বহুব্রীহি সমাস — নিয়ম, প্রকারভেদ ও উদাহরণ
বহুব্রীহি সমাসের সংজ্ঞা, চেনার উপায় এবং সমানাধিকরণ, ব্যধিকরণ ও ব্যতিহার বহুব্রীহি।
সংজ্ঞা
যে সমাসে পূর্বপদ বা পরপদ কোনোটিরই অর্থ প্রধান না হয়ে তৃতীয় কোনো অর্থ প্রধান হয়, তাকে বহুব্রীহি সমাস বলে। সমস্তপদটি সাধারণত একটি বিশেষণে পরিণত হয়।
অন্য পদের অর্থ প্রধান
যে সমাসে সমস্যমান কোনো পদেরই অর্থ প্রধান থাকে না, বরং তৃতীয় কোনো কিছুর অর্থ বোঝায়, তাকে বহুব্রীহি সমাস বলে। নীলকণ্ঠ মানে নীল নয়, কণ্ঠও নয় — শিব। অর্থটি দুই পদের বাইরে চলে গেছে বলেই একে বলা হয় “অন্য পদের অর্থ প্রধান”।
নামটি নিজেই এর সবচেয়ে ভালো উদাহরণ। বহু ব্রীহি মানে অনেক ধান; কিন্তু বহুব্রীহি শব্দটি ধান বোঝায় না, বোঝায় সেই ব্যক্তিকে যার অনেক ধান আছে — অর্থাৎ ধনী।
চেনার সূত্র ব্যাসবাক্যে। বহুব্রীহির ব্যাসবাক্যে প্রায় সব সময় যার, যাতে, যাদের, যে — এই জাতীয় সম্বন্ধসূচক শব্দ থাকে, কারণ সেটিই অর্থকে তৃতীয় কারও দিকে পাঠায়।
- ব্যাসবাক্যে যার / যাতে / যাদের থাকে।
- সমস্তপদের অর্থ দুই পদের বাইরে।
- নামটি নিজেই উদাহরণ — বহু ব্রীহি আছে যার।
- ✓ নীল কণ্ঠ যার = নীলকণ্ঠ (শিব)
- ✓ দশ আনন যার = দশানন (রাবণ)
- ✗ দশানন দ্বিগু সমাস ✓ দশানন বহুব্রীহি — সমাহার নেই
বহুব্রীহির প্রধান প্রকারভেদ
বহুব্রীহি সমাসের ভাগ সবচেয়ে বেশি, আর পরীক্ষায় প্রকার নির্ণয়ই মূল প্রশ্ন। প্রতিটি ভাগের চেনার আলাদা চিহ্ন আছে, তাই ছকটি একবার মিলিয়ে নেওয়াই যথেষ্ট।
বহুব্রীহির প্রকার
| প্রকার | চেনার চিহ্ন | উদাহরণ |
|---|---|---|
| সমানাধিকরণ | পূর্বপদ বিশেষণ | নীল কণ্ঠ যার = নীলকণ্ঠ |
| ব্যধিকরণ | পূর্বপদে বিভক্তি | আশীতে বিষ যার = আশীবিষ |
| ব্যতিহার | পরস্পর ক্রিয়া | হাতে হাতে যে যুদ্ধ = হাতাহাতি |
| নঞ | না-বোধক পূর্বপদ | নাই জ্ঞান যার = অজ্ঞান |
| সংখ্যাবাচক | সংখ্যা + যার | দশ আনন যার = দশানন |
| মধ্যপদলোপী | মাঝের পদ লোপ | বিড়াল চোখের ন্যায় চোখ যার = বিড়ালচোখো |
| সহার্থক | সহ বা স | স্ত্রীর সহিত = সস্ত্রীক |
| অলুক | বিভক্তি টিকে থাকে | গায়ে হলুদ, মুখেভাত |
- ✓ কানে কানে যে কথা = কানাকানি — ব্যতিহার
- ✓ বান্ধবের সহিত = সবান্ধব — সহার্থক
ব্যতিহার বহুব্রীহি — পারস্পরিক ক্রিয়া
দুই পক্ষের মধ্যে পরস্পর ঘটা ক্রিয়া বোঝাতে যে বহুব্রীহি হয়, তাকে ব্যতিহার বহুব্রীহি বলে। হাতাহাতি, কানাকানি, লাঠালাঠি, চুলোচুলি — প্রতিটিতেই কাজটি দুই পক্ষ পরস্পরের প্রতি করছে।
