যতিচিহ্ন — বিরামচিহ্নের তালিকা ও ব্যবহারের নিয়ম
যতিচিহ্নের সংজ্ঞা, প্রধান চিহ্নগুলোর তালিকা এবং কোথায় কোন চিহ্ন বসে তার নিয়ম।
সংজ্ঞা
লেখায় থামা, বিরতি ও ভাবের গতি বোঝাতে যেসব চিহ্ন ব্যবহৃত হয়, তাদের যতিচিহ্ন বা বিরামচিহ্ন বলে।
লেখায় থামার চিহ্ন
বাক্যের অর্থ স্পষ্ট করতে এবং পড়ার সময় কোথায় কতটুকু থামতে হবে তা বোঝাতে যেসব চিহ্ন ব্যবহৃত হয়, তাদের যতিচিহ্ন বা বিরামচিহ্ন বলে। যতি শব্দের অর্থই বিরতি বা থামা।
কথা বলার সময় আমরা স্বাভাবিকভাবেই থামি, স্বর ওঠানামা করাই, জোর দিই। লেখায় সেই সবটুকু হারিয়ে যায় — যতিচিহ্নই সেই ঘাটতি পূরণ করে। তাই যতিচিহ্ন লেখার সাজসজ্জা নয়, অর্থেরই অংশ।
একটি চিহ্ন বদলে দিলে বাক্যের অর্থ পাল্টে যেতে পারে। সে আসবে না আর সে আসবে, না? — একই শব্দ, কিন্তু কমা ও প্রশ্নচিহ্ন অর্থ সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছে।
- যতি শব্দের অর্থ বিরতি।
- বক্তৃতার থামা ও স্বরভঙ্গি লেখায় ধরে রাখে।
- চিহ্ন বদলালে অর্থ বদলায়।
- ✓ সে আসবে না। — সে আসবে, না?
- ✓ যতিচিহ্ন অর্থেরই অংশ, সাজসজ্জা নয়
যতিচিহ্ন ও বিরতির পরিমাণ
প্রতিটি যতিচিহ্নের জন্য নির্দিষ্ট বিরতিকাল আছে, আর পরীক্ষায় এই হিসাবটি সরাসরি জিজ্ঞাসা করা হয়। এক মাত্রা বলতে বোঝায় এক সেকেন্ড থামা।
যতিচিহ্ন ও বিরতিকাল
| চিহ্ন | নাম | বিরতি |
|---|---|---|
| , | কমা | ১ বলতে যে সময় লাগে |
| ; | সেমিকোলন | ১ বলার দ্বিগুণ সময় |
| । | দাঁড়ি | ১ সেকেন্ড |
| ? | প্রশ্নচিহ্ন | ১ সেকেন্ড |
| ! | বিস্ময়চিহ্ন | ১ সেকেন্ড |
| : | কোলন | ১ সেকেন্ড |
| — | ড্যাশ | ১ সেকেন্ড |
| " " | উদ্ধরণচিহ্ন | থামার প্রয়োজন নেই |
- ✓ কমা < সেমিকোলন < দাঁড়ি — বিরতি বাড়ে
- ✓ হাইফেনে থামতে হয় না
প্রধান যতিচিহ্নের কাজ
প্রতিটি চিহ্নের নিজস্ব কাজ আছে, আর ভুল চিহ্ন বসালে অর্থ ঘোলাটে হয়। নিচের ছকটি কোন চিহ্ন কোথায় বসে তার সংক্ষিপ্ত নির্দেশিকা।
| চিহ্ন | কোথায় বসে |
|---|---|
| দাঁড়ি (।) | বাক্য শেষে |
| কমা (,) | একই জাতীয় পদের মাঝে, সম্বোধনের পরে |
| সেমিকোলন (;) | দুটি ঘনিষ্ঠ বাক্যাংশের মাঝে |
| কোলন (:) | উদাহরণ বা তালিকার আগে |
| প্রশ্নচিহ্ন (?) | প্রশ্নবোধক বাক্যের শেষে |
| বিস্ময়চিহ্ন (!) | আবেগ বা বিস্ময়ে |
| উদ্ধরণচিহ্ন (“ ”) | প্রত্যক্ষ উক্তিতে |
| হাইফেন (-) | সমাসবদ্ধ পদে |
| ড্যাশ (—) | ব্যাখ্যা বা বিরতি বোঝাতে |
- ✓ রহিম, করিম ও সালাম এল। — কমা তালিকায়
- ✓ সে বলল, “আমি যাব।” — উদ্ধরণচিহ্ন
