লিঙ্গ — প্রকারভেদ ও স্ত্রীলিঙ্গ গঠনের নিয়ম
পুং, স্ত্রী, উভয় ও ক্লীবলিঙ্গের পরিচয় এবং স্ত্রীবাচক শব্দ গঠনের নিয়ম উদাহরণসহ।
সংজ্ঞা
যে শব্দ দিয়ে পুরুষ, স্ত্রী, উভয় বা কোনোটিই নয় — এই ভেদ বোঝানো হয়, তাকে লিঙ্গ বলে। বাংলায় লিঙ্গ চার প্রকার।
লিঙ্গের চার প্রকার
যে শব্দ দিয়ে পুরুষ, স্ত্রী, জড় বা উভয় জাতি বোঝায়, তার সেই জাতিনির্দেশক রূপকে লিঙ্গ বলে। বাংলায় লিঙ্গ চার প্রকার, এবং প্রকার চেনার নিয়ম সহজ — শব্দটি কী বোঝাচ্ছে, সেটাই দেখতে হয়।
ইংরেজি বা সংস্কৃতের তুলনায় বাংলায় লিঙ্গের ভূমিকা অনেক কম। বাংলায় লিঙ্গভেদে ক্রিয়ার রূপ বদলায় না — ছেলেটি গেল আর মেয়েটি গেল, ক্রিয়া একই। হিন্দি বা সংস্কৃতে এই দুই বাক্যে ক্রিয়ার রূপ আলাদা হতো।
তাই বাংলায় লিঙ্গ মূলত শব্দগঠনের বিষয়, বাক্যগঠনের নয়। স্ত্রীবাচক শব্দ কীভাবে তৈরি হয়, সেটিই এই অধ্যায়ের প্রধান আলোচ্য।
লিঙ্গের চার প্রকার
| প্রকার | কী বোঝায় | উদাহরণ |
|---|---|---|
| পুংলিঙ্গ | পুরুষ জাতি | বালক, পিতা, রাজা, ছাত্র |
| স্ত্রীলিঙ্গ | স্ত্রী জাতি | বালিকা, মাতা, রানি, ছাত্রী |
| ক্লীবলিঙ্গ | জড় বা অচেতন | বই, ঘর, গাছ, পাথর |
| উভয়লিঙ্গ | উভয় জাতি | শিশু, সন্তান, ডাক্তার, কবি |
- ✓ ছেলেটি গেল / মেয়েটি গেল — বাংলায় ক্রিয়ার রূপ বদলায় না
- ✗ বই একটি পুংলিঙ্গ শব্দ ✓ বই ক্লীবলিঙ্গ — জড় বস্তু
স্ত্রীবাচক শব্দ গঠনের প্রত্যয়
পুংলিঙ্গ শব্দের শেষে প্রত্যয় যোগ করে স্ত্রীবাচক শব্দ তৈরি হয়। কোন প্রত্যয় কোথায় বসবে তার কোনো একক নিয়ম নেই, তাই প্রত্যয়ভিত্তিক তালিকা ধরে মনে রাখাই কাজের পথ।
স্ত্রীবাচক প্রত্যয়
| প্রত্যয় | পুংলিঙ্গ | স্ত্রীলিঙ্গ |
|---|---|---|
| আ | প্রিয়, তনয়, কান্ত | প্রিয়া, তনয়া, কান্তা |
| ঈ | ছাত্র, কুমার, দেব | ছাত্রী, কুমারী, দেবী |
| ইকা | বালক, গায়ক, সেবক | বালিকা, গায়িকা, সেবিকা |
| ইনী | তপস্বী, মায়াবী | তপস্বিনী, মায়াবিনী |
| নী | মালি, কাঙাল | মালিনী, কাঙালিনী |
| আনী | ইন্দ্র, ঠাকুর | ইন্দ্রাণী, ঠাকুরানি |
- ✓ নায়ক + ইকা = নায়িকা
- ✓ ছাত্র + ঈ = ছাত্রী
- ✗ গায়ক > গায়কী ✓ গায়ক > গায়িকা
অনিয়মিত স্ত্রীবাচক শব্দ
কিছু স্ত্রীবাচক শব্দ কোনো প্রত্যয়ের নিয়মে পড়ে না — শব্দটি সম্পূর্ণ আলাদা, কিংবা মূল শব্দের চেহারা বদলে গেছে। এগুলো নিয়ম খুঁজে বের করার চেষ্টা না করে মুখস্থ রাখতে হয়।
নর থেকে নারী, রাজা থেকে রানি, সম্রাট থেকে সম্রাজ্ঞী — তিনটিতেই গঠনের ধারা আলাদা। আবার পিতা থেকে মাতা, ভাই থেকে বোন — এখানে শব্দটিই সম্পূর্ণ ভিন্ন।
| পুংলিঙ্গ | স্ত্রীলিঙ্গ | ধরন |
|---|---|---|
| নর | নারী | রূপ বদলেছে |
| রাজা | রানি | রূপ বদলেছে |
| সম্রাট | সম্রাজ্ঞী | রূপ বদলেছে |
