ক্রিয়ার কাল — বর্তমান, অতীত ও ভবিষ্যৎ
ক্রিয়ার কালের সংজ্ঞা ও তিন কালের বারোটি রূপ — নিত্যবৃত্ত অতীত ও পুরাঘটিত কালসহ উদাহরণ।
সংজ্ঞা
ক্রিয়া সম্পাদনের সময়কে ক্রিয়ার কাল বলে। বাংলায় কাল তিন প্রকার — বর্তমান, অতীত ও ভবিষ্যৎ; প্রত্যেকটির আবার চারটি করে রূপ আছে।
কাজটি কখন ঘটল
ক্রিয়া সম্পাদনের সময়কে ক্রিয়ার কাল বলে। কাজটি এখন ঘটছে, আগে ঘটেছে, নাকি পরে ঘটবে — এই তিনটি সম্ভাবনাই বাংলার তিনটি কাল: বর্তমান, অতীত ও ভবিষ্যৎ।
কাল বোঝা যায় ক্রিয়াবিভক্তি দেখে। করি বর্তমান, করলাম অতীত, করব ভবিষ্যৎ — ধাতু এক (√কর্), কেবল বিভক্তি বদলেছে। তাই কাল নির্ণয় মানে বিভক্তি চেনা।
তিনটি কালের প্রতিটির আবার কয়েকটি উপভাগ আছে, যেগুলো কাজটির অবস্থা জানায় — কাজটি চলছে, শেষ হয়েছে, নাকি অভ্যাসগত। এই উপভাগগুলোই এই অধ্যায়ের আসল আলোচ্য।
- কাল তিনটি — বর্তমান, অতীত, ভবিষ্যৎ।
- কাল বোঝা যায় ক্রিয়াবিভক্তি দেখে।
- প্রতিটি কালের কয়েকটি উপভাগ আছে।
- ✓ করি (বর্তমান), করলাম (অতীত), করব (ভবিষ্যৎ)
- ✓ ধাতু এক √কর্, বিভক্তি ভিন্ন
বর্তমান কালের চার ভাগ
বর্তমান কালে কাজটি এখন ঘটছে বা ঘটে থাকে। চারটি উপভাগ কাজটির অবস্থা আলাদা করে জানায় — সাধারণভাবে ঘটে, এখন চলছে, সদ্য শেষ হয়েছে, নাকি অভ্যাসগতভাবে ঘটে।
বর্তমান কাল
| উপভাগ | কী বোঝায় | উদাহরণ |
|---|---|---|
| সাধারণ বর্তমান | সাধারণভাবে ঘটে | সে বই পড়ে |
| ঘটমান বর্তমান | এখন চলছে | সে বই পড়ছে |
| পুরাঘটিত বর্তমান | সদ্য শেষ হয়েছে | সে বই পড়েছে |
| নিত্যবৃত্ত বর্তমান | অভ্যাসগত | সে রোজ বই পড়ে |
- ✓ সে পড়ছে — ঘটমান বর্তমান
- ✓ সে পড়েছে — পুরাঘটিত বর্তমান
অতীত কালের চার ভাগ
অতীত কালে কাজটি আগে ঘটে গেছে। এখানেও চারটি উপভাগ, আর নিত্যবৃত্ত অতীত উপভাগটি বাংলার একটি সুন্দর বৈশিষ্ট্য — এটি অতীতের অভ্যাস বোঝায়, যা ইংরেজিতে used to দিয়ে বলতে হয়।
সে রোজ স্কুলে যেত — এই একটি শব্দেই বোঝা যাচ্ছে কাজটি অতীতে নিয়মিত ঘটত, এখন আর ঘটে না। বাংলায় আলাদা কোনো শব্দ যোগ না করেই ভাবটি প্রকাশ পায়।
অতীত কাল
| উপভাগ | কী বোঝায় | উদাহরণ |
|---|---|---|
| সাধারণ অতীত | আগে ঘটেছে | সে বই পড়ল |
| ঘটমান অতীত | তখন চলছিল | সে বই পড়ছিল |
| পুরাঘটিত অতীত | আরও আগে শেষ | সে বই পড়েছিল |
| নিত্যবৃত্ত অতীত | অতীতের অভ্যাস | সে রোজ বই পড়ত |
- ✓ সে রোজ স্কুলে যেত — নিত্যবৃত্ত অতীত
- ✓ সে তখন পড়ছিল — ঘটমান অতীত
ভবিষ্যৎ কালের তিন ভাগ