কমা বসানোর নিয়ম
সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত এবং সবচেয়ে বেশি ভুল হওয়া চিহ্নটি কমা। এর প্রধান কাজ চারটি, আর চারটিই আলাদা করে জানা দরকার।
প্রথমত, একই জাতীয় একাধিক পদের মাঝে — রহিম, করিম ও সালাম এল। লক্ষ করো, শেষ দুটির মাঝে কমা নয়, ও বসে। দ্বিতীয়ত, সম্বোধনের পরে — রহিম, এদিকে এসো।
তৃতীয়ত, প্রত্যক্ষ উক্তির আগে — সে বলল, “আমি যাব।”। চতুর্থত, দীর্ঘ বাক্যে অর্থ স্পষ্ট করতে বিরতি দিতে — যদি সময় পাও, তবে এসো।
- একই জাতীয় পদের মাঝে — শেষ দুটিতে ও বসে।
- সম্বোধনের পরে।
- প্রত্যক্ষ উক্তির আগে।
- দীর্ঘ বাক্যে অর্থ স্পষ্ট করতে।
- ✗ রহিম, করিম, ও সালাম এল ✓ রহিম, করিম ও সালাম এল
- ✓ যদি সময় পাও, তবে এসো
বাংলার নিজস্ব চিহ্ন — দাঁড়ি
দাঁড়ি (।) বাংলা লিপির নিজস্ব চিহ্ন, ইংরেজি ফুলস্টপ থেকে আলাদা। বাক্য শেষ করতে বাংলায় দাঁড়িই বসে, বিন্দু (.) নয় — এটি বানান-ভুলের মতোই একটি ভুল।
তবে সব জায়গায় দাঁড়ি নয়। সংক্ষিপ্ত রূপে বিন্দু বসে — ড., মো., ডা.। আর প্রশ্নবোধক ও বিস্ময়সূচক বাক্যে দাঁড়ির বদলে যথাক্রমে প্রশ্নচিহ্ন ও বিস্ময়চিহ্ন বসে।
দুটি দাঁড়ি (॥) কবিতার শ্লোক বা চরণ শেষে ব্যবহৃত হতো, আজ প্রায় অপ্রচলিত। তবে পুরোনো পুঁথি বা ধর্মগ্রন্থে এটি দেখা যায়।
| ব্যবহার | চিহ্ন | উদাহরণ |
|---|---|---|
| বাক্য শেষে | দাঁড়ি (।) | সে বাড়ি গেল। |
| সংক্ষিপ্ত রূপে | বিন্দু (.) | ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ |
| প্রশ্নে | প্রশ্নচিহ্ন (?) | সে কি এসেছে? |
| বিস্ময়ে | বিস্ময়চিহ্ন (!) | কী সুন্দর! |
- ✗ সে বাড়ি গেল. ✓ সে বাড়ি গেল।
- ✓ ড. — সংক্ষিপ্ত রূপে বিন্দু
পরীক্ষায় কী আসে
যতিচিহ্ন থেকে প্রশ্ন সাধারণত দুই রকম — চিহ্নের নাম ও বিরতিকাল লেখা, অথবা একটি চিহ্নহীন অনুচ্ছেদে যতিচিহ্ন বসানো। দ্বিতীয়টি বেশি নম্বরের এবং সেখানেই দক্ষতা যাচাই হয়।
চিহ্ন বসানোর প্রশ্নে প্রথমে পুরো অনুচ্ছেদটি পড়ে নাও — কোথায় বাক্য শেষ হচ্ছে, কোথায় প্রশ্ন, কোথায় উক্তি। তারপর ধাপে ধাপে চিহ্ন বসাও, একবারে নয়।
সবচেয়ে বেশি ভুল হয় বাংলা দাঁড়ির বদলে ইংরেজি বিন্দু বসিয়ে। বাংলা লেখায় বাক্য শেষ হয় দাঁড়িতে — এটি ভুললে পুরো অনুচ্ছেদেই নম্বর কাটা যায়।
- আগে পুরো অনুচ্ছেদ পড়ে নাও।
- বাক্য শেষে দাঁড়ি, বিন্দু নয়।
- তালিকায় শেষ দুটিতে ও, কমা নয়।
- ✗ সে বাড়ি গেল. ✓ সে বাড়ি গেল।
যতিচিহ্ন ভুল হলে কী হয়
