বাক্য প্রকরণ — গঠন ও অর্থ অনুসারে বাক্যের শ্রেণিবিভাগ
বাক্যের সংজ্ঞা, উদ্দেশ্য-বিধেয়, সরল-জটিল-যৌগিক ভেদ এবং আকাঙ্ক্ষা, আসত্তি ও যোগ্যতা।
সংজ্ঞা
যে সুবিন্যস্ত পদসমষ্টি দ্বারা মনের ভাব সম্পূর্ণরূপে প্রকাশ পায়, তাকে বাক্য বলে। প্রতিটি বাক্যের দুটি অংশ — উদ্দেশ্য ও বিধেয়।
বাক্যের তিনটি গুণ
যে সুবিন্যস্ত পদসমষ্টি দ্বারা বক্তার মনের ভাব সম্পূর্ণরূপে প্রকাশ পায়, তাকে বাক্য বলে। কেবল কয়েকটি পদ পাশাপাশি বসালেই বাক্য হয় না — তিনটি গুণ থাকতে হয়: আকাঙ্ক্ষা, আসত্তি ও যোগ্যতা।
আকাঙ্ক্ষা মানে বাক্যটি শোনার পর আর কিছু জানার ইচ্ছা না থাকা। সে বই বললে মন চায় জানতে — বই কী করল? তাই এটি বাক্য নয়। আসত্তি মানে পদগুলোর সঠিক ক্রমে বসা; পড়ে সে বই বললে অর্থ ঘোলাটে হয়। যোগ্যতা মানে অর্থগত সংগতি — আগুন দিয়ে ভাত রান্না হয় যুক্তিসংগত, কিন্তু পানি দিয়ে আগুন জ্বলে নয়।
তিনটি গুণের যেকোনো একটি না থাকলে বাক্য অসম্পূর্ণ বা অশুদ্ধ হয়। পরীক্ষায় বাক্যের সংজ্ঞা লিখতে বললে এই তিনটির নাম ও ব্যাখ্যা দিতেই হয়।
বাক্যের তিন গুণ
| গুণ | অর্থ | অভাবে যা হয় |
|---|---|---|
| আকাঙ্ক্ষা | আর কিছু জানার ইচ্ছা না থাকা | সে বই — অসম্পূর্ণ |
| আসত্তি | পদের সঠিক ক্রম | পড়ে সে বই — অর্থ ঘোলাটে |
| যোগ্যতা | অর্থগত সংগতি | পানি দিয়ে আগুন জ্বলে — অসংগত |
- ✗ সে বই ✓ সে বই পড়ে — আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ হলো
- ✗ পড়ে সে বই ✓ সে বই পড়ে — আসত্তি
উদ্দেশ্য ও বিধেয়
প্রতিটি বাক্যের দুটি অংশ। যাকে নিয়ে কিছু বলা হয় তাকে বলে উদ্দেশ্য, আর তার সম্পর্কে যা বলা হয় তাকে বিধেয়। রহিম বই পড়ে — এখানে রহিম উদ্দেশ্য এবং বই পড়ে বিধেয়।
উদ্দেশ্য খুঁজতে ক্রিয়াকে কে বা কী প্রশ্ন করো — উত্তরটিই উদ্দেশ্য। কে পড়ে? উত্তর রহিম। বাকি অংশটুকুই বিধেয়।
উদ্দেশ্য ও বিধেয় দুটিরই সম্প্রসারক থাকতে পারে। ভালো ছেলে রহিম মন দিয়ে বই পড়ে — এখানে ভালো ছেলে উদ্দেশ্যের সম্প্রসারক এবং মন দিয়ে বিধেয়ের সম্প্রসারক।
| বাক্য | উদ্দেশ্য | বিধেয় |
|---|---|---|
| রহিম বই পড়ে | রহিম | বই পড়ে |
| পাখিটি উড়ে গেল | পাখিটি | উড়ে গেল |
| ভালো ছেলে রহিম মন দিয়ে পড়ে | ভালো ছেলে রহিম | মন দিয়ে পড়ে |
- ✓ কে পড়ে? রহিম → উদ্দেশ্য
- ✓ বাকি অংশ → বিধেয়
গঠন অনুযায়ী বাক্যের তিন প্রকার
বাক্যে কয়টি খণ্ডবাক্য আছে এবং তারা কীভাবে যুক্ত, তার ভিত্তিতে বাক্য তিন প্রকার। এই ভাগটি বাক্য রূপান্তরের অধ্যায়ে সরাসরি কাজে লাগে।
