বিভক্তি — শব্দবিভক্তি ও ক্রিয়াবিভক্তি
বিভক্তির সংজ্ঞা, সাতটি শব্দবিভক্তির তালিকা এবং বিভক্তি ও অনুসর্গের পার্থক্য।
সংজ্ঞা
শব্দ বা ধাতুর সঙ্গে যুক্ত হয়ে যে বর্ণ বা বর্ণসমষ্টি পদ গঠন করে, তাকে বিভক্তি বলে। বিভক্তি দুই প্রকার — শব্দবিভক্তি ও ক্রিয়াবিভক্তি।
বিভক্তি কী কাজ করে
শব্দ ও ধাতুর সঙ্গে যুক্ত হয়ে যেসব বর্ণ বা বর্ণসমষ্টি তাদের বাক্যে ব্যবহারের যোগ্য করে তোলে, তাদের বিভক্তি বলে। ছেলে একটি শব্দ; ছেলেকে একটি পদ — কে বিভক্তিটিই শব্দকে পদে পরিণত করেছে।
বিভক্তি দুই রকম। শব্দের সঙ্গে যুক্ত হলে শব্দবিভক্তি, আর ধাতুর সঙ্গে যুক্ত হলে ক্রিয়াবিভক্তি। ছেলেকে-তে কে শব্দবিভক্তি; করি-তে ই ক্রিয়াবিভক্তি।
বিভক্তির কাজ কেবল রূপ বদলানো নয় — এটি বাক্যে পদটির সম্পর্ক জানায়। কে কর্তা, কে কর্ম, কোথায় ঘটছে — সব তথ্য বিভক্তিই বহন করে। তাই কারক নির্ণয় করতে হলে বিভক্তি চেনা অপরিহার্য।
- বিভক্তি শব্দকে পদে পরিণত করে।
- শব্দের সঙ্গে → শব্দবিভক্তি; ধাতুর সঙ্গে → ক্রিয়াবিভক্তি।
- বিভক্তি বাক্যে পদের সম্পর্ক জানায়।
- ✓ ছেলে (শব্দ) → ছেলেকে (পদ)
- ✓ √কর্ + ই = করি — ক্রিয়াবিভক্তি
শব্দবিভক্তির সাতটি রূপ
সংস্কৃত ব্যাকরণ অনুসরণে শব্দবিভক্তিকে সাত ভাগে ভাগ করা হয় — প্রথমা থেকে সপ্তমী। প্রতিটির নির্দিষ্ট চিহ্ন আছে, আর সেই চিহ্ন দেখেই কারক নির্ণয় করা যায়।
শব্দবিভক্তি
| বিভক্তি | চিহ্ন | উদাহরণ |
|---|---|---|
| প্রথমা | শূন্য, অ, এ, য়, তে | রহিম যায় |
| দ্বিতীয়া | কে, রে, শূন্য | রহিমকে ডাকো |
| তৃতীয়া | দ্বারা, দিয়া, কর্তৃক | কলম দ্বারা লিখি |
| চতুর্থী | কে, রে | ভিক্ষুককে ভিক্ষা দাও |
| পঞ্চমী | হতে, থেকে, চেয়ে | গাছ থেকে ফল পড়ে |
| ষষ্ঠী | র, এর | রহিমের বই |
| সপ্তমী | এ, য়, তে | ঘরে আছে |
- ✓ রহিমের বই — ষষ্ঠী বিভক্তি
- ✓ ঘরে আছে — সপ্তমী বিভক্তি
শূন্য বিভক্তি — চিহ্ন না থাকাও একটি চিহ্ন
কিছু পদে কোনো দৃশ্যমান বিভক্তি থাকে না, তবু সেটি পদ। এই অবস্থাকে বলে শূন্য বিভক্তি বা অ-বিভক্তি। রহিম যায় — রহিম শব্দে কোনো চিহ্ন নেই, তবু এটি কর্তা, তাই প্রথমা শূন্য বিভক্তি।
শূন্য বিভক্তি কর্মেও বসতে পারে। সে ভাত খায় — ভাত কর্ম, অথচ কোনো বিভক্তি নেই, তাই দ্বিতীয়া শূন্য বিভক্তি। প্রাণিবাচক কর্মে সাধারণত কে বসে, অপ্রাণিবাচকে বসে না।
এই ধারণাটি না জানলে অনেক বাক্যে কারক নির্ণয় আটকে যায়, কারণ শিক্ষার্থী চিহ্ন খুঁজে না পেয়ে থেমে যায়। মনে রাখো — চিহ্ন না থাকাও একটি বৈধ অবস্থা।
