মূলপাতা
লগইন

Color

Indigo
Red
Green
Teal
Blue
Purple
Rose

Mode

Light
EN

সাধু ও চলিত রীতির পার্থক্য কোথায়, কীভাবে চিনবে এবং দুই রীতি মেশালে কী ভুল হয়।

সাধু ও চলিত রীতি — পার্থক্য ও গুরুচণ্ডালী দোষ

সাধু ও চলিত রীতির পার্থক্য কোথায়, কীভাবে চিনবে এবং দুই রীতি মেশালে কী ভুল হয়।

সংজ্ঞা

বাংলা লেখ্য ভাষার দুটি রীতি — সাধু ও চলিত। ক্রিয়াপদ ও সর্বনামের রূপেই দুই রীতির প্রধান পার্থক্য ধরা পড়ে।

দুই রীতির জন্ম

বাংলা গদ্যের দুটি রীতি — সাধু ও চলিত। সাধু রীতি গড়ে ওঠে ঊনবিংশ শতকের শুরুতে, ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের গদ্যচর্চার হাত ধরে; এর শব্দভাণ্ডার তৎসম-প্রধান এবং ক্রিয়া ও সর্বনামের রূপ দীর্ঘ।

চলিত রীতি এসেছে অনেক পরে। প্রমথ চৌধুরী সবুজপত্র পত্রিকায় ১৯১৪ সালে চলিত রীতিতে লেখা শুরু করেন, আর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সেটিকে সাহিত্যের ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা দেন।

আজ প্রায় সব লেখাই চলিত রীতিতে হয়। সাধু রীতি টিকে আছে কেবল কিছু আনুষ্ঠানিক দলিলে ও পুরোনো সাহিত্যে, তাই সাধু চেনা দরকার পড়ার জন্য, লেখার জন্য নয়।

  • সাধু রীতি — ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ, ঊনবিংশ শতক।
  • চলিত রীতি — প্রমথ চৌধুরী, সবুজপত্র, ১৯১৪।
  • আজ প্রায় সব লেখা চলিত রীতিতে।
  • সাধু — তাহারা করিয়াছিল
  • চলিত — তারা করেছিল

দুই রীতির পার্থক্য কোথায়

পার্থক্যটি প্রধানত দুই জায়গায় — ক্রিয়াপদের রূপসর্বনামের রূপ। বিশেষ্য ও বিশেষণ দুই রীতিতে প্রায় একই থাকে, তাই এই দুটি চিনলেই রীতি নির্ণয় হয়ে যায়।

সাধু রীতিতে ক্রিয়াপদ দীর্ঘ ও তৎসমঘেঁষা — করিয়াছিল, যাইতেছে, খাইয়া। চলিত রীতিতে সেগুলো সংক্ষিপ্ত — করেছিল, যাচ্ছে, খেয়ে। এই সংক্ষেপণ ঘটেছে অপিনিহিতি ও অভিশ্রুতির মাধ্যমে।

সর্বনামেও একই ধারা — তাহারা হয়েছে তারা, যাহা হয়েছে যা, তাহাদিগকে হয়েছে তাদের। মাঝের হ লোপ পেয়েছে, যাকে বলে অন্তর্হতি।

সাধু ও চলিত রূপ

শ্রেণিসাধুচলিত
ক্রিয়াকরিয়াছিলকরেছিল
ক্রিয়াযাইতেছেযাচ্ছে
ক্রিয়াখাইয়াখেয়ে
সর্বনামতাহারাতারা
সর্বনামযাহাযা
সর্বনামতাহাদিগকেতাদের
অনুসর্গহইতেথেকে
অনুসর্গদ্বারা, দিয়াদিয়ে
  • ক্রিয়া ও সর্বনামেই পার্থক্য
  • বিশেষ্য ও বিশেষণ দুই রীতিতে প্রায় এক

দুই রীতির বৈশিষ্ট্য

সাধু রীতি গম্ভীর, আনুষ্ঠানিক ও ব্যাকরণে কঠোর — পদবিন্যাস সুনির্দিষ্ট এবং তৎসম শব্দ বেশি। চলিত রীতি সহজ, স্বাভাবিক ও কথ্যভাষার কাছাকাছি, তাই পড়তে ও লিখতে দুটিই সহজ।

