সমার্থক শব্দ — প্রতিশব্দের তালিকা ও ব্যবহার
সমার্থক শব্দের সংজ্ঞা, প্রচলিত প্রতিশব্দের উদাহরণ এবং প্রসঙ্গভেদে অর্থের সূক্ষ্ম পার্থক্য।
সংজ্ঞা
একই বা প্রায় একই অর্থ প্রকাশ করে এমন শব্দগুলোকে সমার্থক শব্দ বা প্রতিশব্দ বলে, আর বাংলায় এদের সংখ্যা বিস্ময়করভাবে বেশি।
একই অর্থের ভিন্ন শব্দ
যেসব শব্দের অর্থ একই বা প্রায় একই, তাদের সমার্থক শব্দ বা প্রতিশব্দ বলে। সূর্য, রবি, ভানু, দিবাকর — চারটি আলাদা শব্দ, অথচ একই বস্তু বোঝায়।
বাংলায় সমার্থক শব্দ এত বেশি কারণ ভাষাটির শব্দভাণ্ডার একাধিক উৎস থেকে এসেছে। একই জিনিসের জন্য সংস্কৃত থেকে একটি শব্দ, তদ্ভব ধারায় আরেকটি, আর ফারসি বা আরবি থেকে তৃতীয় একটি শব্দ ঢুকেছে।
তবে সমার্থক মানে সম্পূর্ণ এক নয়। গৃহ, ঘর ও বাড়ি একই অর্থ বহন করলেও প্রয়োগের জায়গা আলাদা — চিঠিতে গৃহ, কথায় ঘর, আর ঠিকানায় বাড়ি। এই সূক্ষ্ম পার্থক্য বোঝাই ভালো লেখার শর্ত।
- সমার্থক শব্দের আরেক নাম প্রতিশব্দ।
- বাংলায় এত বেশি, কারণ শব্দভাণ্ডার বহু-উৎসের।
- সমার্থক মানে সম্পূর্ণ এক নয় — প্রয়োগ আলাদা।
- ✓ সূর্য, রবি, ভানু, দিবাকর — একই বস্তু
- ✓ গৃহ (আনুষ্ঠানিক) / ঘর (কথ্য) / বাড়ি (ঠিকানা)
প্রকৃতি ও আকাশবাচক সমার্থক
সবচেয়ে বেশি সমার্থক শব্দ আছে প্রকৃতি নিয়ে — সূর্য, চাঁদ, আকাশ, জল, পৃথিবী। কারণ সংস্কৃত সাহিত্যে এই বিষয়গুলো নিয়ে বহু কবিতা লেখা হয়েছে, আর প্রতিটি কবি নতুন শব্দ যোগ করেছেন।
প্রকৃতিবাচক সমার্থক শব্দ
| মূল শব্দ | সমার্থক শব্দ |
|---|---|
| সূর্য | রবি, ভানু, দিবাকর, তপন, আদিত্য, প্রভাকর |
| চাঁদ | চন্দ্র, শশী, ইন্দু, বিধু, সুধাংশু, নিশাকর |
| আকাশ | আসমান, গগন, অম্বর, নভ, ব্যোম, অন্তরিক্ষ |
| জল | পানি, বারি, সলিল, নীর, অম্বু, উদক |
| পৃথিবী | ধরা, ধরণী, বসুধা, বসুন্ধরা, অবনী, মেদিনী |
| নদী | তটিনী, স্রোতস্বিনী, প্রবাহিণী, নির্ঝরিণী |
| সমুদ্র | সাগর, জলধি, রত্নাকর, বারিধি, পয়োধি |
- ✓ রত্নাকর — সমুদ্রের সমার্থক — রত্নের আকর বা খনি
- ✓ নিশাকর — চাঁদের সমার্থক — রাতের স্রষ্টা
মানুষ ও সম্পর্কবাচক সমার্থক
দ্বিতীয় বড় দলটি মানুষ ও সম্পর্ক নিয়ে। এখানে অনেক শব্দই তৎসম, আর দৈনন্দিন কথায় কম চললেও রচনা ও কবিতায় বহুল ব্যবহৃত।
| মূল শব্দ | সমার্থক শব্দ |
|---|---|
| মানুষ | মানব, নর, লোক, জন, মনুষ্য |
| নারী | রমণী, মহিলা, ললনা, কামিনী, অঙ্গনা |
| পুত্র | ছেলে, তনয়, সুত, নন্দন, আত্মজ |
| কন্যা | মেয়ে, তনয়া, দুহিতা, নন্দিনী, আত্মজা |