গঠনে একটি নিয়মিত ধারা আছে: পূর্বপদে আ-কার এবং পরপদে ই-কার যুক্ত হয়। হাত থেকে হাতাহাতি, কান থেকে কানাকানি, লাঠি থেকে লাঠালাঠি। এই ধারাটি চিনলে ব্যতিহার শনাক্ত করা সহজ।
| মূল শব্দ | সমস্তপদ | ব্যাসবাক্য |
|---|---|---|
| হাত | হাতাহাতি | হাতে হাতে যে যুদ্ধ |
| কান | কানাকানি | কানে কানে যে কথা |
| লাঠি | লাঠালাঠি | লাঠিতে লাঠিতে যে যুদ্ধ |
| চুল | চুলোচুলি | চুলে চুলে যে যুদ্ধ |
| কাড়া | কাড়াকাড়ি | পরস্পর কেড়ে নেওয়া |
- ✓ পূর্বপদে আ-কার, পরপদে ই-কার — ব্যতিহারের ধারা
- ✗ হাতাহাতি একটি দ্বিরুক্ত শব্দ ✓ হাতাহাতি ব্যতিহার বহুব্রীহি
বহুব্রীহি বনাম দ্বিগু — সংখ্যা থাকলেই দ্বিগু নয়
পূর্বপদে সংখ্যা দেখলেই দ্বিগু লিখে ফেলা সবচেয়ে সাধারণ ভুল। আসল প্রশ্ন হলো সমস্তপদটি কী বোঝাচ্ছে। সমাহার বা মিলন বোঝালে দ্বিগু; কোনো ব্যক্তি বা বস্তু বোঝালে বহুব্রীহি।
ত্রিফলা মানে তিন ফলের সমাহার — তাই দ্বিগু। দশানন মানে দশ মুখ যার, অর্থাৎ রাবণ — তাই বহুব্রীহি। দুটিতেই সংখ্যা আছে, অথচ প্রকার আলাদা।
| সমস্তপদ | ব্যাসবাক্য | বোঝায় | প্রকার |
|---|---|---|---|
| ত্রিফলা | তিন ফলের সমাহার | তিনটি ফল একসঙ্গে | দ্বিগু |
| শতাব্দী | শত অব্দের সমাহার | একশো বছর | দ্বিগু |
| দশানন | দশ আনন যার | রাবণ | বহুব্রীহি |
| চতুষ্পদ | চার পদ যার | পশু | বহুব্রীহি |
| চৌচালা | চার চালা যার | একধরনের ঘর | বহুব্রীহি |
- ✓ সমাহার বোঝালে দ্বিগু
- ✓ ব্যক্তি বা বস্তু বোঝালে বহুব্রীহি
নঞ ও অলুক বহুব্রীহি
পূর্বপদে ন, না, নাই, অ, নি — কোনো না-বোধক শব্দ বসে যে বহুব্রীহি হয়, তাকে নঞ বহুব্রীহি বলে। নাই জ্ঞান যার = অজ্ঞান, নাই অক্ষর যার = নিরক্ষর। এখানেও অর্থ তৃতীয় কারও দিকে যাচ্ছে বলেই বহুব্রীহি, তৎপুরুষ নয়।
অলুক বহুব্রীহিতে বিভক্তি লোপ পায় না। গায়ে হলুদ, মুখেভাত — দুটিতেই এ বিভক্তি টিকে আছে, আর শব্দ দুটি একটি অনুষ্ঠান বোঝায়, গা বা মুখ নয়। বিভক্তি ও তৃতীয় অর্থ — দুটিই থাকলে অলুক বহুব্রীহি।
| প্রকার | সমস্তপদ | ব্যাসবাক্য |
|---|---|---|
| নঞ | অজ্ঞান | নাই জ্ঞান যার |
| নঞ | নিরক্ষর | নাই অক্ষর যার |
| নঞ | বেহুঁশ | নাই হুঁশ যার |
| অলুক | গায়ে হলুদ | গায়ে হলুদ দেওয়া হয় যে অনুষ্ঠানে |
| অলুক | মুখেভাত | মুখে ভাত দেওয়া হয় যে অনুষ্ঠানে |
- ✓ নাই জ্ঞান যার = অজ্ঞান — নঞ বহুব্রীহি
- ✗ গায়ে হলুদ তৎপুরুষ ✓ গায়ে হলুদ অলুক বহুব্রীহি
পরীক্ষায় কী আসে