তবে চলিত রীতি মানে আঞ্চলিক ভাষা নয়। চলিত রীতির ভিত্তি ভাগীরথী-তীরবর্তী অঞ্চলের শিক্ষিত মানুষের কথ্যভাষা, আর সেটিই আজকের প্রমিত বাংলা। উপভাষা এর থেকে আলাদা।

দিকসাধু রীতিচলিত রীতি
শব্দভাণ্ডারতৎসম-প্রধানতদ্ভব-প্রধান
ক্রিয়ারূপদীর্ঘসংক্ষিপ্ত
ভাবগম্ভীর, আনুষ্ঠানিকসহজ, স্বাভাবিক
ব্যবহারপুরোনো সাহিত্য ও দলিলআজকের সব লেখা
নাটকের সংলাপেঅনুপযোগীউপযোগী
  • চলিত রীতি আঞ্চলিক ভাষা নয়
  • চলিতের ভিত্তি — শিক্ষিত মানুষের কথ্যভাষা

গুরুচণ্ডালী দোষ

একই বাক্যে সাধু ও চলিত রীতি মিশিয়ে ফেললে যে দোষ হয়, তাকে বলে গুরুচণ্ডালী দোষগুরু মানে সাধু আর চণ্ডাল মানে চলিত — নামটিই মিশ্রণের কথা বলছে।

তাহারা বাড়ি গেল — এখানে তাহারা সাধু আর গেল চলিত, তাই বাক্যটি দোষযুক্ত। শুদ্ধ রূপ হবে হয় তাহারা বাড়ি গিয়াছিল, নয়তো তারা বাড়ি গেল

নিয়মটি কঠোর: একটি রচনায় যেকোনো একটি রীতি বেছে নিতে হবে এবং শেষ পর্যন্ত সেটিই চালাতে হবে। পরীক্ষায় গুরুচণ্ডালী দোষ ধরা পড়লে নম্বর কাটা যায়।

দোষযুক্তশুদ্ধ সাধুশুদ্ধ চলিত
তাহারা বাড়ি গেলতাহারা বাড়ি গিয়াছিলতারা বাড়ি গেল
যাহা বলছিযাহা বলিতেছিযা বলছি
সে গৃহে যাইতেছেসে গৃহে যাইতেছেসে ঘরে যাচ্ছে
  • তাহারা বাড়ি গেল তারা বাড়ি গেল
  • যাহা বলছি যা বলছি

সাধু থেকে চলিতে রূপান্তর

পরীক্ষায় প্রায়ই একটি সাধু অনুচ্ছেদ দিয়ে চলিততে রূপান্তর করতে বলা হয়। কাজটি তিন ধাপে করা যায়, আর ধাপ মেনে চললে ভুল হয় না।

প্রথমে সব ক্রিয়াপদ বদলাও — করিয়াছিল থেকে করেছিল, যাইতেছে থেকে যাচ্ছে। তারপর সব সর্বনামতাহারা থেকে তারা, যাহা থেকে যা। শেষে অনুসর্গহইতে থেকে থেকে, দ্বারা থেকে দিয়ে

বিশেষ্য ও বিশেষণ সাধারণত অপরিবর্তিত থাকে, তাই সেগুলো নিয়ে সময় নষ্ট করার দরকার নেই। তবে অতিরিক্ত ভারী তৎসম শব্দ থাকলে হালকা প্রতিশব্দ বসানো যায়।

  • ধাপ ১ — ক্রিয়াপদ বদলাও।
  • ধাপ ২ — সর্বনাম বদলাও।
  • ধাপ ৩ — অনুসর্গ বদলাও।
  • বিশেষ্য ও বিশেষণ প্রায় অপরিবর্তিত
  • সাধু — তাহারা গৃহ হইতে বাহির হইয়া গেল
  • চলিত — তারা ঘর থেকে বেরিয়ে গেল