ভবিষ্যৎ কালে কাজটি পরে ঘটবে। এখানে উপভাগ তিনটি — নিত্যবৃত্ত ভবিষ্যৎ বলে আলাদা কোনো রূপ বাংলায় নেই, কারণ ভবিষ্যতের অভ্যাস বোঝাতে সাধারণ ভবিষ্যৎই যথেষ্ট।
ঘটমান ও পুরাঘটিত ভবিষ্যতের রূপ বাংলায় যৌগিক — করতে থাকব, করে থাকব। এক শব্দে প্রকাশ পায় না বলে অনেকে এদের আলাদা কাল বলে চিনতে পারে না।
ভবিষ্যৎ কাল
| উপভাগ | কী বোঝায় | উদাহরণ |
|---|---|---|
| সাধারণ ভবিষ্যৎ | পরে ঘটবে | সে বই পড়বে |
| ঘটমান ভবিষ্যৎ | পরে চলতে থাকবে | সে বই পড়তে থাকবে |
| পুরাঘটিত ভবিষ্যৎ | পরে শেষ হয়ে যাবে | সে বই পড়ে থাকবে |
- ✓ সে পড়তে থাকবে — ঘটমান ভবিষ্যৎ
- ✓ সে পড়ে থাকবে — পুরাঘটিত ভবিষ্যৎ
একই ধাতুর এগারোটি রূপ
কাল ও উপভাগ মিলিয়ে একটি ধাতু থেকে এগারোটি আলাদা রূপ পাওয়া যায়। ছকটি একবার লিখে ফেললে কাল নির্ণয়ের যেকোনো প্রশ্নের উত্তর মিলে যায়, কারণ বিভক্তির চেহারাই কালটি বলে দেয়।
√কর্ ধাতু, উত্তম পুরুষ
| কাল | সাধারণ | ঘটমান | পুরাঘটিত | নিত্যবৃত্ত |
|---|---|---|---|---|
| বর্তমান | করি | করছি | করেছি | করি |
| অতীত | করলাম | করছিলাম | করেছিলাম | করতাম |
| ভবিষ্যৎ | করব | করতে থাকব | করে থাকব | — |
- ✓ করছিলাম — ঘটমান অতীত
- ✓ করতাম — নিত্যবৃত্ত অতীত
- ✗ করেছিলাম ঘটমান অতীত ✓ করেছিলাম পুরাঘটিত অতীত
পরীক্ষায় কী আসে
কাল অধ্যায় থেকে প্রশ্ন সাধারণত দুই রকম — একটি বাক্যের ক্রিয়ার কাল নির্ণয়, অথবা একটি কালের রূপ লিখতে বলা। দুটিতেই বিভক্তির চেহারা চেনাই আসল কাজ।
সবচেয়ে বেশি ভুল হয় ঘটমান ও পুরাঘটিত অতীতে। করছিলাম মানে তখন চলছিল (ঘটমান), আর করেছিলাম মানে তারও আগে শেষ হয়েছিল (পুরাঘটিত)। ছিলাম অংশটি দুটিতেই আছে, তাই আগের অক্ষরটি দেখতে হয় — ছ থাকলে ঘটমান, এ থাকলে পুরাঘটিত।
দ্বিতীয় সতর্কতা নিত্যবৃত্ত বর্তমান নিয়ে। এর রূপ সাধারণ বর্তমানের সমান (করি), তাই কেবল বাক্যের অর্থ দেখে আলাদা করতে হয় — রোজ, প্রতিদিন, সবসময় জাতীয় শব্দ থাকলে সেটি নিত্যবৃত্ত।
- ছিলাম-এর আগে ছ → ঘটমান; এ → পুরাঘটিত।
- রোজ, প্রতিদিন থাকলে নিত্যবৃত্ত।
- কাল নির্ণয় মানে বিভক্তি চেনা।
- ✗ করেছিলাম — ঘটমান অতীত ✓ করেছিলাম — পুরাঘটিত অতীত
কাল বদলালে বাক্যের অর্থ কতটা বদলায়
কাল কেবল ব্যাকরণের শ্রেণিবিভাগ নয় — একটি বাক্যের কাল বদলে দিলে তার বক্তব্যই বদলে যায়। সে আসে, সে আসছে, সে এসেছে, সে এসেছিল — চারটি বাক্যে একই কর্তা ও একই ধাতু, অথচ চারটি আলাদা বাস্তবতা।
রচনা বা প্রতিবেদন লেখার সময় এই পার্থক্যটিই সবচেয়ে বেশি কাজে লাগে। ঘটনার বর্ণনায় অতীত কাল, সাধারণ সত্য বা নিয়ম বোঝাতে বর্তমান কাল, আর পরিকল্পনা বা সুপারিশে ভবিষ্যৎ কাল বসে।