| পিতা | মাতা | সম্পূর্ণ ভিন্ন শব্দ |
| ভাই | বোন | সম্পূর্ণ ভিন্ন শব্দ |
| বর | কনে | সম্পূর্ণ ভিন্ন শব্দ |
| শ্বশুর | শাশুড়ি | রূপ বদলেছে |
- ✗ রাজা > রাজী ✓ রাজা > রানি
- ✗ নর > নরী ✓ নর > নারী
নিত্য পুংলিঙ্গ ও নিত্য স্ত্রীলিঙ্গ
কিছু শব্দের কোনো বিপরীত লিঙ্গরূপ নেই — এদের বলে নিত্য পুংলিঙ্গ বা নিত্য স্ত্রীলিঙ্গ। কবিরাজ, কৃতদার সব সময় পুরুষ বোঝায়; সতীন, সধবা, বিধবা, দাই সব সময় স্ত্রী বোঝায়।
কারণটি ব্যাকরণগত নয়, সামাজিক। শব্দগুলো এমন ভূমিকা বোঝায় যা ঐতিহাসিকভাবে এক জাতিরই ছিল, তাই বিপরীত রূপ তৈরি হয়নি। ভাষা বদলালে এই তালিকাও বদলায় — অনেক পেশাবাচক শব্দ আজ উভয়লিঙ্গ হিসেবেই ব্যবহৃত হয়।
| শ্রেণি | উদাহরণ |
|---|---|
| নিত্য পুংলিঙ্গ | কবিরাজ, কৃতদার, ঢাকী |
| নিত্য স্ত্রীলিঙ্গ | সতীন, সধবা, বিধবা, দাই, ডাইনি |
| উভয়লিঙ্গ | শিশু, সন্তান, মানুষ, ডাক্তার, কবি, সভাপতি |
- ✓ সধবা — নিত্য স্ত্রীলিঙ্গ, পুরুষরূপ নেই
- ✓ ডাক্তার — উভয়লিঙ্গ
- ✗ কবি > কবিনী ✓ কবি উভয়লিঙ্গ — আলাদা স্ত্রীরূপ নেই
প্রাণী ও অপ্রাণীর লিঙ্গ
পশুপাখির ক্ষেত্রেও লিঙ্গভেদ আছে, আর সেখানে অনেক সময় সম্পূর্ণ আলাদা শব্দ ব্যবহৃত হয়। ষাঁড় ও গাভি, মোরগ ও মুরগি, ঘোড়া ও ঘুড়ি — জোড়াগুলো পরীক্ষায় আসে।
অপ্রাণিবাচক শব্দ বাংলায় সাধারণত ক্লীবলিঙ্গ। তবে সাহিত্যে প্রায়ই এদের ওপর লিঙ্গ আরোপ করা হয় — নদীকে নারী, পর্বতকে পুরুষ বলে কল্পনা করা হয়। এটি ব্যাকরণের নিয়ম নয়, অলংকারের প্রয়োগ।
| পুংলিঙ্গ | স্ত্রীলিঙ্গ |
|---|---|
| ষাঁড় | গাভি |
| মোরগ | মুরগি |
| সিংহ | সিংহী |
| হরিণ | হরিণী |
| বাঘ | বাঘিনি |
| হাতি | হাতিনি |
- ✓ সিংহ > সিংহী — ঈ প্রত্যয়
- ✓ ষাঁড় > গাভি — সম্পূর্ণ ভিন্ন শব্দ
পরীক্ষায় কী আসে
লিঙ্গ অধ্যায় থেকে প্রশ্ন সাধারণত তিন রকম — প্রকারভেদ ও উদাহরণ, স্ত্রীবাচক শব্দ লেখা, আর নিত্য বা উভয়লিঙ্গ শব্দ চিহ্নিত করা। দ্বিতীয়টি সবচেয়ে বেশি আসে এবং সবচেয়ে বেশি ভুলও হয়।
ভুল এড়ানোর উপায় প্রত্যয়ভিত্তিক তালিকা। ক-এ শেষ হওয়া শব্দে প্রায় সব সময় ইকা বসে — বালক > বালিকা, গায়ক > গায়িকা, সেবক > সেবিকা, নায়ক > নায়িকা। এই একটি ধারা মনে রাখলেই অনেকগুলো উত্তর মেলে।
অনিয়মিত জোড়াগুলো আলাদা করে লিখে রাখো — নর-নারী, রাজা-রানি, সম্রাট-সম্রাজ্ঞী, বর-কনে। এদের কোনো নিয়ম নেই, আর প্রশ্নে ঠিক এদেরই বেশি চাওয়া হয়।
- ক-এ শেষ শব্দে প্রায় সব সময় ইকা — বালিকা, গায়িকা।
- অনিয়মিত জোড়া আলাদা করে মুখস্থ রাখো।
- উভয়লিঙ্গ শব্দে জোর করে স্ত্রীরূপ বানিয়ো না।
- ✗ সভাপতি > সভাপত্নী ✓ সভাপতি উভয়লিঙ্গ
- ✗ সেবক > সেবকী ✓ সেবক > সেবিকা
পেশা ও পদবাচক শব্দে লিঙ্গ
