ধাতু — প্রকারভেদ ও প্রযোজক ধাতু
ধাতুর সংজ্ঞা, মৌলিক, সাধিত ও সংযোগমূলক ধাতু এবং প্রযোজক ধাতুর ব্যাখ্যা।
সংজ্ঞা
ক্রিয়াপদের যে মূল অংশ থেকে বিভিন্ন কালে ও পুরুষে ক্রিয়ার রূপ গঠিত হয়, তাকে ধাতু বলে। ধাতুর আগে √ চিহ্ন দিয়ে তাকে চিহ্নিত করা হয়।
ক্রিয়ার যে অংশ আর ভাঙা যায় না
ক্রিয়াপদের যে মূল অংশকে আর বিশ্লেষণ করা যায় না, তাকে ধাতু বলে। করি, করছি, করব, করেছিলাম — সব কটিতেই কর্ অংশটি অভিন্ন, আর সেটিই ধাতু। বাকি অংশ ক্রিয়াবিভক্তি, যা কাল ও পুরুষ অনুযায়ী বদলায়।
ধাতু বোঝাতে তার আগে √ চিহ্ন বসানো হয় — √কর্, √চল্, √দেখ্। চিহ্নটি জানিয়ে দেয় অংশটি ক্রিয়ার মূল, নামশব্দ নয়। প্রকৃতি-প্রত্যয়ের অধ্যায়ে এই ধাতুকেই বলা হয় ক্রিয়াপ্রকৃতি।
ধাতু একা বাক্যে বসতে পারে না — এটি ধাতুর সংজ্ঞার মতোই গুরুত্বপূর্ণ। কর্ বলে কোনো বাক্য হয় না; বিভক্তি যুক্ত হয়ে করি, করো, করে হলে তবেই সেটি পূর্ণ ক্রিয়াপদ।
- ধাতু = ক্রিয়ার অবিভাজ্য মূল।
- ধাতুর আগে √ চিহ্ন বসে।
- ধাতু একা বাক্যে বসতে পারে না।
- ✓ করি, করছি, করব — সবেতেই √কর্
- ✗ কর একটি ক্রিয়াপদ ✓ √কর্ একটি ধাতু; ক্রিয়াপদ হলো করি, করো, করে
ধাতুর প্রকারভেদ
গঠন অনুযায়ী বাংলা ধাতুকে চার ভাগে ভাগ করা হয়। ভাগগুলো চেনার সূত্র আলাদা, আর পরীক্ষায় প্রকার নির্ণয়ই মূল প্রশ্ন।
ধাতুর চার প্রকার
| প্রকার | কীভাবে তৈরি | উদাহরণ |
|---|---|---|
| মৌলিক / সিদ্ধ ধাতু | ভাঙা যায় না | √কর্, √চল্, √পড়্, √দেখ্ |
| সাধিত ধাতু | নামশব্দ বা ধাতু থেকে | √ঘুমা, √বেতা, √করা |
| যৌগিক ধাতু | নামশব্দ + কর্/হ/দে/পা | গোসল করা, ভয় পাওয়া |
| অনুকার ধাতু | ধ্বন্যাত্মক শব্দ থেকে | √ঝনঝনা, √কনকনা |
- ✓ √কর্ — মৌলিক ধাতু
- ✓ ঘুম (বিশেষ্য) → √ঘুমা — সাধিত ধাতু
- ✓ ঝনঝন → √ঝনঝনা — অনুকার ধাতু
সাধিত ধাতুর তিন উপভাগ
সাধিত ধাতু মৌলিক নয় — কোনো নামশব্দ বা অন্য ধাতু থেকে তৈরি। এর তিনটি উপভাগ আছে, আর তিনটিই পরীক্ষায় আলাদা করে জিজ্ঞাসা করা হয়।
নামধাতু তৈরি হয় বিশেষ্য বা বিশেষণ থেকে — ঘুম থেকে √ঘুমা, বেত থেকে √বেতা, হাত থেকে √হাতা। প্রযোজক ধাতু বোঝায় অন্যকে দিয়ে কাজ করানো — √কর্ থেকে √করা, √দেখ্ থেকে √দেখা। আর কর্মবাচ্যের ধাতু তৈরি হয় কর্মবাচ্যের রূপ গড়তে।
| উপভাগ | কোথা থেকে | উদাহরণ |