পরীক্ষায় কী আসে

এই অধ্যায় থেকে প্রশ্ন তিন রকম — দুই রীতির পার্থক্য লেখা, গুরুচণ্ডালী দোষ চিহ্নিত করা, আর সাধু অনুচ্ছেদকে চলিততে রূপান্তর করা। তৃতীয়টি সবচেয়ে বেশি নম্বরের।

রূপান্তরের প্রশ্নে সবচেয়ে বেশি ভুল হয় একটি-দুটি সাধু রূপ থেকে যাওয়ায় — ফলে উত্তরটিই গুরুচণ্ডালী দোষে পড়ে। তাই লেখা শেষে একবার পড়ে দেখো কোথাও হইয়া, তাহা বা করিয়া রয়ে গেছে কি না।

পার্থক্য লিখতে বললে ছকের রূপে লেখাই দ্রুত ও স্পষ্ট। শব্দভাণ্ডার, ক্রিয়ারূপ, সর্বনাম ও ব্যবহারের ক্ষেত্র — এই চারটি দিক ধরে লিখলে উত্তর সম্পূর্ণ হয়।

  • রূপান্তরের পর একবার পড়ে দেখো সাধু রূপ রয়ে গেছে কি না।
  • পার্থক্য ছকের রূপে লেখো।
  • একটি রচনায় একটিই রীতি চালাও।
  • তারা গৃহ হইতে বেরিয়ে গেল তারা ঘর থেকে বেরিয়ে গেল

বিস্তারিত আলোচনা

সাধু রীতি তৎসম শব্দবহুল, ক্রিয়াপদ ও সর্বনামের রূপ দীর্ঘ এবং গঠন সুনির্দিষ্ট ও গম্ভীর — করিয়াছিলাম, তাহারা, যাহাদের, উহাদিগকে। উনিশ শতকের গদ্যে এই রীতিই প্রধান ছিল। চলিত রীতিতে সেই রূপগুলো সংক্ষিপ্ত ও কথ্যভঙ্গির কাছাকাছি — করেছিলাম, তারা, যাদের, ওদের।

দুই রীতির পার্থক্য মূলত তিন জায়গায় — ক্রিয়াপদের রূপ, সর্বনামের রূপ এবং অনুসর্গ ও অব্যয়ের রূপ। বিশেষ্য ও বিশেষণ প্রায়ই অভিন্ন থাকে, তাই কোনো লেখা সাধু না চলিত তা ধরার সবচেয়ে দ্রুত উপায় ক্রিয়াপদটি দেখা। "করিতেছিল" দেখলে সাধু, "করছিল" দেখলে চলিত।

বর্তমানে বই, সংবাদপত্র ও পরীক্ষার উত্তরপত্র সবখানেই চলিত রীতিই ব্যবহৃত হয়; সাধু রীতি এখন প্রায় সাহিত্যিক ও ঐতিহাসিক প্রসঙ্গেই সীমাবদ্ধ। তবে যে রীতিই বেছে নাও, একটি রচনায় দুই রীতি মেশানো যাবে না — মেশালেই গুরুচণ্ডালী দোষ হয়, যা পরীক্ষায় নম্বর কাটার সরাসরি কারণ।

মনে রাখার কথা

একটি লেখায় একটিই রীতি — শুরুতে যেটি বেছে নেবে, শেষ পর্যন্ত সেটিই ধরে রাখতে হবে।

সাধারণ ভুল

পরীক্ষায় এই ভুলগুলোই সবচেয়ে বেশি নম্বর কাটে। ভুল রূপটি দেখে নিলে নিজের লেখায় ধরা সহজ হয়।

  • তাহারা বাড়ি গেল। তারা বাড়ি গেল — এক রীতি চালাতে হয়।
  • চলিত রীতি মানে আঞ্চলিক ভাষা। চলিতের ভিত্তি শিক্ষিত মানুষের কথ্যভাষা; উপভাষা আলাদা।
  • চলিত রীতি প্রবর্তন করেন রবীন্দ্রনাথ। প্রমথ চৌধুরী সবুজপত্রে; রবীন্দ্রনাথ প্রতিষ্ঠা দেন।
  • সাধু ও চলিতে বিশেষ্যও আলাদা। পার্থক্য মূলত ক্রিয়া ও সর্বনামে।