গঠন অনুযায়ী বাক্য
| প্রকার | বৈশিষ্ট্য | উদাহরণ |
|---|---|---|
| সরল বাক্য | একটি কর্তা, একটি সমাপিকা ক্রিয়া | সে বই পড়ে |
| জটিল / মিশ্র বাক্য | একটি প্রধান + এক বা একাধিক অধীন খণ্ডবাক্য | যে পড়ে, সে শেখে |
| যৌগিক বাক্য | দুটি স্বাধীন বাক্য অব্যয়ে যুক্ত | সে এল এবং বসল |
- ✓ যদি পড়ো, তবে পাশ করবে — জটিল বাক্য
- ✓ সে এল কিন্তু বসল না — যৌগিক বাক্য
জটিল ও যৌগিক বাক্য আলাদা করার নিয়ম
দুটিতেই একাধিক খণ্ডবাক্য থাকে, তাই এই জোড়াটিই সবচেয়ে বেশি গুলিয়ে যায়। পার্থক্য নির্ভরশীলতায়: যৌগিক বাক্যের খণ্ডবাক্যগুলো স্বাধীন, আর জটিল বাক্যের একটি খণ্ডবাক্য অন্যটির ওপর নির্ভরশীল।
সে এল এবং বসল — দুটি অংশই আলাদা বাক্য হিসেবে দাঁড়াতে পারে, তাই যৌগিক। যে পড়ে, সে শেখে — যে পড়ে অংশটি একা দাঁড়াতে পারে না, তাই জটিল।
চেনার চিহ্নও আলাদা। যৌগিক বাক্যে বসে সমুচ্চয়ী অব্যয় — এবং, ও, কিন্তু, অথবা। জটিল বাক্যে বসে সাপেক্ষ সর্বনাম বা অব্যয় — যে-সে, যদি-তবে, যখন-তখন, যেহেতু-সেহেতু।
| দিক | যৌগিক | জটিল |
|---|---|---|
| খণ্ডবাক্য | স্বাধীন | একটি নির্ভরশীল |
| যোগকারী | এবং, ও, কিন্তু, অথবা | যদি-তবে, যে-সে, যখন-তখন |
| উদাহরণ | সে এল এবং বসল | যদি পড়ো, তবে পাশ করবে |
- ✓ এবং / কিন্তু → যৌগিক
- ✓ যদি / যে / যখন → জটিল
অর্থ অনুযায়ী বাক্যের প্রকার
বাক্যটি কী কাজ করছে — জানাচ্ছে, প্রশ্ন করছে, আদেশ দিচ্ছে, নাকি বিস্ময় প্রকাশ করছে — তার ভিত্তিতেও বাক্যকে ভাগ করা হয়। এই ভাগটি ক্রিয়ার ভাবের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত।
| প্রকার | কী করে | উদাহরণ |
|---|---|---|
| বিবৃতিমূলক | জানায় | সে বই পড়ে |
| প্রশ্নবোধক | প্রশ্ন করে | সে কি বই পড়ে? |
| অনুজ্ঞাসূচক | আদেশ বা অনুরোধ | বই পড়ো |
| বিস্ময়সূচক | বিস্ময় প্রকাশ | আহা, কী সুন্দর! |
| ইচ্ছাসূচক | ইচ্ছা বা প্রার্থনা | তুমি দীর্ঘজীবী হও |
| কার্যকারণাত্মক | কারণ ও ফল | বৃষ্টি হলো, তাই খেলা বন্ধ |
- ✓ সে কি এসেছে? — প্রশ্নবোধক
- ✓ আহা, কী চমৎকার! — বিস্ময়সূচক
পরীক্ষায় কী আসে
বাক্য প্রকরণ থেকে প্রশ্ন সাধারণত তিন রকম — বাক্যের সংজ্ঞা ও তিন গুণ, উদ্দেশ্য-বিধেয় চিহ্নিত করা, আর গঠন অনুযায়ী প্রকার নির্ণয়। তিনটিই নিয়মিত আসে।
