অনুসর্গ কাকে বলে — উদাহরণ ও উপসর্গের সঙ্গে পার্থক্য
অনুসর্গের সংজ্ঞা, প্রকারভেদ ও উদাহরণ এবং উপসর্গের সঙ্গে পার্থক্য স্পষ্ট করে ব্যাখ্যা।
সংজ্ঞা
যেসব অব্যয় শব্দ বিশেষ্য বা সর্বনামের পরে বসে বিভক্তির মতো কাজ করে, তাদের অনুসর্গ বা কর্মপ্রবচনীয় বলে — যেমন দিয়ে, হতে, চেয়ে, জন্য।
অব্যয় হয়েও বিভক্তির কাজ
যেসব অব্যয় বিশেষ্য বা সর্বনামের পরে বসে বিভক্তির মতো কাজ করে, তাদের অনুসর্গ বলে। ব্যাকরণে এদের আরেক নাম কর্মপ্রবচনীয় অব্যয়। কলম দিয়ে লিখি — এখানে দিয়ে অনুসর্গ, আর সেটি করণ কারক নির্দেশ করছে।
অনুসর্গ ও বিভক্তির কাজ এক, কিন্তু অবস্থান আলাদা। বিভক্তি শব্দের সঙ্গে জুড়ে যায় — ছেলেকে। অনুসর্গ আলাদা শব্দ হিসেবে বসে — ছেলের জন্য। এই একটি পার্থক্যই দুটিকে চেনার জন্য যথেষ্ট।
অনুসর্গ কারক নির্ণয়ে বড় ভূমিকা রাখে। কোন অনুসর্গ বসেছে দেখেই কারকটি বলা যায় — দিয়ে করণ, থেকে অপাদান, জন্য নিমিত্ত। তাই কারক অধ্যায় পড়ার আগে অনুসর্গ জানা থাকা দরকার।
- অনুসর্গ = কর্মপ্রবচনীয় অব্যয়।
- বিভক্তি জুড়ে বসে, অনুসর্গ আলাদা।
- কারক নির্ণয়ে অনুসর্গ প্রধান সূত্র।
- ✓ কলম দিয়ে লিখি — দিয়ে অনুসর্গ
- ✓ ছেলেকে (বিভক্তি) বনাম ছেলের জন্য (অনুসর্গ)
ধাতুজ ও অধাতুজ অনুসর্গ
উৎস অনুযায়ী অনুসর্গ দুই ভাগে বিভক্ত। যেগুলো ক্রিয়াপদ থেকে এসেছে তাদের বলে ধাতুজ অনুসর্গ, আর যেগুলোর সঙ্গে ক্রিয়ার সম্পর্ক নেই তাদের অধাতুজ।
দিয়ে এসেছে √দে ধাতু থেকে, থেকে এসেছে √থাক্ থেকে, ধরে এসেছে √ধর্ থেকে — এগুলো ধাতুজ। আর জন্য, নিমিত্ত, বিনা, ছাড়া কোনো ধাতু থেকে আসেনি, তাই অধাতুজ।
উৎস অনুযায়ী অনুসর্গ
| প্রকার | উৎস | উদাহরণ |
|---|---|---|
| ধাতুজ | ক্রিয়াপদ থেকে | দিয়ে, নিয়ে, করে, ধরে, থেকে, হতে |
| অধাতুজ | ক্রিয়ার সম্পর্ক নেই | জন্য, নিমিত্ত, বিনা, ছাড়া, তরে |
- ✓ √দে → দিয়ে — ধাতুজ অনুসর্গ
- ✓ জন্য — অধাতুজ অনুসর্গ
কোন অনুসর্গ কোন কারক বোঝায়
প্রতিটি অনুসর্গ একটি নির্দিষ্ট সম্পর্ক নির্দেশ করে, আর সেই সম্পর্কই কারক ঠিক করে দেয়। ছকটি মনে রাখলে কারক নির্ণয়ের অর্ধেক কাজ হয়ে যায়।
| অনুসর্গ | যে সম্পর্ক | কারক | উদাহরণ |
|---|---|---|---|
| দিয়ে, দ্বারা, কর্তৃক | উপায় বা মাধ্যম | করণ | কলম দিয়ে লিখি |
| থেকে, হতে | উৎস বা বিচ্যুতি | অপাদান | গাছ থেকে ফল পড়ে |
| জন্য, নিমিত্ত, তরে | উদ্দেশ্য | সম্প্রদান / নিমিত্ত | তোমার জন্য এনেছি |
| চেয়ে | তুলনা | অপাদান | তার চেয়ে ভালো |
| পর্যন্ত | সীমা | অধিকরণ | সকাল পর্যন্ত |
