অর্থ জানা থাকলে বানানও নিজে থেকেই ঠিক হয়ে যায়; অর্থ না জানলে যত মুখস্থই করো, পরীক্ষার হলে গুলিয়ে যাবে।
- ভুল বানানে অর্থ বদলে যায়।
- একটি মাত্রা-চিহ্নেই পুরো বক্তব্য পাল্টায়।
- মুখস্থ নয়, অর্থ বোঝাই আসল পথ।
- ✗ দিন-দুঃখীর সেবা ✓ দীন-দুঃখীর সেবা
- ✗ নদীর কুলে বসে ✓ নদীর কূলে বসে
বিস্তারিত আলোচনা
"অন্ন" মানে ভাত আর "অন্য" মানে ভিন্ন; উচ্চারণে দুটি প্রায় একই শোনায় কিন্তু বানান ও অর্থ আলাদা। এমন জোড়া বাংলায় অনেক — "কূল" অর্থ তীর ও "কুল" অর্থ বংশ, "নীর" অর্থ জল ও "নীড়" অর্থ পাখির বাসা, "শব" অর্থ মৃতদেহ ও "সব" অর্থ সকল। সবচেয়ে চেনা জোড়াটি সম্ভবত "দিন" ও "দীন", যেখানে প্রথমটি দিবস আর দ্বিতীয়টি দরিদ্র।
এই শব্দগুলোতে ভুল হয় মূলত তিন কারণে — ই-কার ও ঈ-কারের পার্থক্য, শ-ষ-স-এর পার্থক্য এবং ন ও ণ-এর পার্থক্য। "বাণী" অর্থ কথা কিন্তু "বানি" অর্থ গয়না গড়ার মজুরি; "আপন" অর্থ নিজের কিন্তু "আপণ" অর্থ দোকান। বানানের এই ছোট একটি পার্থক্যই পুরো অর্থ বদলে দেয়, তাই লেখার সময় সতর্কতা জরুরি।
পরীক্ষায় সাধারণত একজোড়া শব্দ দিয়ে অর্থসহ বাক্য রচনা করতে বলা হয়। বাক্যটি এমন হতে হবে যেন সেখান থেকেই অর্থটি স্পষ্ট বোঝা যায় — "কূলে নৌকা ভিড়ল" ও "সে ভালো কুলের ছেলে" পাশাপাশি লিখলে পার্থক্যটি নিজেই ধরা পড়ে। কেবল অর্থ লিখে দিলে অনেক সময় পুরো নম্বর মেলে না।
মনে রাখার কথা
জোড়া ধরে অর্থসহ বাক্য লিখে অভ্যাস করলে সমোচ্চারিত শব্দে ভুল প্রায় হয় না।
সাধারণ ভুল
পরীক্ষায় এই ভুলগুলোই সবচেয়ে বেশি নম্বর কাটে। ভুল রূপটি দেখে নিলে নিজের লেখায় ধরা সহজ হয়।
- ✗ সমোচ্চারিত ও সমার্থক শব্দ এক। ✓ সমোচ্চারিত = এক উচ্চারণ ভিন্ন অর্থ; সমার্থক = এক অর্থ ভিন্ন শব্দ।
- ✗ “কুল” মানে নদীর তীর। ✓ “কূল” মানে তীর; “কুল” মানে বংশ।
- ✗ “দিন” মানে দরিদ্র। ✓ “দীন” মানে দরিদ্র; “দিন” মানে দিবস।
- ✗ বাক্যে কেবল শব্দটি বসিয়ে দেওয়া। ✓ প্রসঙ্গ এমন হতে হবে যাতে অর্থ স্পষ্ট হয়।
অনুশীলন
নিচের প্রশ্নগুলোর উত্তর নিজে লেখো, তারপর মিলিয়ে নাও।
- সমোচ্চারিত শব্দ কাকে বলে?
- অর্থ লেখো: কূল ও কুল।
- অর্থ লেখো: দিন ও দীন।
- অর্থ লেখো: অনু ও অণু।
- বাক্যে প্রয়োগ করো: শাপ ও সাপ।
- সমোচ্চারিত ও সমার্থক শব্দের পার্থক্য কী?
- এই শব্দগুলো বানানের ফাঁদ কেন?
- সমোচ্চারিত শব্দ শেখার সঠিক পদ্ধতি কী?