| বন্ধু | মিত্র, সখা, সুহৃদ, বান্ধব |
| শত্রু | রিপু, অরি, বৈরী, প্রতিপক্ষ |
| রাজা | নৃপ, ভূপতি, নরপতি, মহীপাল |
- ✓ পুত্র → তনয়, কন্যা → তনয়া — জোড়ায় মনে রাখো
- ✓ সুহৃদ — বন্ধুর সমার্থক — সু + হৃদ, ভালো হৃদয় যার
সমার্থক শব্দ বাছাইয়ের নিয়ম
সব সমার্থক শব্দ সব জায়গায় বসে না। তিনটি বিবেচনা আছে — ভাষারীতি, প্রসঙ্গ এবং শব্দটির ভারীত্ব। পানি আর জল একই অর্থ, কিন্তু অঞ্চল ও রীতিভেদে ব্যবহার আলাদা।
কবিতায় ভারী তৎসম শব্দ মানায় — সলিল, বারি। গদ্যে হালকা শব্দই ভালো — জল, পানি। আর দাপ্তরিক লেখায় প্রচলিত শব্দ ব্যবহার করাই নিরাপদ।
রচনায় একই শব্দ বারবার না লিখে সমার্থক ব্যবহার করলে লেখা প্রাণবন্ত হয়। তবে অতিরিক্ত ভারী শব্দ বসালে লেখা কৃত্রিম শোনায় — ভারসাম্যই আসল দক্ষতা।
- কবিতায় ভারী তৎসম, গদ্যে হালকা শব্দ।
- একই শব্দের পুনরাবৃত্তি এড়াতে সমার্থক কাজে লাগে।
- অতিরিক্ত ভারী শব্দে লেখা কৃত্রিম হয়।
- ✓ গদ্যে — নদীর জল স্বচ্ছ
- ✓ কবিতায় — তটিনীর সলিল স্বচ্ছ
সমার্থক ও সমোচ্চারিত এক নয়
নাম দুটি কাছাকাছি হলেও ধারণা সম্পূর্ণ আলাদা। সমার্থক শব্দের অর্থ এক কিন্তু উচ্চারণ আলাদা — সূর্য ও রবি। সমোচ্চারিত শব্দের উচ্চারণ এক কিন্তু অর্থ আলাদা — কূল ও কুল।
পরীক্ষায় দুটি আলাদা অধ্যায় হিসেবেই আসে, তাই গুলিয়ে ফেললে পুরো উত্তরটিই ভুল হয়ে যায়। মনে রাখার সূত্র: সমার্থক = এক অর্থ, সমোচ্চারিত = এক উচ্চারণ।
| দিক | সমার্থক শব্দ | সমোচ্চারিত শব্দ |
|---|---|---|
| অর্থ | এক | আলাদা |
| উচ্চারণ | আলাদা | এক বা প্রায় এক |
| উদাহরণ | সূর্য, রবি, ভানু | কূল (তীর) / কুল (বংশ) |
| কাজ | পুনরাবৃত্তি এড়ানো | অর্থভেদ বোঝা |
- ✓ সমার্থক = এক অর্থ
- ✓ সমোচ্চারিত = এক উচ্চারণ
পরীক্ষায় কী আসে
সমার্থক শব্দ থেকে প্রশ্ন সোজাসুজি — একটি শব্দ দিয়ে বলা হয় তিনটি বা পাঁচটি সমার্থক লিখতে। উত্তর নির্দিষ্ট, তাই প্রস্তুতি নিলে নম্বর নিশ্চিত।
প্রস্তুতির সেরা উপায় বিষয়ভিত্তিক তালিকা — প্রকৃতি একসঙ্গে, মানুষ ও সম্পর্ক একসঙ্গে, গুণ ও অবস্থা একসঙ্গে। এলোমেলোভাবে মুখস্থ করলে পরীক্ষার হলে মনে পড়ে না।
বানানে সতর্ক থাকতে হয়, কারণ অনেক সমার্থক শব্দই তৎসম এবং যুক্তবর্ণে ভরা — বসুন্ধরা, স্রোতস্বিনী, সুধাংশু। ভুল বানানে লিখলে শব্দটি জানা থাকলেও নম্বর কাটা যায়।
- বিষয়ভিত্তিক তালিকা ধরে মুখস্থ করো।
- তৎসম শব্দের বানান মিলিয়ে নাও।
- সমার্থক ও সমোচ্চারিত গুলিয়ো না।
- ✗ বসুন্দরা ✓ বসুন্ধরা
- ✗ স্রোতস্বীনি ✓ স্রোতস্বিনী
