প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম — মূল সূত্রগুলো
তৎসম ও তৎসম-বহির্ভূত শব্দের বানান, ণ-ত্ব ও ষ-ত্ব বিধানের সীমা এবং রেফ-সংক্রান্ত নিয়ম।
সংজ্ঞা
বাংলা একাডেমির প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম অনুসরণ করে শব্দের বানান লেখার যে স্বীকৃত রীতি, তাকে প্রমিত বানানরীতি বলা হয়।
প্রমিত বানানের ভিত্তি
বাংলা বানানে একসময় বিপুল অরাজকতা ছিল — একই শব্দ পাঁচ রকমে লেখা হতো। সেই বিশৃঙ্খলা কমাতেই বাংলা একাডেমি প্রমিত বানানের নিয়ম প্রকাশ করে, আর আজ পাঠ্যবই ও দাপ্তরিক লেখায় সেই রীতিই অনুসৃত হয়।
প্রমিত রীতির মূল নীতিটি সরল: তৎসম শব্দে সংস্কৃত বানান অপরিবর্তিত থাকবে, আর অ-তৎসম শব্দে বানান সরল হবে। শব্দটি তৎসম কি না — এই একটি প্রশ্নই বেশির ভাগ বানানের ফয়সালা করে দেয়।
এ কারণেই বানান শেখার আগে শব্দের উৎস চেনা দরকার। ণত্ব বিধান, ষত্ব বিধান, ঈ-কার বনাম ই-কার — সব নিয়মই তৎসম ও অ-তৎসমের ভাগ ধরে চলে।
- তৎসম শব্দে বানান অপরিবর্তিত।
- অ-তৎসম শব্দে বানান সরল।
- প্রথম প্রশ্ন — শব্দটি কি তৎসম?
- ✓ নদী (তৎসম) — ঈ-কার থাকবে
- ✓ বাড়ি (তদ্ভব) — ই-কার হবে
অ-তৎসম শব্দে কেবল ই ও উ
প্রমিত রীতির সবচেয়ে বেশি প্রয়োগ হওয়া নিয়মটি এটাই: তদ্ভব, দেশি ও বিদেশি শব্দে কেবল হ্রস্ব ই-কার ও হ্রস্ব উ-কার বসবে; দীর্ঘ ঈ-কার বা ঊ-কার নয়।
বাড়ী নয়, বাড়ি; গাড়ী নয়, গাড়ি; শাড়ী নয়, শাড়ি। শব্দ তিনটিই তদ্ভব, তাই দীর্ঘ ঈ-কারের কোনো ভিত্তি নেই। পুরোনো বইয়ে দীর্ঘ রূপ দেখা গেলেও আজ সেটি অশুদ্ধ।
একই নিয়ম -আলি প্রত্যয়েও — সোনালী নয়, সোনালি; খেয়ালী নয়, খেয়ালি; বর্ণালী নয়, বর্ণালি।
অ-তৎসম শব্দে হ্রস্ব স্বর
| অশুদ্ধ | শুদ্ধ | কারণ |
|---|---|---|
| বাড়ী | বাড়ি | তদ্ভব শব্দ |
| গাড়ী | গাড়ি | তদ্ভব শব্দ |
| শাড়ী | শাড়ি | তদ্ভব শব্দ |
| চিঠী | চিঠি | দেশি শব্দ |
| সোনালী | সোনালি | -আলি প্রত্যয় |
| খেয়ালী | খেয়ালি | -আলি প্রত্যয় |
| বেশী | বেশি | অ-তৎসম |
- ✗ বাড়ী ✓ বাড়ি
- ✗ সোনালী ✓ সোনালি
তৎসম শব্দে দীর্ঘ স্বর টিকে থাকে
উল্টো দিকে, তৎসম শব্দে সংস্কৃত বানানই বহাল থাকে — দীর্ঘ ঈ-কার বা ঊ-কার তুলে দেওয়া যায় না। নদী, পৃথিবী, সরস্বতী, ভূমি — সব কটিতেই দীর্ঘ স্বর।