- বাক্যে প্রয়োগের প্রশ্নে বেশি নম্বর কেন?
- অর্থ লেখো: বাণী ও বানি।
- সমোচ্চারিত শব্দ বাংলায় এত বেশি কেন?
উত্তর
- যেসব শব্দের উচ্চারণ এক বা প্রায় এক অথচ বানান ও অর্থ আলাদা, তাদের সমোচ্চারিত শব্দ বলে।
- কূল মানে তীর বা তট, আর কুল মানে বংশ বা গোত্র।
- দিন মানে দিবস, আর দীন মানে দরিদ্র বা নিঃস্ব।
- অনু মানে পশ্চাৎ বা অনুসরণ, আর অণু মানে ক্ষুদ্র কণা।
- মুনির শাপে সে পাথর হলো। — বনে সাপ দেখা গেল।
- সমোচ্চারিত শব্দের উচ্চারণ এক কিন্তু অর্থ আলাদা (কূল, কুল); সমার্থক শব্দের অর্থ এক কিন্তু উচ্চারণ আলাদা (সূর্য, রবি)।
- কারণ কান শুনে বানান ঠিক করা যায় না — শ, ষ, স একই রকম শোনায়; ই ও ঈ, ন ও ণ-এরও একই সমস্যা। অর্থ জানা না থাকলে বানানও ঠিক হয় না।
- অর্থ ও বানান একসঙ্গে শেখা। কান শুনে বানান ঠিক করা যায় না, তাই শব্দটির অর্থ জানা না থাকলে বানানও ঠিক হয় না — দুটি অবিচ্ছেদ্য।
- কারণ সেখানে অর্থ ও বানান দুটিই একসঙ্গে যাচাই হয়। বাক্যটি এমন হতে হবে যাতে প্রসঙ্গ থেকেই শব্দটির অর্থ বোঝা যায়।
- বাণী মানে কথা বা উক্তি, আর বানি মানে গহনা তৈরির মজুরি।
- কারণ বাংলা উচ্চারণে কয়েকটি বর্ণের পার্থক্য প্রায় মুছে গেছে। শ, ষ ও স একই রকম শোনায়; হ্রস্ব ই ও দীর্ঘ ঈ-এর উচ্চারণগত পার্থক্য নেই; দন্ত্য-ন ও মূর্ধন্য-ণ-এরও একই অবস্থা। অথচ বানানে বর্ণগুলো আলাদা রয়ে গেছে, ফলে একই উচ্চারণের বহু শব্দজোড়া তৈরি হয়েছে।
উপযোগী শ্রেণি: নবম, দশম, একাদশ, দ্বাদশ শ্রেণি।
সচরাচর জিজ্ঞাসা
উচ্চারণে প্রায় একই শোনালেও বানান ও অর্থে ভিন্ন এমন শব্দকে সমোচ্চারিত ভিন্নার্থক শব্দ বলে — যেমন অন্ন অর্থ ভাত, অন্য অর্থ ভিন্ন।
"কূল" অর্থ তীর বা নদীর পাড়, আর "কুল" অর্থ বংশ বা গোষ্ঠী। কেবল ঊ-কার ও উ-কারের পার্থক্যেই অর্থ সম্পূর্ণ বদলে যায়।
সাধারণত একজোড়া শব্দ দিয়ে অর্থসহ আলাদা বাক্য রচনা করতে বলা হয়, যাতে বাক্য থেকেই প্রতিটির অর্থ স্পষ্ট বোঝা যায়।
প্রতিটি শব্দের অর্থ যেন বাক্য থেকেই স্পষ্ট বোঝা যায়। শুধু শব্দটি বসিয়ে দিলে হয় না — “নদীর কূলে বসে আছি” লিখলে অর্থ ধরা পড়ে, “কূল ভালো” লিখলে পড়ে না।
আরও বাংলা ব্যাকরণ পড়ো
বাংলা ব্যাকরণ-এর পূর্ণ তালিকা ও বাংলা লেখার অন্যান্য অংশ এক জায়গায়।
আমাদের সাথে যুক্ত থাকো
পড়াশোনার আপডেট, সাজেশন ও প্রশ্নোত্তর সবার আগে পেতে আমাদের ফেসবুক পেজ ও গ্রুপে যুক্ত হও।






