পেশা বা পদ বোঝায় এমন শব্দে লিঙ্গের প্রয়োগ আজ বদলে যাচ্ছে, আর এটি ভাষার সামাজিক দিকের একটি ভালো উদাহরণ। এক সময় শিক্ষয়িত্রী, অধ্যাপিকা, লেখিকা — এই স্ত্রীবাচক রূপগুলো নিয়মিত ব্যবহৃত হতো।
আজ অনেক ক্ষেত্রেই পুংলিঙ্গ রূপটিকেই উভয়লিঙ্গ হিসেবে ধরা হয় — শিক্ষক, অধ্যাপক, লেখক, ডাক্তার, সভাপতি। কারণ পদটি যিনি ধারণ করছেন তাঁর জাতি আলাদা করে জানানোর প্রয়োজন সব সময় থাকে না।
পরীক্ষার উত্তরে অবশ্য প্রচলিত স্ত্রীবাচক রূপটিই লিখতে হয়, যদি সেটি চাওয়া হয়। তবে সাধারণ লেখায় কোনটি ব্যবহার করবে তা প্রসঙ্গ ও সৌজন্য বিবেচনা করে ঠিক করাই ভালো।
| পুংলিঙ্গ | প্রচলিত স্ত্রীবাচক | আজকের প্রয়োগ |
|---|---|---|
| শিক্ষক | শিক্ষয়িত্রী | শিক্ষক (উভয়) |
| অধ্যাপক | অধ্যাপিকা | অধ্যাপক (উভয়) |
| লেখক | লেখিকা | দুটিই চলে |
| ডাক্তার | — | উভয়লিঙ্গ |
| সভাপতি | — | উভয়লিঙ্গ |
- ✓ তিনি একজন অধ্যাপক — আজ উভয়লিঙ্গ হিসেবে গ্রহণযোগ্য
- ✗ ডাক্তারনী ✓ ডাক্তার — উভয়লিঙ্গ শব্দে জোর করে স্ত্রীরূপ নয়
বিস্তারিত আলোচনা
বাংলা লিঙ্গ চার প্রকার। পুংলিঙ্গে পুরুষজাতি বোঝায় — বালক, পিতা, রাজা, সিংহ। স্ত্রীলিঙ্গে স্ত্রীজাতি — বালিকা, মাতা, রানি, সিংহী। উভয় লিঙ্গে নারী-পুরুষ উভয়কেই বোঝায় — শিশু, সন্তান, মানুষ, ডাক্তার, শিক্ষার্থী। আর ক্লীবলিঙ্গে প্রাণহীন বস্তু বোঝায় — ঘর, বই, গাছ, পাথর।
পুংলিঙ্গ থেকে স্ত্রীলিঙ্গ গঠনের কয়েকটি নিয়ম আছে। আ যোগে — ছাত্র থেকে ছাত্রী নয়, বরং সুত থেকে সুতা, বৃদ্ধ থেকে বৃদ্ধা। ঈ যোগে — কিশোর থেকে কিশোরী, ছাত্র থেকে ছাত্রী, নর্তক থেকে নর্তকী। ইনী বা নী যোগে — মালি থেকে মালিনী, হাতি থেকে হাতিনী। আনী যোগে — ইন্দ্র থেকে ইন্দ্রাণী, চন্দ্র থেকে চন্দ্রাণী।
কিছু শব্দে স্ত্রীলিঙ্গ গঠিত হয় সম্পূর্ণ আলাদা শব্দ দিয়ে — পিতা থেকে মাতা, ভাই থেকে বোন, রাজা থেকে রানি, বর থেকে কনে, পুরুষ থেকে নারী। আবার কিছু শব্দের কোনো স্ত্রীবাচক রূপ নেই — কবি, সভাপতি, ডাক্তার। এসব ক্ষেত্রে প্রয়োজনে "মহিলা" বা "নারী" শব্দ আগে বসানো হয়।
মনে রাখার কথা
উভয় লিঙ্গ ও ক্লীবলিঙ্গের পার্থক্য মনে রাখো — প্রাণী হলে উভয়, প্রাণহীন হলে ক্লীব।
সাধারণ ভুল
পরীক্ষায় এই ভুলগুলোই সবচেয়ে বেশি নম্বর কাটে। ভুল রূপটি দেখে নিলে নিজের লেখায় ধরা সহজ হয়।
- ✗ রাজা > রাজী ✓ রাজা > রানি — অনিয়মিত রূপ।
- ✗ গায়ক > গায়কী ✓ গায়ক > গায়িকা — ক-এ শেষ শব্দে ইকা বসে।
- ✗ কবি > কবিনী ✓ কবি উভয়লিঙ্গ — আলাদা স্ত্রীরূপ নেই।
- ✗ বাংলায় লিঙ্গভেদে ক্রিয়ার রূপ বদলায়। ✓ বদলায় না — ছেলেটি গেল, মেয়েটি গেল, ক্রিয়া একই।
অনুশীলন
নিচের প্রশ্নগুলোর উত্তর নিজে লেখো, তারপর মিলিয়ে নাও।
- লিঙ্গ কত প্রকার ও কী কী?