একই কথা -জীবী, -কারী, -ধারী প্রত্যয়ে। এগুলো তৎসম, তাই দীর্ঘ ঈ-কার বসে — কৃষিজীবী, প্রতিবাদকারী, দায়িত্বধারী। কৃষিজীবি লেখা অশুদ্ধ।
| শুদ্ধ | অশুদ্ধ | কারণ |
|---|---|---|
| নদী | নদি | তৎসম |
| পৃথিবী | পৃথিবি | তৎসম |
| কৃষিজীবী | কৃষিজীবি | -জীবী প্রত্যয় |
| প্রতিবাদকারী | প্রতিবাদকারি | -কারী প্রত্যয় |
| মন্ত্রী | মন্ত্রি | তৎসম |
- ✗ কৃষিজীবি ✓ কৃষিজীবী
- ✗ নদি ✓ নদী
রেফের পরে দ্বিত্ব নয়
পুরোনো বানানে রেফের পরের ব্যঞ্জন দ্বিত্ব করা হতো — কর্ম্ম, ধর্ম্ম, সূর্য্য। প্রমিত রীতিতে এই দ্বিত্ব উঠে গেছে; এখন লিখতে হয় কর্ম, ধর্ম, সূর্য।
নিয়মটি সরল ও ব্যতিক্রমহীন: রেফের পরে কখনো ব্যঞ্জন দ্বিত্ব হবে না। পুরোনো বই বা শিলালিপিতে দ্বিত্ব দেখা গেলেও আজকের লেখায় সেটি অশুদ্ধ।
| পুরোনো রূপ | প্রমিত রূপ |
|---|---|
| কর্ম্ম | কর্ম |
| ধর্ম্ম | ধর্ম |
| সূর্য্য | সূর্য |
| কার্য্য | কার্য |
| বর্ণ্ণ | বর্ণ |
- ✗ কর্ম্ম ✓ কর্ম
- ✗ সূর্য্য ✓ সূর্য
বিদেশি শব্দে ণ ও ষ নয়
ণত্ব ও ষত্ব বিধান কেবল তৎসম শব্দে খাটে, তাই বিদেশি শব্দে কখনো মূর্ধন্য-ণ বা মূর্ধন্য-ষ বসবে না। স্টেশন, মাস্টার, পোস্ট, কর্নেল — সব কটিতেই দন্ত্য-ন ও দন্ত্য-স।
এই একটি নিয়ম মনে রাখলে বহু বানান-ভুল এড়ানো যায়, কারণ ইংরেজি থেকে আসা শব্দের সংখ্যা বাংলায় কম নয়। শব্দটি বিদেশি কি না — সেটাই একমাত্র বিবেচনা।
| অশুদ্ধ | শুদ্ধ | কারণ |
|---|---|---|
| ষ্টেশন | স্টেশন | বিদেশি শব্দ |
| মাষ্টার | মাস্টার | বিদেশি শব্দ |
| পোষ্ট | পোস্ট | বিদেশি শব্দ |
| কর্ণেল | কর্নেল | বিদেশি শব্দ |
| ইষ্টিশন | ইস্টিশন | বিদেশি শব্দ |
- ✗ মাষ্টার ✓ মাস্টার
- ✗ কর্ণেল ✓ কর্নেল
পরীক্ষায় কী আসে
বানান রীতি থেকে প্রশ্ন সাধারণত দুই রকম — নিয়ম লিখতে বলা, অথবা একটি তালিকা দিয়ে শুদ্ধ বানান বাছতে বলা। দ্বিতীয়টি বেশি আসে এবং সেখানে নিয়ম জানা থাকলে অনুমান করতে হয় না।
প্রতিটি বানানের সিদ্ধান্তে একটাই প্রশ্ন করো — শব্দটি তৎসম না অ-তৎসম? তৎসম হলে সংস্কৃত বানান অপরিবর্তিত; অ-তৎসম হলে হ্রস্ব ই-কার ও উ-কার, আর ণ-ষ নয়।
সবচেয়ে বেশি ভুল হয় -জীবী ও -আলি নিয়ে। প্রথমটি তৎসম প্রত্যয়, তাই দীর্ঘ ঈ-কার; দ্বিতীয়টি অ-তৎসম, তাই হ্রস্ব ই-কার। কৃষিজীবী কিন্তু সোনালি — জোড়াটি মনে রাখলে দুটিই ঠিক থাকে।
- প্রতিবার প্রশ্ন করো — তৎসম না অ-তৎসম?