সবচেয়ে বেশি ভুল হয় জটিল ও যৌগিক বাক্য আলাদা করতে গিয়ে। সূত্রটি এক লাইনের: সমুচ্চয়ী অব্যয় থাকলে যৌগিক, সাপেক্ষ জোড়া থাকলে জটিল। এবং, কিন্তু দেখলে যৌগিক; যদি-তবে, যে-সে দেখলে জটিল।
সংজ্ঞার প্রশ্নে তিনটি গুণের নাম লেখা বাধ্যতামূলক, আর প্রতিটির এক লাইনের ব্যাখ্যা দিলে পূর্ণ নম্বর মেলে। কেবল “মনের ভাব প্রকাশ পায়” লিখে থেমে গেলে উত্তর অসম্পূর্ণ থাকে।
- সমুচ্চয়ী অব্যয় → যৌগিক; সাপেক্ষ জোড়া → জটিল।
- সংজ্ঞায় আকাঙ্ক্ষা, আসত্তি, যোগ্যতা তিনটিই লেখো।
- উদ্দেশ্য খুঁজতে ক্রিয়াকে কে প্রশ্ন করো।
- ✗ “সে এল এবং বসল” — জটিল বাক্য ✓ যৌগিক — দুটি অংশই স্বাধীন
বিস্তারিত আলোচনা
উদ্দেশ্য হলো বাক্যে যার সম্পর্কে কিছু বলা হয়, আর বিধেয় হলো তার সম্পর্কে যা বলা হয়। "পরিশ্রমী ছাত্রটি ভালো ফল করেছে" বাক্যে "পরিশ্রমী ছাত্রটি" উদ্দেশ্য এবং "ভালো ফল করেছে" বিধেয়। উদ্দেশ্যের সঙ্গে যুক্ত বিশেষণকে বলে উদ্দেশ্যের সম্প্রসারক, আর বিধেয়ের সম্প্রসারকও একইভাবে থাকতে পারে।
গঠন অনুসারে বাক্য তিন প্রকার। সরল বাক্যে একটিমাত্র সমাপিকা ক্রিয়া থাকে — "সে বই পড়ে"। জটিল বা মিশ্র বাক্যে একটি প্রধান খণ্ডবাক্য ও এক বা একাধিক অধীন খণ্ডবাক্য থাকে — "যে ছেলেটি এসেছিল, সে আমার বন্ধু"। যৌগিক বাক্যে দুই বা তার বেশি স্বাধীন বাক্য অব্যয় দিয়ে যুক্ত থাকে — "সে এল এবং বসল"।
অর্থ অনুসারে বাক্য সাত প্রকার — বিবৃতিমূলক, প্রশ্নবোধক, অনুজ্ঞাসূচক, ইচ্ছাসূচক, আবেগসূচক, শর্তসূচক ও কার্যকারণাত্মক। একটি সার্থক বাক্যের তিনটি গুণ থাকা চাই — আকাঙ্ক্ষা (আরও জানার ইচ্ছা মেটানো), আসত্তি (পদগুলোর সঠিক পাশাপাশি অবস্থান) ও যোগ্যতা (অর্থের সংগতি)। এই তিনটির যেকোনো একটির অভাবে বাক্য অসার্থক হয়ে যায়।
মনে রাখার কথা
আকাঙ্ক্ষা, আসত্তি ও যোগ্যতা — এই তিন গুণ না থাকলে পদসমষ্টি সার্থক বাক্য হয় না।
সাধারণ ভুল
পরীক্ষায় এই ভুলগুলোই সবচেয়ে বেশি নম্বর কাটে। ভুল রূপটি দেখে নিলে নিজের লেখায় ধরা সহজ হয়।
- ✗ “সে এল এবং বসল” জটিল বাক্য। ✓ যৌগিক — দুটি খণ্ডবাক্যই স্বাধীন।
- ✗ বাক্যের গুণ দুটি। ✓ তিনটি — আকাঙ্ক্ষা, আসত্তি ও যোগ্যতা।
- ✗ উদ্দেশ্য মানে বাক্যের ক্রিয়া। ✓ যাকে নিয়ে কিছু বলা হয় সেটি উদ্দেশ্য; ক্রিয়াসহ বাকি অংশ বিধেয়।
- ✗ “যে পড়ে, সে শেখে” যৌগিক বাক্য। ✓ জটিল — “যে পড়ে” অংশটি একা দাঁড়াতে পারে না।
অনুশীলন
নিচের প্রশ্নগুলোর উত্তর নিজে লেখো, তারপর মিলিয়ে নাও।
- বাক্য কাকে বলে?
- বাক্যের তিনটি গুণ কী কী?
- উদ্দেশ্য ও বিধেয় কাকে বলে?
- গঠন অনুযায়ী বাক্য কত প্রকার?