- বাংলায় লিঙ্গের ভূমিকা কম কেন?
- স্ত্রীবাচক শব্দ লেখো: বালক, নায়ক, সেবক।
- নিত্য স্ত্রীলিঙ্গ শব্দ কাকে বলে? তিনটি উদাহরণ দাও।
- উভয়লিঙ্গ শব্দের চারটি উদাহরণ দাও।
- অনিয়মিত স্ত্রীবাচক শব্দের তিনটি জোড়া লেখো।
- অপ্রাণিবাচক শব্দ বাংলায় কোন লিঙ্গ?
উত্তর
- চার প্রকার — পুংলিঙ্গ, স্ত্রীলিঙ্গ, ক্লীবলিঙ্গ ও উভয়লিঙ্গ।
- কারণ বাংলায় লিঙ্গভেদে ক্রিয়ার রূপ বদলায় না। সংস্কৃত বা হিন্দিতে বদলায়, তাই সেখানে লিঙ্গ বাক্যগঠনেরও বিষয়।
- বালিকা, নায়িকা ও সেবিকা — তিনটিতেই ইকা প্রত্যয় যুক্ত হয়েছে।
- যেসব শব্দের কোনো পুংলিঙ্গ রূপ নেই তাদের নিত্য স্ত্রীলিঙ্গ বলে — সতীন, সধবা ও দাই।
- শিশু, সন্তান, ডাক্তার ও কবি — এগুলো পুরুষ ও স্ত্রী উভয়কেই বোঝায়।
- নর-নারী, রাজা-রানি ও সম্রাট-সম্রাজ্ঞী — কোনোটিই নিয়মিত প্রত্যয়ের নিয়মে পড়ে না।
- সাধারণত ক্লীবলিঙ্গ। সাহিত্যে লিঙ্গ আরোপ করা হলেও সেটি অলংকার, ব্যাকরণের নিয়ম নয়।
উপযোগী শ্রেণি: নবম, দশম, একাদশ, দ্বাদশ শ্রেণি।
সচরাচর জিজ্ঞাসা
চার প্রকার — পুংলিঙ্গ (বালক), স্ত্রীলিঙ্গ (বালিকা), উভয় লিঙ্গ (শিশু, মানুষ) এবং ক্লীবলিঙ্গ (ঘর, বই)। প্রাণহীন বস্তু বোঝালে ক্লীবলিঙ্গ।
যে শব্দ দিয়ে নারী ও পুরুষ উভয়কেই বোঝানো যায়, তাকে উভয় লিঙ্গ বলে — যেমন শিশু, সন্তান, মানুষ, ডাক্তার, শিক্ষার্থী।
না। কবি, সভাপতি, ডাক্তার প্রভৃতি শব্দের আলাদা স্ত্রীবাচক রূপ নেই। প্রয়োজনে "মহিলা" বা "নারী" শব্দ আগে বসিয়ে বোঝানো হয়।
কারণ লিঙ্গ বাংলায় শব্দগঠনের বিষয়। স্ত্রীবাচক শব্দ কীভাবে তৈরি হয় — বালক থেকে বালিকা, নায়ক থেকে নায়িকা — সেটি জানা না থাকলে বানান ও প্রয়োগে ভুল হয়, আর পরীক্ষায় এই গঠনই সবচেয়ে বেশি জিজ্ঞাসা করা হয়।
আরও বাংলা ব্যাকরণ পড়ো
বাংলা ব্যাকরণ-এর পূর্ণ তালিকা ও বাংলা লেখার অন্যান্য অংশ এক জায়গায়।
আমাদের সাথে যুক্ত থাকো
পড়াশোনার আপডেট, সাজেশন ও প্রশ্নোত্তর সবার আগে পেতে আমাদের ফেসবুক পেজ ও গ্রুপে যুক্ত হও।






