ভুল যতিচিহ্ন কেবল সৌন্দর্যের ক্ষতি করে না, অর্থই বদলে দেয়। একটি বিখ্যাত উদাহরণ: “রোসো, মেরো না” আর “রোসো মেরো, না” — কমার জায়গা বদলে প্রাণরক্ষা ও প্রাণনাশ দুটি বিপরীত নির্দেশ দাঁড়িয়ে গেল।
দৈনন্দিন লেখাতেও এই ঝুঁকি থাকে। “শিক্ষক বললেন ছাত্রটি অসৎ” আর “শিক্ষক, বললেন ছাত্রটি, অসৎ” — প্রথমটিতে ছাত্র অসৎ, দ্বিতীয়টিতে শিক্ষক। কমা দুটিই এই উল্টে দেওয়া ঘটিয়েছে।
তাই যতিচিহ্ন বসানোর সময় প্রতিবার প্রশ্ন করতে হয় — এই চিহ্নটি কি আমি যা বলতে চাইছি সেটিই বোঝাচ্ছে? সন্দেহ হলে বাক্যটি ভেঙে ছোট করে দেওয়াই নিরাপদ।
- ভুল চিহ্নে অর্থ উল্টে যেতে পারে।
- সন্দেহ হলে বাক্য ভেঙে ছোট করো।
- প্রতিবার প্রশ্ন করো — চিহ্নটি কি ঠিক অর্থ দিচ্ছে?
- ✓ রোসো, মেরো না — প্রাণরক্ষা
- ✓ রোসো মেরো, না — বিপরীত অর্থ
বিস্তারিত আলোচনা
কথা বলার সময় আমরা স্বাভাবিকভাবেই থামি, জোর দিই, প্রশ্ন করি। লেখায় সেই থামা ও সুরের কাজটি করে যতিচিহ্ন। যতিচিহ্ন ছাড়া লেখা পড়তে গিয়ে অর্থ গুলিয়ে যায় — "চলো খাই" আর "চলো, খাই" এক কথা নয়। তাই যতিচিহ্ন কেবল সাজসজ্জা নয়, অর্থের অংশ।
প্রধান যতিচিহ্নগুলো হলো দাঁড়ি বা পূর্ণচ্ছেদ (।), কমা বা পাদচ্ছেদ (,), সেমিকোলন বা অর্ধচ্ছেদ (;), কোলন (:), প্রশ্নচিহ্ন (?), বিস্ময়চিহ্ন (!), উদ্ধরণচিহ্ন (" "), হাইফেন (-), ড্যাশ (—), বন্ধনী ( ) এবং ইলেক বা লোপচিহ্ন (্)। প্রতিটির থামার মাত্রা আলাদা — দাঁড়িতে সবচেয়ে বেশি, কমায় সবচেয়ে কম।
ব্যবহারের কয়েকটি সাধারণ নিয়ম আছে। বাক্য শেষে দাঁড়ি বসে, তবে প্রশ্নবোধক বাক্যে প্রশ্নচিহ্ন ও আবেগসূচক বাক্যে বিস্ময়চিহ্ন বসে। একজাতীয় একাধিক পদের মাঝে কমা বসে। সম্বোধনের পরে কমা বসে। উদ্ধৃত কথা উদ্ধরণচিহ্নের ভেতরে থাকে, এবং সাধারণত তার আগে কমা বসে। বাংলায় ইংরেজির ফুলস্টপের বদলে দাঁড়ি ব্যবহারই প্রমিত রীতি।
মনে রাখার কথা
যতিচিহ্ন লেখার সাজসজ্জা নয়, অর্থেরই অংশ — একটি কমা সরালে বাক্যের মানে বদলে যেতে পারে।
সাধারণ ভুল
পরীক্ষায় এই ভুলগুলোই সবচেয়ে বেশি নম্বর কাটে। ভুল রূপটি দেখে নিলে নিজের লেখায় ধরা সহজ হয়।
- ✗ সে বাড়ি গেল. ✓ সে বাড়ি গেল। — বাংলায় বাক্য শেষে দাঁড়ি।
- ✗ রহিম, করিম, ও সালাম এল। ✓ রহিম, করিম ও সালাম এল। — শেষ দুটিতে ও বসে।
- ✗ যতিচিহ্ন লেখার সাজসজ্জা। ✓ যতিচিহ্ন অর্থেরই অংশ — চিহ্ন বদলালে অর্থ বদলায়।
- ✗ সেমিকোলনের বিরতি কমার সমান। ✓ সেমিকোলনে কমার দ্বিগুণ সময় থামতে হয়।
অনুশীলন
নিচের প্রশ্নগুলোর উত্তর নিজে লেখো, তারপর মিলিয়ে নাও।
- যতিচিহ্ন কাকে বলে?