|---|---|---|
| নামধাতু | বিশেষ্য / বিশেষণ | ঘুম → √ঘুমা, বেত → √বেতা |
| প্রযোজক ধাতু | মৌলিক ধাতু | √কর্ → √করা, √পড়্ → √পড়া |
| কর্মবাচ্যের ধাতু | মৌলিক ধাতু | √দেখ্ → √দেখা (দেখা যায়) |
- ✓ সে আমাকে বই পড়ায় — প্রযোজক ধাতু √পড়া
- ✓ ছেলেটি ঘুমায় — নামধাতু √ঘুমা
যৌগিক ধাতু চেনার উপায়
একটি নামশব্দের সঙ্গে কর্, হ, দে, পা, খা জাতীয় সাধারণ ধাতু যুক্ত হয়ে যে ক্রিয়া তৈরি হয়, তাকে যৌগিক বা সংযোগমূলক ধাতু বলে। গোসল করা, ভয় পাওয়া, কষ্ট হওয়া, ধরা দেওয়া — চারটিই যৌগিক ধাতু।
বাংলায় যৌগিক ধাতু খুব সক্রিয়, কারণ নতুন ধারণা এলে আলাদা ক্রিয়া না বানিয়ে চেনা ধাতু জুড়ে দিলেই চলে। ফোন করা, ইমেইল করা, ডাউনলোড করা — বিদেশি শব্দও এভাবেই বাংলা ক্রিয়া হয়ে যায়।
শনাক্ত করার সহজ উপায়: ক্রিয়াটি দুটি শব্দে লেখা হচ্ছে কি না দেখো, আর দ্বিতীয় শব্দটি করা, হওয়া, পাওয়া, দেওয়া কি না। দুটিই হ্যাঁ হলে সেটি যৌগিক ধাতু।
| নামশব্দ | সহায়ক ধাতু | যৌগিক ক্রিয়া |
|---|---|---|
| গোসল | করা | গোসল করা |
| ভয় | পাওয়া | ভয় পাওয়া |
| কষ্ট | হওয়া | কষ্ট হওয়া |
| ধরা | দেওয়া | ধরা দেওয়া |
| ফোন | করা | ফোন করা |
- ✓ সে ভয় পেয়েছে — যৌগিক ধাতু
- ✓ আমি ফোন করেছি — বিদেশি শব্দে যৌগিক ধাতু
ধাতু ও ক্রিয়াবিভক্তি
ক্রিয়াপদ = ধাতু + ক্রিয়াবিভক্তি। ধাতু অপরিবর্তিত থাকে, আর বিভক্তি বদলায় কাল ও পুরুষ অনুযায়ী। এই ভাগটি চিনতে পারলে যেকোনো ক্রিয়াপদ বিশ্লেষণ করা যায়।
√কর্ ধাতুর সঙ্গে -ি বসলে করি (উত্তম, বর্তমান), -ছিলাম বসলে করছিলাম (উত্তম, ঘটমান অতীত), -বে বসলে করবে (মধ্যম, ভবিষ্যৎ)। ধাতুটি এক, বিভক্তি তিন রকম।
| ক্রিয়াপদ | ধাতু | বিভক্তি | কাল ও পুরুষ |
|---|---|---|---|
| করি | √কর্ | ই | বর্তমান, উত্তম |
| করো | √কর্ | ও | বর্তমান, মধ্যম |
| করছিলাম | √কর্ | ছিলাম | ঘটমান অতীত, উত্তম |
| করবে | √কর্ | বে | ভবিষ্যৎ, মধ্যম |
| করেছেন | √কর্ | এছেন | পুরাঘটিত বর্তমান, সম্ভ্রম |
- ✓ করছিলাম = √কর্ + ছিলাম
- ✗ করছিলাম-এর ধাতু করছ ✓ ধাতু √কর্
পরীক্ষায় কী আসে
ধাতু অধ্যায় থেকে প্রশ্ন সাধারণত তিন রকম — সংজ্ঞা, প্রকারভেদ ও উদাহরণ, আর একটি ক্রিয়াপদ থেকে ধাতু বের করা। শেষটিতে বিভক্তি বাদ দিয়ে মূল অংশ চিনতে পারাই দক্ষতা।