| সঙ্গে, সহিত | সঙ্গ | করণ | বন্ধুর সঙ্গে গেলাম |
- ✓ দিয়ে → করণ কারক
- ✓ থেকে → অপাদান কারক
অনুসর্গের অর্থবৈচিত্র্য
একই অনুসর্গ প্রসঙ্গভেদে ভিন্ন অর্থ দিতে পারে, তাই অনুসর্গ দেখেই কারক বলে দেওয়া সব সময় নিরাপদ নয়। থেকে কখনো উৎস বোঝায় (গাছ থেকে ফল পড়ে), কখনো সময় (সকাল থেকে বসে আছি), কখনো তুলনা (তার থেকে ভালো)।
দিয়েও তেমনি — কখনো উপায় (কলম দিয়ে লিখি), কখনো মাধ্যম (তাকে দিয়ে কাজ করালাম)। বাক্যটি কী বলছে, সেটিই শেষ বিচারক।
তাই কারক নির্ণয়ের সময় দুটি ধাপ: প্রথমে অনুসর্গটি চিহ্নিত করো, তারপর বাক্যে সেটি কী সম্পর্ক তৈরি করছে দেখো। অনুসর্গের নাম যথেষ্ট নয়, তার কাজটিই নির্ণায়ক।
| অনুসর্গ | অর্থ | উদাহরণ |
|---|---|---|
| থেকে | উৎস | গাছ থেকে ফল পড়ে |
| থেকে | সময় | সকাল থেকে বসে আছি |
| থেকে | তুলনা | তার থেকে ভালো |
| দিয়ে | উপায় | কলম দিয়ে লিখি |
| দিয়ে | মাধ্যম | তাকে দিয়ে কাজ করালাম |
- ✓ অনুসর্গের নাম নয়, তার কাজই নির্ণায়ক
অনুসর্গ ও উপসর্গ গুলিয়ো না
নাম দুটি কাছাকাছি হলেও কাজ সম্পূর্ণ বিপরীত। উপসর্গ বসে শব্দের আগে এবং নতুন শব্দ তৈরি করে — প্র + হার = প্রহার। অনুসর্গ বসে শব্দের পরে এবং বাক্যে সম্পর্ক বোঝায় — ছেলের জন্য।
আরেকটি পার্থক্য স্বাধীনতায়। উপসর্গ একা ব্যবহৃত হতে পারে না, শব্দের সঙ্গে জুড়ে থাকতেই হয়। অনুসর্গ একটি আলাদা শব্দ, তাই বাক্যে ফাঁক রেখে লেখা হয়।
| দিক | উপসর্গ | অনুসর্গ |
|---|---|---|
| অবস্থান | শব্দের আগে | শব্দের পরে |
| কাজ | নতুন শব্দ গড়ে | বাক্যে সম্পর্ক বোঝায় |
| স্বাধীনতা | একা বসে না | আলাদা শব্দ |
| উদাহরণ | প্র + হার = প্রহার | ছেলের জন্য |
- ✗ “জন্য” একটি উপসর্গ ✓ “জন্য” একটি অনুসর্গ
- ✗ “প্র” একটি অনুসর্গ ✓ “প্র” একটি উপসর্গ
পরীক্ষায় কী আসে
অনুসর্গ থেকে প্রশ্ন সাধারণত তিন রকম — সংজ্ঞা, উপসর্গের সঙ্গে পার্থক্য, আর বাক্য থেকে অনুসর্গ চিহ্নিত করে কারক নির্ণয়। তৃতীয়টি সবচেয়ে বেশি নম্বরের।
সবচেয়ে বেশি ভুল হয় অনুসর্গকে বিভক্তি ভেবে। সূত্রটি সহজ: শব্দের সঙ্গে জুড়ে থাকলে বিভক্তি, ফাঁক রেখে আলাদা বসলে অনুসর্গ। ছেলেকে বিভক্তি, ছেলের জন্য অনুসর্গ।
দ্বিতীয় সতর্কতা অর্থবৈচিত্র্য নিয়ে। থেকে দেখলেই অপাদান লিখে ফেলা চলবে না — সকাল থেকে সময় বোঝাচ্ছে, তাই সেটি অধিকরণ। বাক্যটি পড়ে সম্পর্কটি বুঝে নিতে হবে।
- জুড়ে থাকলে বিভক্তি, আলাদা বসলে অনুসর্গ।
- উপসর্গ আগে, অনুসর্গ পরে।
- অনুসর্গ দেখেই কারক নয় — সম্পর্কটি দেখো।
- ✗ “সকাল থেকে” — অপাদান কারক ✓ সময় বোঝাচ্ছে, তাই অধিকরণ
