ক্রিয়ার ভাব — চার প্রকার ও উদাহরণ
নির্দেশক, অনুজ্ঞা, সাপেক্ষ ও আকাঙ্ক্ষা প্রকাশক ভাবের পরিচয় এবং কাল ও ভাবের পার্থক্য।
সংজ্ঞা
বক্তার মনোভাব অনুযায়ী ক্রিয়ার যে রূপভেদ হয়, তাকে ক্রিয়ার ভাব বা প্রকার বলে। বাংলায় ক্রিয়ার ভাব চার প্রকার।
বক্তার মনোভাব প্রকাশ করে ক্রিয়ার ভাব
ক্রিয়া সম্পাদনের ধরন বা বক্তার মনোভাব প্রকাশ করতে ক্রিয়ার যে রূপভেদ হয়, তাকে ক্রিয়ার ভাব বলে। কাল জানায় কাজটি কখন ঘটল, আর ভাব জানায় বক্তা কাজটিকে কীভাবে দেখছেন।
সে যায় — এটি একটি সাধারণ বিবৃতি। তুমি যাও — এটি আদেশ। যদি যাও — এটি শর্ত। সে যেন আসে — এটি ইচ্ছা। চারটি বাক্যে একই ধাতু, কিন্তু বক্তার মনোভাব চার রকম।
বাংলায় ক্রিয়ার ভাব চার প্রকার, আর এদের চেনার সূত্রও আলাদা। ভাব নির্ণয় করতে হলে বাক্যটি কী করছে তা দেখতে হয় — জানাচ্ছে, আদেশ করছে, শর্ত দিচ্ছে, নাকি ইচ্ছা প্রকাশ করছে।
- কাল = কখন; ভাব = কীভাবে দেখছেন।
- বাংলায় ক্রিয়ার ভাব চার প্রকার।
- বাক্যের কাজ দেখে ভাব নির্ণয় করতে হয়।
- ✓ সে যায় (নির্দেশক) / তুমি যাও (অনুজ্ঞা)
- ✓ যদি যাও (সাপেক্ষ) / সে যেন আসে (আকাঙ্ক্ষা)
ক্রিয়ার চার ভাব
চারটি ভাবের প্রতিটির নিজস্ব কাজ ও চেনার চিহ্ন আছে। ছকটি একবার মিলিয়ে নিলে ভাব নির্ণয়ের প্রশ্নে আর ভুল হয় না।
ক্রিয়ার চার ভাব
| ভাব | কী প্রকাশ করে | চেনার চিহ্ন | উদাহরণ |
|---|---|---|---|
| নির্দেশক | সাধারণ বিবৃতি বা প্রশ্ন | কোনো বিশেষ চিহ্ন নেই | সে বই পড়ে |
| অনুজ্ঞা | আদেশ, উপদেশ, অনুরোধ | কর্তা প্রায়ই উহ্য | তুমি বই পড়ো |
| সাপেক্ষ | শর্ত | যদি, তবে | যদি পড়ো, তবে পাশ করবে |
| আকাঙ্ক্ষা | ইচ্ছা বা প্রার্থনা | যেন, হোক | সে যেন আসে |
- ✓ দীর্ঘজীবী হও — অনুজ্ঞা (আশীর্বাদ)
- ✓ আহা, আমি যদি পাখি হতাম — আকাঙ্ক্ষা
অনুজ্ঞা ভাব — আদেশ থেকে প্রার্থনা
অনুজ্ঞা ভাবে ক্রিয়া কেবল আদেশ বোঝায় না; বক্তা ও শ্রোতার সম্পর্ক অনুযায়ী সেটি উপদেশ, অনুরোধ, প্রার্থনা বা আশীর্বাদও হতে পারে। রূপ এক, ভাব আলাদা।
এখানে বসো — আদেশ বা অনুরোধ। সত্য কথা বলো — উপদেশ। দীর্ঘজীবী হও — আশীর্বাদ। ঈশ্বর তোমার মঙ্গল করুন — প্রার্থনা। প্রসঙ্গই ঠিক করে দেয় কোনটি।