| বাক্য | পদ | বিভক্তি |
|---|---|---|
| রহিম যায় | রহিম | প্রথমা শূন্য |
| সে ভাত খায় | ভাত | দ্বিতীয়া শূন্য |
| সে রহিমকে ডাকে | রহিমকে | দ্বিতীয়া কে |
- ✓ প্রাণিবাচক কর্মে কে বসে — রহিমকে
- ✓ অপ্রাণিবাচক কর্মে শূন্য — ভাত
ক্রিয়াবিভক্তি
ধাতুর সঙ্গে যুক্ত হয়ে যে বিভক্তি ক্রিয়াপদ গড়ে, তাকে ক্রিয়াবিভক্তি বলে। এটি একসঙ্গে দুটি তথ্য বহন করে — কাল ও পুরুষ। করি-তে ই বিভক্তিটি জানাচ্ছে কাজটি বর্তমান কালে এবং কর্তা উত্তম পুরুষ।
একই ধাতুর সঙ্গে ভিন্ন ক্রিয়াবিভক্তি বসিয়ে এগারোটিরও বেশি রূপ পাওয়া যায়। ধাতু অপরিবর্তিত থাকে, বিভক্তিই সব পার্থক্য তৈরি করে — এ কারণেই কাল নির্ণয় মানে আসলে বিভক্তি চেনা।
| ক্রিয়াপদ | ধাতু | বিভক্তি | কাল ও পুরুষ |
|---|---|---|---|
| করি | √কর্ | ই | বর্তমান, উত্তম |
| করো | √কর্ | ও | বর্তমান, মধ্যম |
| করে | √কর্ | এ | বর্তমান, নাম |
| করলাম | √কর্ | লাম | অতীত, উত্তম |
| করব | √কর্ | ব | ভবিষ্যৎ, উত্তম |
- ✓ একটি বিভক্তি একসঙ্গে কাল ও পুরুষ জানায়
- ✗ করলাম-এর ধাতু করল ✓ ধাতু √কর্, বিভক্তি লাম
বিভক্তি ও অনুসর্গ
দুটিই পদের পরে বসে সম্পর্ক বোঝায়, তাই গুলিয়ে যাওয়া স্বাভাবিক। পার্থক্য অবস্থানে: বিভক্তি শব্দের সঙ্গে জুড়ে যায় এবং আলাদা করা যায় না; অনুসর্গ আলাদা শব্দ হিসেবে ফাঁক রেখে বসে।
ছেলেকে লিখতে হয় একসঙ্গে — ছেলে কে লিখলে ভুল। কিন্তু ছেলের জন্য লিখতে হয় ফাঁক রেখে — ছেলেরজন্য লিখলে ভুল। এই বানানের নিয়মটিই দুটির পার্থক্য চোখে দেখিয়ে দেয়।
কাজের দিক থেকে দুটি প্রায় সমান, তাই ব্যাকরণে অনুসর্গকে বলা হয় কর্মপ্রবচনীয় অব্যয় — অর্থাৎ যে অব্যয় বিভক্তির কাজ করে।
| দিক | বিভক্তি | অনুসর্গ |
|---|---|---|
| অবস্থান | শব্দের সঙ্গে জুড়ে | আলাদা শব্দ |
| বানান | ছেলেকে | ছেলের জন্য |
| পদ | পদের অংশ | অব্যয় পদ |
| উদাহরণ | কে, রে, র, এ, তে | দিয়ে, থেকে, জন্য, চেয়ে |
- ✗ ছেলে কে ডাকো ✓ ছেলেকে ডাকো — বিভক্তি জুড়ে বসে
- ✗ ছেলেরজন্য ✓ ছেলের জন্য — অনুসর্গ আলাদা বসে
পরীক্ষায় কী আসে
বিভক্তি অধ্যায় থেকে প্রশ্ন সাধারণত তিন রকম — সংজ্ঞা ও প্রকারভেদ, একটি পদের বিভক্তি নির্ণয়, আর বিভক্তি ও অনুসর্গের পার্থক্য। দ্বিতীয়টি কারক অধ্যায়ের সঙ্গে মিলিয়ে জিজ্ঞাসা করা হয়।
সবচেয়ে বেশি ভুল হয় শূন্য বিভক্তি নিয়ে। রহিম যায় বাক্যে রহিম-এ কোনো চিহ্ন নেই দেখে অনেকে লেখে “বিভক্তি নেই”। সঠিক উত্তর “প্রথমা শূন্য বিভক্তি” — চিহ্ন না থাকাও একটি বৈধ অবস্থা।
