অব্যয়ীভাব সমাস — নিয়ম ও উদাহরণ
অব্যয়ীভাব সমাসের সংজ্ঞা, অব্যয়ের অর্থভেদ এবং তৎপুরুষের সঙ্গে পার্থক্য।
সংজ্ঞা
পূর্বপদে অব্যয় থেকে যে সমাসে অব্যয়ের অর্থই প্রধান থাকে, তাকে অব্যয়ীভাব সমাস বলে। সমস্তপদটি সাধারণত ক্রিয়াবিশেষণের মতো কাজ করে।
পূর্বপদ অব্যয়, তার অর্থই প্রধান
যে সমাসে পূর্বপদ একটি অব্যয় এবং সেই অব্যয়ের অর্থই প্রধান থাকে, তাকে অব্যয়ীভাব সমাস বলে। মিলের অভাব মিলে গরমিল — এখানে গর অব্যয়ের অভাব-অর্থটিই শব্দটির প্রাণ।
ছয়টি সমাসের মধ্যে এটিই একমাত্র যেখানে পূর্বপদের অর্থ প্রধান। দ্বন্দ্বে উভয়, বহুব্রীহিতে অন্য পদ, বাকি তিনটিতে পরপদ — আর অব্যয়ীভাবে পূর্বপদ। এই একটি তথ্যই প্রকার চেনার সবচেয়ে বড় সূত্র।
নামটিও কাজটি বলে দেয়। অব্যয়ীভাব মানে অব্যয়ের ভাব — অর্থাৎ সমস্ত পদটি অব্যয়ের মতো আচরণ করে এবং সাধারণত ক্রিয়াবিশেষণ হিসেবে বসে।
- পূর্বপদ একটি অব্যয়।
- পূর্বপদের অর্থই প্রধান — ছয় সমাসের মধ্যে একমাত্র।
- সমস্তপদ প্রায়ই ক্রিয়াবিশেষণ হিসেবে বসে।
- ✓ মিলের অভাব = গরমিল
- ✓ কণ্ঠ পর্যন্ত = আকণ্ঠ
- ✗ গরমিল তৎপুরুষ ✓ গরমিল অব্যয়ীভাব — পূর্বপদের অর্থ প্রধান
অব্যয়ীভাব কী কী অর্থ প্রকাশ করে
অব্যয়ীভাব সমাসের প্রকারভেদ হয় অর্থ অনুযায়ী, আর পরীক্ষায় ঠিক এই অর্থটিই জানতে চাওয়া হয়। কোন অব্যয় কোন ভাব আনছে তা জানা থাকলে উত্তর সঙ্গে সঙ্গে মেলে।
অর্থ অনুযায়ী অব্যয়ীভাব
| অর্থ | অব্যয় | উদাহরণ |
|---|---|---|
| অভাব | নির্, গর, বে | নির্ভুল, গরমিল, নির্ঝঞ্ঝাট |
| পর্যন্ত | আ | আকণ্ঠ, আমরণ, আজীবন |
| সামীপ্য | উপ | উপকূল, উপনগর |
| সাদৃশ্য | উপ | উপবন, উপগ্রহ |
| ঈষৎ | আ | আরক্ত, আভাস |
| বীপ্সা (প্রত্যেক) | প্রতি | প্রতিদিন, প্রতিবার |
| অনতিক্রম্যতা | যথা | যথারীতি, যথাসাধ্য |
| পশ্চাৎ | অনু | অনুগমন, অনুতাপ |
- ✓ ভুলের অভাব = নির্ভুল — অভাব অর্থে
- ✓ দিন দিন = প্রতিদিন — বীপ্সা অর্থে
- ✓ রীতিকে অতিক্রম না করে = যথারীতি — অনতিক্রম্যতা
অব্যয়ীভাব বনাম বহুব্রীহি — নঞ নিয়ে ফাঁদ
না-বোধক পূর্বপদ দেখলে অব্যয়ীভাব ও নঞ বহুব্রীহি দুটিই সম্ভব, আর এখানেই সবচেয়ে বেশি ভুল হয়। পার্থক্য অর্থে: অব্যয়ীভাবে অভাবটিই মূল কথা, আর বহুব্রীহিতে অভাব দিয়ে কোনো ব্যক্তি বা বস্তু বোঝানো হয়।
নির্ভুল মানে ভুলের অভাব — অভাবটিই বক্তব্য, তাই অব্যয়ীভাব। নিরক্ষর মানে নাই অক্ষর যার, অর্থাৎ একজন মানুষ — অর্থ তৃতীয় কারও দিকে গেছে, তাই বহুব্রীহি। ব্যাসবাক্যে যার আছে কি না দেখলেই ফয়সালা হয়।
| সমস্তপদ | ব্যাসবাক্য | প্রকার |
|---|---|---|
| নির্ভুল | ভুলের অভাব | অব্যয়ীভাব |
| নির্ঝঞ্ঝাট | ঝঞ্ঝাটের অভাব | অব্যয়ীভাব |
| নিরক্ষর | নাই অক্ষর যার | বহুব্রীহি |