অনুজ্ঞা ভাবের একটি গঠনগত বৈশিষ্ট্য হলো কর্তা প্রায়ই উহ্য থাকে। বসো বললেই বোঝা যায় তুমি বসো — কর্তা লেখার দরকার হয় না। এটিই অনুজ্ঞা চেনার সহজ সূত্র।
| ভাব | উদাহরণ |
|---|---|
| আদেশ | এখনই যাও |
| অনুরোধ | একটু বসুন |
| উপদেশ | সত্য কথা বলো |
| আশীর্বাদ | দীর্ঘজীবী হও |
| প্রার্থনা | ঈশ্বর মঙ্গল করুন |
- ✓ বসো — কর্তা “তুমি” উহ্য
- ✓ অনুজ্ঞায় পুরুষভেদে রূপ বদলায় — যা, যাও, যান
সাপেক্ষ ও আকাঙ্ক্ষা ভাব
সাপেক্ষ ভাবে একটি কাজ অন্য একটি কাজের ওপর নির্ভরশীল — অর্থাৎ শর্ত। বাক্যে সাধারণত যদি থাকে এবং তার জোড়া হিসেবে তবে বা তাহলে বসে। যদি পড়ো, তবে পাশ করবে।
আকাঙ্ক্ষা ভাবে বক্তা কোনো ইচ্ছা, প্রার্থনা বা অসম্ভব কল্পনা প্রকাশ করেন। সে যেন আসে — ইচ্ছা। আহা, আমি যদি পাখি হতাম — অসম্ভব কল্পনা। দ্বিতীয়টিতে যদি থাকলেও এটি শর্ত নয়, কারণ কোনো ফল ঘোষিত হয়নি।
এই পার্থক্যটিই পরীক্ষায় সবচেয়ে বেশি ভুল হয়। সূত্র: যদি-র সঙ্গে ফল ঘোষিত হলে সাপেক্ষ; কেবল ইচ্ছা বা কল্পনা থাকলে আকাঙ্ক্ষা।
| বাক্য | ভাব | কারণ |
|---|---|---|
| যদি পড়ো, তবে পাশ করবে | সাপেক্ষ | শর্ত ও ফল দুটিই আছে |
| আহা, আমি যদি পাখি হতাম | আকাঙ্ক্ষা | কেবল কল্পনা, ফল নেই |
| সে যেন আসে | আকাঙ্ক্ষা | ইচ্ছা প্রকাশ |
| যদি বৃষ্টি হয়, খেলা বন্ধ | সাপেক্ষ | শর্ত ও ফল |
- ✓ শর্ত + ফল → সাপেক্ষ
- ✓ কেবল ইচ্ছা → আকাঙ্ক্ষা
ভাব ও কাল একসঙ্গে
একটি ক্রিয়াপদে ভাব ও কাল দুটিই থাকে, তাই প্রশ্নে দুটিই আলাদা করে জানতে চাওয়া হতে পারে। সে বই পড়ছিল — কাল ঘটমান অতীত, ভাব নির্দেশক। তুমি বই পড়ো — কাল বর্তমান, ভাব অনুজ্ঞা।
অনুজ্ঞা ভাবে কাল কেবল বর্তমান ও ভবিষ্যৎ হয়, অতীত হয় না — কারণ অতীতের ঘটনায় আদেশ দেওয়া যায় না। এটি যুক্তিরই ব্যাপার, মুখস্থ করার নয়।
| বাক্য | কাল | ভাব |
|---|---|---|
| সে পড়ছিল | ঘটমান অতীত | নির্দেশক |
| তুমি পড়ো | বর্তমান | অনুজ্ঞা |
| তুমি পড়ো (পরে) | ভবিষ্যৎ | অনুজ্ঞা |
| যদি পড়তে | অতীত | সাপেক্ষ |
- ✓ অনুজ্ঞায় অতীত কাল হয় না
- ✓ একই ক্রিয়ায় কাল ও ভাব দুটিই থাকে
পরীক্ষায় কী আসে
ক্রিয়ার ভাব থেকে প্রশ্ন সাধারণত দুই রকম — সংজ্ঞা ও প্রকারভেদ, অথবা একটি বাক্যের ক্রিয়ার ভাব নির্ণয়। দ্বিতীয়টিতে সাপেক্ষ ও আকাঙ্ক্ষা গুলিয়ে ফেলাই প্রধান ভুল।