গুণ ও অবস্থাবাচক সমার্থক
প্রকৃতি ও সম্পর্কের বাইরে তৃতীয় বড় দলটি গুণ ও অবস্থা নিয়ে। রচনায় একই গুণ বারবার বোঝাতে গেলে এই শব্দগুলোই কাজে লাগে, নইলে লেখা একঘেয়ে হয়ে যায়।
| মূল শব্দ | সমার্থক শব্দ |
|---|---|
| সুন্দর | মনোহর, চারু, রমণীয়, শোভন |
| বড় | বিশাল, বৃহৎ, প্রকাণ্ড, বিরাট |
| আনন্দ | হর্ষ, উল্লাস, প্রমোদ, আহ্লাদ |
| দুঃখ | বিষাদ, শোক, ব্যথা, ক্লেশ |
| শক্তি | বল, ক্ষমতা, সামর্থ্য, তেজ |
| ভয় | ত্রাস, শঙ্কা, আতঙ্ক, ভীতি |
- ✓ সুন্দর → মনোহর, চারু, রমণীয়
- ✓ আনন্দ → হর্ষ, উল্লাস, প্রমোদ
বিস্তারিত আলোচনা
বাংলায় একটি ধারণার জন্য অনেক সময় বহু শব্দ পাওয়া যায়। "সূর্য" বোঝাতে বলা যায় রবি, দিবাকর, ভানু, তপন, আদিত্য, মার্তণ্ড। "চাঁদ" বোঝাতে শশী, বিধু, সুধাকর, নিশাকর, ইন্দু। "নদী" বোঝাতে তটিনী, স্রোতস্বিনী, প্রবাহিণী, তরঙ্গিণী। এই প্রাচুর্যই বাংলা শব্দভাণ্ডারের সমৃদ্ধির প্রমাণ।
তবে সমার্থক শব্দ সবসময় হুবহু বদলযোগ্য নয়। "গৃহ" ও "কুটির" দুটোই ঘর বোঝায়, কিন্তু কুটির বললে ছোট ও সাধারণ ঘরের ছবি আসে। তেমনি "মৃত্যু" ও "প্রয়াণ" এক অর্থ বোঝালেও প্রয়াণ শব্দটি শ্রদ্ধার আবহ বহন করে। তাই লেখায় প্রতিশব্দ বসানোর আগে প্রসঙ্গটি বিবেচনা করতে হয়।
পরীক্ষায় সাধারণত একটি শব্দের তিন-চারটি প্রতিশব্দ লিখতে বলা হয়, কখনো বাক্যে প্রয়োগ করতেও বলা হয়। রচনা ও ভাব সম্প্রসারণে একই শব্দ বারবার না লিখে প্রতিশব্দ ব্যবহার করলে লেখা প্রাণবন্ত হয়। তাই সমার্থক শব্দ মুখস্থ করা কেবল নম্বরের জন্য নয়, লেখার মান বাড়ানোর জন্যও দরকারি।
মনে রাখার কথা
প্রতিশব্দ বদলযোগ্য হলেও অর্থের সূক্ষ্ম পার্থক্য থাকে, তাই প্রসঙ্গ বুঝে শব্দ বসাতে হয়।
সাধারণ ভুল
পরীক্ষায় এই ভুলগুলোই সবচেয়ে বেশি নম্বর কাটে। ভুল রূপটি দেখে নিলে নিজের লেখায় ধরা সহজ হয়।
- ✗ সমার্থক ও সমোচ্চারিত শব্দ এক। ✓ সমার্থক = এক অর্থ; সমোচ্চারিত = এক উচ্চারণ।
- ✗ সমার্থক শব্দ সব জায়গায় বদলে বসানো যায়। ✓ ভাষারীতি ও প্রসঙ্গ অনুযায়ী বাছতে হয়।
- ✗ বসুন্দরা ✓ বসুন্ধরা
- ✗ কন্যার সমার্থক তনয়। ✓ তনয়া — তনয় পুত্রের সমার্থক।
অনুশীলন
নিচের প্রশ্নগুলোর উত্তর নিজে লেখো, তারপর মিলিয়ে নাও।
- সমার্থক শব্দ কাকে বলে?
- “সূর্য”-এর পাঁচটি সমার্থক শব্দ লেখো।
- “পৃথিবী”-র চারটি সমার্থক শব্দ লেখো।
- বাংলায় সমার্থক শব্দ এত বেশি কেন?
- সমার্থক ও সমোচ্চারিত শব্দের পার্থক্য কী?
- সমার্থক শব্দ বাছাইয়ে কী কী বিবেচনা করতে হয়?