একটি অনুচ্ছেদে কাল হঠাৎ বদলে গেলে লেখা এলোমেলো শোনায় — একে বলে কালের অসঙ্গতি। সে এল এবং বসে অশুদ্ধ; হবে সে এল এবং বসল। পরীক্ষায় বাক্য শুদ্ধিকরণে এই ভুলটিই বেশি ধরা হয়।
| লেখার ধরন | যে কাল বসে | উদাহরণ |
|---|---|---|
| ঘটনার বর্ণনা | অতীত | সে এল, দেখল, চলে গেল |
| সাধারণ সত্য | বর্তমান | সূর্য পূর্ব দিকে ওঠে |
| অভ্যাস | নিত্যবৃত্ত | সে রোজ হাঁটে |
| পরিকল্পনা / সুপারিশ | ভবিষ্যৎ | আমরা বৃক্ষরোপণ করব |
- ✗ সে এল এবং বসে ✓ সে এল এবং বসল — কালের সঙ্গতি
- ✓ সূর্য পূর্ব দিকে ওঠে — চিরন্তন সত্যে বর্তমান কাল
বিস্তারিত আলোচনা
বর্তমান কালের চারটি রূপ। সাধারণ বর্তমানে অভ্যাস বা চিরন্তন সত্য বোঝায় — "সে রোজ হাঁটে", "সূর্য পূর্বে ওঠে"। ঘটমান বর্তমানে কাজ চলছে বোঝায় — "সে হাঁটছে"। পুরাঘটিত বর্তমানে কাজ সদ্য শেষ হয়েছে — "সে হেঁটেছে"। আর অনুজ্ঞা বর্তমানে আদেশ বা অনুরোধ বোঝায় — "তুমি হাঁটো"।
অতীত কালের চারটি রূপ একইভাবে সাজানো। সাধারণ অতীত — "সে হাঁটল"। ঘটমান অতীত — "সে হাঁটছিল"। পুরাঘটিত অতীত, যেখানে অতীতের দুটি কাজের একটি আগে ঘটেছে — "সে হেঁটেছিল"। আর নিত্যবৃত্ত অতীত, যা অতীতের অভ্যাস বোঝায় — "সে রোজ হাঁটত"। এই শেষ রূপটি বাংলার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য, ইংরেজিতে যার সরাসরি সমান্তরাল নেই।
ভবিষ্যৎ কালেরও চারটি রূপ — সাধারণ ভবিষ্যৎ ("সে হাঁটবে"), ঘটমান ভবিষ্যৎ ("সে হাঁটতে থাকবে"), পুরাঘটিত ভবিষ্যৎ ("সে হেঁটে থাকবে") এবং অনুজ্ঞা ভবিষ্যৎ ("তুমি কাল হেঁটো")। বাক্যে কাল নির্ণয় করতে হলে ক্রিয়াপদের বিভক্তিটি দেখতে হয়, কারণ কালের সব তথ্য ওই বিভক্তিতেই লুকানো থাকে।
মনে রাখার কথা
ক্রিয়ার শেষ অংশটুকু অর্থাৎ বিভক্তি দেখেই কাল নির্ণয় করতে হয়, বাক্যের অন্য শব্দ দেখে নয়।
সাধারণ ভুল
পরীক্ষায় এই ভুলগুলোই সবচেয়ে বেশি নম্বর কাটে। ভুল রূপটি দেখে নিলে নিজের লেখায় ধরা সহজ হয়।
- ✗ “করেছিলাম” ঘটমান অতীত। ✓ পুরাঘটিত অতীত — ঘটমান হলো করছিলাম।
- ✗ বাংলায় ভবিষ্যৎ কালের চারটি উপভাগ আছে। ✓ তিনটি — নিত্যবৃত্ত ভবিষ্যতের আলাদা রূপ নেই।
- ✗ “সে রোজ পড়ে” সাধারণ বর্তমান। ✓ নিত্যবৃত্ত বর্তমান — “রোজ” অভ্যাস বোঝাচ্ছে।
- ✗ কাল নির্ণয়ে ধাতু দেখতে হয়। ✓ ধাতু অপরিবর্তিত থাকে; কাল বোঝা যায় বিভক্তি দেখে।
অনুশীলন
নিচের প্রশ্নগুলোর উত্তর নিজে লেখো, তারপর মিলিয়ে নাও।
- ক্রিয়ার কাল কাকে বলে ও কত প্রকার?