ভুল এড়ানোর উপায়: একই ক্রিয়ার কয়েকটি রূপ পাশাপাশি লিখে দেখো কোন অংশটি সব রূপে অভিন্ন। পড়ি, পড়ছি, পড়ব, পড়েছিলাম — সব কটিতে পড়্ আছে, তাই ধাতু √পড়্। এই পরীক্ষাটি কখনো ভুল করে না।
উত্তরে √ চিহ্ন বসানো ভালো অভ্যাস, আর প্রকার জিজ্ঞাসা করলে সেটিও লেখো। “পড়ছিলাম — ধাতু √পড়্, মৌলিক ধাতু” — এই কাঠামোই পূর্ণ উত্তর।
- কয়েকটি রূপ পাশাপাশি লিখে অভিন্ন অংশ খোঁজো।
- উত্তরে √ চিহ্ন বসাও।
- ধাতুর নাম + প্রকার দুটিই লেখো।
- ✗ উত্তর: পড়্ ধাতু। ✓ উত্তর: √পড়্, মৌলিক ধাতু।
- ✗ ঘুমায়-এর ধাতু √ঘুম্ ✓ ধাতু √ঘুমা — নামধাতু
বিস্তারিত আলোচনা
"করি", "করছি", "করব", "করেছিলাম" — এই সব রূপের মধ্যে যে অংশটি অপরিবর্তিত থাকে, সেই √কর্ হলো ধাতু। ধাতুকে ক্রিয়ামূলও বলা হয়। ধাতুর সঙ্গে কালবাচক ও পুরুষবাচক বিভক্তি যুক্ত হয়েই সম্পূর্ণ ক্রিয়াপদ তৈরি হয়।
ধাতু প্রধানত তিন প্রকার। মৌলিক ধাতু বা সিদ্ধ ধাতুকে ভাঙা যায় না — √কর্, √পড়, √খা, √যা। সাধিত ধাতু গঠিত হয় শব্দ বা ধাতুর সঙ্গে প্রত্যয় যোগে — √দেখা থেকে √দেখা-ন (দেখানো), √ঘুম থেকে √ঘুমা। আর সংযোগমূলক ধাতু গঠিত হয় বিশেষ্য বা বিশেষণের সঙ্গে কর, দে, পা প্রভৃতি ধাতু যোগে — যেমন যোগ + কর = যোগ করা, ভয় + পা = ভয় পাওয়া।
সাধিত ধাতুর মধ্যে প্রযোজক ধাতু আলাদাভাবে উল্লেখযোগ্য। এতে কর্তা নিজে কাজ না করে অন্যকে দিয়ে করায় — √পড় থেকে √পড়া (পড়ানো), √খা থেকে √খাওয়া (খাওয়ানো)। বাক্যে এর ফলে দুজন কর্তা আসে: প্রযোজক কর্তা ও প্রযোজ্য কর্তা, যেমন "শিক্ষক ছাত্রকে পড়ান" বাক্যে শিক্ষক প্রযোজক ও ছাত্র প্রযোজ্য কর্তা।
মনে রাখার কথা
ক্রিয়ার সব রূপে যে অংশটি অপরিবর্তিত থাকে, সেটিই ধাতু — এটি বের করাই ধাতু নির্ণয়ের কৌশল।
সাধারণ ভুল
পরীক্ষায় এই ভুলগুলোই সবচেয়ে বেশি নম্বর কাটে। ভুল রূপটি দেখে নিলে নিজের লেখায় ধরা সহজ হয়।
- ✗ “করছিলাম”-এর ধাতু “করছ”। ✓ ধাতু √কর্ — বাকিটা ক্রিয়াবিভক্তি।
- ✗ ধাতু একা বাক্যে বসতে পারে। ✓ পারে না — বিভক্তি যুক্ত হলে তবেই ক্রিয়াপদ হয়।
- ✗ “গোসল করা” একটি মৌলিক ধাতু। ✓ এটি যৌগিক ধাতু — নামশব্দ + সহায়ক ধাতু।
- ✗ “ঘুমায়”-এর ধাতু √ঘুম্। ✓ ধাতু √ঘুমা — এটি নামধাতু, ঘুম শব্দ থেকে তৈরি।
অনুশীলন
নিচের প্রশ্নগুলোর উত্তর নিজে লেখো, তারপর মিলিয়ে নাও।
- ধাতু কাকে বলে?