- জটিল ও যৌগিক বাক্য আলাদা করবে কীভাবে?
- “পানি দিয়ে আগুন জ্বলে” — বাক্যটিতে কোন গুণের অভাব?
- অর্থ অনুযায়ী বাক্যের চারটি প্রকার লেখো।
- উদ্দেশ্য ও বিধেয়ের সম্প্রসারক কাকে বলে?
- সরল বাক্য চেনার সূত্র কী?
উত্তর
- যে সুবিন্যস্ত পদসমষ্টি দ্বারা বক্তার মনের ভাব সম্পূর্ণরূপে প্রকাশ পায়, তাকে বাক্য বলে।
- আকাঙ্ক্ষা (আর কিছু জানার ইচ্ছা না থাকা), আসত্তি (পদের সঠিক ক্রম) ও যোগ্যতা (অর্থগত সংগতি)।
- যাকে নিয়ে কিছু বলা হয় তাকে উদ্দেশ্য এবং তার সম্পর্কে যা বলা হয় তাকে বিধেয় বলে।
- তিন প্রকার — সরল, জটিল বা মিশ্র এবং যৌগিক বাক্য।
- যৌগিক বাক্যের খণ্ডবাক্যগুলো স্বাধীন এবং সমুচ্চয়ী অব্যয়ে যুক্ত; জটিল বাক্যে একটি খণ্ডবাক্য অন্যটির ওপর নির্ভরশীল এবং সাপেক্ষ জোড়ায় যুক্ত।
- যোগ্যতার — অর্থগত সংগতি নেই, কারণ পানি দিয়ে আগুন জ্বলে না।
- বিবৃতিমূলক, প্রশ্নবোধক, অনুজ্ঞাসূচক ও বিস্ময়সূচক।
- উদ্দেশ্য বা বিধেয়কে বিস্তৃত করে এমন অংশকে সম্প্রসারক বলে — “ভালো ছেলে রহিম মন দিয়ে পড়ে” বাক্যে “ভালো ছেলে” উদ্দেশ্যের এবং “মন দিয়ে” বিধেয়ের সম্প্রসারক।
- একটি মাত্র কর্তা ও একটি মাত্র সমাপিকা ক্রিয়া থাকলে সেটি সরল বাক্য — যেমন “সে বই পড়ে”। একাধিক সমাপিকা ক্রিয়া বা খণ্ডবাক্য থাকলে সেটি আর সরল নয়।
উপযোগী শ্রেণি: নবম, দশম, একাদশ, দ্বাদশ শ্রেণি।
সচরাচর জিজ্ঞাসা
যে সুবিন্যস্ত পদসমষ্টি দ্বারা মনের ভাব সম্পূর্ণরূপে প্রকাশ পায়, তাকে বাক্য বলে। প্রতিটি বাক্যের দুটি অংশ — উদ্দেশ্য ও বিধেয়।
তিনটি — আকাঙ্ক্ষা, আসত্তি ও যোগ্যতা। আকাঙ্ক্ষা মানে আরও জানার ইচ্ছা না থাকা, আসত্তি মানে পদের সঠিক বিন্যাস, যোগ্যতা মানে অর্থের সংগতি।
তিন প্রকার — সরল বাক্য (একটি সমাপিকা ক্রিয়া), জটিল বা মিশ্র বাক্য (প্রধান ও অধীন খণ্ডবাক্য) এবং যৌগিক বাক্য (অব্যয়ে যুক্ত স্বাধীন বাক্য)।
বাক্যটি অসম্পূর্ণ বা অশুদ্ধ হয়ে যায়। আকাঙ্ক্ষা না থাকলে অসম্পূর্ণ (“সে বই”), আসত্তি না থাকলে অর্থ ঘোলাটে (“পড়ে সে বই”), আর যোগ্যতা না থাকলে অর্থগত অসংগতি ঘটে (“পানি দিয়ে আগুন জ্বলে”)।
আরও বাংলা ব্যাকরণ পড়ো
বাংলা ব্যাকরণ-এর পূর্ণ তালিকা ও বাংলা লেখার অন্যান্য অংশ এক জায়গায়।
আমাদের সাথে যুক্ত থাকো
পড়াশোনার আপডেট, সাজেশন ও প্রশ্নোত্তর সবার আগে পেতে আমাদের ফেসবুক পেজ ও গ্রুপে যুক্ত হও।






