| বেহুঁশ | নাই হুঁশ যার | বহুব্রীহি |
- ✓ ব্যাসবাক্যে “অভাব” → অব্যয়ীভাব
- ✓ ব্যাসবাক্যে “যার” → বহুব্রীহি
উপ ও আ — দুটি বহুমুখী অব্যয়
উপ আর আ — এই দুটি অব্যয় একাধিক অর্থে বসে, তাই এদের নিয়ে আলাদা করে সতর্ক থাকা দরকার। উপ কখনো সামীপ্য বোঝায় (উপকূল — কূলের সমীপে), কখনো সাদৃশ্য (উপবন — বনের তুল্য), কখনো ক্ষুদ্রতা (উপগ্রহ)।
আ কখনো পর্যন্ত বোঝায় (আকণ্ঠ — কণ্ঠ পর্যন্ত, আমরণ — মৃত্যু পর্যন্ত), কখনো ঈষৎ বা সামান্য (আরক্ত — ঈষৎ রক্তবর্ণ)। কোন অর্থে বসেছে তা বাক্য বা প্রসঙ্গ দেখে ঠিক করতে হয়।
পরীক্ষায় শুধু প্রকার নয়, অর্থটিও জানতে চাওয়া হয়। তাই উত্তরে “অব্যয়ীভাব সমাস” লিখে থামলে হবে না — কোন অর্থে, সেটিও লিখতে হবে।
| অব্যয় | অর্থ | উদাহরণ |
|---|---|---|
| উপ | সামীপ্য | উপকূল, উপনগর |
| উপ | সাদৃশ্য | উপবন |
| উপ | ক্ষুদ্রতা | উপগ্রহ, উপনদী |
| আ | পর্যন্ত | আকণ্ঠ, আমরণ, আজীবন |
| আ | ঈষৎ | আরক্ত, আভাস |
- ✓ কূলের সমীপে = উপকূল — সামীপ্য
- ✓ বনের তুল্য = উপবন — সাদৃশ্য
সমস্তপদ কোন পদ হয়
অব্যয়ীভাব সমাসে গঠিত পদটি সাধারণত ক্রিয়াবিশেষণ হিসেবে বাক্যে বসে — অর্থাৎ ক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত হয়ে সময়, পরিমাণ বা ধরন বোঝায়। আমরণ সংগ্রাম করেছেন, যথাসাধ্য চেষ্টা করো, প্রতিদিন আসে — তিনটিতেই সমস্তপদটি ক্রিয়াকে বিশেষিত করছে।
কখনো আবার বিশেষণ হিসেবেও বসে — নির্ভুল উত্তর, নিরুপায় মানুষ। পদশ্রেণি জিজ্ঞাসা করা হলে বাক্যে শব্দটি কী কাজ করছে তা দেখে সিদ্ধান্ত নিতে হয়।
- সাধারণত ক্রিয়াবিশেষণ — আমরণ, যথারীতি, প্রতিদিন।
- কখনো বিশেষণ — নির্ভুল, নিরুপায়।
- পদশ্রেণি বাক্যের কাজ দেখে ঠিক হয়।
- ✓ তিনি আমরণ সংগ্রাম করেছেন — ক্রিয়াবিশেষণ
- ✓ এটি একটি নির্ভুল উত্তর — বিশেষণ
পরীক্ষায় কী আসে
অব্যয়ীভাব থেকে প্রশ্ন সাধারণত দুই রকম — সংজ্ঞা ও অর্থভেদে উদাহরণ, অথবা একটি সমস্তপদ দিয়ে ব্যাসবাক্য ও অর্থ নির্ণয়। দ্বিতীয়টিতে অর্থ না লিখলে উত্তর অসম্পূর্ণ থাকে।
মনে রাখার সবচেয়ে কাজের সূত্রটি হলো অর্থপ্রাধান্য। ছয় সমাসের মধ্যে কেবল অব্যয়ীভাবেই পূর্বপদের অর্থ প্রধান — এই একটি বাক্য মনে থাকলে অন্য সমাসের সঙ্গে গুলিয়ে যাওয়ার সুযোগ কমে যায়।
দ্বিতীয় সতর্কতা নঞ নিয়ে। ব্যাসবাক্যে অভাব থাকলে অব্যয়ীভাব, আর যার থাকলে বহুব্রীহি। নির্ভুল ও নিরক্ষর — এই জোড়াটি উদাহরণ হিসেবে মনে রাখলে পার্থক্য আর ভোলা যায় না।
- ছয় সমাসে একমাত্র অব্যয়ীভাবে পূর্বপদের অর্থ প্রধান।
- ব্যাসবাক্যে অভাব → অব্যয়ীভাব; যার → বহুব্রীহি।
- উত্তরে প্রকার + অর্থ দুটিই লেখো।
- ✗ উত্তর: অব্যয়ীভাব সমাস। ✓ উত্তর: অব্যয়ীভাব, অভাব অর্থে — ভুলের অভাব = নির্ভুল।