- ধাতু কত প্রকার ও কী কী?
- নামধাতু কাকে বলে? দুটি উদাহরণ দাও।
- প্রযোজক ধাতু কী বোঝায়?
- যৌগিক ধাতু চেনার উপায় কী?
- “ঝনঝনানো” কোন ধরনের ধাতু থেকে?
- ক্রিয়াপদ থেকে ধাতু বের করার নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি কী?
- ধাতু ও ক্রিয়াপদের সম্পর্ক এক বাক্যে লেখো।
উত্তর
- ক্রিয়াপদের যে মূল অংশকে আর বিশ্লেষণ করা যায় না, তাকে ধাতু বলে — যেমন করি, করছি, করব সব কটিতেই √কর্।
- চার প্রকার — মৌলিক বা সিদ্ধ ধাতু, সাধিত ধাতু, যৌগিক ধাতু ও অনুকার ধাতু।
- বিশেষ্য বা বিশেষণ থেকে তৈরি ধাতুকে নামধাতু বলে — যেমন ঘুম থেকে √ঘুমা, বেত থেকে √বেতা।
- অন্যকে দিয়ে কাজ করানো বোঝায় — যেমন √কর্ থেকে √করা, √পড়্ থেকে √পড়া। “সে আমাকে বই পড়ায়” বাক্যে প্রযোজক ধাতু আছে।
- ক্রিয়াটি দুটি শব্দে লেখা হয় এবং দ্বিতীয় শব্দটি করা, হওয়া, পাওয়া বা দেওয়া হয় — যেমন গোসল করা, ভয় পাওয়া।
- অনুকার ধাতু — ধ্বন্যাত্মক শব্দ ঝনঝন থেকে √ঝনঝনা ধাতুটি তৈরি হয়েছে।
- একই ক্রিয়ার কয়েকটি রূপ পাশাপাশি লিখে দেখো কোন অংশটি সব রূপে অভিন্ন — পড়ি, পড়ছি, পড়ব সব কটিতে পড়্ আছে, তাই ধাতু √পড়্।
- ক্রিয়াপদ = ধাতু + ক্রিয়াবিভক্তি; ধাতু অপরিবর্তিত থাকে আর বিভক্তি কাল ও পুরুষ অনুযায়ী বদলায়।
উপযোগী শ্রেণি: নবম, দশম, একাদশ, দ্বাদশ শ্রেণি।
সচরাচর জিজ্ঞাসা
ক্রিয়াপদের যে মূল অংশ থেকে বিভিন্ন কালে ও পুরুষে ক্রিয়ার রূপ গঠিত হয়, তাকে ধাতু বা ক্রিয়ামূল বলে — যেমন করি, করছি, করব-এর মূল √কর্।
তিন প্রকার — মৌলিক বা সিদ্ধ ধাতু (√কর্, √পড়), সাধিত ধাতু (√দেখা-ন) এবং সংযোগমূলক ধাতু (যোগ করা, ভয় পাওয়া)।
যে ধাতুতে কর্তা নিজে কাজ না করে অন্যকে দিয়ে করায় — যেমন √পড় থেকে পড়ানো, √খা থেকে খাওয়ানো। এতে বাক্যে প্রযোজক ও প্রযোজ্য দুই কর্তা আসে।
কারণ নতুন ধারণার জন্য আলাদা ক্রিয়া না বানিয়ে চেনা সহায়ক ধাতু জুড়ে দিলেই চলে। এ কারণেই ফোন করা, ইমেইল করা বা ডাউনলোড করা — বিদেশি শব্দও সহজে বাংলা ক্রিয়া হয়ে যায়।
আরও বাংলা ব্যাকরণ পড়ো
বাংলা ব্যাকরণ-এর পূর্ণ তালিকা ও বাংলা লেখার অন্যান্য অংশ এক জায়গায়।
আমাদের সাথে যুক্ত থাকো
পড়াশোনার আপডেট, সাজেশন ও প্রশ্নোত্তর সবার আগে পেতে আমাদের ফেসবুক পেজ ও গ্রুপে যুক্ত হও।






