অনুশীলন

নিচের প্রশ্নগুলোর উত্তর নিজে লেখো, তারপর মিলিয়ে নাও।

  1. সাধু ও চলিত রীতির প্রধান পার্থক্য কোথায়?
  2. চলিত রীতির প্রবর্তক কে?
  3. গুরুচণ্ডালী দোষ কাকে বলে?
  4. চলিত রূপ লেখো: করিয়াছিল, যাইতেছে, তাহাদিগকে।
  5. সাধু থেকে চলিতে রূপান্তরের তিন ধাপ কী?
  6. চলিত রীতির ভিত্তি কোন অঞ্চলের ভাষা?
  7. আজ সাধু রীতি কোথায় টিকে আছে?
  8. সাধু রীতি আজ কেন প্রায় ব্যবহৃত হয় না?
  9. সাধু রীতির ক্রিয়ারূপ চলিততে সংক্ষিপ্ত হলো কীভাবে?
  10. একটি রচনায় কি সাধু ও চলিত দুই রীতি ব্যবহার করা যায়?

উত্তর

  1. ক্রিয়াপদ ও সর্বনামের রূপে। বিশেষ্য ও বিশেষণ দুই রীতিতে প্রায় একই থাকে।
  2. প্রমথ চৌধুরী — সবুজপত্র পত্রিকায় ১৯১৪ সালে চলিত রীতিতে লেখা শুরু করেন; রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সেটিকে সাহিত্যের ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা দেন।
  3. একই বাক্যে সাধু ও চলিত রীতি মিশিয়ে ফেললে যে দোষ হয় — যেমন “তাহারা বাড়ি গেল”।
  4. করেছিল, যাচ্ছে ও তাদের।
  5. এক, ক্রিয়াপদ বদলানো; দুই, সর্বনাম বদলানো; তিন, অনুসর্গ বদলানো। বিশেষ্য ও বিশেষণ প্রায় অপরিবর্তিত থাকে।
  6. ভাগীরথী-তীরবর্তী অঞ্চলের শিক্ষিত মানুষের কথ্যভাষা — সেটিই আজকের প্রমিত বাংলা।
  7. কিছু আনুষ্ঠানিক দলিলে ও পুরোনো সাহিত্যে। তাই সাধু চেনা দরকার পড়ার জন্য, লেখার জন্য নয়।
  8. কারণ এর ক্রিয়া ও সর্বনামের রূপ দীর্ঘ এবং কথ্যভাষা থেকে অনেক দূরে, ফলে পড়তে ও লিখতে দুটিই কষ্টসাধ্য। চলিত রীতি স্বাভাবিক ও সহজ বলে সাহিত্য, সংবাদপত্র ও পাঠ্যবই সবই আজ চলিত রীতিতে লেখা হয়।
  9. অপিনিহিতি ও অভিশ্রুতির মাধ্যমে। “করিয়া” প্রথমে অপিনিহিতিতে “কইরা” হয়েছে, তারপর অভিশ্রুতিতে স্বরগুলো মিলে “করে” রূপ নিয়েছে — ধ্বনি পরিবর্তনের স্বাভাবিক ধারা।
  10. যায় না। একই রচনায় দুই রীতি মিশলে গুরুচণ্ডালী দোষ হয়, আর পরীক্ষায় এর জন্য নম্বর কাটা যায়। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একটি রীতিই ধরে রাখতে হয় — আজকের প্রমিত লেখায় সেটি চলিত রীতি।

উপযোগী শ্রেণি: নবম, দশম, একাদশ, দ্বাদশ শ্রেণি।

সচরাচর জিজ্ঞাসা

আরও বাংলা ব্যাকরণ পড়ো

বাংলা ব্যাকরণ-এর পূর্ণ তালিকা ও বাংলা লেখার অন্যান্য অংশ এক জায়গায়।

আমাদের সাথে যুক্ত থাকো

পড়াশোনার আপডেট, সাজেশন ও প্রশ্নোত্তর সবার আগে পেতে আমাদের ফেসবুক পেজ ও গ্রুপে যুক্ত হও।