অব্যয়ীভাব সমস্তপদ বাক্যে কীভাবে বসে
অব্যয়ীভাব সমাসে গঠিত পদটি বাক্যে সাধারণত ক্রিয়াবিশেষণের কাজ করে — অর্থাৎ ক্রিয়াকে বিশেষিত করে সময়, পরিমাণ বা ধরন বোঝায়। তিনি আমরণ সংগ্রাম করেছেন — এখানে আমরণ সংগ্রামের ব্যাপ্তি বোঝাচ্ছে।
কখনো আবার বিশেষণ হিসেবেও বসে — নির্ভুল উত্তর, নিরুপায় মানুষ, যথাযোগ্য ব্যবস্থা। এখানে শব্দটি একটি বিশেষ্যকে বিশেষিত করছে, ক্রিয়াকে নয়।
পদশ্রেণি জিজ্ঞাসা করা হলে বাক্যে শব্দটি কী কাজ করছে তা দেখে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। একই সমস্তপদ এক বাক্যে ক্রিয়াবিশেষণ, অন্য বাক্যে বিশেষণ হতে পারে।
| বাক্য | সমস্তপদ | পদশ্রেণি |
|---|---|---|
| তিনি আমরণ সংগ্রাম করেছেন | আমরণ | ক্রিয়াবিশেষণ |
| যথারীতি কাজ হলো | যথারীতি | ক্রিয়াবিশেষণ |
| এটি নির্ভুল উত্তর | নির্ভুল | বিশেষণ |
| যথাযোগ্য ব্যবস্থা নেওয়া হলো | যথাযোগ্য | বিশেষণ |
- ✓ ক্রিয়াকে বিশেষিত করলে ক্রিয়াবিশেষণ
- ✓ বিশেষ্যকে বিশেষিত করলে বিশেষণ
বিস্তারিত আলোচনা
অব্যয়ীভাব সমাসে পূর্বপদ হয় একটি অব্যয় — উপ, অনু, প্রতি, আ, নির়, যথা, সম প্রভৃতি। সেই অব্যয়ের অর্থই সমস্তপদে প্রধান থাকে। যেমন কূলের সমীপে = উপকূল, বীণার পশ্চাতে = অনুবীণা, দিন দিন = প্রতিদিন, মরণ পর্যন্ত = আমরণ।
অব্যয়টি কোন অর্থে বসেছে, সেটিও পরীক্ষায় জিজ্ঞাসা করা হয়। "উপ" সামীপ্য বোঝায় — উপকূল, উপকণ্ঠ। "অনু" পশ্চাৎ বা অনুরূপ বোঝায় — অনুগমন, অনুরূপ। "প্রতি" বীপ্সা অর্থাৎ পুনঃপুন বোঝায় — প্রতিদিন, প্রতিক্ষণ। "যথা" সাদৃশ্য বোঝায় — যথাসময়, যথারীতি। "নির়" অভাব বোঝায় — নির্বিঘ্ন, নিরুপায়।
অব্যয়ীভাব সমাসকে তৎপুরুষ থেকে আলাদা করতে হলে দেখতে হবে কোন পদ প্রধান। তৎপুরুষে পরপদ প্রধান, আর অব্যয়ীভাবে পূর্বপদ অর্থাৎ অব্যয়টিই প্রধান। "উপকূল" মানে কূলের সমীপবর্তী অঞ্চল — এখানে "সমীপ" ভাবটিই মুখ্য, কূল নয়। তেমনি "প্রতিদিন" মানে প্রতিটি দিন, যেখানে পুনরাবৃত্তির ভাবটিই আসল কথা বলছে।
মনে রাখার কথা
পূর্বপদ অব্যয় এবং সেই অব্যয়ের অর্থই প্রধান — দুটো মিললে তবেই অব্যয়ীভাব।
সাধারণ ভুল
পরীক্ষায় এই ভুলগুলোই সবচেয়ে বেশি নম্বর কাটে। ভুল রূপটি দেখে নিলে নিজের লেখায় ধরা সহজ হয়।
- ✗ “নিরক্ষর” অব্যয়ীভাব সমাস। ✓ নঞ বহুব্রীহি — ব্যাসবাক্য “নাই অক্ষর যার”।
- ✗ অব্যয়ীভাবে পরপদের অর্থ প্রধান। ✓ পূর্বপদের অর্থ প্রধান — ছয় সমাসের মধ্যে একমাত্র।
- ✗ “গরমিল” তৎপুরুষ সমাস। ✓ অব্যয়ীভাব — পূর্বপদ গর একটি অব্যয়।
- ✗ “উপবন” মানে বনের সমীপে। ✓ “বনের তুল্য” — এখানে উপ সাদৃশ্য অর্থে।
অনুশীলন
নিচের প্রশ্নগুলোর উত্তর নিজে লেখো, তারপর মিলিয়ে নাও।
- অব্যয়ীভাব সমাস কাকে বলে?