- কমা ও সেমিকোলনের বিরতিকাল কত?
- কমা কোন চার জায়গায় বসে?
- বাংলায় বাক্য শেষে কোন চিহ্ন বসে?
- একটি চিহ্ন বদলে অর্থ বদলায় — উদাহরণ দাও।
- তালিকায় শেষ দুটি পদের মাঝে কী বসে?
- যতিচিহ্ন বসানোর প্রশ্নে প্রথমে কী করবে?
- দুটি দাঁড়ি (॥) কোথায় ব্যবহৃত হতো?
উত্তর
- বাক্যের অর্থ স্পষ্ট করতে এবং পড়ার সময় কোথায় কতটুকু থামতে হবে তা বোঝাতে যেসব চিহ্ন ব্যবহৃত হয়, তাদের যতিচিহ্ন বা বিরামচিহ্ন বলে।
- কমায় ১ বলতে যে সময় লাগে, আর সেমিকোলনে তার দ্বিগুণ সময় থামতে হয়।
- একই জাতীয় পদের মাঝে, সম্বোধনের পরে, প্রত্যক্ষ উক্তির আগে এবং দীর্ঘ বাক্যে অর্থ স্পষ্ট করতে।
- দাঁড়ি (।) — ইংরেজি বিন্দু নয়। তবে সংক্ষিপ্ত রূপে বিন্দু বসে, যেমন ড., মো.।
- “সে আসবে না।” আর “সে আসবে, না?” — একই শব্দ, কিন্তু কমা ও প্রশ্নচিহ্ন অর্থ সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছে।
- কমা নয়, “ও” — যেমন “রহিম, করিম ও সালাম এল”।
- পুরো অনুচ্ছেদটি একবার পড়ে নেবে — কোথায় বাক্য শেষ, কোথায় প্রশ্ন, কোথায় উক্তি; তারপর ধাপে ধাপে চিহ্ন বসাবে।
- কবিতার শ্লোক বা চরণ শেষে। আজ এটি প্রায় অপ্রচলিত, তবে পুরোনো পুঁথি ও ধর্মগ্রন্থে এখনো দেখা যায়।
উপযোগী শ্রেণি: নবম, দশম, একাদশ, দ্বাদশ শ্রেণি।
সচরাচর জিজ্ঞাসা
লেখায় থামা, বিরতি ও ভাবের গতি বোঝাতে যেসব চিহ্ন ব্যবহৃত হয়, তাদের যতিচিহ্ন বা বিরামচিহ্ন বলে — যেমন দাঁড়ি, কমা, প্রশ্নচিহ্ন।
দাঁড়িতে বাক্য সম্পূর্ণ শেষ হয় বলে থামা সবচেয়ে দীর্ঘ, আর কমায় বাক্যের ভেতরে সামান্য বিরতি বোঝায়, তাই থামা সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত।
না, প্রমিত রীতিতে বাংলা বাক্য শেষে দাঁড়ি (।) বসে। ইংরেজির ফুলস্টপ বাংলা বাক্যের শেষে ব্যবহার করা হয় না।
যায় না। বাংলা লিপির নিজস্ব চিহ্ন দাঁড়ি (।), আর বাক্য শেষ করতে সেটিই বসে। তবে সংক্ষিপ্ত রূপে বিন্দু বসে — ড., মো., ডা.।
আরও বাংলা ব্যাকরণ পড়ো
বাংলা ব্যাকরণ-এর পূর্ণ তালিকা ও বাংলা লেখার অন্যান্য অংশ এক জায়গায়।
আমাদের সাথে যুক্ত থাকো
পড়াশোনার আপডেট, সাজেশন ও প্রশ্নোত্তর সবার আগে পেতে আমাদের ফেসবুক পেজ ও গ্রুপে যুক্ত হও।






