- “নদী”-র তিনটি সমার্থক শব্দ লেখো।
- সমার্থক শব্দ কি সব জায়গায় বদলে বসানো যায়?
- কবিতা ও গদ্যে সমার্থক শব্দ বাছাই আলাদা হয় কেন?
- “আনন্দ”-এর চারটি সমার্থক শব্দ লেখো।
- “ভয়”-এর তিনটি সমার্থক শব্দ লেখো।
- “দুঃখ”-এর চারটি সমার্থক শব্দ লেখো।
- সমার্থক শব্দ ব্যবহারে ভারসাম্য কেন দরকার?
উত্তর
- যেসব শব্দের অর্থ একই বা প্রায় একই, তাদের সমার্থক শব্দ বা প্রতিশব্দ বলে — যেমন সূর্য, রবি, ভানু।
- রবি, ভানু, দিবাকর, তপন ও প্রভাকর।
- ধরা, ধরণী, বসুধা ও বসুন্ধরা।
- কারণ শব্দভাণ্ডার একাধিক উৎস থেকে এসেছে — একই জিনিসের জন্য সংস্কৃত, তদ্ভব ও বিদেশি ধারায় আলাদা শব্দ ঢুকেছে।
- সমার্থক শব্দের অর্থ এক কিন্তু উচ্চারণ আলাদা (সূর্য, রবি); সমোচ্চারিত শব্দের উচ্চারণ এক কিন্তু অর্থ আলাদা (কূল, কুল)।
- ভাষারীতি, প্রসঙ্গ ও শব্দটির ভারীত্ব — কবিতায় ভারী তৎসম মানায়, গদ্যে হালকা শব্দ।
- তটিনী, স্রোতস্বিনী ও প্রবাহিণী।
- যায় না। গৃহ, ঘর ও বাড়ি একই অর্থ বহন করলেও প্রয়োগ আলাদা — চিঠিতে গৃহ, কথায় ঘর, ঠিকানায় বাড়ি। এই সূক্ষ্ম পার্থক্য বোঝাই ভালো লেখার শর্ত।
- কবিতায় ভারী তৎসম শব্দ মানায় — সলিল, বারি, তটিনী; গদ্যে হালকা শব্দই ভালো — জল, নদী। অতিরিক্ত ভারী শব্দ বসালে গদ্য কৃত্রিম শোনায়।
- হর্ষ, উল্লাস, প্রমোদ ও আহ্লাদ।
- ত্রাস, শঙ্কা ও আতঙ্ক।
- বিষাদ, শোক, ব্যথা ও ক্লেশ।
- একই শব্দ বারবার লিখলে লেখা একঘেয়ে হয়, আবার অতিরিক্ত ভারী তৎসম শব্দ বসালে লেখা কৃত্রিম শোনায়। তাই প্রসঙ্গ ও ভাষারীতি দেখে শব্দ বাছাই করতে হয় — গদ্যে হালকা শব্দ, কবিতায় ভারী শব্দ।
উপযোগী শ্রেণি: নবম, দশম, একাদশ, দ্বাদশ শ্রেণি।
সচরাচর জিজ্ঞাসা
একই বা প্রায় একই অর্থ প্রকাশ করে এমন শব্দগুলোকে সমার্থক শব্দ বা প্রতিশব্দ বলে — যেমন সূর্যের প্রতিশব্দ রবি, দিবাকর, ভানু।
না। "গৃহ" ও "কুটির" এক অর্থ বোঝালেও কুটির ছোট ঘর বোঝায়, তাই প্রসঙ্গ বুঝে প্রতিশব্দ বসাতে হয়।
শশী, বিধু, সুধাকর, নিশাকর, ইন্দু, চন্দ্র — এগুলো চাঁদের প্রচলিত প্রতিশব্দ, যা কবিতা ও রচনায় ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়।
বিষয়ভিত্তিক তালিকা — প্রকৃতি একসঙ্গে, মানুষ ও সম্পর্ক একসঙ্গে, গুণ ও অবস্থা একসঙ্গে। এলোমেলোভাবে মুখস্থ করলে পরীক্ষার হলে মনে পড়ে না।
আরও বাংলা ব্যাকরণ পড়ো
বাংলা ব্যাকরণ-এর পূর্ণ তালিকা ও বাংলা লেখার অন্যান্য অংশ এক জায়গায়।
আমাদের সাথে যুক্ত থাকো
পড়াশোনার আপডেট, সাজেশন ও প্রশ্নোত্তর সবার আগে পেতে আমাদের ফেসবুক পেজ ও গ্রুপে যুক্ত হও।






