- বর্তমান কালের চারটি উপভাগ লেখো।
- “সে রোজ স্কুলে যেত” — কোন কাল?
- “করছিলাম” ও “করেছিলাম” — পার্থক্য কী?
- ভবিষ্যৎ কালে কয়টি উপভাগ ও কেন?
- নিত্যবৃত্ত বর্তমান কীভাবে চিনবে?
- ঘটমান ভবিষ্যতের রূপ কেমন?
- কালের অসঙ্গতি কাকে বলে?
উত্তর
- ক্রিয়া সম্পাদনের সময়কে ক্রিয়ার কাল বলে। এটি তিন প্রকার — বর্তমান, অতীত ও ভবিষ্যৎ।
- সাধারণ বর্তমান (পড়ে), ঘটমান বর্তমান (পড়ছে), পুরাঘটিত বর্তমান (পড়েছে) ও নিত্যবৃত্ত বর্তমান (রোজ পড়ে)।
- নিত্যবৃত্ত অতীত। এটি অতীতের অভ্যাস বোঝায়, যা ইংরেজিতে used to দিয়ে বলতে হয়।
- “করছিলাম” ঘটমান অতীত, কাজটি তখন চলছিল; “করেছিলাম” পুরাঘটিত অতীত, কাজটি তারও আগে শেষ হয়েছিল।
- তিনটি — সাধারণ, ঘটমান ও পুরাঘটিত। নিত্যবৃত্ত ভবিষ্যতের আলাদা রূপ বাংলায় নেই, সাধারণ ভবিষ্যৎই সে কাজ করে।
- রূপ সাধারণ বর্তমানের সমান, তাই বাক্যে “রোজ”, “প্রতিদিন” বা “সবসময়” জাতীয় শব্দ আছে কি না দেখতে হয়।
- যৌগিক — “করতে থাকব”, “পড়তে থাকবে”। এক শব্দে প্রকাশ পায় না।
- একটি বাক্য বা অনুচ্ছেদে কাল হঠাৎ বদলে গেলে তাকে কালের অসঙ্গতি বলে — যেমন “সে এল এবং বসে” অশুদ্ধ, শুদ্ধ হবে “সে এল এবং বসল”।
উপযোগী শ্রেণি: নবম, দশম, একাদশ, দ্বাদশ শ্রেণি।
সচরাচর জিজ্ঞাসা
ক্রিয়া সম্পাদনের সময়কে ক্রিয়ার কাল বলে। বাংলায় কাল তিন প্রকার — বর্তমান, অতীত ও ভবিষ্যৎ, আর প্রত্যেকটির চারটি করে রূপ আছে।
যে অতীত কাল দিয়ে অতীতের নিয়মিত অভ্যাস বোঝায়, তাকে নিত্যবৃত্ত অতীত বলে — যেমন "সে রোজ সকালে হাঁটত", "আমরা তখন গ্রামে থাকতাম"।
পুরাঘটিত বর্তমানে কাজ সদ্য শেষ হয়েছে ও তার ফল এখনও আছে ("সে হেঁটেছে"); সাধারণ অতীতে কাজটি নিছক অতীতে ঘটেছে ("সে হাঁটল")।
“ছিলাম”-এর আগের অক্ষরটি দেখো। “ছ” থাকলে ঘটমান অতীত (করছিলাম — তখন চলছিল), আর “এ” থাকলে পুরাঘটিত অতীত (করেছিলাম — তারও আগে শেষ হয়েছিল)।
আরও বাংলা ব্যাকরণ পড়ো
বাংলা ব্যাকরণ-এর পূর্ণ তালিকা ও বাংলা লেখার অন্যান্য অংশ এক জায়গায়।
আমাদের সাথে যুক্ত থাকো
পড়াশোনার আপডেট, সাজেশন ও প্রশ্নোত্তর সবার আগে পেতে আমাদের ফেসবুক পেজ ও গ্রুপে যুক্ত হও।






