- -জীবী দীর্ঘ ঈ-কার, -আলি হ্রস্ব ই-কার।
- রেফের পরে দ্বিত্ব নয়।
- ✓ কৃষিজীবী (তৎসম) কিন্তু সোনালি (অ-তৎসম)
এ-কার ও অ্যা-কার
প্রমিত রীতির আরেকটি নিয়ম এ-কার ও অ্যা-কার নিয়ে। বাংলায় এ বর্ণটি দুইভাবে উচ্চারিত হয় — কখনো এ-এর মতো (এক), কখনো অ্যা-এর মতো (একটি, যা প্রায় অ্যাকটি শোনায়)।
নিয়মটি হলো, তৎসম শব্দে সব সময় এ-কার বসবে, উচ্চারণ যাই হোক — এক, দেব, দেশ। আর বিদেশি শব্দে উচ্চারণ অনুযায়ী অ্যা-কার বসতে পারে — অ্যাসিড, অ্যাকাডেমি, ব্যাংক।
এই পার্থক্যটি না জানলে বিদেশি শব্দের বানানে ভুল হয়। একাডেমি না অ্যাকাডেমি — উত্তর হলো দ্বিতীয়টি, কারণ শব্দটি বিদেশি এবং উচ্চারণে অ্যা-ধ্বনি স্পষ্ট।
| শব্দ | শ্রেণি | যা বসে |
|---|---|---|
| এক, দেশ, দেব | তৎসম | এ-কার |
| অ্যাসিড | বিদেশি | অ্যা-কার |
| অ্যাকাডেমি | বিদেশি | অ্যা-কার |
| ব্যাংক | বিদেশি | অ্যা-ধ্বনি |
- ✗ একাডেমি ✓ অ্যাকাডেমি — বিদেশি শব্দ
- ✓ দেশ — তৎসম, তাই এ-কার
বিস্তারিত আলোচনা
প্রমিত বানানের সবচেয়ে বড় ভাগটি হলো তৎসম ও তৎসম-বহির্ভূত শব্দের আলাদা নিয়ম। তৎসম অর্থাৎ সংস্কৃত থেকে অবিকৃত অবস্থায় আসা শব্দের বানান সংস্কৃত রীতিতেই অপরিবর্তিত থাকে — নদী, স্ত্রী, পৃথিবী। কিন্তু তৎসম নয় এমন শব্দে, অর্থাৎ তদ্ভব, দেশি ও বিদেশি শব্দে, সাধারণত ই-কার ও উ-কার বসে — বাড়ি, গাড়ি, চিঠি, বাঁশি, খুশি।
ণ-ত্ব ও ষ-ত্ব বিধানও কেবল তৎসম শব্দেই প্রযোজ্য। দেশি, বিদেশি ও তদ্ভব শব্দে মূর্ধন্য ণ বসে না — তাই "কান", "সোনা", "ইরান" এমনভাবেই লেখা হয়। তেমনি বিদেশি শব্দে ষ ব্যবহার করা হয় না; ইংরেজি বা আরবি-ফারসি শব্দে স বসে। এই একটি সূত্র মনে রাখলে বহু বানান ভুল আপনাআপনি এড়ানো যায়।
আরও কয়েকটি রীতি নিয়মিত কাজে লাগে। রেফের পরে ব্যঞ্জনের দ্বিত্ব হয় না — কর্ম, ধর্ম, সূর্য এভাবেই লেখা হয়, দুবার ম বা য নয়। বিদেশি শব্দে সাধারণত অনুস্বার নয়, ঙ ব্যবহৃত হয়। আর ব্যক্তিনাম, প্রতিষ্ঠানের নাম বা লেখকের নিজস্ব বানান রীতি এই নিয়মের বাইরে থাকতে পারে, কারণ নামের বানানে ব্যক্তির পছন্দই অগ্রগণ্য।
মনে রাখার কথা
শব্দটি তৎসম কি না — এই একটি প্রশ্নের উত্তরই বাংলা বানানের বেশিরভাগ সিদ্ধান্ত ঠিক করে দেয়।
সাধারণ ভুল
পরীক্ষায় এই ভুলগুলোই সবচেয়ে বেশি নম্বর কাটে। ভুল রূপটি দেখে নিলে নিজের লেখায় ধরা সহজ হয়।
- ✗ বাড়ী, গাড়ী, শাড়ী ✓ বাড়ি, গাড়ি, শাড়ি — অ-তৎসমে হ্রস্ব ই-কার।
- ✗ কৃষিজীবি ✓ কৃষিজীবী — -জীবী তৎসম প্রত্যয়।
- ✗ কর্ম্ম, সূর্য্য ✓ কর্ম, সূর্য — রেফের পরে দ্বিত্ব নয়।
- ✗ মাষ্টার, কর্ণেল ✓ মাস্টার, কর্নেল — বিদেশি শব্দে ণ-ষ নয়।
অনুশীলন
নিচের প্রশ্নগুলোর উত্তর নিজে লেখো, তারপর মিলিয়ে নাও।
- প্রমিত বানান রীতির মূল নীতি কী?