দ্বিতীয় সতর্কতা কারক ও বিভক্তি আলাদা রাখা। কারক বোঝায় ক্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক, আর বিভক্তি হলো সেই সম্পর্ক প্রকাশের চিহ্ন। প্রশ্নে দুটিই চাওয়া হলে আলাদা করে লিখতে হয় — যেমন “কর্ম কারকে দ্বিতীয়া বিভক্তি”।
- চিহ্ন না থাকলে লেখো শূন্য বিভক্তি, “নেই” নয়।
- কারক = সম্পর্ক; বিভক্তি = চিহ্ন।
- জুড়ে থাকলে বিভক্তি, আলাদা হলে অনুসর্গ।
- ✗ রহিম যায় — বিভক্তি নেই ✓ প্রথমা শূন্য বিভক্তি
বিস্তারিত আলোচনা
শব্দের সঙ্গে যে বিভক্তি যুক্ত হয়ে বিশেষ্য বা সর্বনাম পদ গঠন করে, তাকে শব্দবিভক্তি বা নামবিভক্তি বলে। আর ধাতুর সঙ্গে যুক্ত হয়ে যে বিভক্তি ক্রিয়াপদ গঠন করে, তাকে ক্রিয়াবিভক্তি বলে। "ছেলেটিকে" শব্দে "কে" শব্দবিভক্তি, আর "পড়ছে" শব্দে "ছে" ক্রিয়াবিভক্তি।
বাংলা শব্দবিভক্তি সাতটি ভাগে সাজানো হয়। প্রথমা বা শূন্য বিভক্তিতে কোনো চিহ্ন থাকে না — "ছেলে যায়"। দ্বিতীয়ায় বসে কে, রে — "ছেলেকে ডাকো"। তৃতীয়ায় বসে দ্বারা, দিয়ে, কর্তৃক। চতুর্থীতে কে, জন্য, নিমিত্ত। পঞ্চমীতে হতে, থেকে, চেয়ে। ষষ্ঠীতে র, এর। আর সপ্তমীতে এ, য়, তে।
বিভক্তি ও অনুসর্গের পার্থক্য মনে রাখা দরকার। বিভক্তি শব্দের সঙ্গে জুড়ে বসে, আলাদা করে লেখা যায় না — "ছেলেটিকে"। অনুসর্গ আলাদা শব্দ হিসেবে পাশে বসে — "ছেলেটির জন্য"। কারক নির্ণয়ের প্রশ্নে বিভক্তি চিহ্নিত করতে বলা হয় বলে এই তালিকাটি ভালোভাবে মুখস্থ রাখা কাজে দেয়।
মনে রাখার কথা
বিভক্তি শব্দের সঙ্গে জুড়ে বসে, আর অনুসর্গ আলাদা শব্দ হয়ে পাশে বসে — এটিই মূল পার্থক্য।
সাধারণ ভুল
পরীক্ষায় এই ভুলগুলোই সবচেয়ে বেশি নম্বর কাটে। ভুল রূপটি দেখে নিলে নিজের লেখায় ধরা সহজ হয়।
- ✗ “রহিম যায়” — এখানে বিভক্তি নেই। ✓ প্রথমা শূন্য বিভক্তি — চিহ্ন না থাকাও একটি অবস্থা।
- ✗ “জন্য” একটি বিভক্তি। ✓ অনুসর্গ — আলাদা শব্দ হিসেবে বসে।
- ✗ কারক ও বিভক্তি একই জিনিস। ✓ কারক সম্পর্ক বোঝায়, বিভক্তি সেই সম্পর্কের চিহ্ন।
- ✗ “করলাম”-এর ধাতু “করল”। ✓ ধাতু √কর্, ক্রিয়াবিভক্তি লাম।
অনুশীলন
নিচের প্রশ্নগুলোর উত্তর নিজে লেখো, তারপর মিলিয়ে নাও।
- বিভক্তি কাকে বলে?
- বিভক্তি কত প্রকার ও কী কী?
- শব্দবিভক্তি কয়টি ও তাদের নাম কী?
- শূন্য বিভক্তি কাকে বলে?
- ক্রিয়াবিভক্তি কী কী তথ্য জানায়?
- বিভক্তি ও অনুসর্গের পার্থক্য কী?