মনে রাখার এক লাইনের সূত্র: যদি-র সঙ্গে ফল ঘোষিত হলে সাপেক্ষ, না হলে আকাঙ্ক্ষা। যদি পড়ো, তবে পাশ করবে — ফল আছে, সাপেক্ষ। আমি যদি পাখি হতাম — ফল নেই, আকাঙ্ক্ষা।
দ্বিতীয় সতর্কতা অনুজ্ঞা নিয়ে। কর্তা উহ্য থাকলেই বুঝতে হবে ভাবটি অনুজ্ঞা। বসো, যাও, শোনো — তিনটিতেই কর্তা লেখা নেই, তবু বোঝা যাচ্ছে কাকে বলা হচ্ছে।
- যদি + ফল → সাপেক্ষ; কেবল ইচ্ছা → আকাঙ্ক্ষা।
- কর্তা উহ্য থাকলে ভাবটি অনুজ্ঞা।
- অনুজ্ঞায় অতীত কাল হয় না।
- ✗ “আমি যদি পাখি হতাম” — সাপেক্ষ ✓ আকাঙ্ক্ষা — কোনো ফল ঘোষিত হয়নি
বিস্তারিত আলোচনা
নির্দেশক ভাবে সাধারণভাবে কিছু বর্ণনা বা নির্দেশ করা হয় — "সে বই পড়ে", "আজ বৃষ্টি হচ্ছে"। এটি সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ভাব, এবং বাক্যের অধিকাংশ ক্রিয়াই এই ভাবে থাকে। এখানে বক্তা কেবল ঘটনা জানাচ্ছেন, কোনো আদেশ বা শর্ত আরোপ করছেন না।
অনুজ্ঞা ভাবে আদেশ, উপদেশ, অনুরোধ বা প্রার্থনা বোঝায় — "তুমি পড়ো", "দয়া করে বসুন", "ঈশ্বর তোমার মঙ্গল করুন"। অনুজ্ঞা কেবল মধ্যম ও নাম পুরুষে হয়, উত্তম পুরুষে হয় না — কেউ নিজেকে আদেশ করে না। আর সাপেক্ষ ভাবে একটি ক্রিয়া আরেকটির ওপর নির্ভর করে — "যদি পড়তে, তবে পাশ করতে"।
চতুর্থ ভাব হলো আকাঙ্ক্ষা প্রকাশক বা ইচ্ছাসূচক ভাব, যাতে বক্তার ইচ্ছা বা সম্ভাবনা প্রকাশ পায় — "ইশ, যদি টাকাটা থাকত", "সে হয়তো আসবে"। ভাব নির্ণয়ে বক্তার মনোভাবটিই মূল সূত্র — একই কাল হলেও মনোভাব বদলালে ভাব বদলে যায়, তাই কাল আর ভাবকে এক করে ফেলা চলবে না।
মনে রাখার কথা
কাল জানায় কখন, আর ভাব জানায় বক্তা কোন মনোভাব নিয়ে কথাটি বলছেন — দুটি আলাদা বিষয়।
সাধারণ ভুল
পরীক্ষায় এই ভুলগুলোই সবচেয়ে বেশি নম্বর কাটে। ভুল রূপটি দেখে নিলে নিজের লেখায় ধরা সহজ হয়।
- ✗ “আমি যদি পাখি হতাম” সাপেক্ষ ভাব। ✓ আকাঙ্ক্ষা ভাব — কোনো ফল ঘোষিত হয়নি।
- ✗ অনুজ্ঞা ভাবে অতীত কাল হয়। ✓ হয় না — অতীতের ঘটনায় আদেশ দেওয়া যায় না।
- ✗ ক্রিয়ার ভাব মানে ক্রিয়ার কাল। ✓ কাল জানায় কখন, ভাব জানায় বক্তা কীভাবে দেখছেন।
- ✗ অনুজ্ঞা মানে কেবল আদেশ। ✓ উপদেশ, অনুরোধ, প্রার্থনা ও আশীর্বাদও অনুজ্ঞা।
অনুশীলন
নিচের প্রশ্নগুলোর উত্তর নিজে লেখো, তারপর মিলিয়ে নাও।
- ক্রিয়ার ভাব কাকে বলে?
- ক্রিয়ার ভাব কত প্রকার ও কী কী?