বহুব্রীহি থেকে প্রশ্ন সবচেয়ে বেশি আসে, কারণ প্রকারভেদও সবচেয়ে বেশি। প্রশ্ন সাধারণত ব্যাসবাক্যসহ প্রকার নির্ণয়, কিংবা কোনো একটি প্রকারের দুটি উদাহরণ চাওয়া হয়।
উত্তর লেখার সময় ব্যাসবাক্যে যার বা যাতে বসাতে ভুলো না — ওই শব্দটিই দেখায় যে অর্থ তৃতীয় কারও দিকে যাচ্ছে। নীলকণ্ঠ-এর ব্যাসবাক্য নীল কণ্ঠ নয়, নীল কণ্ঠ যার।
আর একটি অভ্যাস নম্বর বাড়ায়: সমস্তপদটি আসলে কী বোঝায় তা বন্ধনীতে লিখে দেওয়া। “নীলকণ্ঠ — সমানাধিকরণ বহুব্রীহি, ব্যাসবাক্য: নীল কণ্ঠ যার (শিব)” — এতে বোঝা যায় তুমি অর্থটিও ধরেছ।
- ব্যাসবাক্যে যার / যাতে বসাতে ভুলো না।
- সংখ্যা থাকলেও সমাহার না হলে বহুব্রীহি।
- সমস্তপদ কী বোঝায় তা বন্ধনীতে লিখে দাও।
- ✗ নীলকণ্ঠ = নীল কণ্ঠ ✓ নীলকণ্ঠ = নীল কণ্ঠ যার (শিব)
বিস্তারিত আলোচনা
"বহুব্রীহি" শব্দটি নিজেই একটি উদাহরণ — বহু ব্রীহি অর্থাৎ ধান আছে যার, সেই ব্যক্তি। এখানে "বহু"ও প্রধান নয়, "ব্রীহি"ও প্রধান নয়; প্রধান হলো তৃতীয় একটি অর্থ, অর্থাৎ ধনী লোক। ব্যাসবাক্যে প্রায়ই "যার", "যিনি", "যাতে" প্রভৃতি সর্বনাম বসে — এটিই বহুব্রীহি চেনার প্রধান সূত্র।
উদাহরণ দেখলে বিষয়টি স্পষ্ট হয়। দশ আনন যার = দশানন (রাবণ), নীল কণ্ঠ যার = নীলকণ্ঠ (শিব), মহান আত্মা যার = মহাত্মা, চন্দ্র চূড়ায় যার = চন্দ্রচূড়। প্রতিটি ক্ষেত্রেই সমস্তপদটি এমন কাউকে বোঝাচ্ছে যে সমস্যমান পদের বাইরের কেউ।
বহুব্রীহির কয়েকটি প্রকারভেদ আছে। সমানাধিকরণ বহুব্রীহিতে পূর্বপদ বিশেষণ হয় — হত হয়েছে শ্রী যার = হতশ্রী। ব্যধিকরণ বহুব্রীহিতে পূর্বপদ বিশেষ্য — আশীতে বিষ যার = আশীবিষ। ব্যতিহার বহুব্রীহিতে ক্রিয়ার পারস্পরিকতা বোঝায় — হাতে হাতে যে যুদ্ধ = হাতাহাতি, কেশে কেশে যে যুদ্ধ = কেশাকেশি।
মনে রাখার কথা
ব্যাসবাক্যে "যার", "যিনি" বা "যাতে" বসলে প্রায় নিশ্চিতভাবেই ধরে নেওয়া যায় সেটি বহুব্রীহি সমাস।
সাধারণ ভুল
পরীক্ষায় এই ভুলগুলোই সবচেয়ে বেশি নম্বর কাটে। ভুল রূপটি দেখে নিলে নিজের লেখায় ধরা সহজ হয়।
- ✗ “দশানন” দ্বিগু সমাস। ✓ বহুব্রীহি — রাবণ বোঝাচ্ছে, সমাহার নয়।
- ✗ “অজ্ঞান” নঞ তৎপুরুষ। ✓ নঞ বহুব্রীহি — ব্যাসবাক্যে “যার” আছে।
- ✗ “হাতাহাতি” একটি দ্বিরুক্ত শব্দ। ✓ ব্যতিহার বহুব্রীহি — পরস্পর ঘটা ক্রিয়া।
- ✗ “নীলকণ্ঠ”-এর ব্যাসবাক্য “নীল কণ্ঠ”। ✓ “নীল কণ্ঠ যার” — “যার” ছাড়া বহুব্রীহি হয় না।
অনুশীলন
নিচের প্রশ্নগুলোর উত্তর নিজে লেখো, তারপর মিলিয়ে নাও।
- বহুব্রীহি সমাস কাকে বলে?
- বহুব্রীহি চেনার সূত্র কী?
- ব্যতিহার বহুব্রীহির গঠনগত ধারা কী?