বহুল ব্যবহৃত অনুসর্গের তালিকা
অনুসর্গ সংখ্যায় সীমিত, তাই তালিকা ধরে মনে রাখা সহজ। নিচের শব্দগুলোই পরীক্ষায় ঘুরেফিরে আসে, আর প্রতিটির সঙ্গে একটি চেনা উদাহরণ গেঁথে রাখলে বাক্য থেকে চিহ্নিত করতে দেরি হয় না।
লক্ষ করো, বেশ কয়েকটি অনুসর্গের একাধিক রূপ আছে — দিয়ে ও দ্বারা একই কাজ করে, থেকে ও হতে একই, জন্য ও নিমিত্ত একই। সাধু ভাষায় দ্বিতীয় রূপটি বসে, চলিত ভাষায় প্রথমটি।
বহুল ব্যবহৃত অনুসর্গ
| চলিত রূপ | সাধু রূপ | উদাহরণ |
|---|---|---|
| দিয়ে | দ্বারা, কর্তৃক | কলম দিয়ে লিখি |
| থেকে | হতে | ঘর থেকে বেরোলাম |
| জন্য | নিমিত্ত, তরে | তোমার জন্য এনেছি |
| ছাড়া | ব্যতীত, বিনা | তুমি ছাড়া কেউ নেই |
| সঙ্গে | সহিত, সহ | বন্ধুর সঙ্গে গেলাম |
| চেয়ে | অপেক্ষা | তার চেয়ে ভালো |
- ✓ চলিত “থেকে” = সাধু “হতে”
- ✓ চলিত “জন্য” = সাধু “নিমিত্ত”
বিস্তারিত আলোচনা
অনুসর্গ পদের পরে বসে বলে এর নাম অনুসর্গ, আর উপসর্গ বসে শব্দের আগে — এটিই দুইয়ের মূল পার্থক্য। "কলম দিয়ে লিখি" বাক্যে "দিয়ে" অনুসর্গ; এটি করণ কারকের ভাব প্রকাশ করছে, ঠিক যেমন একটি বিভক্তি করত। এ কারণেই অনুসর্গকে অনেক সময় "পদান্বয়ী অব্যয়"ও বলা হয়।
অনুসর্গ দুই ধরনের হতে পারে। কিছু অনুসর্গ স্বাধীনভাবে ব্যবহৃত হয় এবং নিজের অর্থ রাখে — বিনা, ব্যতীত, ছাড়া, পর্যন্ত, দ্বারা, নিমিত্ত। আবার কিছু অনুসর্গ আসলে ক্রিয়া থেকে এসেছে এবং এখন অব্যয়ের মতো কাজ করে — দিয়ে, হতে, থেকে, চেয়ে, ধরে, নিয়ে।
অনুসর্গ চেনার সহজ উপায় হলো দেখা, শব্দটি কোনো বিশেষ্য বা সর্বনামের পরে বসে সেটির সঙ্গে বাক্যের অন্য অংশের সম্পর্ক তৈরি করছে কি না। "তোমার জন্য এনেছি" বাক্যে "জন্য" অনুসর্গ, কারণ এটি "তোমার" পদের পরে বসে নিমিত্তের সম্পর্ক বোঝাচ্ছে। ইংরেজি preposition-এর সঙ্গে এর কাজের মিল আছে, তবে অবস্থান উল্টো।
মনে রাখার কথা
উপসর্গ বসে শব্দের আগে আর অনুসর্গ বসে পদের পরে — নামেই পার্থক্যটি ধরা আছে।
সাধারণ ভুল
পরীক্ষায় এই ভুলগুলোই সবচেয়ে বেশি নম্বর কাটে। ভুল রূপটি দেখে নিলে নিজের লেখায় ধরা সহজ হয়।
- ✗ “জন্য” একটি বিভক্তি। ✓ এটি অনুসর্গ — আলাদা শব্দ হিসেবে বসে।
- ✗ অনুসর্গ শব্দের আগে বসে। ✓ শব্দের পরে বসে; আগে বসে উপসর্গ।
- ✗ “থেকে” সব সময় অপাদান কারক বোঝায়। ✓ সময় বোঝালে অধিকরণ — “সকাল থেকে বসে আছি”।
- ✗ অনুসর্গ একটি সব্যয় পদ। ✓ অনুসর্গ অব্যয় — এর রূপ বদলায় না।
অনুশীলন
নিচের প্রশ্নগুলোর উত্তর নিজে লেখো, তারপর মিলিয়ে নাও।
- অনুসর্গ কাকে বলে?