- অনুজ্ঞা ভাব চেনার সহজ সূত্র কী?
- সাপেক্ষ ও আকাঙ্ক্ষা ভাব আলাদা করবে কীভাবে?
- অনুজ্ঞা ভাবে অতীত কাল হয় না কেন?
- “দীর্ঘজীবী হও” — কোন ভাব ও কী প্রকাশ করছে?
- কাল ও ভাবের পার্থক্য এক বাক্যে লেখো।
- নির্দেশক ভাব চেনার চিহ্ন কী?
- অনুজ্ঞা ভাবে পুরুষভেদে রূপ বদলায় কি?
উত্তর
- ক্রিয়া সম্পাদনের ধরন বা বক্তার মনোভাব প্রকাশ করতে ক্রিয়ার যে রূপভেদ হয়, তাকে ক্রিয়ার ভাব বলে।
- চার প্রকার — নির্দেশক, অনুজ্ঞা, সাপেক্ষ ও আকাঙ্ক্ষা ভাব।
- কর্তা প্রায়ই উহ্য থাকে — “বসো” বললেই বোঝা যায় “তুমি বসো”।
- “যদি”-র সঙ্গে ফল ঘোষিত হলে সাপেক্ষ (যদি পড়ো, তবে পাশ করবে); কেবল ইচ্ছা বা কল্পনা থাকলে আকাঙ্ক্ষা (আমি যদি পাখি হতাম)।
- কারণ অতীতে ঘটে যাওয়া ঘটনায় আদেশ বা অনুরোধ করা যায় না — এটি যুক্তিরই ব্যাপার।
- অনুজ্ঞা ভাব, আশীর্বাদ প্রকাশ করছে।
- কাল জানায় কাজটি কখন ঘটল, আর ভাব জানায় বক্তা কাজটিকে কীভাবে দেখছেন — বিবৃতি, আদেশ, শর্ত না ইচ্ছা।
- কোনো বিশেষ চিহ্ন নেই — এটিই তার পরিচয়। সাধারণ বিবৃতি বা প্রশ্ন হলে ভাবটি নির্দেশক, যেমন “সে বই পড়ে” বা “সে কি এসেছে?”।
- বদলায়। তুচ্ছার্থে “যা”, সাধারণে “যাও”, সম্ভ্রমার্থে “যান”, আর নাম পুরুষে “যাক” — একই আদেশ, চার রকম রূপ।
উপযোগী শ্রেণি: নবম, দশম, একাদশ, দ্বাদশ শ্রেণি।
সচরাচর জিজ্ঞাসা
বক্তার মনোভাব অনুযায়ী ক্রিয়ার যে রূপভেদ হয়, তাকে ক্রিয়ার ভাব বলে। বাংলায় এটি চার প্রকার — নির্দেশক, অনুজ্ঞা, সাপেক্ষ ও আকাঙ্ক্ষা প্রকাশক।
কেবল মধ্যম ও নাম পুরুষে হয় — "তুমি পড়ো", "তিনি আসুন"। উত্তম পুরুষে অনুজ্ঞা হয় না, কারণ কেউ নিজেকে আদেশ করে না।
কাল জানায় কাজটি কখন ঘটছে, আর ভাব জানায় বক্তা কোন মনোভাব নিয়ে কথাটি বলছেন — নির্দেশ, আদেশ, শর্ত না ইচ্ছা।
থাকে। প্রতিটি ক্রিয়াপদেই দুটিই আছে — “সে পড়ছিল”-এ কাল ঘটমান অতীত ও ভাব নির্দেশক; “তুমি পড়ো”-তে কাল বর্তমান ও ভাব অনুজ্ঞা। তাই প্রশ্নে দুটিই আলাদা করে জানতে চাওয়া হতে পারে।
আরও বাংলা ব্যাকরণ পড়ো
বাংলা ব্যাকরণ-এর পূর্ণ তালিকা ও বাংলা লেখার অন্যান্য অংশ এক জায়গায়।
আমাদের সাথে যুক্ত থাকো
পড়াশোনার আপডেট, সাজেশন ও প্রশ্নোত্তর সবার আগে পেতে আমাদের ফেসবুক পেজ ও গ্রুপে যুক্ত হও।






