- “দশানন” বহুব্রীহি অথচ “ত্রিফলা” দ্বিগু কেন?
- নঞ বহুব্রীহির দুটি উদাহরণ দাও।
- অলুক বহুব্রীহি কাকে বলে?
- “সবান্ধব” কোন ধরনের বহুব্রীহি?
- ব্যতিহার বহুব্রীহির গঠনগত চিহ্ন কী?
- সহার্থক বহুব্রীহি কাকে বলে?
- বহুব্রীহি সমাসের নামটি নিজেই একটি উদাহরণ — ব্যাখ্যা করো।
উত্তর
- যে সমাসে সমস্যমান কোনো পদেরই অর্থ প্রধান থাকে না, বরং তৃতীয় কোনো কিছুর অর্থ বোঝায়, তাকে বহুব্রীহি সমাস বলে।
- ব্যাসবাক্যে “যার”, “যাতে” বা “যাদের” থাকে — এই শব্দটিই অর্থকে তৃতীয় কারও দিকে পাঠায়।
- পূর্বপদে আ-কার এবং পরপদে ই-কার যুক্ত হয় — যেমন হাত থেকে হাতাহাতি, কান থেকে কানাকানি।
- দশানন রাবণ বোঝায়, অর্থাৎ অর্থ তৃতীয় কারও দিকে গেছে; আর ত্রিফলা তিন ফলের সমাহার বোঝায়, অর্থ পরপদেই আছে।
- অজ্ঞান (নাই জ্ঞান যার) ও নিরক্ষর (নাই অক্ষর যার)।
- যে বহুব্রীহিতে বিভক্তি লোপ পায় না তাকে অলুক বহুব্রীহি বলে — যেমন গায়ে হলুদ, মুখেভাত।
- সহার্থক বহুব্রীহি — ব্যাসবাক্য “বান্ধবের সহিত”, পূর্বপদে সহ বা স যুক্ত হয়েছে।
- পূর্বপদে আ-কার এবং পরপদে ই-কার — হাত থেকে হাতাহাতি, কান থেকে কানাকানি, লাঠি থেকে লাঠালাঠি।
- পূর্বপদে “সহ” বা “স” যুক্ত হয়ে যে বহুব্রীহি হয় — যেমন স্ত্রীর সহিত মানে সস্ত্রীক, বান্ধবের সহিত মানে সবান্ধব।
- “বহু ব্রীহি” মানে অনেক ধান; কিন্তু “বহুব্রীহি” শব্দটি ধান বোঝায় না, বোঝায় সেই ব্যক্তিকে যার অনেক ধান আছে অর্থাৎ ধনী। অর্থ দুই পদের বাইরে চলে গেছে।
উপযোগী শ্রেণি: নবম, দশম, একাদশ, দ্বাদশ শ্রেণি।
সচরাচর জিজ্ঞাসা
যে সমাসে পূর্বপদ বা পরপদ কোনোটির অর্থই প্রধান না হয়ে তৃতীয় একটি অর্থ প্রধান হয়, তাকে বহুব্রীহি সমাস বলে — যেমন দশ আনন যার = দশানন।
ব্যাসবাক্যে "যার", "যিনি", "যাতে" প্রভৃতি সর্বনাম বসে কি না দেখো। বসলে সেটি বহুব্রীহি, কারণ সমস্তপদ তৃতীয় কোনো সত্তাকে বোঝাচ্ছে।
যেখানে ক্রিয়ার পারস্পরিকতা বা পরস্পর প্রতিদ্বন্দ্বিতা বোঝায় — যেমন হাতে হাতে যে যুদ্ধ = হাতাহাতি, কেশে কেশে যে যুদ্ধ = কেশাকেশি।
সমস্তপদটি এমন কিছু বোঝায় যা পূর্বপদেও নেই, পরপদেও নেই। ব্যাসবাক্যে “যার”, “যাতে” বা “যাদের” থাকলে প্রায় নিশ্চিতভাবে বহুব্রীহি — “নীল কণ্ঠ যার” মানে শিব।
আরও বাংলা ব্যাকরণ পড়ো
বাংলা ব্যাকরণ-এর পূর্ণ তালিকা ও বাংলা লেখার অন্যান্য অংশ এক জায়গায়।
আমাদের সাথে যুক্ত থাকো
পড়াশোনার আপডেট, সাজেশন ও প্রশ্নোত্তর সবার আগে পেতে আমাদের ফেসবুক পেজ ও গ্রুপে যুক্ত হও।






