- কারক ও বিভক্তির সম্পর্ক কী?
- প্রাণিবাচক ও অপ্রাণিবাচক কর্মে বিভক্তি আলাদা হয় কেন?
- সাধু ও চলিত ভাষায় বিভক্তির রূপ বদলায় কি?
উত্তর
- শব্দ ও ধাতুর সঙ্গে যুক্ত হয়ে যেসব বর্ণ বা বর্ণসমষ্টি তাদের বাক্যে ব্যবহারের যোগ্য করে তোলে, তাদের বিভক্তি বলে।
- দুই প্রকার — শব্দবিভক্তি (শব্দের সঙ্গে) ও ক্রিয়াবিভক্তি (ধাতুর সঙ্গে)।
- সাতটি — প্রথমা, দ্বিতীয়া, তৃতীয়া, চতুর্থী, পঞ্চমী, ষষ্ঠী ও সপ্তমী।
- যে পদে কোনো দৃশ্যমান বিভক্তি-চিহ্ন থাকে না, তাকে শূন্য বিভক্তি বলে — যেমন “রহিম যায়” বাক্যে রহিম পদে প্রথমা শূন্য বিভক্তি।
- একসঙ্গে দুটি — কাল ও পুরুষ। “করি”-তে ই বিভক্তিটি জানায় কাজটি বর্তমান কালে এবং কর্তা উত্তম পুরুষ।
- বিভক্তি শব্দের সঙ্গে জুড়ে বসে (ছেলেকে), আর অনুসর্গ আলাদা শব্দ হিসেবে ফাঁক রেখে বসে (ছেলের জন্য)।
- কারক বোঝায় ক্রিয়ার সঙ্গে পদের সম্পর্ক, আর বিভক্তি হলো সেই সম্পর্ক প্রকাশের চিহ্ন — যেমন “কর্ম কারকে দ্বিতীয়া বিভক্তি”।
- প্রাণিবাচক কর্মে সাধারণত “কে” বসে (রহিমকে ডাকো), আর অপ্রাণিবাচক কর্মে শূন্য বিভক্তি থাকে (ভাত খায়)। এটি বাংলার নিজস্ব রীতি, সংস্কৃত থেকে আসা নয়।
- বদলায়। তৃতীয়া বিভক্তিতে সাধু ভাষায় “দ্বারা” বা “দিয়া” বসে, চলিত ভাষায় “দিয়ে”; পঞ্চমীতে সাধুতে “হইতে”, চলিততে “থেকে”। অর্থ এক, রূপ ভিন্ন।
উপযোগী শ্রেণি: নবম, দশম, একাদশ, দ্বাদশ শ্রেণি।
সচরাচর জিজ্ঞাসা
শব্দ বা ধাতুর সঙ্গে যুক্ত হয়ে যে বর্ণ বা বর্ণসমষ্টি পদ গঠন করে, তাকে বিভক্তি বলে। এটি দুই প্রকার — শব্দবিভক্তি ও ক্রিয়াবিভক্তি।
যেখানে শব্দের সঙ্গে কোনো দৃশ্যমান বিভক্তিচিহ্ন যুক্ত হয় না, তাকে শূন্য বা প্রথমা বিভক্তি বলে — যেমন "ছেলে যায়" বাক্যে "ছেলে"।
বিভক্তি শব্দের সঙ্গে জুড়ে বসে এবং আলাদা করে লেখা যায় না; অনুসর্গ স্বতন্ত্র শব্দ হিসেবে পদের পাশে বসে — যেমন "ছেলেটির জন্য"।
হ্যাঁ। কোনো দৃশ্যমান চিহ্ন না থাকাও ব্যাকরণে একটি বৈধ অবস্থা, আর তারই নাম শূন্য বিভক্তি। “রহিম যায়” বাক্যে রহিম পদে প্রথমা শূন্য বিভক্তি আছে — উত্তরে “বিভক্তি নেই” লেখা ভুল।
আরও বাংলা ব্যাকরণ পড়ো
বাংলা ব্যাকরণ-এর পূর্ণ তালিকা ও বাংলা লেখার অন্যান্য অংশ এক জায়গায়।
আমাদের সাথে যুক্ত থাকো
পড়াশোনার আপডেট, সাজেশন ও প্রশ্নোত্তর সবার আগে পেতে আমাদের ফেসবুক পেজ ও গ্রুপে যুক্ত হও।






