- অনুসর্গ ও বিভক্তির পার্থক্য কী?
- ধাতুজ ও অধাতুজ অনুসর্গ বলতে কী বোঝ?
- অনুসর্গ ও উপসর্গের পার্থক্য কী?
- “কলম দিয়ে লিখি” — অনুসর্গটি কোন কারক বোঝাচ্ছে?
- “থেকে” অনুসর্গটি কয় অর্থে বসে?
- কারক নির্ণয়ে অনুসর্গ কীভাবে সাহায্য করে?
- অনুসর্গকে কর্মপ্রবচনীয় অব্যয় বলা হয় কেন?
উত্তর
- যেসব অব্যয় বিশেষ্য বা সর্বনামের পরে বসে বিভক্তির মতো কাজ করে, তাদের অনুসর্গ বা কর্মপ্রবচনীয় অব্যয় বলে।
- বিভক্তি শব্দের সঙ্গে জুড়ে বসে (ছেলেকে), আর অনুসর্গ আলাদা শব্দ হিসেবে ফাঁক রেখে বসে (ছেলের জন্য)।
- ক্রিয়াপদ থেকে আসা অনুসর্গ ধাতুজ (দিয়ে, থেকে, ধরে), আর ক্রিয়ার সম্পর্ক নেই এমন অনুসর্গ অধাতুজ (জন্য, বিনা, ছাড়া)।
- উপসর্গ শব্দের আগে বসে নতুন শব্দ গড়ে (প্রহার), আর অনুসর্গ শব্দের পরে বসে বাক্যে সম্পর্ক বোঝায় (ছেলের জন্য)।
- “দিয়ে” অনুসর্গটি উপায় বোঝাচ্ছে, তাই এটি করণ কারক।
- অন্তত তিন অর্থে — উৎস (গাছ থেকে ফল পড়ে), সময় (সকাল থেকে বসে আছি) ও তুলনা (তার থেকে ভালো)।
- কোন অনুসর্গ বসেছে দেখে সম্পর্কটি ধরা যায় — দিয়ে করণ, থেকে অপাদান, জন্য নিমিত্ত। তবে বাক্যে অনুসর্গটির কাজ কী, সেটিই শেষ বিচারক।
- কারণ এটি অব্যয় হয়েও কর্ম বা অন্য কারকের সম্পর্ক প্রকাশ করে — অর্থাৎ বিভক্তির কাজটি করে দেয়, অথচ নিজে আলাদা শব্দ হিসেবেই থাকে।
উপযোগী শ্রেণি: নবম, দশম, একাদশ, দ্বাদশ শ্রেণি।
সচরাচর জিজ্ঞাসা
যেসব অব্যয় শব্দ বিশেষ্য বা সর্বনামের পরে বসে বিভক্তির মতো কাজ করে, তাদের অনুসর্গ বলে — যেমন দিয়ে, হতে, ছাড়া, জন্য, পর্যন্ত।
উপসর্গ শব্দের আগে বসে নতুন শব্দ গঠন করে, আর অনুসর্গ পদের পরে বসে বিভক্তির মতো সম্পর্ক বোঝায়।
কর্মপ্রবচনীয় বা পদান্বয়ী অব্যয় নামেও ডাকা হয়, কারণ এটি একটি পদের সঙ্গে বাক্যের অন্য অংশের অন্বয় ঘটায়।
সব সময় নয়। একই অনুসর্গ প্রসঙ্গভেদে ভিন্ন সম্পর্ক বোঝায় — “গাছ থেকে ফল পড়ে”-তে থেকে অপাদান, কিন্তু “সকাল থেকে বসে আছি”-তে সময় বোঝাচ্ছে, তাই অধিকরণ। বাক্যে অনুসর্গটির কাজ কী, সেটিই শেষ বিচারক।
আরও বাংলা ব্যাকরণ পড়ো
বাংলা ব্যাকরণ-এর পূর্ণ তালিকা ও বাংলা লেখার অন্যান্য অংশ এক জায়গায়।
আমাদের সাথে যুক্ত থাকো
পড়াশোনার আপডেট, সাজেশন ও প্রশ্নোত্তর সবার আগে পেতে আমাদের ফেসবুক পেজ ও গ্রুপে যুক্ত হও।






