- অ-তৎসম শব্দে কোন স্বরচিহ্ন বসে?
- শুদ্ধ বানান লেখো: বাড়ী, সোনালী, বেশী।
- “-জীবী” ও “-আলি” প্রত্যয়ে বানান আলাদা কেন?
- রেফের পরের ব্যঞ্জন সম্পর্কে প্রমিত নিয়ম কী?
- বিদেশি শব্দে ণ ও ষ বসে না কেন?
- বানান নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে প্রথম কোন প্রশ্নটি করবে?
- বিদেশি শব্দে অ্যা-কার বসে কেন?
- প্রমিত বানান রীতি কেন দরকার হলো?
উত্তর
- তৎসম শব্দে সংস্কৃত বানান অপরিবর্তিত থাকবে, আর অ-তৎসম শব্দে বানান সরল হবে।
- কেবল হ্রস্ব ই-কার ও হ্রস্ব উ-কার — যেমন বাড়ি, গাড়ি, চিঠি, বেশি।
- বাড়ি, সোনালি ও বেশি — তিনটিই অ-তৎসম শব্দ।
- “-জীবী” একটি তৎসম প্রত্যয়, তাই দীর্ঘ ঈ-কার (কৃষিজীবী); “-আলি” অ-তৎসম, তাই হ্রস্ব ই-কার (সোনালি)।
- রেফের পরে কখনো ব্যঞ্জন দ্বিত্ব হবে না — কর্ম্ম নয়, কর্ম; সূর্য্য নয়, সূর্য।
- কারণ ণত্ব ও ষত্ব বিধান কেবল তৎসম শব্দে প্রযোজ্য। তাই স্টেশন, মাস্টার, কর্নেল — সব কটিতে দন্ত্য-ন ও দন্ত্য-স।
- শব্দটি তৎসম না অ-তৎসম — এই একটি প্রশ্নই বেশির ভাগ বানানের ফয়সালা করে দেয়।
- কারণ তৎসম শব্দে উচ্চারণ যাই হোক এ-কারই বসে, কিন্তু বিদেশি শব্দে উচ্চারণ অনুযায়ী বানান হয়। তাই “দেশ” এ-কারে, আর “অ্যাকাডেমি” ও “অ্যাসিড” অ্যা-কারে।
- একসময় একই শব্দ পাঁচ রকমে লেখা হতো, ফলে বই ও দলিলে বিপুল অসংগতি তৈরি হয়। সেই বিশৃঙ্খলা কমাতেই বাংলা একাডেমি প্রমিত বানানের নিয়ম প্রকাশ করে, আর আজ পাঠ্যবই ও দাপ্তরিক লেখায় সেটিই অনুসৃত হয়।
উপযোগী শ্রেণি: নবম, দশম, একাদশ, দ্বাদশ শ্রেণি।
সচরাচর জিজ্ঞাসা
তৎসম শব্দের বানান সংস্কৃত রীতিতে অপরিবর্তিত থাকে (নদী, স্ত্রী); তৎসম-বহির্ভূত শব্দে সাধারণত ই-কার ও উ-কার বসে (বাড়ি, চিঠি, খুশি)।
কেবল তৎসম শব্দে। দেশি, বিদেশি ও তদ্ভব শব্দে মূর্ধন্য ণ বসে না — তাই কান, সোনা, ইরান এভাবেই লেখা হয়।
না, বসে না। প্রমিত রীতিতে কর্ম, ধর্ম, সূর্য এভাবেই লেখা হয় — রেফের পরে ব্যঞ্জনটি দুবার লেখা হয় না।
শব্দটি তৎসম না অ-তৎসম। তৎসম হলে সংস্কৃত বানান অপরিবর্তিত থাকবে (নদী, কৃষিজীবী); অ-তৎসম হলে হ্রস্ব ই-কার ও উ-কার বসবে (বাড়ি, সোনালি) এবং ণ বা ষ বসবে না।
আরও বাংলা ব্যাকরণ পড়ো
বাংলা ব্যাকরণ-এর পূর্ণ তালিকা ও বাংলা লেখার অন্যান্য অংশ এক জায়গায়।
আমাদের সাথে যুক্ত থাকো
পড়াশোনার আপডেট, সাজেশন ও প্রশ্নোত্তর সবার আগে পেতে আমাদের ফেসবুক পেজ ও গ্রুপে যুক্ত হও।






