- ছয় সমাসের মধ্যে অব্যয়ীভাবের বিশেষত্ব কী?
- ব্যাসবাক্য ও অর্থ লেখো: আকণ্ঠ।
- “নির্ভুল” ও “নিরক্ষর” — দুটির প্রকার আলাদা কেন?
- “উপ” অব্যয়টি কোন কোন অর্থে বসে?
- বীপ্সা অর্থে অব্যয়ীভাবের উদাহরণ দাও।
- অব্যয়ীভাব সমাসে গঠিত পদ বাক্যে কী কাজ করে?
- অব্যয়ীভাব সমাসের নামটির অর্থ কী?
উত্তর
- যে সমাসে পূর্বপদ একটি অব্যয় এবং সেই অব্যয়ের অর্থই প্রধান থাকে, তাকে অব্যয়ীভাব সমাস বলে।
- এটিই একমাত্র সমাস যেখানে পূর্বপদের অর্থ প্রধান — বাকিগুলোতে উভয়, পরপদ বা অন্য পদের অর্থ প্রধান।
- কণ্ঠ পর্যন্ত। এখানে আ অব্যয়টি “পর্যন্ত” অর্থে বসেছে।
- নির্ভুল মানে ভুলের অভাব, অভাবটিই বক্তব্য, তাই অব্যয়ীভাব; নিরক্ষর মানে নাই অক্ষর যার, অর্থ ব্যক্তির দিকে গেছে, তাই বহুব্রীহি।
- সামীপ্য (উপকূল), সাদৃশ্য (উপবন) ও ক্ষুদ্রতা (উপগ্রহ) — তিন অর্থেই বসে।
- প্রতিদিন ও প্রতিবার — এখানে প্রতি অব্যয়টি “প্রত্যেক” অর্থে বসেছে।
- সাধারণত ক্রিয়াবিশেষণ হিসেবে বসে (আমরণ, যথারীতি), কখনো বিশেষণ হিসেবেও (নির্ভুল উত্তর)।
- “অব্যয়ের ভাব” — অর্থাৎ সমস্ত পদটি অব্যয়ের মতো আচরণ করে এবং বাক্যে সাধারণত ক্রিয়াবিশেষণ হিসেবে বসে।
উপযোগী শ্রেণি: নবম, দশম, একাদশ, দ্বাদশ শ্রেণি।
সচরাচর জিজ্ঞাসা
পূর্বপদে অব্যয় থেকে যে সমাসে অব্যয়ের অর্থই প্রধান থাকে, তাকে অব্যয়ীভাব সমাস বলে — যেমন কূলের সমীপে = উপকূল, দিন দিন = প্রতিদিন।
বীপ্সা অর্থাৎ পুনঃপুন বা প্রত্যেক অর্থে — যেমন প্রতিদিন, প্রতিক্ষণ, প্রতিবার। এখানে পুনরাবৃত্তির ভাবটিই প্রধান।
তৎপুরুষে পরপদের অর্থ প্রধান, আর অব্যয়ীভাবে পূর্বপদের অর্থাৎ অব্যয়ের অর্থ প্রধান। "উপকূল"-এ সমীপ ভাবটিই মুখ্য, কূল নয়।
ছয়টি সমাসের মধ্যে এটিই একমাত্র যেখানে পূর্বপদের অর্থ প্রধান। দ্বন্দ্বে উভয় পদের, বহুব্রীহিতে অন্য পদের, আর বাকি তিনটিতে পরপদের অর্থ প্রধান থাকে।
আরও বাংলা ব্যাকরণ পড়ো
বাংলা ব্যাকরণ-এর পূর্ণ তালিকা ও বাংলা লেখার অন্যান্য অংশ এক জায়গায়।
আমাদের সাথে যুক্ত থাকো
পড়াশোনার আপডেট, সাজেশন ও প্রশ্নোত্তর সবার আগে পেতে আমাদের ফেসবুক পেজ ও গ্রুপে যুক্ত হও।






















